কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে বিধানচন্দ্র রায়ের পিতামাতার ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। ধর্ম-সাধনার ক্ষেত্রে তাঁরা সকলেই রাজা রামমোহন রায়ের আদর্শ ও পথকে গ্রহণ করেছিলেন, অর্থাৎ তাঁরা ব্রাহ্ম ছিলেন। বর্তমানে প্রায় সকলেই অবগত রয়েছে যে, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের প্রচেষ্টায় ব্রাহ্মধর্মের প্রবর্তক রামমোহনের ভাবধারা ভারতে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল। তাঁর প্রতি বিধান রায়ের মা অঘোরকামিনী ও পিতা প্রকাশচন্দ্রের গভীর শ্রদ্ধা-ভক্তি ছিল। ১৮৮৬ সালের জুন মাসে বিধান রায়ের পিতামাতা যখন দার্জিলিং ভ্রমণে গিয়াছিলেন, তখন যাত্রাপথে কার্শিয়াঙে প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের শৈলাশ্রমে গিয়ে তাঁরা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং নিজেদের অন্যান্য ধর্মবন্ধুদের সঙ্গে তাঁরা সেখানে উপাসনায় যোগদান করেছিলেন। প্রতাপচন্দ্রের উপাসনা তাঁদের প্রাণকে স্পর্শ করেছিল। এরপরে তাঁরা মহর্ষির দর্শন পেয়েছিলেন। পরে সেই ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বিধান রায়ের পিতা তাঁর ‘অঘোর-প্রকাশ’ নামক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে
লিখেছিলেন—
“তখন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ তথায় ছিলেন। একদিন তাঁহাকে দেখিতে যাইবার প্রস্তাব হইল। তোমার (অঘোরকামিনীর) ইচ্ছা ছিল, সকলের সঙ্গে হাঁটিয়া যাইবে। যখন গৃহ হইতে যাত্রা করা হয়, আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম না। অন্যান্য গুরুজনগণ মীমাংসা করিলেন, নারীর পক্ষে পদব্রজে যাওয়া অবিধেয়। তাই তোমাকে ভাণ্ডিতে যাইতে হইল। তাঁহাদের এই আদেশ পালন করিতে গিয়া তোমার চক্ষু অশ্রুপূর্ণ হইয়াছিল। তুমি ভাণ্ডিতে চড়িয়া কিছুদূর গিয়া পরে হাঁটিয়া চলিলে। মহর্ষির উজ্জ্বল ভাব, তাঁহার উৎসাহ ও আমাদের প্রতিজনের প্রতি সম্ভাষণ দেখিয়া মুগ্ধ হইয়া গেলে। আমাকে তোমাদের রাখিয়া কিছু আগেই মতিহারী চলিয়া আসিতে হইল। তোমরা ২২শে জুন ফিরিয়া আসিলে।”
১৯০৫ সালের ১৯শে জানুয়ারি তারিখে দেবেন্দ্রনাথের তিরোধানের পরে প্রকাশচন্দ্র একবার শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তৎকালীন ব্রাহ্মসমাজে সুপরিচিত ও সমাদৃত রায় পরিবার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ আগে থেকেই সম্যকভাবে অবগত ছিলেন। তাই তিনি সেদিন তাঁর পূজনীয় অতিথিকে সশ্রদ্ধ সমাদরে সেখানে স্বাগত জানিয়েছিলেন। সেবারে প্রকাশচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের সাথে সেখানে কিছুদিন কাটিয়েছিলেন। এরপরেই প্রকাশচন্দ্রের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে রায়-পরিবারের যে প্রীতি ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, প্রকাশচন্দ্রের পুত্র বিধানচন্দ্র সেটাকে কখনো ক্ষুণ্ণ হতে দেননি। বরং তাঁর পিতার পরে তিনি সেই সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ এবং গাঢ় করে তুলেছিলেন। অন্যদিকে লোকাতীত প্রতিভার অধিকারী রবীন্দ্রনাথও গুণগ্রহিতায় কখনও পশ্চাৎপদ ছিলেন না। প্রতিভাশালীর প্রতিভা এবং গুণিজনের গুণ— তাঁর কাছে সবসময়েই উপযুক্ত সমাদর পেয়েছিল। একজন চিকিৎসা-বিজ্ঞানীরূপে বিধানচন্দ্র নিজের যে প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন, একজন অধ্যাপকরূপে তিনি যে সুখ্যাতি লাভ করেছিলেন, একজন জনসেবকরূপে বিবিধ জনসেবার ক্ষেত্রে নিরলস ও নিঃস্বার্থ কর্মানুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে তিনি যেভাবে লোকপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন এবং রাজনীতিক্ষেত্রে প্রবেশ করে কর্মকুশলতা, আদর্শ-নিষ্ঠা ও সৎসাহসের বলে অল্প সময়ের মধ্যে যে সম্মান ও মর্যাদা পেয়েছিলেন— সেসব রবীন্দ্রনাথেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তাই রবীন্দ্রনাথের স্নেহ, শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ পেয়ে বিধানচন্দ্রও ধন্য হয়েছিলেন।
১৯২৫ সালের ১৬ই জুন তারিখে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের মহাপ্রয়াণের পরে তাঁর শেষশয্যায় শায়িত অবস্থার একটি আলোকচিত্র তোলা হয়েছিল এবং সেটার উপরে রবীন্দ্রনাথ তাঁর রচিত চারছত্রের ছোট্ট একটি মমস্পর্শী কবিতা নিজের হাতে লিখে দিয়ে স্বাক্ষর করে দিয়েছিলেন। এরপরে দেশবন্ধুর স্মৃতি-রক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে ওই আলোকচিত্রের ব্লক করে মুদ্রিত প্রতিলিপির ব্যাপকভাবে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেই ছবির কয়েক লক্ষ কপি বিক্রি হয়ে গিয়েছিল এবং সেই বিক্রয়-লব্ধ অর্থ ‘চিত্তরঞ্জন সেবাসদন’ ভাণ্ডারে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রধানতঃ ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ই নিজে উদ্যোগী হয়ে দেশবন্ধু স্মৃতি-রক্ষা কমিটির পক্ষে অর্থ-সংগ্রহ করবার জন্য ওই ব্যবস্থা করেছিলেন। অতীতে এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক, সাহিত্যিক এবং বিশ্বভারতী প্রকাশন বিভাগের অধ্যক্ষ চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য, বিধানচন্দ্র রায়ের জীবনীলেখক নগেন্দ্রকুমার গুহ রায়কে ১৯৫৭ সালের ১৪ই মে তারিখে লিখিত একটি পত্রে জানিয়েছিলেন—
“শ্রদ্ধাস্পদেষু—
আপনার পত্র পাইয়া অনুগৃহীত হইলাম। আমার শুধু একটা ঘটনা জানা আছে, বলিতেছি।
চিত্তরঞ্জন দাশ মারা গিয়েছেন। তাঁর একটা ছবি নিয়ে বিধানচন্দ্র রায় কবির কাছে গিয়ে বললেন,—
এর উপর একটা কবিতা লিখে দিন।
ডাক্তার, এ তো প্রেস্ক্রিপশন করা নয়, কাগজ ধরলে আর চট করে লেখা হয়ে গেল।
বেশ, আমি অপেক্ষা করছি।
কিন্তু বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। ছবির উপর সেই অপূর্ব কবিতাটি লেখা হল—
‘এনেছিলে সাথে করে
মৃত্যুহীন প্রাণ
মরণে তাহাই তুমি
করে গেলে দান।’
আপনার সর্বাঙ্গীণ কুশল কামনা করি।
ভবদীয়
শ্রীচারুচন্দ্র ভট্টাচার্য।”
ডাঃ বিধান রায়ের চিকিৎসা-নৈপুণ্যের উপরে কবিগুরুর যথেষ্ট আস্থা ছিল। সেজন্য চল্লিশের দশকের শেষেরদিকে তিনি রোগাক্রান্ত হইয়া পড়লে ডাঃ স্যার নীলরতন সরকারের সঙ্গে বিধানচন্দ্রকেও ডাকা হত। ১৯৩৭ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর তারিখে কবিগুরু বিসর্প রোগে (Erysipelas) আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন। তখন একইসাথে ডাঃ নীলরতন সরকার এবং ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়কে তাঁর চিকিৎসার ভার গ্রহণ করবার জন্য ডাকা হয়েছিল। সেবারে এই দুই চিকিৎসক যথোচিত ব্যবস্থা অবলম্বন করবার ফলে তাঁর অবস্থা তেমন বিপজ্জনক হতে পারেনি, এবং দিন দশেক ভোগার পরে তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। এর প্রায় তিনবছর পরে, ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে কবি কালিম্পঙে বায়ুপরিবর্তন করবার জন্য গিয়েছিলেন। কিন্তু সেবারে সেখানেই তিনি সাংঘাতিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সেই সংবাদ পেয়ে তাঁর কর্মসচিব অনিল চন্দ্র ও প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ কলকাতা থেকে সেযুগের তিনজন বিশিষ্ট চিকিৎসক— ডাঃ অমিয় বসু, ডাঃ সত্যসখা মৈত্র এবং ডাঃ জ্যোতিঃপ্রকাশ সরকারকে —নিজেদের সঙ্গে নিয়ে ২৮শে সেপ্টেম্বর তারিখের সকালবেলা কালিম্পঙে পৌঁছেছিলেন। তখন সেই তিনজন ডাক্তার এবং দার্জিলিঙের সিভিল সার্জন কবিগুরুকে পরীক্ষা করে জানিয়েছিলেন যে, অবিলম্বে তাঁর দেহে অস্ত্রোপচার করা প্রয়োজন। তাঁদের মত ছিল যে— কবিগুরু বৃক্ক-পীড়ায় (Kidney trouble) ভুগছিলেন। এরপরে সেদিনই ওই তিনজন ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরেরদিন রবিবার ২৯শে সেপ্টেম্বর তারিখে কবিগুরু রোগার্ত দেহে শয্যাশায়ী অবস্থায় কলকাতায় পৌঁছেছিলেন। তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁর জোড়াসাঁকোর বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেদিন ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের সঙ্গে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ডাঃ পি. এন. রায় এবং ডাঃ দীনেশচন্দ্র চক্রবর্তীও কবিগুরুকে পরীক্ষা করে দেখেছিলেন। এরপরে তাঁরা তিনজনে আলোচনা করে এই সিদ্ধানে পৌঁছেছিলেন যে, কবিগুরুর দেহে অস্ত্রোপচার করবার কোন প্রয়োজন নেই। এরপর থেকে বিধানচন্দ্র প্রত্যেকদিন একাধিকবার কবিগুরুকে দেখতে গিয়েছিলেন। তখন তাঁর উপদেশমতোই প্রতিদিন কবিগুরুর অবস্থা সম্পর্কে বুলেটিন প্রচারিত হত। মহাত্মা গান্ধী তখন নতুন দিল্লীতে ছিলেন। তিনি কবিগুরুর অসুস্থতার সংবাদ পাওয়ার পর থেকে অত্যন্ত উদ্বেগের মধ্যে সেখানে নিজের দিন কাটাচ্ছিলেন। ইতিমধ্যে তাঁর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে শুনে গান্ধীজী স্বস্তিবোধ করেছিলেন। এরপরে তিনি তাঁর কর্মসচিব মহাদেব দেশাইকে কবিগুরুর উদ্দেশ্যে তাঁর লেখা একটি পত্র সমেত কলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তখনও কবগুরুর শয্যাগৃহে কোন দর্শনার্থীকে যেতে দেওয়া না হলেও শুধুমাত্র মহাদেব দেশাইর বেলায় সেই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেছিল। কবিগুরুকে উদ্দেশ্য করে গান্ধীজী সেই পত্রে লিখেছিলেন—
“Delhi, Oct. 1
Dear Gurudev,
You must stay for a while. Humanity needs you. I was pleased beyond measure to find that you were better. With love,
Yours
M. K. Gandhi.”
সেবারে কয়েক সপ্তাহ রোগে ভোগার পরে ডাঃ বিধান রায়ের চিকিৎসায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ আরোগ্যলাভ করেছিলেন। কিন্তু ১৯৪১ সালের জুন মাসের শেষের দিকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তখন প্রতিদিনই তাঁর জ্বর হচ্ছিল এবং তিনি পুষ্টিকর কোন আহার্য গ্রহণ করতে পারছিলেন না। এরপরে দিনের পর দিন তাঁর দুর্বলতা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, তিনি শেষপর্যন্ত শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন। তখন তাঁর চিকিৎসার সময়োপযোগী ব্যবস্থা করবার জন্য তৎকালীন কলকাতার খ্যাতনামা চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল। সেবারে ঠিক হয়েছিল যে, প্রথমে আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসা করা হবে। সেইমত ১লা জুলাই তারিখে কলকাতার স্বনামখ্যাত আয়ুর্বেদজ্ঞ বিমলানন্দ তর্কতীর্থ রবীন্দ্রনাথের চিকিৎসার ভার গ্রহণ করবার জন্য শান্তিনিকেতনে পৌঁছেছিলেন। তিনি ১০ই জুলাই তারিখে কলকাতায় ফিরে জানিয়েছিলেন যে, রোগীর উপরে আয়ুর্বেদীয় ওষুধ বেশ ভালোই কাজ করছে। কিন্তু ১৩ই জুলাই তারিখে কবিগুরুর অসুস্থতা পুনরায় বৃদ্ধি পেয়েছিল। সেদিন সেই সংবাদ পেয়ে ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন। এরপরে ২৬শে জুলাই তারিখে কবিগুরুকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নিয়ে আসা হয়েছিল ও ৩০শে জুলাই তারিখে চিকিৎসকদের উপদেশমত তাঁর দেহে অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। সেবারে মূত্রাশয়ের (bladder) অসুখের জন্যই তাঁর অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। সেই চিকিৎসকদের মধ্যে ছিলেন— ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, ডাঃ এল. এম. ব্যানার্জি, ডাঃ সত্যসখা মৈত্র, ডাঃ ইন্দু বসু, ডাঃ অমিয় সেন, ডাঃ দীননাথ চ্যাটার্জি এবং ডাঃ কে. সি. মুখার্জি। ওই অস্ত্রোপচার সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হওয়ায় পরবর্তী দুটি দিন কবিগুরুর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও, তারপর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমে অবনতির দিকে চলে গিয়েছিল। চিকিৎসকদের আপ্রাণ পরিশ্রম সত্ত্বেও সেবারে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি রোধ করা সম্ভব হয়নি। এরপরে ৭ই আগস্ট বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার সময়ে কবির শারীরিক অবস্থার সামান্য পরিবর্তন হওয়ায় তাঁকে একটি ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছিল এবং বেলা ৯টা ১০ মিনিট থেকে তাঁকে অক্সিজেন দেওয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু বেলা ১০টায় ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় এবং ডাঃ এল. এম. ব্যানার্জি উভয়ে মিলে কবিগুরুকে পরীক্ষা করে ঘোষণা করেছিলেন যে, তাঁর শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। সেই দুঃসংবাদ কলকাতায় প্রচারিত হয়ে যাওয়ার পরে দলে দলে মানুষ জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে জড়ো হতে শুরু করেছিলেন। অবশেষে দীর্ঘকাল রোগভোগের পরে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘকাল রোগভোগের পরে বৃহস্পতিবার বেলা ১২টা ১০ মিনিটে ৮১ বৎসর বয়সে কবিগুরু তাঁর শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন।
কবিগুরুর দেহাবসানের পরে তাঁর সাথে বিধানচন্দ্রের মর্ত্য-সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটলেও তাঁকে নিয়ে বিধানচন্দ্রের কাজ শেষ হয়নি। কেননা তাঁদের উভয়ের মধ্যে যে সম্বন্ধ ছিল, সেটা রোগী ও চিকিৎসকের গণ্ডীতে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও প্রসারিত হয়েছিল। তাই কবিগুরুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত তিনিও অন্যান্য জননায়কের এবং রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়স্বজনের মতোই কর্মব্যস্ত ছিলেন।
কবিগুরুর মৃত্যুর প্রায় ছয় বৎসর পরে ভারত-ব্যবচ্ছেদের অভিশাপের সঙ্গে স্বাধীনতা এসেছিল এবং ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে বিধানচন্দ্র রায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে কবিগুরুর প্রতিষ্ঠানগুলিকে নানাভাবে সাহায্য করতে শুরু করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে তাঁর মন্ত্রিসভার শাসন আরম্ভ হওয়ার পর থেকেই বিশ্বভারতী, শ্রীনিকেতন ইত্যাদিকে সংস্থাগুলিকে উপযুক্ত আর্থিক সাহায্য দান করা হয়েছিল। ডাঃ রায় সবসময়ে বিশ্বভারতীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখে চলেছিলেন। পরে বিশ্বভারতী যে একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছিল, তাতে তাঁর অবদান কিছু কম ছিল না। এপ্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে ১৯৫৪ সালের ২৪শে ডিসেম্বর তারিখে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক সমাবর্তন উৎসব উপলক্ষ্যে ডাঃ রায় যে তথ্যপূর্ণ উপাদেয় ভাষণ দিয়েছিলেন, সেটার মাধ্যমে কবিগুরুর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা-ভক্তি এবং কবিগুরুর আদর্শের প্রতি তাঁর অনুরাগ সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয়ে উঠেছিল। সেদিন সেই ভাষণের শুরুতেই তিনি কবিগুরুকে প্রণতি জানাতে গিয়ে বলেছিলেন—
“এই মহৎ প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক সমাবর্তন-উৎসবে সকলে সমবেত হইয়া সর্বাগ্রে শান্তিনিকেতন, শ্রীনিকেতন ও বিশ্বভারতীর পরিকল্পক ও প্রতিষ্ঠাতা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ ও প্রণাম করি।”
এরপরে শান্তিনিকেতনের পুরোনো ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে ডাঃ রায় প্রথমে রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন, এবং তারপরে প্রাচীন ভারতের ঋষিদের তপোবনের কল্পনার সাথে শান্তিনিকেতনের তুলনা করে বলেছিলেন—
“এই কল্পনাকে ভিত্তি করিয়া ১৯০১ খ্রীষ্টাব্দে শান্তিনিকেতনে প্রথম বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। রবীন্দ্রনাথের মনে এই ধারণা নিশ্চয়ই ছিল যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রচলিত শিক্ষা আমাদের দেশের পক্ষে সর্বাংশে শুভ নয়। তাঁহার তৎকালীন রচনা ও বক্তৃতা হইতে আমরা একথাও জানিতে পারি, সেই শিক্ষা যে ছাত্রদের মনকে স্ট্যাটিক বা স্থাণু করিয়া দেয়, নূতন সত্য বা তথ্য আবিষ্কারের মৌলিক শক্তি হ্রাস করে এবং আত্মনির্ভরতা নষ্ট করে— এই উপলব্ধিও তাঁহার হইয়াছিল। ইহারই প্রতিকারের জন্ত তিনি নগর কলিকাতার কর্মকোলাহল হইতে প্রায় একশত মাইল দূরে বোলপুরের এই উন্মুক্ত অবাধ প্রান্তরে প্রকৃতির কল্যাণকর পরিবেশে সঙ্গীত, শিল্পকারু ও সাহিত্যকলার মধ্য দিয়া দেশের তরুণেরা যাহাতে আত্মস্থ হইয়া ভারতের পূর্বগৌরব ফিরিয়া পায়, সেই মহৎ উদ্দেশ্যে এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আয়োজন করিয়াছিলেন। ভারতীয় ঋষিদের তপোবনের আদর্শে গুরু এবং ছাত্রেরা পরস্পর একাত্ম ও স্থিরচিত্ত হইয়া অধ্যাপন ও অধ্যয়নে নিরত থাকিবেন, সেই ব্যবস্থাও তিনি করিতে চাহিয়াছিলেন; চাহিয়াছিলেন— অধ্যাপকেরা ‘অধ্যাপনকার্যকে যথার্থ ধর্মব্রত স্বরূপ গ্রহণ’ করিবেন, ‘বালকেরা হোমধেনু চরাইয়া আসিয়া পড়া লইয়া বসিবে’, এবং ‘বালিকারা গোদোহন কার্য সারিয়া কুটির প্রাঙ্গণে গৃহকার্যে শুচিস্নাতা কল্যাণময়ী মাতৃদেবীর সহিত যোগ’ দিবে। অতীত ভারতের যে ইতিহাস আমরা উপনিষদে ব্রাহ্মণে পাই, তাহাতে দেখি এই তপোবন-আশ্রিত শিক্ষায় ছাত্রদের মন জীবনের বিবিধ সমস্যা সম্পর্কেও সর্বদা জাগ্রত ও জীবন্ত থাকিত। তাহারা অহরহ নিজেদের পূর্ণ বিকশিত করিয়া তুলিবার সাধনা করিত, জগৎ ও জীবনের জটিল সমস্যার সমাধানে তাহাদের চিন্তাধারা গভীরতা ও প্রসারতা লাভ করিত। তাহার প্রমাণের অভাব নাই। একদিকে এই আরণ্যক তপোবনের বাণীসম্পদ এবং অন্যদিকে কৃষিজ, খনিজ ও শিল্পজ সম্পদে ভারতবর্ষ তখন এমন খ্যাতি লাভ করিয়াছিল যে, আমরা দেখিতে পাই ক্রমে ক্রমে নানা দেশবিদেশ হইতে ভারতবর্ষকে জয় করিবার জন্য উপর্যুপরি অভিযান চলিয়াছে। সেই গৌরবমণ্ডিত যুগে শুধু আধ্যাত্মিক শক্তিতেই নয়, পার্থিব শক্তিতেও ভারত প্রভৃত পরিমাণে সম্পন্ন ছিল; সেই ভারতবর্ষ কখন কেমন করিয়া দুর্বিপাকে পতিত হইল, নিদারুণ হীনতার মধ্যে তাহার অধোগতি হইল— শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্য-বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালেই এই সকল প্রশ্ন রবীন্দ্রনাথের চিত্তকে আলোড়িত করিয়া থাকিবে। পশ্চিমের ছকে ও ছাঁচে ফেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার প্রতি এই সকল চিন্তাই তাঁহার মনে ধিক্কার জন্মাইল। ভারতীয় তপোবনের আদর্শে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে জ্ঞানদানের ব্যবস্থা ছাড়াও নিজেদের প্রতি আস্থাহীন মানুষদের আত্মনির্ভরশীল করিয়া তুলিবার জন্য কবির মন ব্যাকুল হইল। … সুখের বিষয়, তিনি তখন একক ছিলেন না। বঙ্গমাতার অনেক কৃতবিদ্য গুণী জ্ঞানী সুসন্তানও বিশ্ববিদ্যালয়ের গতানুগতিক শিক্ষার প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করিয়া লোককল্যাণকর একটা কিছু করিবার জন্য আগ্রহান্বিত হইলেন। আমি ১৯০৫ সনে বঙ্গ-ব্যবচ্ছেদের দরুন বাঙালীর সর্বাঙ্গীণ নবজাগরণের কথা আপনাদের স্মরণ করাইতেছি। আন্দোলন আরম্ভ হইল এই ব্যবচ্ছেদের উদ্দাম প্রতিবাদে। কিন্তু অচিরাং এই বিদেশী ও বিজাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রতি সকলের দৃষ্টি পড়িল। লোকে বুঝিল, এই প্রাণহীন গতানুগতিক শিক্ষাই আমাদের অধঃপতনের প্রধান কারণ। শাসনকর্তা স্বয়ং বৈদেশিক, সুতরাং জনমত উপেক্ষিত হইতে লাগিল, যাঁহারা তখন দেশের মুখপাত্র তাঁহারাও শিক্ষায় দীক্ষায় সম্পূর্ণ বিদেশীভাবাপন্ন, কাজেই দেশবাসীর ঐকান্তিক আবেদন রাষ্ট্র কর্তৃক সহজেই উপেক্ষিত হইল। দেশের লোক যখন বুঝিল, এই বৈদেশিক শিক্ষার মোহেই প্রধানেরা দেশের দাবি অগ্রাহ্য করিতেছেন, তখন শিক্ষা-ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রতিই তাহাদের দৃষ্টি পড়িল সর্বাধিক— অর্থাৎ বঙ্গ-ব্যবচ্ছেদের রাজনৈতিক আন্দোলন প্রধানতঃ শিক্ষার আন্দোলন হইয়া দাঁড়াইল। ঘরে ঘবে, পাড়ায় পাড়ায়, পল্লীতে, শহবে আলাপ-আলোচনা, বক্তৃতা, আন্দোলন চলিতে লাগিল। দেশের তরুণেবা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘গোলামখানা’ আখ্যা দিয়া তাহা হইতে বাহির হইতে চাহিল। আমি নিজে যদিও এই আন্দোলনে ব্যাপকভাবে যোগ দিই নাই, তথাপি এ-কথা অস্বীকার করিতে পারি নাই এবং এখনও পারি না যে, প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক শিক্ষা-ব্যবস্থা আমাদের জাতীয় চরিত্রকে দুর্বল এবং মনুষ্যত্বকে খর্ব করে। সে শিক্ষায় সর্বতোভাবে মনেব বিকাশ হয় না, সেই শিক্ষা মানুষকে যন্ত্রচালিত নির্জীব পুত্তলিকামাত্রে পরিণত করে; যেটুকু তাঁহারা মুখস্থ করে, সেইটুকুই উদ্গীরণ করে মাত্র, আয়ত্ত ও জীর্ণ করিয়া সেই শিক্ষাকে নিজস্ব করিয়া লইতে পাবে না। স্বদেশী আন্দোলনের আনুষঙ্গিক এই শিক্ষা-আন্দোলনের মধ্যে এই কথাটাই সুস্পষ্ট হইয়া উঠিল যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৃত শিক্ষা হয় না, ছাত্রেরা কোনও প্রকারে একটা ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট সংগ্রহ করিয়া অর্থোপার্জনের দিকেই ঝুঁকিয়া পড়ে অর্থাৎ ডিগ্রিটাই লক্ষ্য, শিক্ষাটা নয়। ক্রমে ক্রমে দেশের বিদ্বান ও বুদ্ধিমান নেতারাও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার ব্যর্থতার কথা উপলব্ধি ও স্বীকাব করিলেন। তাঁহারা সমবেত হইয়া প্রতিকারের পথ খুঁজিতে লাগিলেন। ১৯০৬ খ্রীষ্টাব্দের ১৫ই আগস্ট তারিখে আমাদের স্বাধীনতা লাভের ঠিক ৪১ বৎসর পূর্বে কলিকাতাব টাউন হলে বাংলাদেশে একটি আদর্শ জাতীয় বিদ্যামন্দির স্থাপনের উদ্দেশ্যে সদ্য-প্রতিষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা-পরিষদের আহ্বানে সর্বজনমান্য ডক্টব রাসবিহারী ঘোষের সভাপতিত্বে এক বিরাট সভা হইল। বাংলাদেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা প্রায় সকলেই উপস্থিত ছিলেন। দেশপূজ্য ডক্টর গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এই সভায় বঙ্গীয় জাতীয় গবিষদের উদ্দেশ্য ও কর্মপদ্ধতি সম্বন্ধে বিবৃতি-শীর্ষক দীর্ঘ লিখিত ইংরেজী ভাষণ পাঠ করেন।”
ডাঃ রায়ের উপরিল্লিখিত ভাষণ বিশ্লেষণ করে তাঁর জীবনীকার নগেন্দ্রকুমার গুহ রায় লিখেছিলেন—
“ডাঃ রায়ের সমাবর্তন ভাষণেব পূর্বোল্লিখিত অংশ হইতে বুঝা যাইবে যে, তিনি সংক্ষেপে শান্তিনিকেতনের অতীত ইতিহাসের কতক বিবৃত করিয়া দেশের শিক্ষার তৎকালীন অবস্থা ও ব্যবস্থার নিরপেক্ষ বিচার-বিশ্লেষণ করিয়াছেন। কবিগুরুর মত ও পথ যে দেশ ও জাতির অশেষ কল্যাণ সাধন করিবে, সে বিষয়েও তিনি ছিলেন নিঃসন্দেহ।”
এরপরে গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইংরেজি ভাষণ থেকে বিস্তারিত উদ্ধৃতি দিয়ে ডাঃ রায় বলেছিলেন—
“আমাদের মনে বাখিতে হইবে যে, রবীন্দ্রনাথ উহারও ঠিক চৌদ্দ বৎসর পূর্বে, এমন কি তাঁহার শান্তিনিকেতন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠারও নয় বৎসর আগে, তাঁহার সুবিখ্যাত ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে মাতৃভাষাকে শিক্ষার বাহন করিবার জন্য সর্বপ্রথম আন্দোলন আরম্ভ করিয়াছিলেন। তিনিও সেই ১৫ই আগস্টের (১৯০৭) মহতী সভায় উপস্থিত থাকিয়া ‘জাতীয় বিদ্যালয়’ নামক প্রসিদ্ধ ভাষণ পাঠ করিয়াছিলেন। তপোবনের আদর্শে শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় স্থাপন করিয়াও তাঁহার মনে নূতনতর বৈজ্ঞানিক ও কারুশিল্প-সঙ্গীত শিক্ষার সহায়তায় ছাত্রদের জীবনযুদ্ধে জয়ী দেখিবার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়াছিল এবং ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা হওয়া সত্ত্বেও তিনি মনে-প্রাণে বঙ্গীয় জাতীয় শিক্ষা-পরিষদে যোগদান কবিয়াছিলেন। …শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয় প্রথম পর্ব, বঙ্গায় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ দ্বিতীয় পর্ব, ইহার পরই রবীন্দ্রনাথের জীবনের তৃতীয় বা শেষ পর্ব বিশ্বভারতী।”
ইতিহাস বলে যে, ১৯১৯ সালের এপ্রিল মাসে বা ১৩২৬ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে কবিগুরু সর্বপ্রথম এভাবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের নাম-প্রস্তাব করেছিলেন—
“আমাদের নূতন বিশ্ববিদ্যালয় দেশের মাটির উপরে নাই। তাহা পরগাছার মতো পরদেশীয় বনস্পতির শাখায় ঝুলিতেছে। ভারতবর্ষে যদি সত্য বিদ্যালয় স্থাপিত হয় তবে গোড়া হইতেই সে বিদ্যালয় তাহার অর্থশাস্ত্র, তাহার কৃষিতত্ত্ব, তাহার স্বাস্থ্যবিদ্যা, তাহার সমস্ত ব্যবহারিক বিজ্ঞানকে আপন প্রতিষ্ঠা স্থাপনের চতুর্দিকবর্তী পল্লীর মধ্যে প্রয়োগ করিয়া দেশের জীবনযাত্রার কেন্দ্রস্থান অধিকার করিবে। এই বিদ্যালয় উৎকৃষ্ট আদর্শে চাষ করিবে, গো-পালন করিবে, কাপড় বুনিবে এবং নিজের আর্থিক সম্বল লাভের জন্য সমবায়-প্রণালী অবলম্বন করিয়া ছাত্র, শিক্ষক ও চারিদিকের অধিবাসীদের জীবিকার যোগে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হইবে। … এইরূপ আদর্শ বিদ্যালয়কে আমি ‘বিশ্বভারতী’ নাম দিবার প্রস্তাব করিয়াছি।”
এর কয়েক মাস পরে, ১৯১৯ সালের ৩রা জুলাই তারিখে বা ১৩২৬ বঙ্গাব্দের ১৮ই আষাঢ় তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। এর প্রায় আড়াই বছর পরে, ১৯২১ সালের ২৩শে ডিসেম্বর বা ১৩২৮ সালের ৮ই পৌষ তারিখে আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের সভাপতিত্বে এবং সারা বিশ্বের বহু মনীষীর উপস্থিতিতে কবি সর্বসাধারণের হাতে তাঁর বিশ্বভারতীকে সমর্পণ করে বলেছিলেন—
“এই বিশ্বভারতী ভারতবর্ষের জিনিস হলেও একে সমস্ত মানবের তপস্যার ক্ষেত্র করতে হবে।”
ডাঃ রায় সেদিন দেশবাসীকে বিশ্বভারতীর গোড়ার কথা থেকে আরম্ভ করে কবিগুরুর বিদ্যালয়টি স্থাপনের উদ্দেশ্য এবং সেটির ক্রমবিকাশের কথাও সংক্ষেপে জানিয়ে দিয়েছিলেন; এবং সেই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেছিলে—
“জনসাধারণের হাতে বিশ্বভারতীকে সমর্পণের পর প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতিরূপে রবীন্দ্রনাথ আরও প্রায় কুড়ি বৎসর ইহার তত্ত্বাবধান করিয়াছিলেন। তাঁহার খ্যাতির গুণে, বিশ্বভারতীর উদ্দেশ্যের উদারতায় কবির জীবদ্দশায় ও তাঁহার তিরোধানের পরও এই প্রতিষ্ঠান সমগ্র বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছে। তবুও আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, এই প্রতিষ্ঠানের বিশেষত্ব কি? এই সভায় এমন অনেকে উপস্থিত আছেন, যাঁহারা ইহার সহিত যুক্ত ছিলেন অথবা এখনও যুক্ত আছেন; যাঁহারা এখানে শিক্ষালাভ করিয়াছেন তাঁহাদেরও অনেকে উপস্থিত রহিয়াছেন। তাঁহাদের সকলের কাছে আমার এই প্রশ্ন— এখানকার শিক্ষা ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায় কোনও তারতম্য কি তাঁহারা দেখিতে পাইয়াছেন? অন্যত্র অবলম্বিত শিক্ষাপ্রণালী অপেক্ষা এখানকার প্রণালী যে উচ্চতর সে ধারণা কি তাঁহাদের মনে দৃঢ়? বিশ্বভারতীর প্রাক্তন ছাত্রেরা কি এমন কিছু পাইয়াছেন যাহা অন্যত্র দুর্লভ? এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিশ্বকবি; তাঁহার ভাব-দৃষ্টিতে যাহা উদ্ভাসিত হইয়াছিল, এই প্রতিষ্ঠানের যে ভাবী পরিণত রূপ তিনি দোখয়াছিলেন তাহা হয়তো আমাদের ধারণার অতীত। যে আবেগ এবং উদ্দেশ্য এই বিশ্বভারতী স্থাপনে তাহাকে প্রণোদিত করিয়াছিল তাহা আজ আমাদের বিচারের বিষয় নয়, যাঁহারা এখানে শিক্ষালাভ করিয়াছেন বা করিতেছেন তাঁহাদের জীবনে ইহা কি পরিমাণ প্রভাব বিস্তার করিয়াছে— সেই সাক্ষ্যই বিশ্বভারতীর সার্থকতার প্রমাণ দিবে।”
এই ভাষণের মধ্যে দিয়ে কবিগুরুর প্রতি বিধানচন্দ্রের শ্রদ্ধা এবং বিশ্বভারতীর উদ্দেশ্য ও আদর্শের প্রতি তাঁর অখণ্ড অনুরাগ সুস্পষ্টরূপে ব্যক্ত হয়েছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শের প্রতি তাঁর পরিপূর্ণ শ্রদ্ধাই এরপরে তাঁকে একদিন রবীন্দ্রনাথের জন্মস্থানে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে প্রণোদিত করেছিল।#




