ক্লিন্টন বি সিলি এবং আমাদের সাংস্কৃতিক ঋণ

সুদূর শিকাগোর প্রাতিষ্ঠানিক পরিমণ্ডল থেকে যিনি বারবার ফিরে এসেছিলেন কার্তিকের নবান্ন, কুয়াশামোড়া রূপসী বাংলা এবং জীবনানন্দের কাব্যভূমিতে, তিনি ক্লিন্টন বি. সিলি। রবার্ট ফ্রস্ট একদা সংশয় প্রকাশ করেছিলেন যে, শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলো অনুবাদের ফলে তাদের মৌলিক সত্তার অনেকটাই হারিয়ে ফেলে। সিলি সেই সংশয়কে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছেন। এই নিবেদিতপ্রাণ গবেষক বাংলার ধুলোবালি, স্তব্ধতা ও বিপন্ন বিস্ময়কে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছেন। পাশ্চাত্যের পাঠকদের কাছে জীবনানন্দকে জানার কোনো সুস্পষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক সেতু তখনও নির্মিত হয়নি। সিলি ছিলেন জীবনানন্দ-গবেষণার আন্তর্জাতিক পরিসরের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পথপ্রদর্শকদের একজন, যিনি জীবনানন্দ দাশকে বিশ্বসাহিত্যের বৃহত্তর পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অথচ তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রার সূচনা হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতায়, যখন ১৯৬৩ সালের এক হেমন্তে পিস কোরের তরুণ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তিনি প্রথম পা রাখেন বরিশালের পলিমাটিতে।

১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫—এই সময়ে বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন কলেজের বিজ্ঞানাগার এবং বরিশাল জিলা স্কুলে বিজ্ঞান শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা তাঁর ভেতরে গভীর এক মানসিক রূপান্তরের সূচনা করে। চারপাশের প্রকৃতি, রূপসী-ধানসিঁড়ির জলছাপ আর কীর্তনখোলার বাতাস রসায়নের এই তরুণ ছাত্রকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। তিনি কেবল দূর থেকে এই ভূপ্রকৃতিকে দেখেননি; ব্রজমোহন কলেজের চারপাশের সবুজ প্রান্তর, ধানসিঁড়ির অববাহিকা এবং বরিশালের শীতের কুয়াশাকে নিজের ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করেছিলেন। সেখানেই তিনি পরিচিত হন ব্রজমোহন কলেজেরই সাবেক শিক্ষক, বাংলা কবিতার অন্যতম স্বতন্ত্র কণ্ঠ জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে। তাঁর সৃষ্টির গভীরে প্রবেশ করে সিলি উপলব্ধি করেছিলেন, জীবনানন্দের কবিতার ধূসরতা ও অন্ধকার কোনো বিমূর্ত কাব্যিক নির্মাণ নয়; বরং এই ভূপ্রকৃতি ও জীবনবাস্তবতার গভীর অভিজ্ঞতা থেকেই তার উৎস।

বরিশালের সেই মুগ্ধতাই সিলির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। রসায়নের ল্যাবরেটরি ছেড়ে তিনি পুরোদস্তুর বাংলা সাহিত্যের গবেষক হয়ে ওঠেন। এরপর ১৯৬৯-৭০ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তিনি আবারও টেক্সটের বাইরে গিয়ে ব্যক্তি জীবনানন্দের ফেলে যাওয়া পদচিহ্ন অনুসরণ করেছেন বরিশাল ও কলকাতায়। নথিপত্র সংরক্ষণের প্রাক-ডিজিটাল যুগে দুর্লভ তথ্য ও আদি দলিল সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁকে যে পরিশ্রম করতে হয়েছিল, তা যেকোনো গবেষকের জন্য শিক্ষণীয়। জীবনানন্দের সবেতন ছুটি মঞ্জুরের জন্য বিএম কলেজ কাউন্সিলের সভার মূল কার্যবিবরণী তিনি সংগ্রহ করেছিলেন দীর্ঘ চব্বিশ বছর পর। কবির বাড়িভাড়া-সংক্রান্ত দেওয়ানি মামলার তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে কলকাতার রেন্ট কন্ট্রোল অফিসে তিনি নিজেই ঘেঁটেছেন প্রায় আঠারো বছরের পুরোনো ধূলিধূসরিত নথিপত্র। এই দীর্ঘ সাধনার পথ ধরেই ১৯৭১ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি স্নাতকোত্তর এবং ১৯৭৬ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক গবেষণার পরিসরে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এ অর্জন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে ওঠে।

এই প্রাতিষ্ঠানিক সাধনার মধ্য দিয়েই সিলি জীবনানন্দকে নিয়ে সমকালীন মূল্যায়নের সঙ্গে একটি নতুন আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করেন। বুদ্ধদেব বসু কিংবা সঞ্জয় ভট্টাচার্যের মতো সমালোচকেরা জীবনানন্দকে যেভাবে মূল্যায়ন করেছিলেন, সিলি তাঁর পশ্চিমা মনন ও গবেষণার আলোকে সেই পাঠকে আরও বিস্তৃত পরিসরে নিয়ে যান। ‘কবিতা’ পত্রিকার সম্পাদক
বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দকে ‘শুদ্ধতম কবি’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। সিলির গবেষণা সেই মূল্যায়নকে অস্বীকার না করে তার সঙ্গে নতুন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক মাত্রা যুক্ত করে। সিলি দেখান, জীবনানন্দ কেবল অরণ্য ও প্রকৃতির কবি নন; তাঁর গদ্য ও কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে আছে সমকাল, বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সংকট এবং দেশভাগের ঐতিহাসিক অভিঘাত। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ কীভাবে কবিকে মানসিকভাবে উদ্বাস্তু করে বরিশালের সর্বানন্দ ভবন থেকে কলকাতায় নিয়ে গিয়েছিল, সিলি তাঁর গবেষণায় সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকে নতুন আলোয় পাঠ করেছেন।

ক্লিন্টন সিলির গবেষণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল জীবনানন্দের সৃষ্ট জগৎ এবং তাঁর জীবনের বাস্তবতার মধ্যে একটি সুদৃঢ় সংযোগ স্থাপন। তিনি কেবল কবির কবিতা পাঠেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং বরিশালের সর্বানন্দ ভবনের ব্রাহ্ম উপাসনার পরিবেশ কীভাবে কবির মরমী চেতনাকে প্রভাবিত করেছিল, তারও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছেন। কবির পারিবারিক ডাকনাম ‘মিলু’র উৎস থেকে শুরু করে তাঁর মা কুসুমকুমারী দাশের কবিতার অন্তর্নিহিত মনস্তত্ত্ব জীবনানন্দের সংবেদনশীল মানসগঠনে কী ভূমিকা রেখেছিল, সিলি তাঁর অভিসন্দর্ভে তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন।

সিলির গবেষণা-নিষ্ঠা তাঁর কাজের প্রতিটি স্তরে প্রতিফলিত হয়েছে। বইয়ের অনুবাদে সনাতন সমাজের গোত্রপ্রথার যথাযথ সাংস্কৃতিক তাৎপর্য ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ করা কিংবা জীবনানন্দের অক্ষরবৃত্ত ছন্দের সূক্ষ্ম গঠন নিয়ে সমকালীন কবি ও সম্পাদকদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ তাত্ত্বিক আলোচনাগুলো পরবর্তীকালে বইয়ের পাদটিকাগুলোকে সমৃদ্ধ জ্ঞানভাণ্ডারে পরিণত করেছে। তিনি দেখিয়েছেন, জীবনানন্দের কবিতার ‘শব্দহীন স্তব্ধতা’ কেবল নৈরাশ্যের প্রকাশ নয়; তা এক ধরনের মহাজাগতিক একাকীত্বেরও অভিব্যক্তি। তিনি শুধু অনুবাদ করেননি, জীবনানন্দের দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাব্যজগতকেও ইংরেজি ভাষার আধুনিক ব্যঞ্জনায় রূপান্তর করেছেন। বিশেষ করে ‘সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন’-এর মতো পঙ্ক্তিগুলোকে তিনি নতুন পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

একই সঙ্গে সিলি গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন যে, জীবনানন্দের নন্দনতাত্ত্বিক ও দার্শনিক চিন্তার অন্যতম চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে তাঁর ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধসংকলনে। আন্তর্জাতিক মহলে সিলিই প্রথম সুসংগঠিতভাবে দেখান যে, জীবনানন্দ কেবল স্বতঃস্ফূর্ত ভাবপ্রবণ কবি নন; তিনি ছিলেন গভীর সাহিত্যচিন্তার অধিকারী এক সচেতন সাহিত্য-দার্শনিক। তাঁর গদ্যের তাত্ত্বিক ভিত্তি কবিতার পরাবাস্তব জগৎকে একটি যুক্তিসংগত কাঠামো প্রদান করে। জীবনানন্দের কবিতার চিরায়ত গীতিময়তা এবং আধুনিক নাগরিক জীবনের দ্বন্দ্ব, বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্বের মধ্যকার সূক্ষ্ম সম্পর্কও সিলি তাঁর আলোচনায় গভীর বিশ্লেষণের সঙ্গে তুলে ধরেছেন।

সিলির গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি উন্মোচিত হয় জীবনানন্দের সেই বিখ্যাত ট্রাঙ্কে সংরক্ষিত অপ্রকাশিত গদ্য ও ডায়েরির পাঠোদ্ধারের মধ্য দিয়ে। পশ্চিমা গবেষকদের মধ্যে তিনিই প্রথম জীবনানন্দের সংকেতলিপিতে লেখা ডায়েরিগুলোর সুসংবদ্ধ পাঠোদ্ধার করেন। তিনি দেখান, ট্রাঙ্ক থেকে উদ্ধার হওয়া ‘মাল্যবান’ কিংবা ‘সুতীর্থ’র মতো উপন্যাসে পরাবাস্তবতার আড়ালে মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনের নির্মম ও ক্ষয়িষ্ণু বাস্তবতা লুকিয়ে আছে। তাঁর বিশ্লেষণে জীবনানন্দ কোনো পলায়নপর নিভৃতচারী নন; বরং বিশ শতকের বৈশ্বিক রাজনীতি, ফ্যাসিবাদের উত্থান এবং কলকাতার দাঙ্গার ক্ষতচিহ্নে ক্রমাগত আলোড়িত এক সৃজনশীল সত্তা।

১৯৯০ সালে ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় প্রেস থেকে প্রকাশিত সিলির গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ A Poet Apart: A Literary Biography of the Bengali Poet Jibanananda Das (এক নির্জন কবি: বাঙালি কবি জীবনানন্দ দাশের সাহিত্যিক জীবনী) তিরিশের দশকের রবীন্দ্র-উত্তর আধুনিকতাকে নতুন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করে। এই গ্রন্থ জীবনানন্দকে টি. এস. এলিয়ট কিংবা ডব্লিউ. বি. ইয়েটসের মতো আধুনিকতাবাদী কবিদের সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনার পরিসরে নিয়ে আসে এবং বিশ্বসাহিত্যের বৃহত্তর মানচিত্রে তাঁর অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করে।

তবে সিলির জ্ঞানতাত্ত্বিক সাধনাকে কেবল জীবনানন্দ-গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তাঁর প্রতি অন্যায় করা হবে। ২০০৪ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত তাঁর The Slaying of Meghanada: A Ramayana Century (মেঘনাদবধ: একটি রামায়ণী শতক) বিশ্বসাহিত্যে তুলনামূলক সাহিত্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য-এর জটিল অমিত্রাক্ষর ছন্দকে জন মিল্টনের Paradise Lost-এর ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সঙ্গে সংলাপে রেখে ইংরেজি ব্ল্যাঙ্ক ভার্সে রূপান্তর করা ছিল একটি কঠিন সাহিত্যিক কাজ। এই অনুবাদের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রামানুজন পুরস্কারে সম্মানিত হন। সিলি কেবল ভাষান্তর করেননি; মধুসূদনের কাব্যে নিহিত ঔপনিবেশিকতাবিরোধী চেতনা এবং আর্যকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে রাক্ষস সংস্কৃতির প্রতি যে সহমর্মী অবস্থান লক্ষ করা যায়, তাকেও তিনি অনুবাদে যথাসম্ভব অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করেছেন। ফলে পাশ্চাত্যের পাঠক মধুসূদনের কাব্যজগতকে নতুন আলোয় দেখার সুযোগ পেয়েছেন।

এর পরপরই ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয় The Essential Jibanananda Das এবং ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় প্রবন্ধসংকলন Barisal and Beyond (বরিশাল এবং তার ওপারে)। গ্রন্থ দুটি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ করে দেয়। বিশেষ করে Barisal and Beyond-এ বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল, চাঁদ সওদাগরের লৌকিক মিথ এবং বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরের উপাখ্যান কীভাবে বরিশালের পলিমাটির সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্ব নির্মাণ করেছে, সিলি তার একটি গুরুত্বপূর্ণ লোকায়ত পাঠ উপস্থাপন করেছেন।

সিলি কেবল একজন দূরবর্তী প্রাতিষ্ঠানিক গবেষক ছিলেন না। তিনি যখনই বাংলায় এসেছেন, সাধারণ মানুষের মতোই জীবনযাপন করেছেন। কলকাতার পুরোনো ট্রামে চড়া কিংবা বরিশালের কর্দমাক্ত মেঠোপথ ধরে হেঁটে বেড়ানো—এই অনাড়ম্বর জীবনচর্চা প্রমাণ করে, জীবনানন্দ তাঁর কাছে কেবল গবেষণার বিষয় ছিলেন না; বরং এক গভীর সাংস্কৃতিক ও মানবিক অন্বেষণের অংশ ছিলেন। একজন বিদেশি গবেষক হয়েও তিনি যেভাবে বরিশালের লোকসংস্কৃতি ও লৌকিক বিশ্বাসের জগৎকে আত্মস্থ করেছিলেন, তা বাংলা সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের পরিচয় বহন করে।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশীয় ভাষা ও সভ্যতা বিভাগের বরেণ্য অধ্যাপক এডওয়ার্ড ডিমকের উত্তরসূরি হিসেবে সিলি শুধু নিজে গবেষণা করেননি; তিনি একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্যও নির্মাণ করেছেন। পশ্চিমা বিশ্বে বাংলা ইউনিকোড ফন্টের ব্যবহার প্রসারে তাঁর ভূমিকা এবং অবাঙালি শিক্ষার্থীদের জন্য Flashword Bengali–এর মতো ডিজিটাল সফটওয়্যার তৈরির উদ্যোগ বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিক প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। একটি দেশের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে যখন কোনো আন্তর্জাতিক গবেষক নিজের দীর্ঘ কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ উৎসর্গ করে বিশ্বপরিসরে পরিচিত করে তোলেন, তখন তাঁর অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

ক্লিন্টন বি. সিলি ১৯৯০ সালে A Poet Apart প্রকাশের পর থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যাকার ও সাংস্কৃতিক দূত হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেন। রাষ্ট্র চাইলে তখনই তাঁর অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারত। কিন্তু তা হয়নি। ২০০৯ সালে দেশের বিশিষ্ট সংস্কৃতিকর্মীদের পক্ষ থেকে তাঁর অবদানের স্বীকৃতির দাবি উত্থাপিত হলেও বিষয়টি বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ২০২৬ সালে এসে দেখা যায়, এই স্বীকৃতির প্রশ্নটি কোনো সাময়িক অবহেলার বিষয় নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে অনাদৃত একটি সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার প্রতীক হয়ে আছে।

ইতিহাসের এই দীর্ঘদিনের ঋণ পরিশোধ করা একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতির সাংস্কৃতিক দায়িত্ব। বাংলা সাহিত্যের সচেতন পাঠকসমাজের পক্ষ থেকে তাই ক্লিন্টন বি. সিলির অবদানের যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি নতুন করে উচ্চারিত হওয়া প্রয়োজন। তাঁকে সাম্মানিক নাগরিকত্ব প্রদান এবং তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বরিশালে একটি আন্তর্জাতিক অনুবাদ ও গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হলে তা ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা হয়ে উঠতে পারে। এটি শুধু একজন গবেষকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন নয়; বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আন্তর্জাতিক সংযোগকে আরও সুদৃঢ় করার একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগও হতে পারে।

ক্লিন্টন সিলির জীবন ও কর্ম প্রমাণ করে, সংস্কৃতির কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা নেই। সুদূর শিকাগোতে বসেও একজন গবেষক কীভাবে বরিশালের কীর্তনখোলা, ধানসিঁড়ি কিংবা জীবনানন্দের কাব্যজগতের সঙ্গে গভীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন, সিলির জীবন তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি কখনও ব্যক্তিগত সম্মান বা স্বীকৃতির প্রত্যাশায় কাজ করেননি। নীরবে, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করে তোলার কাজে নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন।

এই দীর্ঘ সময়ে ক্ষতিটি সিলির হয়নি; বরং আমাদের সাংস্কৃতিক মূল্যায়নবোধের হয়েছে। তাঁর গবেষণা, অনুবাদ ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। একই সঙ্গে তিনি প্রমাণ করেছেন, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ একজন মানুষকে জন্মভূমির সীমানা অতিক্রম করে অন্য এক সংস্কৃতির আপনজন করে তুলতে পারে।

আজ ২১ জুন, ক্লিন্টন বি. সিলির জন্মদিন। জীবনানন্দ দাশকে বিশ্বপরিসরে নতুনভাবে পরিচিত করে তোলা এই নিবেদিতপ্রাণ গবেষকের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানানোর এ এক উপযুক্ত মুহূর্ত। তাঁর অবদানের যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কেবল একজন গবেষককে সম্মানিত করা নয়; বরং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি আমাদের নিজস্ব দায়বদ্ধতারও প্রকাশ। এই জন্মদিনে তাঁর দীর্ঘ সাধনা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক অবদানের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!