মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে ইতিহাস বিকৃতি ও অপব্যাখ্যাকারীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা মৈত্রী সংসদের উদ্যোগে এবং বঙ্গীয় সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদের সহযোগিতায় ৪ জুলাই ২০২৬, শনিবার, সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত আগারগাঁওস্থ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পরিদর্শন ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। মতবিনিময়কালে বীরমুক্তিযোদ্ধাগণ মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে ইতিহাস বিকৃতি ও অপব্যাখ্যাকারীদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তিকে সোচ্চার ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা মৈত্রী সংসদের সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. আবুল হায়াত হেদায়েতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও সদস্য সচিব, বিশিষ্ট লেখক বীরমুক্তিযোদ্ধা মফিদুল হক, বীরমুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হক বীরপ্রতীক, বীরমুক্তিযোদ্ধা মাহবুব জামান, বীরমুক্তিযোদ্ধা বিশিষ্ট নাট্যজন কাওসার চৌধুরী, বীরমুক্তিযোদ্ধা কবি শেখ রবিউল হক, বীরমুক্তিযোদ্ধা জয়ন্তী রায়, বীরমুক্তিযোদ্ধা ফরিদা আক্তার, বীরমুক্তিযোদ্ধা পদ্মা রহমান, বীরমুক্তিযোদ্ধা এ কে এম শামীম চৌধুরী, বীরমুক্তিযোদ্ধা শামছুল হক সিকদার, বীরমুক্তিযোদ্ধা রাজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, বীরমুক্তিযোদ্ধা ছাদেকুর রহমান, বীরমুক্তিযোদ্ধা ইউজিন ভিনসেন্ট গোমেজ, বীরমুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন (অব.) আব্দুল মালেক, বীরমুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম কাঞ্চন এবং বীরমুক্তিযোদ্ধা রওশন আরা বেগম প্রমুখ। সভা পরিচালনা করেন বীরমুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দিন গেরিলা।

অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য উপস্থাপন করেন বঙ্গীয় সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক বিশিষ্ট লেখক কামরুল ইসলাম।

মফিদুল হক তাঁর বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কার্যক্রম ও ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন, বীরমুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত সামগ্রী, চিঠিপত্র, দুর্লভ ঘটনা এবং যুদ্ধকালীন স্মৃতিচারণের রেকর্ডসহ বিভিন্ন উপকরণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সংগ্রহশালায় সংরক্ষণের জন্য প্রদান করার আহ্বান জানান।

বক্তাগণ বলেন, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাসকে অবমূল্যায়ন ও বিকৃতভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টায় স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি ও তাদের দোসররা লিপ্ত রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন, স্থাপনা, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারীদের গৃহ ও অফিস, বিভিন্ন ভাস্কর্য ভাঙচুর ও ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে একটি অশুভ শক্তির ভয়াবহ দাপট স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

তাঁরা আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে বীরমুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিশিষ্টজনদের ওপর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মবসন্ত্রাস সৃষ্টির বহু ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।

দুষ্কৃতিকারীদের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত বা বিধ্বস্ত মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাস-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা, ভাস্কর্য, নিদর্শন এবং বীরমুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্টজনদের আবাস ও অফিস সংস্কার এবং প্রয়োজনে পুনর্নির্মাণের দাবি জানানো হয়।

বীরমুক্তিযোদ্ধাদের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর তুলনা করা বা অন্য কাউকে তা প্রদানের পরিকল্পনা মোটেই কাঙ্ক্ষিত নয় বলেও মত প্রকাশ করা হয়।

সভায় বীরমুক্তিযোদ্ধাদের বিদ্যমান ভাতা ২৫ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দেশসমূহের সঙ্গে সম্পর্ককে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে আন্তঃদেশীয় পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।

দেশের বিভিন্ন স্থানে সামাজিক অনাচার, ধর্মান্ধতা ও নৃশংসতার যেসব দৃশ্য সামনে আসছে, তা ভীতিকর বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি বলে উল্লেখ করে এসব বিষয়ে সরকার দৃঢ়তার সঙ্গে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।

দেশের অর্থপাচার ও লুটতরাজের ভয়াবহ চিত্র গণমাধ্যম ও পত্রপত্রিকায় উঠে এসেছে উল্লেখ করে এসব লুটেরাদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়।

দেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অসম চুক্তি বাতিলের দাবিও উত্থাপিত হয়।

বীরমুক্তিযোদ্ধাগণ মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন স্মৃতিচারণ করেন। বক্তাগণ বলেন, রাজনৈতিক অভিলাষ ও প্ররোচনার কারণে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস বিকৃত করার কোনো প্রচেষ্টা যেন না হয়, সে বিষয়ে সরকারের সতর্ক দৃষ্টি থাকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা মৈত্রী সংসদের উদ্যোগে এবং বঙ্গীয় সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদের সহযোগিতায় ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে বীরমুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সময় সহায়তাকারী বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, শিল্পী, কবি, লেখক ও পেশাজীবীদের অংশগ্রহণে একটি “আন্তঃদেশীয় সভা” আয়োজনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বীরমুক্তিযোদ্ধাগণ যথাক্রমে মো. আবুল হায়াত হেদায়েত, মোজাম্মেল হক বীরপ্রতীক, মাহবুব জামান, শেখ রবিউল হক, জয়ন্তী রায়, কাওসার চৌধুরী, নাজিম উদ্দিন গেরিলা, শামছুল হক সিকদার, সিরাজুল ইসলাম কাঞ্চন, রাজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, ছাদেকুর রহমান, আবু আক্কাস, শফিকুল ইসলাম, গোপাল চন্দ্র দাস, ইউজিন ভিনসেন্ট গোমেজ, ফরিদা আক্তার, গোলাম হায়দার, এ এম সায়েম, মনসুর আহমেদ, চাঁন মোল্লা, পদ্মা রহমান, বোরহান উদ্দিন মিষ্ঠু, তৌফিকুল বারী, ক্যাপ্টেন (অব.) আব্দুল মালেক, মো. জাহাঙ্গীর খান, সৈয়দ মোস্তফা, মফিজ খান, আব্দুল মালেক, নির্মল চন্দ্র, বিমল চন্দ্র দাস, গোপাল চন্দ্র দাস, রওশন আরা বেগম, এ এম হুমায়ুন রেজা কামাল, আমির হোসেন মোল্লা, আনোয়ার হোসেন পাঠা, গীলবার্ট নির্মল বায়েন, দিল আফরোজ বেগম দিলু, এ কে এম শামীম চৌধুরী, আব্দুর রাজ্জাক, আবু সালেহ মো. নূরুল ইসলাম হিরো, আমির আলী, আনোয়ার হোসেন পাঠান, নাজিম উদ্দীন তালুকদার, মো. আকরাম হোসেন প্রমুখ।

আমন্ত্রিত সম্মানিত পরিবারবর্গ ও অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নূরজাহান বেগম, পারভীন রশীদ, রেফুল করিম, রীনা তালুকদার, কথিকা বড়ুয়া, মরিয়ম আক্তার বকুল, ফায়সাল এজাজ, লায়লা নূর মুক্তি, শাহরিয়ার রশীদ, আতিকা হোসেন, শাহাদাত আবরার, ফারজানা সাথী, মৌসুমী হক, মাহমুদ রশীদ, ক্রিস্টিনা গোমেজ, মো. সিরাজ উদ্দীন, মালেকা বেগম, নিলুফার বেগম, মো. ফকর উদ্দিন, সৈয়দ আনিসুর রহমান, মৌসুমী খাতুন, হাফিজুর রহমান, আসাদুল্লাহ, শাহীন হোসেন, নাজিব তারেক, সাইফুল ইসলাম, রঞ্জন সিনহা, কামরুল ইসলাম প্রমুখ।

অনুষ্ঠানের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সম্মুখে অবস্থিত ‘শিখা অম্লান’-এ বীরদের প্রতি ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এরপর প্রয়াত বীরশহীদ ও বীরমুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে আগত জাতীয় বীরগণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত বিরল সংগ্রহশালার গ্যালারি পরিদর্শন করেন। শেষে উপস্থিত সকল বীরমুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাস সংরক্ষণে ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!