লন্ডন থেকে গিলবার্ট থমাসের সম্পাদনায় ‘দ্য ভেনচারার’ ছোটকাগজের ১৯২১ সালের একটি সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতিদীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল। সে সাক্ষাৎকারটির বঙ্গানুবাদ করেছেন তুহিন দাস। সাক্ষাৎকারটি কে নিয়েছেন তা উল্লেখ নেই; সম্ভবত সম্পাদকের নেয়া।
সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনেক প্রতিকৃতি ছিল এবং সবগুলোই তার মতো! সম্ভবত তিনিই সেই ব্যক্তি যিনি অভিবাদন জানাতে নিজের ক্যানভাস থেকে বেরিয়ে আসছেন বলে মনে হচ্ছে। তিনি তার লেখার মাধ্যমে পশ্চিমকে যে বার্তা ও সঙ্গীত দিয়েছেন সে কথা আমি ভাবছিলাম: ‘গীতাঞ্জলি’র সুবাস, ‘ডাকঘর’ এর সাধারণ অনুভূতিমালা আমার মনে জেগে উঠেছিল, কিন্তু যখন তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন, মানুষটির ব্যক্তিত্ব নিজেই তার কাজের প্রতিটি স্মৃতিকে ভিড় করিয়েছে।
ভারতে চলমান আন্দোলন সম্পর্কে আমি তার মতামত জানতে চাইলাম। খানিকটা উঁচু-নিচু, ক্লান্ত কণ্ঠে, খুব সামান্য বাঁক নিয়ে ও খুব কমই বিরতি দিয়ে, তিনি একটি ধারাবাহিক বক্তব্য দিলেন। কণ্ঠস্বরটি একটি অজানা ও প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা একজন ব্যক্তির পরিশ্রমের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ যা তার ওজনকে উপেক্ষা করার জন্য খুব সংবেদনশীল, আবার যোগসূত্র করার জন্য খুব শক্তিশালী, ক্রমাগত এমন বৈশিষ্ট্যময় চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু প্রায় সময়ে উদ্দীপনা, হাস্যরস, এমনকি এক অতর্কিত নিন্দা তার চোখের গভীর গর্ত জুড়ে জ্বলজ্বল করে।
“বর্তমান আন্দোলন? এটা সবচেয়ে বিস্ময়কর। আমি এর নাম পছন্দ করি না। আমি এর সমস্ত প্রবণতার সঙ্গে একমত নই। অসহযোগের অর্থ হল—অন্তত কিছু—বিচ্ছিন্নতার আকাঙ্ক্ষা, শুধুমাত্র ভারতে ব্রিটিশ সরকারের অপকর্ম থেকে নয়, বরং পশ্চিমের সমগ্র সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, এবং এটি অগ্রগতির সম্ভাবনার জন্য ক্ষতিকর হবে। যদিও নিঃসন্দেহে এমন কিছু লোক আছে যারা পশ্চিমা বস্তুবাদের অশ্লীল অসারতা নিয়ে বিরক্ত এবং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বাসঘাতকতায় মোহভঙ্গ হয়ে আমাদের মধ্য থেকে আধুনিক বিশ্বের প্রতিটি চেহারাকে মূলোৎপাটন করতে চাইবে, সেই ধ্বংসকারীরা কেবলমাত্র পশ্চিমের হাতে আমরা যে গুরুতর মন্দতা পেয়েছি তার লক্ষণ এবং ভারতীয় চেতনার ব্যাপক সহনশীলতা ও গ্রহণযোগ্যতার বৈশিষ্ট্য নয়। আমরা পশ্চিমা সংস্কৃতি ছাড়া উন্নতি করতে পারি না, পশ্চিমও অবশ্যই আমাদের ছাড়া অগ্রসর হতে পারে না। জাতীয় আন্দোলন, যাকে ভুল করে বলা হচ্ছে ’অসহযোগিতা’, আসলে তা নয়, এটি জাতীয় জীবনের একটি মহান পুনর্গঠন, এবং এর পেছনে সমস্ত শ্রেণির জনগণ রয়েছে; কেবলমাত্র কিছু পরিশীলিত ব্যক্তিরা যারা একটি বিচ্ছিন্ন শিক্ষা গ্রহণের শিকার হয়েছে তারা পাশে সরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে।”
“আমার কাছে যে জিনিসটা খুব চমৎকার, যে জিনিসটা খুব স্পর্শকাতর সুন্দর ও আমাদের মানুষের মৌলিক আধ্যাত্মিকতার জন্য এতোটা তাৎপর্যপূর্ণ, সেটা হল গান্ধীর প্রতি তাদের ভক্তি। সমস্ত বুদ্ধিবৃত্তিক সূক্ষ্মতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষিত বাগ্মীতা যা একজন সফল আধুনিক রাজনীতিবিদের থাকে সেসব তাদের কাছে বৃথা। তারা গান্ধীকে দৃঢ়বদ্ধভাবে অনুসরণ করে শুধুমাত্র একটি কারণে যে তারা তাকে একজন সন্ত বা পবিত্র ব্যক্তি বলে বিশ্বাস করে। একজন সাধুকে অনুসরণ করার জন্য নানারকম সম্প্রদায়, মেজাজ ও আদর্শের একটি পুরো দেশকে হাত মেলানো দেখা এটি একটি আধুনিক অলৌকিক ঘটনা এবং শুধুমাত্র ভারতেই সম্ভব। আমি অনেক বিষয়ে গান্ধীর সাথে একমত নই, কিন্তু আমি ওনাকে আমার পরম শ্রদ্ধা ও প্রশংসা করি।তিনি শুধু ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষই নন, তিনি আজ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। আন্দোলনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফলগুলির মধ্যে একটি হল এটি কার্যত মদপান ব্যবসাকে ধ্বংস করেছে। এটা জানতে পারা অসাধারণ যে যারা মদপানের অভ্যাসের জন্য প্ররোচিত ও প্রলুব্ধ হয়েছে তারা কিভাবে শুধুমাত্র গান্ধী বলার কারণে ছেড়ে দিয়েছে। বদ্ধ মাতালরা গান্ধীর প্রতি তাদের ভক্তির মাধ্যমে যে কোন প্রকারে মদকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করার শক্তি খুঁজে পায়। তারা সাদামাটাভাবে বলে যে, ”মহাত্মা গান্ধী এটা নিষেধ করেছেন”, এবং সারাজীবনের মন্দ শেকলগুলো ভেঙে যায়। রাজস্বের একটি ফলপ্রসূ উৎসের এই পাইকারি দমনে সরকার অত্যন্ত বিরক্ত, ভান করছে যে কিছু রাষ্ট্রদ্রোহী প্রভাব রয়েছে এবং অনেককে নির্যাতন করছে। কিন্তু জনগণ কিছু মনে করবে না, গান্ধীর জন্য ও ভারতের মুক্তির জন্য তারা উল্লাস করে কারাগারে যাবে।”
আমি রবীন্দ্রনাথকে তার নিজের কাজ সম্পর্কে আমা
কে কিছু বলতে বলেছিলাম, এবং তিনি বলা চালিয়ে গেলেন:“বর্তমানে, আমি শান্তিনিকেতন বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন নিয়ে সম্পূর্ণভাবে ব্যস্ত, যেটি আপনি জানেন, আমি বিশ বছর আগে একটি ছোট্ট বিদ্যালয় হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। বছরের পর বছর ধরে ভবনগুলো ও সরঞ্জামাদি যোগ করা হয়েছে, এখন পর্যন্ত এর খ্যাতি সারা বিশ্বে পরিচিত ও এর রক্ষণাবেক্ষণ কোনো একক ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের সামর্থ্যের বেশ বাইরে।”
“সমতার শর্তে সহযোগিতা হলো চলমান যুগের মহান বার্তা। সকল মানুষের যৌথতা ভবিষ্যতের সভ্যতার মূল মন্ত্র।”
“যে দেশগুলো অহংকার বা লোভের বশবর্তী হয়ে যুগের চাবিশব্দকে স্বীকার করতে অস্বীকার করে তারা পদযাত্রা থেকে ছিটকে পড়বে এবং মরুভূমিতে ধ্বংস হবে। এখন আমাদের সামনে সমস্যা হল একটি একক দেশের যেটি নিজেই একটি বিশ্ব যেখানে সম্প্রদায়গুলোকে এককভাবে নিজেদের আত্ম-প্রকাশের স্বাধীনতা খুঁজে পেতে হবে এবং সংঘের বন্ধনেও একত্রিত হতে হবে। এই লক্ষ্যে, প্রত্যেককে অবশ্যই অন্য সকলের উপহার ও সামর্থ্যের প্রশংসা করতে হবে। প্রাচ্যকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে উপলব্ধি করতে শিখতে হবে, পশ্চিমকেও পূর্বকে বুঝতে শিখতে হবে। পশ্চিমাদের দ্বারা পূর্বের দেশগুলোর নির্মম বাণিজ্যিক ও সামরিক শোষণের কারণে এ পর্যন্ত প্রাচ্য পাশ্চাত্য থেকে নৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল। এই বিরহ উভয়ের জন্য খুব গভীরভাবে আঘাতমূলক হয়েছে। যদি না আমরা যে যুদ্ধ থেকে সবেমাত্র বেঁচে গেছি তার চেয়েও ভয়ানক এবং ব্যাপক একটি বিশ্ব বিপর্যয়ে অসীমভাবে ধ্বংস হয়ে যাই, কিছু সংশোধনের উপায় কিছু সহযোগিতার উপায় প্রদান করা আবশ্যক। এটি অর্জন করতে পূর্ব ও পশ্চিম মানবতার মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া প্রচারের অন্যতম সেরা উপায় হিসাবে কলকাতা থেকে প্রায় নব্বই মাইল দূরে শান্তিনিকেতনে আমি একটি দুর্দান্ত আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গোড়াপত্তন শুরু করেছি। এটা আমার পরিকল্পনা যে সেখানে বিশ্বের সমস্ত প্রান্ত থেকে ছাত্রদের আমাদের দর্শন, শিল্প, সঙ্গীত ও বিজ্ঞানের পদ্ধতিগুলি তাদের শ্রেণীগত পরিবেশে অধ্যয়ন করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে এবং বিভিন্ন বিষয়ে নিযুক্ত অধ্যাপকদের অধীনে গবেষণার কাজ চালিয়ে যাবে। ইংল্যান্ডে, আমেরিকায়, জার্মানিতে এমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রয়েছে যারা প্রতিটি জাতির বিশেষ সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখা সংরক্ষণ করে ও তাদের মাধ্যমে পাশ্চাত্যের মননের ও অর্জনগুলির বিভিন্ন দিকগুলো বিশ্বের কাছে উন্মোচিত হয়। আমাদের নিজস্ব অমূল্য ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করতে ও সব মানুষের লাভের জন্য দায়বদ্ধ ভারতে এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন। আমার অভিপ্রায় হলো তহবিল বৃদ্ধি করে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ততটুকু সম্প্রসারিত করা যতক্ষণ না এটি প্রাচ্যের সংস্কৃতির সম্পূর্ণ পরিসর–আর্য, মঙ্গোলিয়ান, সেমেটিক ও অন্যান্যকে ধরতে পারে।”
“আমার আকাঙ্ক্ষা শান্তিনিকেতন এমন একটি ভবিষ্যতের ভিত্তি স্থাপনে সহায়ক হবে যেখানে প্রাচ্য ও পশ্চিমের সেরা মননরা একটি নতুন বিশ্ব সভ্যতা গড়ে তুলতে যৌথভাবে কাজ করবে এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্ব শিক্ষা ও ফেলোশিপের কেন্দ্রে পরিণত করতে আমাকে সাহায্য করবে আমি সেই আহ্বানে সাড়া দেওয়া সমস্ত পশ্চিমা কমরেডদের সহযোগিতাকে স্বাগত জানাই।”




