কেন্দ্রীয় চরিত্র

নিশ্চয়ই দেবতা বিমুখ হয়েছেন। তা নাহলে এরকম হতেই পারে না। প্রায় এক যুগ বৃষ্টির‌ নাম গন্ধ নেই। তপ্ত পৃথিবী। চারদিকে যেন অদৃশ্য আগুনের নিরন্তর এক প্রবাহ। এই তাপপ্রবাহে কোনো দিকে কোনো সবুজের চিহ্নমাত্র নেই।
ভূপৃষ্ঠের সবুজ অরণ্যাণীর  কোনো চিহ্ন চোখে পড়ে না। সমস্ত মাঠ শুকিয়ে একবারে ফুটিফাটা। মাটির বুকে বড় বড় হা গর্ত। মানুষ,পশু পাখির মতোই মেদিনী হা করে অপেক্ষা করছে একটু বারিধারার জন্য।
বিভিন্ন জলাশয়, নদী, কূপ সব শুকিয়ে গেছে। আকাশের কোনো কোণায় এক বিন্দু মেঘের সঞ্চার হচ্ছে না। লতাগুল্ম থেকে শুরু করে ঘাস পর্যন্ত শুকিয়ে গিয়ে উষ্ণ বাতাসে উড়ে যাচ্ছে। দিকে দিকে মাত্র এক ফোঁটা জলের জন্য হাহাকার।
কৃষিকাজ কবেই বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে বনিকের বিকিকিনি, পশুপালন সবকিছু। নগর গুলি মানব শূন্য। সমগ্র ভূখণ্ড মানুষ আর পশুপাখির অস্থি ও কঙ্কালে পরিপূর্ণ। যে যেদিকে পারছে পালিয়ে যাচ্ছে। বেদপাঠ, দেবপূজা সব শিকেয় উঠেছে। চারদিকে শুধু খাদ্যের জন্য হাহাকার আর ক্রন্দন। খাদ্যের অভাবে বেশিরভাগ মানুষ মরে গেল। যারা বেঁচেছিল তারা পরস্পর পরস্পরের মাংস খেতে শুরু করল। খাদ্য ছাড়া যে বাঁচা যায় না।‌
ঋষি ও তপস্বীরা তাদের জপ – তপ ভুলে তাদের আশ্রম ছেড়ে পালাল। পালাল মানে খাদ্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল। আকাশে বাতাসে শুধুই খাদ্যের জন্য আকুলতার ধ্বনি ঘূর্ণিঝড়ের মতো ওলোটপালট খাচ্ছে। কিন্তু হায়! কোথায় খাদ্য, কোথায় পানীয়! প্রকৃতি যেমন‌ বৃষ্টিহীনতায় জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে মানুষও তেমনি খিধের জ্বালায় দিশেহারা হয়ে খাদ্য,অখাদ্য-কুখাদ্যের মধ্যে আর কোনো পার্থক্য করছে না। সেই কারণেই মানুষ মানুষের মাংস ভক্ষণ করতে দ্বিধা করছে না।
সম্পন্ন গৃহস্থদের ঘরের দরজা বন্ধ। বড় বড় চাষীদের জমানো খাদ্য নিঃশেষ। অনাবৃষ্টিতে চাষাবাদের কথা পাগলেও ভাবতে পারে না। আর তাছাড়া তাদের হালের বলদ গুলো যাদের দিয়ে চাষ করবে তারা কবেই মরে হেজে গেছে। অনেককেই আবার খিদের তাড়নায় মরো মরো গরু, বলদ গুলোকে কেটে খেয়ে ফেলেছে। তখনও কিছু বেঁচে থাকা গাছের লতাপাতা খেয়ে প্রান্তিক মানুষ বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে।
এই অনাবৃষ্টি ও মহামারিতে কত হাজার নারী পুরুষ যে মৃত্যু বরণ করেছিল তার হিসেব নেই।‌ বাতাসের শরীরেও মৃত্যুর গন্ধ।
সেই বৈদিক যুগেরই এক কালের ক্ষত্রিয় রাজা বিশ্বামিত্র যিনি একসময় সব রাজকার্য পরিত্যাগ করে গভীর তপস্যার গুণে ব্রহ্মর্ষি হয়ে উঠেছিলেন এবং ঋগ্বেদের তৃতীয় মন্ডল ও গায়ত্রী মন্ত্র সৃষ্টি করে ঋষিদের মধ্যে মহর্ষি রূপে পরিচিত হয়েছিলেন তিনিও আজ এই মহামারির কবলে পড়েছেন। তার গৃহেও চরম খাদ্যাভাব। নিজের এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের আজ অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে।
বিশ্বামিত্রএই দুর্বিপাকে একেবারে দিশাহারা হয়ে উঠেছেন। ক্ষিদে যে কী ভয়ঙ্কর রকমের এই নশ্বর শরীরের এক এবং একমাত্র শত্রু তা তিনি সম্যক উপলব্ধি করতে পারছেন।‌ কোথায় তাঁর জপ- তপ, কোথায় তাঁর ধ্যান! সব কিছুই এখন অর্থহীন। আবার এটাও উপলব্ধি করতে পারছেন যে জঠরাগ্নির দহন যখন খাদ্যের সাহায্যে নিবে যায় তখন খাদ্য হয়ে ওঠে পরম রত্ন। ক্ষুধার্তের কাছে খাদ্যের থেকে কোনো কিছুই আর মহার্ঘ নয়।
নিজের এবং পুত্র কন্যাদের নিয়ে বিশ্বামিত্র অনাহারে দিন কাটাতে কাটাতে একেবারেই নাজেহাল হয়ে পড়েছেন।‌ খাদ্যাভাবে ও অনাহারে প্রত্যেকের শরীর দিন দিন অবসন্ন হয়ে পড়ছে। এমন অবস্থা যে একটু কথা বলার ক্ষমতাও প্রায় তারা হারিয়ে ফেলেছে। স্ত্রী ও পুত্র কন্যাদের এই করুণ অবস্থা তিনি আর সহ্য করতে পারছিলেন না। শুধু তাই নয়, নিজে খিদের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। নিজের শরীর বাঁচানোর তাগিদে স্ত্রী মেনকাকে  রেখে গৃহত্যাগ করলেন খাদ্যের সন্ধানে। বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা চাইলেন। কিন্তু সব জায়গা থেকেই তিনি প্রত্যাখ্যাত হলেন। কে ভিক্ষা দেবে ? নিরন্ন মানুষ, অনাহারী মানুষ কখনো ভিক্ষা দিতে পারে না।
এমন সময় হঠাৎ দূরে এক গৃহস্থের বাড়ি দেখতে পেয়ে সেই বাড়িতেই ঢুকে গিয়ে করুণ আর্তনাদের সুরে বললেন,
— কেউ আছো। আমাকে একটু খাবার দেবে কেউ?
অনেকক্ষণ কোনো সাড়া না পেয়ে যেই একটু বারান্দার দিকে এগিয়ে গেলেন তখন দেখলেন এক কঙ্কালসার রমণী বারান্দার মাটির মেঝেতে শুয়ে আছেন। ঐ শরীরে প্রাণ আছে কিনা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। একটু পরেই ঐ রমণীর কন্ঠ থেকে চিঁ চিঁ আওয়াজ বেরিয়ে এলো। মহর্ষি বিশ্বামিত্র কিছুই বুঝতে পারলেন না। অনেকক্ষণ ধরে কান পেতে রইলেন তিনি। এবার যেন একটু একটু বুঝতে পারছেন। মহিলা যেন বলতে চাইছে,
— একটু ভাত দাও।
চমকে উঠলেন মহর্ষি। তিনি দ্রুত পায়ে সেখান থেকে প্রস্থান করলেন।‌
তিনি সম্পূর্ণ দিশেহারা।
প্রবল খিধের জ্বালায় তার খাদ্য – কুখাদ্য – অখাদ্যের জ্ঞানশূন্য হয়ে গেল। উদভ্রান্তের মতো এলোমেলো ঘুরতে ঘুরতে অরণ্যের মধ্যে এক চন্ডাল পল্লীতে এসে পড়লেন।

চারদিকে মৃত মানুষের অঙ্গ বস্ত্র, ভাঙা কলসি, নানা ফুলের মালা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতস্তত। এটা যে একটি শ্মশান তা বুঝতে তার দেরি হলো না। তিনি আরো লক্ষ্য করলেন তার সামনেই পড়ে রয়েছে পশুদের চামড়া কাটার বিভিন্ন অস্ত্র। তিনি স্থির নিশ্চিত হলেন এটা নির্ঘাত চন্ডাল পল্লী। কিন্তু তাতে তার কিছুই যায় আসে না। তার চাই খাদ্য। সে যে খাদ্যই হোক। আর শরীর টানতে পারছেন না। এবার নিশ্চিত মৃত্যু। শরীর এলিয়ে এলো । মাটির উপর শরীর ঢলে পড়ল তাঁর। মাটিতে শুয়ে শুয়েই তিনি লক্ষ্য করলেন তাঁর থেকে কয়েক হাত দূরে তাজা কুকুরের নাড়িভুঁড়ি। নিশ্চয়ই কিছুক্ষণ আগেই কুকুরটিকে হত্যা করা হয়েছে খাওয়ার জন্য। তাই দেখে মহর্ষির প্রায় বুঁজে আসা চোখ চকচক করে উঠল সামনের ঐ খাদ্য দেখে। কিন্তু এই সন্ধ্যায় চন্ডাল পল্লীতে সেখানকার মানুষের মধ্যে চলছে নরক গুলজার। এই অবস্থায় মহর্ষির সাহসে কুলোয় না ঐ খাদ্য চুরি করার। তিনি চোখ বুঁজে অবসন্ন শরীরে মটকা মেরে পড়ে রইলেন একটু গভীর রাতের অপেক্ষায়। ঐ কুকুরের নাড়িভুঁড়ি চুরি করতে না পারলে আর বাঁচার কোনো আশাই নেই।
রাত গভীর হলে চন্ডালের বাড়ি নিঝুম হয়ে পড়ল। সবাই তখন কুকুরের মাংস খেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। মহর্ষি কোনো রকমে নিজের শরীরটাকে ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে ঐ নাড়িভুঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। তিনি একটু এগোতেই কয়েকটা কুকুর চিৎকার করে উঠল। কুকুরের সেই চিৎকারে সেই বাড়ির চন্ডালের ঘুম ভেঙে গেল। সে হাতে একটা বর্শা নিয়ে উঠে এসে চিৎকার করে বলল,
— কে? কে এসেছিস চুরি করতে? আজ শেষ করে ফেলব তোকে।
ভীষণ ভয় পেয়ে মহর্ষি করুণ কন্ঠে বললেন,
— আমায় মেরো না।
— কে তুই? তোর এতো সাহস কোথা থেকে হলো?
লজ্জার মাথা খেয়ে মহর্ষি বললেন,
— আমি মহর্ষি বিশ্বামিত্র।‌
এই কথা শুনে চন্ডালের হাত থেকে ধারালো এবং ছুঁচলো বর্শাটা মাটিতে পড়ে গেল। সে বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। তার বিষ্ময়ের ঘোর কাটতেই সে নত শির হয়ে বলল,
— হে মহর্ষি, আপনার এ কি অবস্থা ?  এই গভীর রাতে একাকী আপনি এখানে কেন এসেছেন?
— আর সহ্য করতে পারছি না। খিদের যে বড় জ্বালা। এই খিদেই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। সারাদিন ঘুরে খাবারের একটা দানাও পাই নি।
— কিন্তু আপনি আমাদের খাদ্য….
চন্ডালের কথা শেষ হওয়ার আগেই মহর্ষি বললেন,
— খিদের যেমন কোনো জাত বর্ণ নেই তেমনি ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য যা পাওয়া যায় তারও কোনো…
— থাক। ও কথা আর বলবেন না।
— তোমাদের কুকুরের যে মাংস কাটা হয়েছে তার জঘনের মাংস নিয়ে ক্ষুধা নিবৃত্তি করতে চাই।
— কি বলছেন আপনি?
— কিছু মনে কোরো না। আমার রুচিকে খিদেই বিষাক্ত করে তুলেছে। তাই খাদ্যের চরিত্র বিচার করা বাতুলতা মাত্র।
— কিন্তু..
— না কোনো কিন্তু না। আমি যথার্থই দুর্বল ও অবসন্ন। বিন্দুমাত্র শক্তি বলতে শরীরে অবশিষ্ট কিছু নেই। খিদের জ্বালায় আমার বোধবুদ্ধি, চৈতন্য সব লোপ পেয়েছে। আমার মন থেকে খাদ্য – কুখাদ্যের প্রভেদ মুছে গেছে। তাই তোমার কাছে কুকুরের জঘনের মাংস ভিক্ষা চাইছি। আমাকে ফিরিয়ে দিও না।
— না, না এ হতে পারে না। আপনি মহর্ষি। আপনাকে আমি কি করে পশুর অধম অংশের মাংস দেবো? তার মধ্যে আমি চন্ডাল।
— দ্যাখ, মরণের থেকে জীবন ভালো। বেঁচে থাকলে ধর্মপালন করা যায়,
তখন জাতের কথা ভাবা যায়। মরে গেলে আর কীইবা থাকে?
— আপনি যা করছেন তা পাপ।
— খিদে পাপ – পুণ্য বোঝে না।
— আমি জ্ঞানত এ কাজ করতে পারব না।
— আমি মহর্ষি। একজন মহর্ষিকে অভুক্ত রাখাও তো পাপ।
— কি বলছেন মহর্ষি?
— ঠিকই বলছি। যদি প্রাণে বেঁচে থাকি তবে পরে পুণ্য কর্মের দ্বারা একসময় পাপের ক্ষয় সম্ভব হবে। তোমারও কোনো পাপ হবে না।‌
— মহর্ষি, আমি পুণ্যের জন্য কাঙাল নই।
—- তা হলে তোমার এই প্রঙ্গনেই আমার দেহের বিনাশ ঘটুক।
চন্ডাল বুঝতে পারল নাচার মহর্ষিকে নিবৃত্ত করা তার পক্ষে আর কিছুতেই সম্ভব না।
সে কুকুরের জঘনের মাংস দিতে বাধ্য হল।
বিশ্বামিত্র কুকুরের অধম অংশের নিকৃষ্ট মাংস নিয়ে ঘরের দিকে ফেরার সময় এক চিরকালীন অমোঘ উচ্চারণ করে গেলেন,
— এই নশ্বর শরীরের চির শত্রু যেমন খিদে তেমনি চিরকালীন মিত্র খাদ্য।  এই পৃথিবীর নাট্যমঞ্চে খিদে আর খাদ্যই কেন্দ্রীয় চরিত্রে বিরাজমান। আর সব পার্শ্ব চরিত্র মাত্র।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!