পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু—উভয়ের নামই উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। ইতিহাস বলে যে, এঁদের মধ্যে একজন যেখানে অগ্নিবীণার ঝঙ্কার তুলে পরাধীন জাতির সুপ্ত চেতনাকে জাগ্রত করেছিলেন, অন্যজন সেখানে সশস্ত্র বিপ্লব ও অদম্য নেতৃত্ব দিয়ে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। আরো লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, এঁদের দু’জনের মধ্যেকার বয়সের ব্যবধান সামান্য (সুভাষচন্দ্র নজরুলের থেকে মাত্র দু’বছরের বড় ছিলেন) হলেও আদর্শ ও কর্মপন্থায় এঁরা উভয়েই আপসহীন পূর্ণস্বরাজের সমর্থক ছিলেন। এছাড়া কাজী নজরুল ইসলাম সুভাষচন্দ্র বসুকে ভারতের মুক্তির প্রধান প্রতীক ও তরুণ প্রজন্মের এক আপসহীন নায়ক হিসেবেই দেখেছিলেন; আর তৎকালীন কংগ্রেসের অহিংস ও ধীরনীতির বিপরীতে সুভাষচন্দ্রের চরমপন্থী এবং সক্রিয় সংগ্রামকে প্রাণভরে নিজের সমর্থন জানিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, নজরুল একথাও অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, ভারতের মুক্তি কখনোই কোনো অনুগ্রহের দান হতে পারে না; বরং, তা শক্তি ও ত্যাগের মাধ্যমেই অর্জন করতে হবে। আর একারণেই সুভাষচন্দ্রের বীরত্ব ও দূরদর্শিতাকে সম্মান জানিয়ে তিনি তাঁর ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতাসহ একাধিক লেখায় এবং বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্মেলনে গাওয়া গানে এ অদম্য নেতৃত্বকেই আহ্বান জানিয়েছিলেন। অতীতে নজরুলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সমকালীন ও প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক-জীবনীকার কাজী আবদুল ওদুদ নজরুল ও সুভাষচন্দ্রের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল সুর এবং ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ সৃষ্টির সময়কাল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছিলেন—
“নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কেবল একটি সাময়িক কবিতা ছিল না; সুভাষচন্দ্রের রাজনীতিতে যে পূর্ণস্বরাজ ও হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বলিষ্ঠ আহ্বান ছিল, এই গান বা কবিতা তারই এক অনবদ্য বাণীময় রূপ। ১৯২৬ সালের কৃষ্ণনগর কংগ্রেস সম্মেলনে যখন রাজনীতিতে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছিল, তখন নজরুল তাঁর গান দিয়ে সুভাষচন্দ্রের চরমপন্থী আন্দোলনের সেনানী ও তরুণদের নতুন উদ্যম এনে দিয়েছিলেন।” (নজরুল-চর্চা, কাজী আবদুল ওদুদ, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, কলকাতা, ১৯৫৬, প্রথম সংস্করণ, পৃ: ৬৪–৬৭ দ্রষ্টব্যঃ)
নজরুলের বিশিষ্ট জীবনীকার বাঁধন সেনগুপ্ত তাঁর গ্রন্থে নজরুল ও সুভাষচন্দ্রের মধ্যেকার গভীর সখ্য এবং কংগ্রেসের মূলধারার অহিংস রাজনীতির বিপরীতে তাঁদের যৌথ চরমপন্থী মনোভাব সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছিলেন—
“সুভাষচন্দ্র ও নজরুল দু’জনেই বিশ্বাস করতেন, ভারতের স্বাধীনতা কোনো ভিক্ষা বা আবেদনের দ্বারা অর্জিত হতে পারে না; তার জন্য প্রয়োজন চরম ত্যাগ ও শক্তি প্রয়োগ। নজরুল সুভাষচন্দ্রের মধ্যে ভারতের মুক্তির প্রকৃত নায়ককে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। কৃষ্ণনগরের প্রাদেশিক কংগ্রেস সম্মেলনে ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ গানটি গাওয়ার মধ্য দিয়ে নজরুল বস্তুত সুভাষচন্দ্রের আপসহীন নেতৃত্বের হাতেই যেন পরাধীন দেশের কাণ্ডারীর দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন।” (নজরুল জীবনকথা, বাঁধন সেনগুপ্ত, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা, ১৯৯৮, পৃ: ১২৮–১৩০ দ্রষ্টব্যঃ)
বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ও জীবনীকার ডঃ রফিকুল ইসলাম নজরুল ও নেতাজির ঐতিহাসিক সম্পর্কের মূল্যায়ন, এবং ১৯২৯ সালে নজরুলকে প্রদত্ত বিখ্যাত গণসংবর্ধনার প্রেক্ষাপটে লিখেছিলেন—
“সুভাষচন্দ্র বসু কাজী নজরুল ইসলামকে স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রধান প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। নজরুল যেমন সুভাষচন্দ্রকে মুক্তি সংগ্রামের কাণ্ডারী হিসেবে তাঁর লেখায় আবাহন করেছিলেন, সুভাষচন্দ্রও তেমনি প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন যে যুদ্ধক্ষেত্রে বা কারাগারে সর্বত্র নজরুলের গানই তাদের পাথেয়। তাঁদের আদর্শ ছিল অভিন্ন—আপসহীন পূর্ণস্বরাজ।” (নজরুল-জীবনী, ডঃ রফিকুল ইসলাম, নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা, ১৯৯৬, পৃ: ২১৫–২১৮ দ্রষ্টব্যঃ)
আর নজরুলের জীবনের রাজনৈতিক পর্যায়ের ঘনিষ্ঠতম সহযোদ্ধা মুজফ্ফর আহমদ তাঁর স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন—
“কাজী নজরুল ইসলাম সুভাষচন্দ্রকে ভারতীয় যুবশক্তির প্রতীক মনে করতেন। গান্ধীজীর অহিংস আন্দোলনের ধীরগতি নজরুলের বৈপ্লবিক চেতনাকে তুষ্ট করতে পারেনি। তাই সুভাষচন্দ্রের চরমপন্থী চিন্তাধারা ও সশস্ত্র বিপ্লবের আহ্বানকে নজরুল তাঁর গান ও কবিতার মাধ্যমে প্রাণঢালা সমর্থন জুগিয়েছিলেন।” (কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা, মুজফ্ফর আহমদ, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৯৫৯, পুনর্মুদ্রণ ২০০৫, পৃ: ৮৫–৮৮ দ্রষ্টব্যঃ)
নজরুল-জীবনীকার ও গবেষকদের এসব বক্তব্য থেকে স্পষ্টভাবেই বুঝতে পারা যায় যে, পরাধীন ভারতের রাজনীতিতে সুভাষচন্দ্রের ভূমিকাকে নজরুল অত্যন্ত উচ্চে স্থান দিয়েছিলেন। আর তিনি দৃঢ়ভাবেই একথা বিশ্বাস করেছিলেন যে, সুভাষচন্দ্র শুধুই একজন রাজনৈতিক নেতা নন; বরং, তিনি প্রথাবোধ্য রাজনীতির ঊর্ধ্বে ওঠা এক বিপ্লবের বার্তাবাহক। বস্তুতঃ, সুভাষচন্দ্র যখন বারবার বৃটিশদের দ্বারা কারারুদ্ধ হচ্ছিলেন, তখন নজরুল তাঁর গান ও কবিতার মাধ্যমে সুভাষের সে আত্মত্যাগকে উদ্যাপিত করেছিলেন। অন্যভাবে বললে, পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বারবার কারারুদ্ধ হওয়া, রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে মান্দালয়ে নির্বাসিত হওয়া, কিংবা গৃহবন্দী অবস্থা থেকে মহানিষ্ক্রমণ—এসব ঘটনাকে কাজী নজরুল ইসলাম শুধু একজন বিপ্লবীর ব্যক্তিগত ত্যাগ হিসেবে দেখেননি; বরং, সমগ্র পরাধীন ভারতের মুক্তির অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে গণকাব্য ও সংগীতে উদ্যাপন করেছিলেন। যেমন—সুভাষচন্দ্রের কারাবাস ও আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নজরুল তাঁর একটি প্রবন্ধে নিজের গভীর আস্থা ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছিলেন—
“সুভাষচন্দ্র আমাদের তরুণ প্রজন্মের আশার প্রদীপ, মুক্তির আলোকবর্তিকা। তিনি এমন এক নেতা, যিনি আপসের রাজনীতি বিশ্বাস করেন না। ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যে ত্যাগ ও রক্তক্ষয় প্রয়োজন, সুভাষচন্দ্র সেই বলিদানের পুরোধা সেনানী।” (নজরুল রচনাবলী, পঞ্চম খণ্ড, রফিকুল ইসলাম ও অন্যান্য সম্পাদিত, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৩, পুনর্মুদ্রণ ২০০৮, পৃ: ৩৪২–৩৪৫ দ্রষ্টব্যঃ)
আর ১৯২৪ সালে রাজদ্রোহিতার অভিযোগে সুভাষচন্দ্রকে যখন মান্দালয় জেলে বন্দি করা হয়েছিল, তখন নজরুল ক্ষোভে ফেটে পড়ে মন্তব্য করেছিলেন—
“সুভাষকে বন্দি করে ওরা (বৃটিশ সরকার) ভেবেছে ভারতের মুক্তি আন্দোলন স্তব্ধ করে দেবে। কিন্তু সুভাষ কোনো ব্যক্তি নন, সুভাষ একটি বিপ্লবের প্রতীক। কারাগারের অন্ধকূপ তাঁর আত্মত্যাগের মহিমাকে আরও উজ্জ্বল করবে।” (নজরুল-জীবনী, ডঃ রফিকুল ইসলাম, নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা, ১৯৯৬, পৃ: ১৯৮–২০০ দ্রষ্টব্যঃ)
শুধু তাই নয় বিদেশী সরকারের বিরুদ্ধে সুভাষচন্দ্রের সংগ্রাম ও বিভিন্ন সময়ে কারারুদ্ধ হওয়ার ঘটনায় উৎসাহিত ও ব্যথিত হয়ে নজরুল তাঁকে নিয়ে একাধিক কালজয়ী কবিতা ও গানও রচনা করেছিলেন। যেমন—সুভাষচন্দ্র বসু মান্দালয় জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বাংলায় ফিরে আসবার পরে তাঁর বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য নজরুল ‘সুভাষ-বন্দনা’ নামক একটি বন্দনাগীতিটি রচনা করে বলেছিলেন—
“ওরে আয় রে ভাই সুভাষ দরদী,
তোর তরে বুক ফাটে রে অহোরাতি।
তুই তো ভারতের মুক্তির পথপ্রদর্শক,
তোর ত্যাগে জাগে ঘুমন্ত জাতি …”
(প্রলয়-শিখা, কাজী নজরুল ইসলাম, ডি. এম. লাইব্রেরি, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৯৩১, প্রথম প্রকাশ নিষিদ্ধ হয়েছিল, পৃ: ২৩–২৫ দ্রষ্টব্যঃ)
বস্তুতঃ, সেযুগের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সুভাষচন্দ্র যখনই কারারুদ্ধ হয়েছিলেন, নজরুল তখনই তাঁর রাজনৈতিক সাময়িকী ‘লাঙল’ ও ‘ধূমকেতু’তে সম্পাদকীয় এবং কবিতার মাধ্যমে সুভাষ ছবি ও আত্মত্যাগের কাহিনী সকলের সামনে তুলে ধরেছিলেন। এমনকি নিজের ‘সাব্যসাচী’ কবিতাতেও তিনি সুভাষচন্দ্রের মত সর্বমুখী রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন—
“বলো ‘না ভীতি!’ বলো ‘জয় ভারত!’
বলো ‘জয় সুভাষ, জয় বিপ্লব!’”
(ফণিমনসা, কাজী নজরুল ইসলাম, ডি. এম. লাইব্রেরি, কলকাতা, ১৯২৭, পৃ: ৪২–৪৫)
নজরুলের স্পষ্ট মত ছিল যে, সুভাষচন্দ্রের রাজনীতিতে কোনো ভণ্ডামি বা আপস বলে কিছু নেই; আর ভারতীয় যুবসমাজকে আত্মাহুতির মন্ত্রে দীক্ষিত করবার ক্ষমতা একমাত্র সুভাষের মধ্যেই রয়েছে বলে তিনি মনে করতেন। আর একারণেই সুভাষচন্দ্রের সততা, অকৃত্রিম দেশপ্রেম এবং যুবসমাজকে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে বলিদানের পথে চালিত করবার অনন্য ক্ষমতা সম্পর্কে নজরুল একসময়ে লিখেছিলেন—
“সুভাষচন্দ্রের রাজনীতিতে কোনো কপটতা বা ভণ্ডামি নেই, নেই কোনো আপসের স্থান। ভারতের তরুণ সমাজকে আজ যদি কেউ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে জীবন উৎসর্গ করার মন্ত্রে দীক্ষিত করতে পারেন, তবে তিনি সুভাষচন্দ্র। তাঁর আহ্বানেই পরাধীন দেশের যুবশক্তি সর্বস্ব পণ করে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত।” (নজরুল রচনাবলী, চতুর্থ খণ্ড, ডঃ রফিকুল ইসলাম ও অন্যান্য, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৩, পুনর্মুদ্রণ ২০০৭, পৃ: ৩১৮–৩২০ দ্রষ্টব্যঃ)
এছাড়া নজরুল তাঁর ‘ধূমকেতু’ ও পরবর্তীকালের বিভিন্ন প্রবন্ধাবলীতে সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে তরুণদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের মহিমাকে বর্ণনা করতে গিয়ে একথাও বলেছিলেন যে—
“ভারতের মুক্তিসংগ্রাম আজ এক নতুন মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। অহিংসার ধীরগতি বা কোনো অনুগ্রহের দান দিয়ে এ দেশ স্বাধীন হবে না। তরুণদের আত্মাহুতির যে মহাদীক্ষা প্রয়োজন, সুভাষের তেজস্বী নেতৃত্বের মধ্যেই তা নিহিত। তিনি এমন এক নেতা যিনি তরুণদের ভণ্ডামিমুক্ত হয়ে দেশের জন্য নিঃশেষ হয়ে যেতে শিখিয়েছেন।” (নজরুল-প্রবন্ধ সমগ্র, আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত, ঐতিহ্য, ঢাকা, ২০০৩, পৃ: ১৪৫–১৪৭ দ্রষ্টব্যঃ)
আর ১৯২৯ সালের ১৫ই ডিসেম্বর তারিখে কলকাতার অ্যালবার্ট হলে (বর্তমানের কফি হাউসে) নজরুলকে দেওয়া সংবর্ধনাসভার প্রেক্ষাপটে এবং তৎকালীন বিভিন্ন যুব সম্মেলনে তিনি সুভাষচন্দ্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দ্বার্থহীন ভাষায় স্বাগত জানিয়ে বলেছিলেন—
“আমি সুভাষকে দেখেছি—তিনি কেবল এক রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি হচ্ছেন ভারতের সুপ্ত যুবশক্তির প্রাণপুরুষ। তাঁর রাজনীতিতে ছদ্মবেশ কিংবা ভণ্ডামির কোনো ঠাঁই নেই। সত্য ও বিপ্লবের যে কঠিন পথ তিনি বেছে নিয়েছেন, কেবল সেখানেই ভারতের মুক্তি নিহিত।” (নজরুল-জীবনী, ডঃ রফিকুল ইসলাম, নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা, ১৯৯৬, পৃ: ২১৮–২২০ দ্রষ্টব্যঃ)
আলোচনা প্রসঙ্গে একথাও উল্লেখ্য যে, সুভাষচন্দ্রের মতোই সেযুগের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নজরুল ইসলামের জাতীয়তাবাদও অত্যন্ত ব্যতিক্রমী, অসাম্প্রদায়িক এবং বৈপ্লবিক ছিল বলেই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। আর একারণেই তিনি তাঁর ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় স্পষ্টভাবেই লিখতে পেরেছিলেন—
“হিন্দু না ওরা মুসলিম? ঐ জিজ্ঞাসা কোন জন?
কণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।”
এথেকে স্পষ্টভাবেই বুঝতে পারা যায় যে, নজরুলের জাতীয়তাবাদ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং, তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির ওপরে ভিত্তি করেই বৃটিশদের হাতে শোষিত ভারতবাসীর জাতীয়তাবাদী চেতনা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। বস্তুতঃ, গান্ধীজির অহিংস আন্দোলন এবং স্বরাজ দাবির অনেক আগেই ১৯২২ সালে নজরুল কিন্তু তাঁর ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার মাধ্যমে স্পষ্টভাষায় ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি করেছিলেন।
“সর্বপ্রথম ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম ক’রে থাকেন। ভারতের এক পরমাণু অংশও বিদেশী অধীনে থাকবে না। ভারতের সর্বময় কর্তৃত্ব, সর্বময় স্বাধীনতা, ভারতীয়দের হাতে থাকবে। তাতে কোনো বিজাতীয়র কোনরূপ শাসন করার অধিকার থাকবে না। যারা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এ দেশে গোলযোগ পাকাচ্ছেন, তাঁদের পাঠাতে হবে আল্পস পর্বতের ওপারে। কোনো হুকুম-হুকুমত বা মেহেরবানি করে স্বরাজ দেওয়া আমাদের মঞ্জুর নয়। আমরা চাই পূর্ণ স্বাধীনতা।” (ধূমকেতু পত্রিকার ১২’শ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘ধূমকেতুর পথ’ শিরোনামের সম্পাদকীয় নিবন্ধ, ১৩ই অক্টোবর ১৯২২, ৭ই কার্তিক ১৩২৯ বঙ্গাব্দ; নজরুল রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, ডঃ রফিকুল ইসলাম ও অন্যান্য সম্পাদিত, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৩, পুনর্মুদ্রণ ২০০৭, পৃ: ২৩–২৫ দ্রষ্টব্যঃ)
শুধু তাই নয়, নজরুল তাঁর সময়কার রাজনীতিকে শুধু শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বৈঠকখানার আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি বলেই ‘লাঙ্গল’ (১৯২৫) ও ‘গণবাণী’ (১৯২৬) পত্রিকার মাধ্যমে কৃষক ও মজুর শ্রেণীর শোষণের বিরুদ্ধে সুর তুলেছিলেন; এবং ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের সাথে যুক্ত করবার চেষ্টা করেছিলেন। অতীতে বিশিষ্ট নজরুল-জীবনীকার ডঃ রফিকুল ইসলাম নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং ‘লাঙল’ ও ‘গণবাণী’ পত্রিকার মাধ্যমে কৃষক-মজুর শ্রেণীকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যুক্ত করবার বিষয়ে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছিলেন—
“নজরুলের জাতীয়তাবাদ ছিল সংকীর্ণতা ও সম্প্রদায়চেতনার ঊর্ধ্বে। তিনি বিশ্বাস করতেন, হিন্দু ও মুসলিম—ভারতের এই দুই বৃহৎ সম্প্রদায়ের ঐক্য ছাড়া ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম জয়যুক্ত হতে পারে না। উপরন্তু, রাজনীতিকে কেবল শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বৈঠকখানা থেকে বের করে এনে তিনি ‘লাঙল’ ও ‘গণবাণী’র মাধ্যমে ভারতের পরাধীনত বিরোধী আন্দোলনকে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের শ্রমাণুভূতির সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তিনি কেবল রাজনীতির মুক্তি চাননি, চেয়েছিলেন সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণ থেকে কৃষক-মজুরের সার্বিক মুক্তি।” (নজরুল-জীবনী, ডঃ রফিকুল ইসলাম, নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা, ১৯৯৬, পৃ: ১৭৫–১৭৯ দ্রষ্টব্যঃ)
নজরুলের রাজনৈতিক জীবনের নিকটতম সখা এবং ‘লাঙল’ ও ‘গণবাণী’ পত্রিকার অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা মুজফ্ফর আহমদ তাঁদের যৌথ রাজনৈতিক উদ্যোগ ও নজরুলের অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানিয়েছিলেন—
“কাজী নজরুল ইসলামের জাতীয়তাবাদে ধর্মীয় সংকীর্ণতার কোনো স্থান ছিল না। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ছিল তাঁর রাজনীতির অন্যতম মৌলিক শর্ত। একই সাথে, তিনি প্রথম অনুধাবন করেছিলেন যে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক ও শ্রমিকদের বাদ দিয়ে কোনো জাতীয় মুক্তি আন্দোলন সফল হতে পারে না। সেই লক্ষ্যেই ১৯২৫ সালে ‘লেবার স্বরাজ পার্টি’র মুখপত্র হিসেবে ‘লাঙল’ এবং পরবর্তীতে ‘গণবাণী’ পত্রিকা প্রকাশ করা হয়, যেখানে কাজী সম্পাদক হিসেবে শোষিত কৃষক-মজুরদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন।” (কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা, মুজফ্ফর আহমদ, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৯৫৯, পুনর্মুদ্রণ ২০০৫, পৃ: ১০২–১০৬ দ্রষ্টব্যঃ)
নজরুলের অন্যতম জীবনীকার বাঁধন সেনগুপ্ত তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও ‘লাঙল’ যুগে তাঁর সাম্যবাদী ও শ্রমজীবী ভাবনার মূল্যায়ন করে লিখেছিলেন—
“নজরুল তাঁর কাব্য ও সাময়িকপত্রের মাধ্যমে ধর্মীয় বিভেদ মুছে ফেলে এক অখণ্ড ভারতীয় জাতীয়তাবোধ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট বুঝেছিলেন যে, ব্রিটিশরা ‘ভাগ কর এবং শাসন কর’ নীতির মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে প্রাচীর তুলেছে, তা না ভাঙলে স্বাধীনতা অসংপূর্ণ থাকবে। আর সেই পথেই তিনি ‘লাঙল’ ও ‘গণবাণী’র পৃষ্ঠায় কৃষক-শ্রমিকের সার্বিক শোষণের বিরুদ্ধে কলম ধরে জাতীয় আন্দোলনকে গণমানুষের অধিকারের আন্দোলনে রূপ দেন।” (নজরুল জীবনকথা, বাঁধন সেনগুপ্ত, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা, ১৯৯৮, পৃ: ১৪২–১৪৫ দ্রষ্টব্যঃ)
আর নজরুলের জীবন ও সাহিত্যরীতির গবেষক আজহারউদ্দীন খান নজরুলের সাম্যবাদী চিন্তাধারা ও সম্প্রীতির রাজনীতি প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন—
“কাজী নজরুল ইসলামের স্বদেশপ্রেম কোনো একটি বিশেষ সম্প্রদায় বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থে আবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন মূলত সাম্যবাদী ও অসাম্প্রদায়িক। হিন্দু ও মুসলিম উভয় সমাজকেই তিনি কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প মুক্ত করে ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর ‘লাঙল’ ও ‘গণবাণী’র লেখনী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে উচ্চবিত্তের ড্রয়িং রুম থেকে টেনে এনে খেটে খাওয়া মানুষের কাস্তে ও লাঙলের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।” (বাংলা সাহিত্যে নজরুল, আজহারউদ্দীন খান, ডি. এম. লাইব্রেরি, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৯৫৪, পরবর্তী বর্ধিত সংস্করণ ১৯৯৩, পৃ: ৮৮–৯১ দ্রষ্টব্যঃ)
যাই হোক, নজরুলের জীবনীকারদের প্রদত্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে, সুভাষচন্দ্র ও নজরুলের মধ্যেকার সম্পর্ক বরাবরই অত্যন্ত নিবিড়, শ্রদ্ধাপূর্ণ ও সখ্যপূর্ণ ছিল; এবং সেযুগের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচিতে তাঁদের মধ্যে একাধিকবার সাক্ষাৎও ঘটেছিল। যেমন—১৯২৮ সালের কলকাতা কংগ্রেস অধিবেশনে—যেখানে সুভাষচন্দ্র বঙ্গীয় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ ছিলেন, সেখানে নজরুল বিপ্লবী সঙ্গীত পরিবেশন করে এ অধিবেশনের পরিবেশকে উদ্বেলিত করে তুলেছিলেন। এরপরের বছর—১৯২৯ সালে চুঁচুড়ায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় যুব সম্মেলনে সুভাষচন্দ্র যখন প্রধান অতিথি ছিলেন, তখন নজরুল এ অনুষ্ঠানের প্রধান গায়ক ও মূল আকর্ষণ ছিলেন। এর আগে ১৯২৩ সালে হুগলি জেলে নজরুল যখন ৩৮ দিনের ঐতিহাসিক অনশন করেছিলেন, তখন সুভাষচন্দ্র ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস তাঁর জন্য অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন; এবং সুভাষচন্দ্র নজরুলের অনশন ভাঙানোর জন্য ব্যক্তিগতভাবে ও রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তাছাড়া ১৯২০’র দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৩০–এর দশকের সূচনা পর্যন্ত কলকাতায় অনুষ্ঠিত বাংলা কংগ্রেসের একাধিক সভা এবং সিরাজগঞ্জের প্রাদেশিক রাজনৈতিক সম্মেলনে তাঁদের ঘন ঘন সাক্ষাৎ ঘটেছিল বলেও ইতিহাস থেকে জানা যায়।
আর নজরুল যেমন সুভাষকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখেছিলেন, ঠিক তেমনি সুভাষচন্দ্র বসুও নজরুল ইসলামের বিপ্লবী চেতনা এবং তাঁর সাহিত্যের রাজনৈতিক শক্তিকে গভীর শ্রদ্ধার সাথেই বিভিন্ন সময়ে স্মরণ করেছিলেন। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে ১৯২৯ সালের ১৫ই ডিসেম্বর তারিখটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়ে থাকে। কারণ, এ দিন কলকাতার ঐতিহাসিক আলবার্ট হলে (বর্তমানের কফি হাউসে) কাজী নজরুল ইসলামকে এক অভূতপূর্ব ও স্বতঃস্ফূর্ত জাতীয় সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছিল। এবং তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ও নজরুল ইসলামের বৈপ্লবিক সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতি হিসেবে এ সভাটি আজও ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। সমকালীন বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায় যে, ১৯২০–এর দশকে নজরুলের অগ্নিঝরা কবিতা, গান এবং রাজনৈতিক কার্যকলাপ বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এসময়ে ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘ভাঙার গান’–এর মত কাব্যগ্রন্থ; এবং ‘ধূমকেতু’ ও ‘লাঙল’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি পরাধীন ভারতবাসীর চেতনায় পূর্ণ স্বাধীনতার আগুন জ্বালিয়ে তুলেছিলেন। আর একারণেই নজরুলকে তখন শুধু একজন কবি বা গীতিকার হিসেবে নয়; বরং, জাতীয় স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে সম্মান জানানোর লক্ষ্যেই সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী ও রাজনেতৃবর্গ এ সংবর্ধনাসভার আয়োজন করেছিলেন। তাছাড়া এ ঐতিহাসিক সংবর্ধনা সভার গুরুত্ব তখন তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বদের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল। কারণ, সেযুগের ভারতের তরুণ বিপ্লবী রাজনীতির অবিসংবাদিত নেতা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু যেখানে এ সভার সভাপতিত্ব করেছিলেন, সেখানে মহান বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় তখন এ সংবর্ধনা কমিটির সভাপতির পদ অলংকৃত করেছিলেন। এছাড়া আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও ব্যারিস্টার এস. ওয়াজেদ আলীসহ তৎকালীন বাংলার অসংখ্য শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মী এ সভায় উপস্থিত ছিলেন। সেদিনের এ সভায় সংবর্ধনা কমিটির সভাপতি হিসেবে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও তাঁর জাতীয়তাবাদী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছিলেন যে, নজরুলের লেখা কবিতা ও গান পরাধীন ও ঘুমন্ত বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তোলবার জন্য অপরিসীম ভূমিকা পালন করেছে। শুধু তাই নয়, এদিন নিজের বক্তৃতায় তিনি নজরুলকে শুধু একজন কবি হিসেবে নয়; বরং, জাতীয় জাগরণের পথিকৃৎ হিসেবেই চিহ্নিত করেছিলেন। অন্যদিকে এ সংবর্ধনাসভার সভাপতি হিসেবে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দেওয়া ভাষণটি আজও পরাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। এদিন সুভাষচন্দ্র তাঁর বক্তৃতায় নজরুলকে জাতীয় সংগ্রামের অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করে বলেছিলেন—
“আমরা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে যাব—তখন সেখানে নজরুলের যুদ্ধের গান গাওয়া হবে। আমরা যখন কারাগারে যাব—তখনও তাঁর গান গাইব।তাঁর লেখার প্রভাব অসাধারণ। তাঁর গান শুনে আমার মত বেরসিক লোকেরও জেলে বসে গান গাইবার ইচ্ছা হত। আমাদের প্রাণ নেই, তাই আমরা এমন প্রাণময় কবিতা লিখতে পারি না। নজরুলকে অনেকে ‘বিদ্রোহী কবি’ বলেন—এটা সত্য কথা। তাঁর অন্তরটা যে বিদ্রোহী, তা স্পষ্ট বোঝা যায়। তিনি যে কেবল কাব্যের রাজ্যেই বিদ্রোহী তা নয়, তাঁর সমস্ত চিন্তাধারা, তাঁর চালচলন, তাঁর কর্ম জীবন—সবই বিদ্রোহে ভরা। ভারত আবার স্বাধীন হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু স্বাধীনতার পর যখন আমাদের একটি নতুন জাতি গড়ে তুলতে হবে, তখনো নজরুলের গানের প্রয়োজন হবে। নজরুল শুধু বর্তমানের কবি নন, তিনি ভবিষ্যতেরও কবি। তিনি সমগ্র ভারতের কবি।” (নজরুল স্মৃতি, বিশ্বনাথ দে সম্পাদিত, সাহিত্যম্, ১৮-বি, শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কলিকাতা–১২, ১৯৬৯, পৃ: ৭৭–৭৯ দ্রষ্টব্যঃ; নজরুল-জীবনী, ডঃ রফিকুল ইসলাম, নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা, ১৯৯৬, পৃ: ২১৮–২২০ দ্রষ্টব্যঃ)
এছাড়া এদিন নিজের বক্তৃতায় সুভাষচন্দ্র আরও জোর দিয়ে একথাও বলেছিলেন যে, নজরুলের মত বিপ্লবের কবি কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা গোষ্ঠীর হতে পারেন না; তিনি সমগ্র ভারতের শোষিত মানুষেরই প্রতিনিধি।
আর এদিনের সভায় উপস্থিত জনতার বিপুল সংবর্ধনা ও গুণীজনদের শ্রদ্ধার্ঘ্যের উত্তরে কাজী নজরুল ইসলাম অত্যন্ত বিনয় ও আবেগঘটিত যে বক্তব্য উপস্থাপিত করেছিলেন, তাতে তিনি স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি কোনো রাজনৈতিক কৃতিত্ব বা মহৎ সুবিধার আশায় নিজের লেখনী ধারণ করেননি; বরং, দেশের পরাধীনতার শৃঙ্খল এবং দেশবাসীর অসীম যন্ত্রণা থেকেই তাঁর লেখনীর জন্ম হয়েছে। এছাড়া নজরুল এদিন সেখানে উপস্থিত তরুণদের উদ্দেশ্যে তাঁর অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী ভাবাদর্শকে জাতীয় সংগ্রামের মূলে রাখবার আহ্বানও জানিয়েছিলেন।
“বন্ধুগণ, আপনারা যে আদর, যে সম্মান আজ আমাকে দিলেন, তা কোনো একক ব্যক্তির প্রাপ্য নয়—তা ভারতের সেই ভবিষ্যৎ মুক্তিসেনার প্রাপ্য, যাঁরা আজ শৃঙ্খলিত দেশমাতৃকার শৃঙ্খলমোচনের জন্য সংগ্রাম করছে। আপনারা আমাকে ‘বিদ্রোহী’ উপাধিতে ভূষিত করেছেন। কিন্তু আমি কেবল বিপ্লবের বাণী শোনাইনি, আমি চেয়েছি মানুষের সঙ্গে মানুষের ভালোবাসার মিলনঘটন। আমার অন্তরের যে বেদনা, যে রক্তক্ষরণ তা আমার কবিতায় ফুটে উঠেছে। ভারতের পরাধীনতা, শোষিত-বঞ্চিত মানুষের কান্না আমাকে শান্ত থাকতে দেয়নি। আমি যদি কোনো অপরাধ করে থাকি, তবে তা হলো এই যে—আমি অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে নীরব থাকতে পারিনি। আপনারা আজ আমাকে ভালোবাসার যে অর্ঘ্য দিলেন, তা আমার জীবনকে ধন্য করল। কবি হিসেবে নয়, একজন সেবক হিসেবে, পরাধীন দেশের একজন সৈনিক হিসেবে আমি আমার সমগ্র জীবনকে দেশ ও গণমানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করে যেতে চাই। ভারতের মুক্তি কোনো করুণার দানে আসবে না, তা আসবে শক্তি, ত্যাগ ও তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে। আপনারা যে আশিস আমাকে করলেন, তা যেন আমার পথচলার প্রেরণা হয়ে থাকে।” (নজরুল রচনাবলী, চতুর্থ খণ্ড, ডঃ রফিকুল ইসলাম ও অন্যান্য সম্পাদিত, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ১৯৯৩, পুনর্মুদ্রণ ২০০৭, পৃ: ৩২৫–৩২৮ দ্রষ্টব্যঃ)
তাছাড়া সুভাষচন্দ্র বিভিন্ন সময়ে একথাও স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে, নজরুলের লেখা ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ বা ‘কারার ঐ লৌহকপাট’–এর মত গানগুলো বিপ্লবী তরুণদের হৃদয়ে যে স্পন্দনের সৃষ্টি করেছিল, কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতার এর সমকক্ষ হওয়া সম্ভব ছিল না। আর যদিও নজরুল ইসলাম স্বভাবজাতভাবেই একজন বিদ্রোহী কবি ছিলেন; কিন্তু তবুও, রাজনৈতিক কর্মপন্থা ও কর্মোদ্যমের ক্ষেত্রে তাঁর উপরে সুভাষচন্দ্রের প্রভাব অনস্বীকার্য ছিল বলেই গবেষকরা মনে করে থাকেন। তাঁদের মতে, সুভাষচন্দ্রের নীতি ও অদম্য সাহসিকতাই নজরুলকে রাজনৈতিক গান রচনায় প্রত্যক্ষ প্রেরণা যুগিয়েছিল। বস্তুতঃ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পরে সুভাষচন্দ্র যখন বাঙলার তরুণদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন, নজরুল তখন সুভাষকে কেন্দ্র করেই জাতীয়তাবাদী আশার আলো দেখতে পেয়েছিলেন। আর একারণেই তখন তিনি বহু রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে সুভাষচন্দ্রের উপস্থিতিতে তাঁর রচিত গানগুলি গেয়ে তরুণদের সামরিক চেতনাকে উদ্দীপিত করবার প্রচেষ্টায় রত হয়েছিলেন।
অতীতে কাজী নজরুল ইসলাম ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়ে যেসব নজরুল-জীবনীকারেরা (যেমন—মুজফ্ফর আহমদ, বাসন্তী চৌধুরী, রফিকুল ইসলাম প্রমুখ) এবং ইতিহাসবিদরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচনা করেছিলেন, তাঁরা সকলেই মতপ্রকাশ করেছিলেন যে, নজরুল ও সুভাষচন্দ্র আসলে পরাধীন ভারতের একই মুদ্রার দু’পিঠ ছিলেন—যেখানে একজন নিজের লেখনী ও সুরের দ্বারা বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে তুলেছিলেন, আর অন্যজন রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মাধ্যমে সে আগুনকে বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন। বস্তুতঃ, ইতিহাসবিদদের মতে, নজরুলের অসাম্প্রদায়িক ভারতীয় চেতনা এবং সুভাষচন্দ্রের সাম্যবাদী ভারতের স্বপ্ন হুবহু একই ধারার ছিল। আর একারণেই তাঁদের মধ্যে কোনো ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতা ছিল না; বরং, গভীর পারস্পরিক সম্মান ও সম্প্রীতি দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। সুতরাং, ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে কাজী নজরুল ইসলাম ও সুভাষচন্দ্র বসুর মধ্যকার সম্পর্ককে শুধু সমকালীন দু’জন ব্যক্তিত্বের সখ্যতায় সীমিত করা চলে না; বরং, এ সম্পর্ককে কবিতা ও রাজনীতির, সুর ও সংগ্রামের এক দুর্লভ মেলবন্ধন বললেই সঠিক কথা বলা হয়। ইতিহাস স্পষ্টভাবেই বলে যে, সুভাষচন্দ্র নজরুলকে ভারতীয় বিপ্লবের চারণ কবি হিসেবে দেখেছিলেন, আর এর বিপরীতে নজরুল সুভাষচন্দ্রকে জাতির সংকটের সময়ের কাণ্ডারী হিসেবে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। এরফলে মিলিতভাবে পরাধীন ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তাঁদের এ যৌথ উপস্থিতি ও মতাদর্শিক ঐক্যই তখন বৃটিশবিরোধী আন্দোলনকে এক অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করতে পেরেছিল।
প্রসঙ্গতঃ এখানে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ওপরে কাজী নজরুল ইসলামের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতাটির প্রভাব ও গুরুত্বের কথাও আলোচনাযোগ্য। কারণ, ইতিহাস স্পষ্টভাবেই বলে যে, কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কালজীয় ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতাটি ১৯২৬ সালে মেদিনীপুরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে পরিবেশন করবার জন্যই রচনা করেছিলেন; আর এরপরে পরাধীন ভারতের জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং বিশেষ করে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক ভাবাদর্শ ও নেতৃত্বের ওপরে এ কবিতাটির গভীর প্রভাব দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। বস্তুতঃ, নিজের এ কবিতাটিতে নজরুল যে আপসহীন, সাহসী এবং সংকটকালে হাল ধরে রাখা নেতৃত্বের আহ্বান জানিয়েছিলেন,—সুভাষচন্দ্র বসুই তখন সে আদর্শের বাস্তব রূপ ছিলেন বলে গবেষকরা মনে করে থাকেন। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, নজরুল নিজের এ কবিতায় সকলকে ভারতের স্বাধীনতা হারানোর ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন; এবং তরুণ কাণ্ডারীকে অতীতের এ পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়ে জাতিকে মুক্ত করবার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অতঃপর সুভাষচন্দ্র বসু বাস্তবেই নজরুল নির্দেশিত এ কাণ্ডারীর ভূমিকা নিজের রাজনৈতিক জীবনে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন; এবং এমনকি বৃটিশদের দমনপীড়ন ও কারাগারে অন্তরীণ থাকবার সময়েও তিনি পরাধীন ভারতের মুক্তিসংগ্রামের মূল কাণ্ডারী হয়ে উঠেছিলেন। এছাড়া জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের যে মুক্তিকে এ কবিতার সবথেকে শক্তিশালী বার্তা বলে মনে করা হয়ে থাকে, সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিও সে একই সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক চেতনাই ছিল বলে লক্ষ্য করা যায়। আর একারণেই পরবর্তীসময়ে প্রথমে ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন এবং তারপরে আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়ে তোলবার সময়ে সুভাষচন্দ্র নজরুল-ঘোষিত এ অসাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শকেই বাস্তবায়ন করেছিলেন, যেখানে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খৃষ্টান—সবাই ‘ভারতীয়’ পরিচয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন বলে দেখতে পাওয়া যায়। বস্তুতঃ, নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ শুধু একটি কবিতা ছিল না; বরং, এটি তখন বিপ্লবীদের কাছে এক রণসঙ্গীত হিসেবেই গণ্য হয়েছিল। অন্যভাবে বললে, কারাগারের অন্ধকার কিংবা সশস্ত্র বিপ্লবের কঠিন পথ—সবক্ষেত্রেই নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’–এর মত গানগুলো তখন সুভাষচন্দ্র ও তাঁর সহযোদ্ধাদের মানসিক বল জুগিয়েছিল। আর একারণেই অতীতে নজরুল-জীবনীকার ও গবেষকরাও সর্বসম্মতিক্রমে একথা স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে, ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’–এর সুর ও বাণী কারান্তরালে এবং যুদ্ধের ময়দানে সুভাষচন্দ্র বসু ও বিপ্লবী তরুণদের সবথেকে বড় উদ্দীপক হিসেবে কাজ করেছিল। যেমন—অতীতে বিশিষ্ট গবেষক ও জীবনীকার ডঃ রফিকুল ইসলাম কৃষ্ণনগর কংগ্রেস সম্মেলন এবং পরবর্তীতে বিপ্লবীদের মানসে ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’–এর প্রভাব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছিলেন—
“… ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ বা ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ গানটি কেবল উদ্বোধনী সুর ছিল না, তা ছিল স্বরাজ সংগ্রামের এক অগ্নিবর্ষী রণসঙ্গীত। সুভাষচন্দ্র ও তাঁর সমর্থক বৈপ্লবিক তরুণ সমাজ এই গানের মধ্য দিয়েই তাঁদের আন্দোলনের প্রকৃত চালিকাশক্তি খুঁজে পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে জেলে বন্দি অবস্থায় এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের কুচকাওয়াজ ও সংগ্রাসে নজরুলের এই ধরণের গানগুলোই যোদ্ধাদের মনে অদম্য আত্মবল ও দেশপ্রেমের সঞ্চার করেছিল।” (নজরুল-জীবনী, ডঃ রফিকুল ইসলাম, নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা, ১৯৯৬, পৃ: ২১৬–২১৭ দ্রষ্টব্যঃ)
নজরুল জীবনীকার বাঁধন সেনগুপ্ত ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’কে বিপ্লবীদের মানসিক শক্তি ও সুভাষচন্দ্রের আপসহীন ধারার সংযোগসূত্র হিসেবে বর্ণনা করে জানিয়েছিলেন—
“নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ গানটি পরাধীন ভারতের রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে সুভাষচন্দ্র ও বিপ্লবী যুব সমাজের কাছে রণভেরীর মতো বেজে উঠেছিল। অন্ধকার কারাগার কিংবা ব্রিটিশদের অত্যাচার—কোনোটাই যখন বিপ্লবীদের মনোবল ভাঙতে পারত না, তখন নজরুলের এই গানটি তাঁদের কণ্ঠে রণসঙ্গীত হয়ে ধ্বনিত হতো। নজরুল সুভাষের সংগ্রামকে সুর দিয়েছিলেন, আর সুভাষ নজরুলকে সংকেত দিয়েছিলেন কর্মের।” (নজরুল জীবনকথা, বাঁধন সেনগুপ্ত, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা, ১৯৯৮, পৃ: ১৩১–১৩৩ দ্রষ্টব্যঃ)
আর নজরুলের রাজনৈতিক জীবনের সুহৃদ মুজফ্ফর আহমদ এপ্রসঙ্গে তাঁর গ্রন্থে লিখেছিলেন—
“… ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ গানটি রচনার পর থেকেই বাংলায় ব্রিটিশবিরোধী যুব আন্দোলনের চেহারা বদলে যায়। সম্মেলন থেকে শুরু করে মিছিল, পথসভা কিংবা বিপ্লবীদের গোপন আস্তানা—সর্বত্রই এটি রণসঙ্গীত হিসেবে গাওয়া হতো। সুভাষচন্দ্র স্বয়ং এই গানটির শক্তি গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন এবং নজরুলের এই গানগুলোকেই স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম হাতিয়ার বলে মনে করতেন।” (কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা, মুজফ্ফর আহমদ, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৯৫৯, পুনর্মুদ্রণ ২০০৫, পৃ: ৯২–৯৫ দ্রষ্টব্যঃ)
শুধু এটুকুই নয়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে গঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজ এবং কাজী নজরুল ইসলামের রচিত বিপ্লবী সঙ্গীতের মধ্যেকার সম্পর্কও গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল বলেই গবেষকরা মনে করে থাকেন। অন্যদিকে ইতিহাসও বলে যে, বৃটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য যখন প্রবাসী ভারতীয় এবং ভারতীয় যুদ্ধবন্দিদের সুসংগঠিত করা হচ্ছিল, তখন সৈনিকদের মনোবল বাড়াতে ও জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে নজরুলের গান অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল। সমসাময়িক বিভিন্ন ঐতিহাসিকসূত্র থেকে জানা যায় যে, আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রশিক্ষণের সময়ে, এবং এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য পরিচালনা করবার সময়েও নজরুলের উদ্দীপনামূলক গানগুলো নিয়মিতভাবে গাওয়ার চল ছিল। বিশেষতঃ এসময়ে নজরুলের রচিত বিখ্যাত রণসঙ্গীত ‘চল্ চল্ চল্’ আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যদের মার্চপাস্ট এবং সামরিক কুচকাওয়াজের সময়ে প্রধান প্রেরণা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল; কারণ, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বার মন্ত্র এ গানটির প্রতিটি চরণে ধ্বনিত হয়েছিল। এছাড়া নজরুলের ‘দুর্গম গিরি কান্তার-মরু’ ও ‘ভাঙার গান’ও তখন আজাদ হিন্দের সৈন্যদের মধ্যে বীর রস ও স্বদেশের জন্য আত্মত্যাগের উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলতে বিশেষভাবে সহায়ক হয়ে উঠেছিল। এমনকি এরপরেও সুভাষচন্দ্র বসু যখন প্রথমে বার্লিন ও পরবর্তীতে সিঙ্গাপুর থেকে আজাদ হিন্দ রেডিও চালু করেছিলেন, তখন বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভারতবাসীকে জাগ্রত করবার জন্য আজাদ হিন্দ রেডিওর নিয়মিত সম্প্রচারে নজরুলের দেশাত্মবোধক গানগুলোকেই বাজানো হয়েছিল। যারফলে তখন শুধু ফৌজিরাই নন; বরং, পরাধীন ভারতের অভ্যন্তরে থাকা লক্ষ লক্ষ মানুষও সশস্ত্র বিপ্লবের বার্তা পেয়েছিলেন। আসলে, সেযুগে নজরুলের গানগুলি অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনন্য প্রতীক ছিল, এবং নজরুলের গানের মাধ্যমে আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যদের মনে এ বিশ্বাস দৃঢ় করা সম্ভব হয়েছিল যে—ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁরা সবাই প্রথম ও প্রধানতঃ ‘ভারতীয়’। এথেকে একথাও বুঝতে পারা যায় যে, ১৯২৯ সালে কলকাতার আলবার্ট হলের সভায় নেতাজি—‘আমরা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে যাব—সেখানে নজরুলের যুদ্ধের গান গাওয়া হবে!’—বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পরবর্তীসময়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনের মাধ্যমে তিনি তাঁর সে কথার পূর্ণ বাস্তবায়ন করেছিলেন। এসময়ে নেতাজির নির্দেশেই নজরুলের গানের সুর ও বাণীকে আজাদ হিন্দ ফৌজিদের দৈনন্দিন অনুশীলনের অংশ করে তোলা হয়েছিল। অন্যদিকে, আজাদ হিন্দ ফৌজে নজরুলের গানের ব্যবহার একথাই প্রমাণ করে যে, শুধু আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র দিয়েই কোন বিপ্লব পরিচালিত হয় না; বরং, বিপ্লবীদের মনোবল ধরে রাখবার জন্য এক অগ্নিঝরা বিপ্লবী চেতনারও প্রয়োজন হয়। আর সময়ে কাজী নজরুল ইসলামই তাঁর লেখনীর মাধ্যমে আজাদ হিন্দ ফৌজিদের এ আত্মিক ও মানসিক রসদ জুগিয়েছিলেন, যা তাঁদের ইম্ফল ও কোহিমার মত কঠিন সীমান্তে চরম প্রতিকূলতার মুখেও বৃটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করবার সাহস জুগিয়েছিল।
পরিশেষে একথাও উল্লেখ্য যে, ১৯৪১ সালের ১৭ই জানুয়ারি তারিখে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু যখন কলকাতার এলগিন রোডের বাসভবন থেকে বৃটিশ পুলিশের নজরদারি এড়িয়ে আত্মগোপন করেছিলেন—যা ইতিহাসে ‘মহানিষ্ক্রমণ’ নামে খ্যাত, তখন প্রথমে কয়েকদিন এ ঘটনা সম্পূর্ণ গোপনীয় থাকলেও, এরপরে ২৬শে জানুয়ারি তারিখে যখন নেতাজির অন্তর্ধানের খবর ভারতে ও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন কাজী নজরুল ইসলাম এ সংবাদে যেমন অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ও সংবিগ্ন হয়েছিলেন, তেমনি একইসঙ্গে আবার আনন্দিতও হয়েছিলেন। এসময়ে সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধানের খবর জানবার পরে নজরুল তাঁর গভীর আবেগ ও নিরাপত্তার আশঙ্কা ব্যক্ত করে তাঁর সুহৃদ ও সমকালীন সাহিত্যিকদের কাছে যে মন্তব্য করেছিলেন, তা অতীতের বিভিন্ন স্মৃতিকথায় এভাবে উল্লিখিত হয়েছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়—
“সুভাষ কোথায় গেল, কীভাবে আছে—তা ভেবে বুক কেঁপে ওঠে। ব্রিটিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে সে যে মুক্তির পথ বেছে নিয়েছে, তা কেবল সুভাষের পক্ষেই সম্ভব। ঈশ্বর যেন আমাদের প্রিয় নেতাকে রক্ষা করেন, তিনি যেন বিজয়ের বেশে আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসেন।” (নজরুল স্মৃতি, বিশ্বনাথ দে সম্পাদিত, সাহিত্যম্, ১৮-বি, শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কলকাতা–১২, ১৯৬৯, পৃ: ১১৫–১১৭ দ্রষ্টব্যঃ)
এছাড়া নেতাজির মহানিষ্ক্রমণ এবং পরবর্তীতে তাঁর সম্ভাব্য কর্মকাণ্ড ও ভারতের মুক্তি সংগ্রামের কাণ্ডারী হিসেবে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নজরুল তখন ‘নেতাজী’ শিরোনামের যে কবিতাটি রচনা করেছিলেন, তাতে সুভাষচন্দ্রের অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতি তাঁর গভীর আস্থা ফুটে উঠেছিল বলে লক্ষ্য করা যায়—
“নব ভারতের হাল ধরেছ হে বীর সেনানী নেতাজী,
তোমার আহ্বানে জীবন সঁপিতে যুবা-সমাজ আজ রাজী।
শৃঙ্খলা ভেঙে ভাঙিলে তিমির, আনিলে মুক্ত আলো,
পরাধীন জাতির বুকের গহনে বিপ্লব-শিখা জ্বালো।
তুমি কাণ্ডারী, তুমি ধ্রুবতারা—মুক্তির সিপাহসালার,
তোমার চরণে কোটি বন্দন ভারত-জনতার।”
(নজরুল রচনাবলী, পঞ্চম খণ্ড, প্রলয়-শিখা ও অন্যান্য কবিতা, ডঃ রফিকুল ইসলাম ও অন্যান্য সম্পাদিত, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৩, পুনর্মুদ্রণ ২০০৮, পৃ: ২১০–২১২ দ্রষ্টব্যঃ)
আর নেতাজির এভাবে অন্তর্ধানের বিষয়ে নজরুলের মানসিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানাতে গিয়ে অতীতে ডঃ রফিকুল ইসলাম তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন—
“১৯৪১ সালে নেতাজির অন্তর্ধানে কবি নজরুল তীব্র উৎকণ্ঠা ও ব্যাকুলতায় দিন কাটিয়েছেন। ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের নজর এড়িয়ে সুভাষের এই মহানিষ্ক্রমণকে নজরুল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক মোড় হিসেবে দেখেছিলেন। কবির রচনায় নেতাজির এই বীরোচিত প্রস্থান এক অগ্নিময় বন্দনাগীতি হিসেবে অমর হয়ে আছে।” (নজরুল-জীবনী, ডঃ রফিকুল ইসলাম, নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা, ১৯৯৬, পৃ: ২৩২–২৩৪ দ্রষ্টব্যঃ)




