বাংলা সাহিত্যজগতের এক বিশিষ্ট সংযত, মননশীল ও গভীরভাবে সময়সচেতন কণ্ঠস্বর, ষাট দশকের অন্যতম প্রধান কবি ও প্রাবন্ধিক অনন্ত দাশ আর নেই। গত ১০ই আগস্ট ২০২৬ তারিখে ৮৬ বছর বয়সে তাঁর দীর্ঘ সৃষ্টিশীল জীবনের অবসান ঘটেছে। ১৯৪১ সালের ১৪ই নভেম্বর জন্মগ্রহণকারী এই প্রথিতযশা সাহিত্যিক বাংলা কবিতার ভুবনে রেখে গেছেন এক অনন্য ও সুদূরপ্রসারী স্বাক্ষর।
মূলত কবি হলেও প্রাবন্ধিক এবং অনুবাদক হিসেবেও তাঁর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কবিতার শব্দে নিহিত ছিল এক অন্তলীন রহস্যমাধুরী ও গভীর জীবনবোধ, যা যুগপৎ পাঠক হৃদয়কে নাড়া দেয়। তাঁর সাহিত্যকর্মে সমকালীন সমাজজীবন, দেশকাল, মানুষের অস্তিত্বের সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা এক শৈল্পিক রূপ লাভ করেছিল। তাঁর জীবনদর্শনে কোনো পলায়নপরতা বা হতাশা ছিল না; বরং সমস্ত প্রতিকূলতার মাঝেও মানুষের টিকে থাকার অকৃত্রিম আকুতি এবং আশার জয়গান উচ্চারিত হয়েছে তাঁর পঙ্ক্তিতে।
পঞ্চাশ ও ষাট দশকের বাংলা কবিতার ভাঙন ও অস্থিরতার মধ্য দিয়েই অনন্ত দাশের কবিসত্তার বিকাশ। পরবর্তী সময়ে আশির দশক থেকে বাংলা কবিতায় যখন উত্তর-আধুনিকতা, অবিনির্মাণতত্ত্ব, বহুত্ববাদ এবং ফর্ম ও ভাষার নানা ভাঙচুরের হাওয়া লাগল—তখন একুশ শতকে পৌঁছেও তিনি সেই প্রচলিত ও শাশ্বত মানবিক প্রজ্ঞাতেই স্থির থেকেছেন। সাহিত্যের বৈচিত্র্যহীন আঙ্গিক বা অতি-আধুনিক জিমিকের প্রতি ঝোঁক না দেখিয়ে তিনি বরাবর মানুষের মৌলিক দুঃখ, সমাজমনস্কতা ও ঐতিহ্যের শেকড়কে আঁকড়ে ধরেছেন।
কবিতার রূপ বদলালেও মানুষের অন্তরের যে মানব-দুঃখের লেলিহান শিখা ও মুক্তির আকুতি—তা থেকে তিনি এক বিন্দুও সরেননি। তাঁর এহেন মানসিকতা মেনে নিয়েও বলা যায়, শিল্প কর্মের রূপভেদে নতুনত্ব না আনতে পারলেও কবি যে এক ভালো পৃথিবীর সন্ধান করেন এবং শান্তি ও কল্যাণের চিরন্তন ভারতীয় ঋষির আদর্শকে লালন করেন… শিল্পের বিষয়- বক্তব্যেও এই আকুতির বিরামবিহীন অভিজ্ঞান অনন্ত দাশকে শতক-দশকের ইতিহাসে স্মরণীয় করে রাখবে।
তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘শিকড়ের টানে ফেরা’ (২০০১)-তে এই শেকড়লগ্নতার ছবি স্পষ্ট। একুশ শতকের কৃত্রিমতা ও উত্তর-আধুনিকতার খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গিকে পাশ কাটিয়ে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন সেই চিরন্তন সংশয় ও প্রত্যয়—
”কবিরা কি পাল্টে যাবে একুশ শতকে?
কি হবে, কেমন হবে কবিতার রূপ?
ভাবে ও ভাষায় কতটা বিমূর্ত হবে
কি করে বা বোঝা যাবে দুঃখের স্বরূপ?”
শহর, রাজনীতি ও ইতিহাসের মুখোমুখি কবি অনন্ত দাশের কবিতার শহর কেবল ইট-কাঠ-পাথরের কোনো ভৌগোলিক পরিসর নয়; বরং তা এক সভ্যতার আয়না। যেখানে মানুষের মুখ ক্রমশ অস্পষ্ট হয়, আদর্শ ক্ষয়ে যায়, রাজনীতি মানুষের জীবনের ওপর ছায়া ফেলে এবং ইতিহাসের দেয়ালে জমে ওঠে কালো রক্তের দাগ। তাঁর ‘এ কোন শহর’ কবিতায় সেই নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে শান্তির আকুতির এক অপূর্ব দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে:
”এ কোন শহর কে যে তার রূপকার
কোনো শিল্পীই আঁকেনি তো এই ছবি
প্রতিটি দেয়ালে কালো রক্তের দাগ
তবুও শান্তি চায় বাংলার কবি”
ইতিহাসের হিংসা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও তিনি আশার আলো খুঁজতে চেয়েছেন। দেশভাগ, কার্গিল যুদ্ধ বা উপসাগরীয় যুদ্ধের রক্তপাত তাঁকে যেমন ব্যথিত করেছে, তেমনই তিনি বারবার কুরুক্ষেত্রের পরাধীন ও তিরবিদ্ধ ভীষ্মদেবের মতো সমস্ত অরাজকতা ও মহাপাপ থেকে পরিত্রাণ চেয়েছেন। তাঁর সেই আকুতি মূর্ত হয়েছে এই পঙ্ক্তিতে—
”জল, দাও জল
দুঃখের শিকড় চূড়ে
এ-হৃদয় যায় পুড়ে ক্ষোভে ও সন্তাপে…
গঙ্গাপুত্র, আমি ভীষ্ম
পরিত্রাণ চাই, মাতা
পরিত্রাণ চাই।”
নিঃসঙ্গতা, দুঃখবোধ ও উত্তরকাল চেতনা
তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ ‘আমার নিজস্ব কোন দুঃখ নেই’ (১৯৭১)-এর সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি—”আমার নিজস্ব কোন দুঃখ নেই / সারাটা জীবন আমি দুঃখে ডুবে আছি”—আসলে কবির বৃহত্তর সামাজিক দায়বদ্ধতা ও পারিপার্শ্বিক শোকেরই রূপান্তর। ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতাকে তিনি বৃহত্তর মানবসমাজের বেদনার সঙ্গে একীভূত করে নিয়েছিলেন।
দীর্ঘ সাহিত্যিক জীবনে তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—
গতসূর্যের আলো (১৯৬৮)
আমার নিজস্ব কোন দুঃখ নেই (১৯৭১)
সময় আমার কণ্ঠে (১৯৭৮)
রক্তপায়ে হেঁটে যাই (১৯৮৭)
যখন চৈতন্যে বিষ (১৯৯১)
বোধের বিষণ্ন অগ্নি (১৯৯৭)
কুয়াশামঞ্চের দিকে (২০০১)
শিকড়ের টানে ফেরা (২০০১)
আজীবন রয়েছি নির্মাণে (২০০৮)
সময়ের জটিল প্রবাহে (২০১২) (এছাড়াও তাঁর মোট প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা পনেরো)
পাশাপাশি প্রবন্ধ ও অনুবাদ সাহিত্যেও তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। ‘কবিতার শব্দপ্রতিমা’ (২০০৮) এবং ‘কাব্যবোধ : কালে কালান্তরে’ (২০১০)-এর মতো মননশীল গ্রন্থগুলোতে ষাট থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রজন্মের কবিতা ও আন্দোলনের গভীর ও বিদগ্ধ মূল্যায়ন রয়েছে। ওড়িয়া থেকে অনূদিত ‘এসপ্লানেড’ এবং ‘ভাষান্তরে গ্রিক কবিতা’ (২০০৭) তাঁর সাহিত্যিক পরিধিকে আরও প্রসারিত করেছে।
একজন কবির মৃত্যু তাঁর শারীরিক কণ্ঠের অবসান ঘটাতে পারে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি ও জিজ্ঞাসাকে মুছে ফেলতে পারে না। সমস্ত প্রতিকূলতা, সামাজিক অবক্ষয় ও দেয়ালের কালো রক্তের দাগ পেরিয়েও যিনি শেষ পর্যন্ত মানুষের আশার জয়গান গেয়ে গেছেন, সেই কবি অনন্ত দাশ আজ অমরত্বের লোকে যাত্র করেছেন। তাঁর রেখে যাওয়া সেই চিরন্তন প্রশ্ন—”এ কোন শহর কে যে তার রূপকার?”—বাঙালি পাঠকের মনে আজও এক সুদীর্ঘ ও অমলিন জিজ্ঞাসা হয়ে বেঁচে থাকবে।
সাহিত্যের এই প্রাজ্ঞ ও মৃদুভাষী সাধকের মহাপ্রয়াণে আমরা জানাই গভীর শ্রদ্ধা এবং তাঁর আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।



