দালি-বুনুয়েলের আঁভাগার্ড পরাবাস্তবতা

আর্টের বিভিন্ন মিডিয়ামের ভিতর মিথস্ক্রিয়া, সংশ্লেষণ, বিচ্যুতি বা স্ফূরণ বরাবর ঘটে এসেছে। কিন্তু সেটা ফরাসি দেশে যতটা ঘটেছে, যে বিষম মাত্রায় ঘটেছে, এমনটা ভূবিশ্বের অন্যত্র দেখা যায়নি। কথাটা কেন বলছি? কারণ এখন আমরা কথা বলব সিনেমা নিয়ে। আর সিনেমাটা এমন সময়কার, যখন সিনেমা কথা বলতে শেখেনি, রং আসেনি সিনেমায়। তারপরও এই সিনেমা আজও আমাদের অনুভূতিকে সমানভাবে নাড়া দেয়। আমাদের বিস্মিত করে। অল্প কয়েকটি শটে এই সিনেমার এডিটিং শেষ করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি শট যেন দর্শকের অনুভূতির আঙিনায় সমানভাবে প্রজ্জ্বলিত। ধারালো রেজরে তরুণীর চোখ কেটে ফেলার দৃশ্যটা তো সিনেমার ইতিহাসে মাস্টারক্লাস হিসেবে পরিগণিত। লং শট, মিড শট, ক্লোজ শটসহ বিভিন্ন মিশ্র শটে এরকম মনে রাখবার মতো বেশ কিছু কোলাজ বুনুয়েল আমাদের দিয়েছেন তার চেতন-অবচেতনের যুক্তিনিষ্ঠ-বুদ্ধিদীপ্ত এই ছবিতে।

সালভাদর দালির প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় ১৯২৯ সালে স্বল্প বাজেটের Un Chien Andalou নির্মাণ করেন লুই বুনুয়েল। উল্লেখ্য, দালি আর বুনুয়েল এই দুই স্প্যানিশ মাতাদরই মারাত্মক জিনিয়াস আর পাগলাটে স্বভাবের ছিলেন। বুনুয়েল স্বপ্নে দেখলেন ধারালো ছুরিতে কারও চোখ কেটে ফেলার দৃশ্য, আর দালি স্বপ্ন দেখলেন হাতের তালু ফুঁড়ে এক ঝাঁক পিঁপড়ের চলাফেরা। তারপর এই দুই স্বপ্ন তারা আছড়ে ফেললেন প্যারির ক্যাফের টেবিলে, তারপর তা ফুটে উঠল সেলুলয়েডের পর্দায়। নির্মিত হলো মাত্র ১৬ মিনিটের Un Chien Andalou বা এক আন্দালুসীয় কুকুর। এটা কোনো গতানুগতিক সিনেমা ছিল না, আজও নেই।

প্যারিতে প্রথম প্রদর্শনের সময় বুনুয়েল তো আতঙ্কে ছিলেন দর্শক ভায়োলেন্ট হয়ে ওঠেন কি না। প্রদর্শনীতে পিকাসো, জ্যঁ ককতোসহ প্যারির বহু রথী-মহারথী উপস্থিত ছিলেন। বুনুয়েলকে বিস্মিত করে সিনেমাটা দর্শকের ভিতর ব্যাপক সাড়া ফেলে। পরে প্রদর্শনী হলগুলোতে উপচে পড়ে ভিড়। বলা যায়, এই ক্ষুদ্রায়তনের সিনেমাটি সিনেমার ভাষাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছিল। পরাবাস্তববাদী চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এটি হয়ে ওঠে সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী কাজগুলোর একটি। আপাত ঝকঝকে-তকতকে ইউরোপের ভিতরটা যে পচে গিয়েছে, ভিতরটা ফাঁপা, দুর্গন্ধযুক্ত, এটা মেনে নেওয়া বেশ কঠিনই ছিল। ১৯৩০ সালে নির্মিত পরবর্তী ছবি L’Âge d’Orও বুর্জোয়া সমাজের উন্মত্ততা, যৌনতা আর প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে মস্করা করে।

স্মরণ করা যায়, L’Âge d’Or মুক্তির পর ছবিটি প্রবল বিতর্কের মুখে পড়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত নিষিদ্ধও হয়েছিল। ছবি দেখতে গিয়ে আমরা যে চোখ আর প্রথাবদ্ধ পরিশীলিত ভাবনাকাঠামো নিয়ে পর্দার সামনে বসি, সেই চোখ আর ভাবনাকাঠামোর প্রতি বুনুয়েল বিদ্রুপ ছুড়ে দিয়েছেন। এতে নির্দিষ্ট প্লট নেই, কাহিনির ধারাবাহিকতা নেই। এই সিনেমাটা যতবার আমি দেখেছি, নতুন একটা কবিতা পড়বার মতো অনুভূতি আমার হয়েছে। যে কবিতার মাথামুণ্ডু কিছু নেই। আছে কিছু ইমেজের সহিংস অভ্যর্থনা। অথবা যেন দাঁড়িয়ে আছি দালির স্টুডিওতে। ছড়ানো-ছিটানো রং, প্যালেট আর অসম্পূর্ণ ক্যানভাস আমাদের দিকে আক্রমণের ভঙ্গিতে। যেন এস এম সুলতান বিশাল ক্যানভাসে রং ছুড়ে ছুড়ে মারছেন। যদিও Un Chien Andalou সাদাকালোয় নির্মিত, কিন্তু এতে রঙের কী কমতি আছে? আমরা টের পাই, প্যারিতে স্যুরিয়ালিস্ট পাণ্ডাদের যে মজমা বসেছিল, সেখানে কেন সগর্বে নিজের অস্তিত্ব জাহির করেছিল এই ‘আন্দালুসীয় কুকুর’।

সে সময় ধ্রুপদি শব্দের পরিমণ্ডলে রীতিমতো নাশকতা চালিয়ে আন্দ্রে ব্রেতোঁ, লুই আরাগঁ, পল এল্যুয়ার আর ককতো কবিতায় পরাবাস্তববাদের জোয়ার বইয়ে দিচ্ছেন। পিকাসো, দালি, ম্যাগরিত্তের মতো চিত্রযজ্ঞভূমির চাঁড়ালেরা ক্যানভাস ভরিয়ে তুলছেন পরাবাস্তববাদের হিংস্র ও অরমণীয় রঙে। সেটা আজকের কবি শিশির আজমকেও তাঁতিয়ে দেয়:

Young Girl Eating a Bird

আমার স্বপ্ন আমি দেখি তুমি দেখো না মাগরিত্তে
আমার স্মৃতি আমার কুয়ো
জমা করে রেখেছি
আমার আঙুলের তলিয়ে যাওয়া ঢেউয়ে
দীর্ঘ এক সপ্তাহ হাসপাতালে ঘুমিয়ে থেকে বাড়ি ফিরলাম
পেছনে প্রাগৈতিহাসিক ময়েশ্চার ট্রান্সফিউশান
আকাশের দিকে তাকাতে পারলাম না
হাসপাতালের আকাশ
আলোবাতাসের নুনে বেঁচে থাকাটাকে কি বলবে তুমি
একটা মথ একটা সূর্য
রাক্ষসের রক্তমাখা দরজা
আমার ছায়ার সংবেদনশীলতায় এদের সবার হাতে আগুন

তো ককতো-বুনুয়েল বসে থাকবেন কেন? ওরাও নেমে পড়লেন ক্যামেরা হাতে পরাবাস্তববাদের যজ্ঞভূমিতে। যে চোখে আমরা বরাবর সিনেমা দেখে থাকি, সেভাবে স্ক্রিনের সামনে বসলে আমাদের ধাক্কা না খেয়ে উপায় নেই। দর্শক এখানে কাহিনির পারম্পর্য তেমন খুঁজে পাবেন না। দর্শকের মনে হতে পারে, এখানে সেজান ছোপ ছোপ রঙের খেলা খেলে গেছেন বুনুয়েলের নামে। আর দালি তো আছেনই। দালির টেবিল থেকে আর সুপরিসর দেয়াল থেকে যেমন সময় চুঁইয়ে চুঁইয়ে গড়িয়ে মেঝেয় পড়ে, তেমনি এখানে রয়েছে ওর অদ্ভুত স্বপ্নের জগৎ আর ফ্রয়েডীয় মনোবিশ্লেষণের ক্যারিকেচার।

গল্পটা শুরু হয়েছে ‘একদা এক সময়’ থেকে। কিছুক্ষণ পর কাহিনি বদলে তা এক লাফে হয়ে যায় ‘আট বছর পরে’। অথচ এই কালপর্বে গল্পের চরিত্রগুলোর বিকাশ তেমন আমাদের চোখে পরিলক্ষিত হয় না। আমরা দেখি ধারাবাহিকতাহীন উল্লম্ফন। যেটা পরবর্তীতে গদারের সিনেমার অন্যতম আর্কিটেকচার হয়ে দাঁড়াবে। শুরুতে দেখি বুনুয়েল স্বয়ং বারান্দায় দাঁড়িয়ে রেজরে ধার দিচ্ছেন আর বুড়ো আঙুলে পরীক্ষা করে নিচ্ছেন সেই ধার। এরপর মেঘে ঢাকা আবছা চাঁদ আর ক্লোজআপে এক তরুণীকে দেখা যায়, শান্ত। এরপরই দেখা যায় ধারালো রেজরে বুনুয়েল কাটছেন তরুণীটির চোখ।

এরপর দালির কম্পোজিশনের মতো একটার পর একটা দৃশ্য আমরা দেখি। যেগুলোর ভিতর আপাত কোনো পারম্পর্য নেই। কিন্তু এগুলো দর্শক-অনুভূতিতে টংকার তোলে, রেনেসাঁর যুক্তিবিচার আর ফরাসি নান্দনিকতায় প্রশ্নবোধক চিহ্ন রেখে। কেন তোলে, এই প্রশ্ন আর্টক্রিটিকরা তুলতে পারেন না। কেননা ব্রাক-পিকাসো-দালি-ম্যাগরিত্তের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্ন তো কেউ তোলেননি পূর্বে। তো সিনেমায় এটা নতুন। দর্শকের অনভ্যস্ত চোখে মানিয়ে নেওয়াটা সহজ নয়। একটার পর একটা অসংলগ্ন ইমেজের খেলা দর্শকের উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। বিভ্রান্তও কি করে? সব ঘটনাই দ্রুত ঘটে।

এই যেমন দেখা যায় হাতের তালুতে গর্ত, সেখান থেকে পিঁপড়ে বেরোচ্ছে। তরুণীটির বগলের লোম থেকে সমুদ্রসৈকত, পিয়ানোর সঙ্গে মৃত পচা গাধার শরীর, বইয়ের পিস্তলে রূপান্তর, আবার রাস্তার সমুদ্র হয়ে যাওয়া। এমনই সব দৃশ্যকল্প নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি আন্দালুসীয় কুকুর-এর শরীর। গাধার এই চিত্রকল্পটির সঙ্গে স্প্যানিশ কবি হুয়ান রামোন হিমেনেথের Platero y yo-এর যোগসূত্রও কেউ কেউ খুঁজেছেন। উল্লেখ্য, দালি-বুনুয়েল দুজনই স্প্যানিশ এবং স্পেনের সঙ্গে তাদের শিল্প ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির সম্পর্ক গভীর। সেই স্পিরিট ১৬ মিনিটের এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে বিদঘুটে সব দৃশ্যের পরতে পরতে আমরা দেখতে পাই।

বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এই পারম্পর্যহীনতা যেমন দর্শকের প্রথাগত গ্রেকো-রোমান রুচি ও ভাবনাকাঠামোয় আঘাত করে, তেমনি দর্শককে উৎসাহিতও করে নতুন দৃশ্যকল্পে ঢুকে যেতে। পুরো ব্যাপারটাই চলচ্চিত্রকার হিসেবে বুনুয়েলের জন্য ছিল মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। প্রথম থেকে এক দৃশ্যকল্প পার হয়ে আমরা আরেক দৃশ্যকল্পে প্রবেশ করি, তারপর আরেকটা, তারপর আরেকটা…। এক দৃশ্যের সঙ্গে আরেক দৃশ্যের কোনো মিল নেই। কিন্তু গল্পের শেষে, গল্পের কি শেষ আছে এই সিনেমায়, কী এক ধরনের গথিক স্থৈর্য আমরা অনুভব করি না, এক অসহনীয়তা সত্ত্বেও? এটাই দালি, এটাই বুনুয়েল। তো শিশির আজম লিখলেন কবিতা:

বুনুয়েলের প্যারি

টেবিলে আপেল
আর সেই আপেল কাটবার জন্য
ছুরি
আপেল আর ছুরি
ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে কিন্তু আপেলের মাহাত্ম্যই বেশি
যা হোক কোনো কুমারী মেয়ের চোখ
যখন
ছুরির ধারালো পোঁচে কেটে ফেলা হয়
সেটা
কীভাবে নেয় প্যারির দুপুর

বুনুয়েল নিজে অবশ্য এই সিনেমাকে সে সময়ের আঁভাগার্ড আন্দোলনের হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছেন। আর এটা ছিল দর্শকের প্রতি তার সর্বাত্মক শৈল্পিক সংবেদনশীলতা! আজ একটি আন্দালুসীয় কুকুর কেবল একটি সিনেমা আর নেই। কবিতা, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, এমনকি পরবর্তীকালের সিনেমাও আক্রান্ত হয়েছে ইউরোপকে গিলে খেতে উদ্যত ফ্যাসিবাদের ঊষামুহূর্তে প্যারিতে থিতু হওয়া পরাবাস্তবতার আঁচ সত্তায় বয়ে বেড়ানো দুই পাগলাটে বন্ধু দালি-বুনুয়েল নির্মিত সংক্ষিপ্ত রানিং-টাইমের ‘ঐতিহ্যবিদ্বেষী’, গৎবাঁধা প্রকরণের বাইরের এই সিনেমা দ্বারা। হ্যাঁ, ঐতিহ্যবিদ্বেষ কিন্তু নতুন ঐতিহ্যের উসকানিদাতা!

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!