“ইউরোপের শ্রমিকদের এই দৃঢ় বিশ্বাস আছে যে স্বাধীনতার জন্য আমেরিকান যুদ্ধ যেমন বুর্জোয়া প্রভুত্বের যুগটার সূত্রওাত করেছিল, তেমনি দাসপ্রথার বিরূদ্ধে আমেরিকান যুদ্ধও শ্রমিকশ্রেণির আধিপত্যের যুগটার সূত্রপাত করবে। আসন্ন যুগের পূর্বাভাষ তারা দেখছে এই ব্যাপার যে দাসকৃত জাতিকে মুক্ত করার জন্য এবং সমাজব্যবস্থা পুনর্গঠনের জন্য অভূতপূর্ব একটা লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে দেশটাকে নিয়ে যাওয়ার ভার পড়েছে শ্রমিক শ্রেণির সাধু সন্তান আব্রাহাম লিঙ্কনের ওপর।’
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের নিকট কার্ল মার্কসের লেখা পত্র। ১৮৬৪ সালের ২২ নভেম্বর এই পত্রটি লেখেন এবং ১৮৬৫ সালের ৭নভেম্বর প্রকাশিত হয় The Bee-Hive Newspaper’ পত্রিকায়। কার্ল মার্কস তাঁর সময়কাল থেকে বর্তমান অবধি সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক ও আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তক।
কার্ল মার্কসের চিন্তাশক্তি ও উপস্থাপিত তত্ত্ব ‘মার্কসবাদ’ নামে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বে মার্কসবাদ সকল দেশের চালিকাশক্তি না হলেও নয়াবিশ্ব সৃষ্টি করতে পেরেছে। বাংলাদেশ, ভারত সহ বৃহৎ ভারতে মাকর্সবাদের অনুসারি হালআমলে জন অনুপাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। তবে দীর্ঘ বছর ধরে সমাজতন্ত্র রাষ্ট্র কাঠামোয় পরিপূরক চালিকাশক্তি হিসেবে পরিগণিত বলা যায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ উত্তর প্রণীত সংবিধানে চারটি মূলনীতির অন্যতম একটি হলো সমাজতন্ত্র । বাংলাদেশের সংবিধানে সমাজতন্ত্র যুক্ত করার মাধ্যমে শ্রেণি বৈষম্যহীন দেশের পরিকল্পনা করা হয়েছিলো। যদিও নানা জটিলতায় বাংলাদেশকে সমাজতন্ত্র রাষ্ট্রে উত্তরণ করা সম্ভব হয়নি। সমাজতন্ত্রের কাল্পনিক ও পুঁজিবাদের সংস্কারপন্থীদের মতাদর্শ গড়ে উঠেছিলো ফরাসী দেশে। তাঁদের মধ্যে সাঁ সিমোর ( Saint Simon), দ্যালেম বের (d’ Alembert ), মতেস্কু (Montesquieu), কঁদরসে (Condorcet) উল্লেখযোগ্য। এই ধারার পরবর্তী পর্যায়ে ইউটোপিয় সমাজতন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশে শার্ল ফুরিয়ে’র (Charles Fourier) এর ” The Theory of Four Movements and the Future in Generals (1808)’, The Traits of Domestic and Agricultural Association (1822)’, The New Industrial Society and Partnership (1829)’ এই রচনাগুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিয়ে অষ্টাদশ শতকে বহু ভাবনা ও মতাদর্শের উদ্ভব হয়েছে। বৃটেনের উইলিয়াম গডউইন ( William Godwin) এর The Inquiry Concerning Political Justice (1793) গ্রন্থে মালিকানা ভিত্তিক সমাজব্যবস্থার পরিবর্তে সাম্যবাদী ও কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের বিষয়াদি উপস্থাপন করেছেন। বিশ্বের খ্যাতিমান দার্শনিক চিন্তকদের ভাবনার নানারকম প্রবাহের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রিক মতবাদের ভিত্তি কার্ল মার্কসের দ্বারা উদ্ভব হয়েছে। কাল্পনিক সমাজতন্ত্রকে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের ( Dialectial Materialism ) তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দ্বারা দার্শনিক ভিত্তি প্রদান করেন। তিনি ফরাসি বিপ্লব, শিল্প বিপ্লবের দ্বারা উদ্ভূত রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিয়ে যুগান্তকারী বিশ্লেষণ করেছেন। সামন্তীয় রাষ্ট্র থেকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, আধুনিক শ্রমিক শ্রেণীর উদ্ভব, শোষক ও শোষিতের প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটন করেন। মার্কস তাঁর অর্থনৈতিক তত্ত্ব, শ্রেণী দ্বন্দ্ব, বস্তুবাদী দর্শন সৃষ্টির ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক বিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। পুঁজিবাদের সময়ে বস্তুবাদী দার্শনিক হলবাখ ( Halbach), দিদেরো (Dederot), হেলেভেসিয়াস (Helvetius), লা মেৎরি (La Mattire ) প্রমুখ, জার্মানির ভাববাদী দার্শনিক কান্ট (Kant), ফিসটে (Fichte), হেগেল (Hegel) প্রমুখ, বস্তবাদী দার্শনিক লুডভিগ ফয়েরবাখ( Ludwig Feuerbach), বৈজ্ঞানিক শ্লাইডেন ( Schleiden), শুভান ( Schwann), মায়ার (Mayer), চার্লস ডারউইন ( Charles Darwin) প্রমুখের উদ্ভাবন পাঠ ও গবেষণা করেন। কার্ল মার্কস তাঁর উদ্ভাবনের দ্বারা বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক মতবাদের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ধারা উত্থাপন করেন। সেই ধারাই মার্কসবাদ।
বিশ্বে প্রযুক্তির সম্ভাবনায় চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পর্যায়কাল অতিক্রম করছে, ঠিক ততই নিত্য নতুন সংকটের আবর্তে জনমানুষের জীবন বাহিত হচ্ছে। এমনকি বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহের জনগণ উপলব্ধি করছে অতি সংকটকে। এমন অবস্থা থেকে উত্তরণের রূপটি মার্কসবাদের রূপরেখায় হতে পারে। ধনবাদীর ধ্বংসাত্মক ভয়াবহতা থেকে বিশ্বের রাষ্ট্র ব্যবস্থার সামগ্রিক শান্তি, সমতা ও কল্যাণের জন্য মার্কসবাদ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের মহান দার্শনিক কার্ল মার্কসের মহাপ্রয়াণের অন্ত্যেষ্টি অনুষ্ঠানে ফ্রেডারিক এঙ্গেলস তাঁর প্রদত্ত ভাষণে বলেন, ‘গত ১৪ মার্চ (১৮৮৩) বিকেলবেলা ঠিক পৌনে তিনটের সময় বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জীবিত চিন্তাবিদের সকল চিন্ত-ভাবনার অবসান ঘটে গেল।…’ এই মানুষটির প্রয়াণে ইউরোপ ও আমেরিকার সংগ্রামী প্রলেতারিয়েত এবং ইতিহাস বিজ্ঞান উভয়রই অপরিমেয় ক্ষতি হল।’

যুগান্তকারী এবং বৈপ্লবিক চিন্তাশক্তির মহান দার্শনিক কার্ল মার্কসের ভাবনা সমকালের বিশ্বে অধিকতর প্রয়োগ অপরিহার্য। কারণ ‘ প্রতিভাদীপ্ত স্বচ্ছতা ও উজ্জ্বলতায় এই রচনাটিতে (কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত) রূপায়িত হয়েছে নতুন বিশ্ববীক্ষা, সমাজ জীবনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য সুসঙ্গত বস্তুবাদ, বিকাশের সব থেকে সর্বাঙ্গীণ ও সুগভীর মতবাদ – দ্বান্দ্বিকতা, শ্রেণী সংগ্রামের তত্ত্ব এবং নতুন, কমিউনিস্ট সমাজের স্রষ্টা প্রলেতারিয়েতের বিশ্ব-ঐতিহাসিক বিপ্লবী ভূমিকার তত্ত্ব।
( ভ.ই. লেনিন, মার্কস-এঙ্গলস স্মৃতি, প্রগতি প্রকাশন ১৯৭৬, মস্কো, পৃ. ১২)
কার্ল মার্কস প্রণীত দার্শনিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক মতবাদ এবং আন্তর্জাতিক কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্বের ইতিহাসে নতুন যুগান্তকারী অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। সেই অধ্যায় হলো সমাজতন্ত্র। জীবনের নির্মম প্রতিকূলতা, নির্বাসন, কুৎসাকে উপেক্ষা করে তিনিই নতুন যুগের প্রবর্তক হয়েছেন। কার্ল মার্কসের সাথে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত হয়েছেন বিশ্বের আরেক দার্শনিক ফ্রেডারিক এঙ্গেলস। ১৮৪৪ সালে মার্কসের সাথে প্যারিসে পরিচয়, তারপর ১৮৭০ সাল পর্যন্ত চিঠিপত্রে ভাবের আদান প্রদান, চিন্তার বিনিময় এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় একসাথে করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। ১৮৭০ সালে এঙ্গেলস লন্ডনে বসবাসরত হলে মার্কসের কার্যক্রমে ব্যাপক প্রসার লাভ করে।’ ‘১৮৮৩ সালে মার্কসের মৃত্যু পর্যন্ত চলে তাঁদের কর্মচঞ্চল মিলিত মানসিক জীবন। এর ফল হল– মার্কসের দিক থেকে– ‘পুঁজি, আমাদের যুগের মহত্তম রাজনীতি-সংক্রান্ত অর্থশাস্ত্রীয় রচনা, আর এঙ্গেলসের ছোটোবড়ো একসারি বই।’ ( প্রাগুক্ত, পৃ ২২)
মার্কসকে নিয়ে আলোচনার আয়োজন সমকালে কেন অপরিহার্য, তা অনুধাবন করতে হলে কিছু বিষয়ে আলোকপাত প্রয়োজন। সেইসব বিষয় তুলে আনতে চাই, অসম বৈপরীত্যের বিশ্বকে সম বিশ্বে উত্তরণের পথ অনুসন্ধান। মানব সমাজের অর্থনেতিক ও রাজনৈতিক বিকাশের পথে কার্ল মার্কসের ভাবনাগুলোকে পুনরায় চর্চিত ও প্রয়োগ হতে পারে।’ মার্কস বলতেন, ‘বিজ্ঞানচর্চাকে স্বার্থপর আনন্দ-উপভোগে পরিণত করা ঠিক নয়। বিজ্ঞানচর্চায় আত্মনিয়োগ করার মতো সৌভাগ্য অর্জন করেছে যারা, অর্জিত জ্ঞানকে মানুষের সেবায় তাদেরই সর্বপ্রথম কাজে লাগানো উচিত। তাঁর একটি বুলিই ছিল, ‘মানুষের জন্য কাজ কর।’ (পোল লাফার্গ, মার্কস-স্মরণে, প্রাগুক্ত, পৃ.২৬)
কার্ল মার্কসের বিচক্ষণ দৃষ্টিভঙ্গি সমকালেও বিদ্যমান। “আজ পর্যন্ত যত সমাজ দেখা গেছে তাদের সকলের ইতিহাস শ্রেণী-সংগ্রামের ইতিহাস।’
ভিলহেলম লিবক্নখট (১৮২৬-১৯০০) নামক জার্মান সেশ্যাল ডেমোক্রিটিক পার্টির নেতা কার্ল মার্কস সম্পর্কে ১৮৯৬ সালে তাঁর স্মৃতিকথায় বলেন, ” মানুষ হিসেবে মার্কসের মূল্য এতখানি ছিল যে মাত্র অল্প কয়েকজন যুগন্ধর বিরাট মানুষই সেক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে তুলিত হতে পারেন।
কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ সৃষ্টিকর্মের বিনিময়ে বুর্জোয়া সমাজ কী দিয়েছিল মার্কসকে?
‘পুঁজি’ বইটি লিখতে মার্কসকে চল্লিশ বছর পরিশ্রম করতে হয়েছিল, আর সে এমনই পরিশ্রম যা ছিল একমাত্র মার্কসেরই সাধ্য।”
“আমরা সোশ্যাল ডেমোক্রাটরা সাধুসন্ত চিনি না, তীর্থস্থান বলে মানি না তাঁদের কবরকে। কিন্তু উত্তর লন্ডনের ওই সমাধিক্ষেত্রে যিনি চির নিদ্রায় শায়িত, লক্ষ-লক্ষ মানুষ সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতায় তাঁকে স্মরণ করে থাকে। আর শ্রমিক শ্রেণির স্বাধীনতার আকাঙ্খাকে অবদমিত করে রাখতে চেষ্টিত যে বর্বরতা ও সংকীর্ণচিত্ততা, হাজার-হাজার বছর পরে তা যখন একদিন অতীতের অবিশ্বাস্য রূপকথায় পরিণত হবে তখন মুক্ত ও কৃতজ্ঞচিত্ত মানুষ টুপি খুলে ওই সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের সন্তানদের আকর্ষণ করে বলবেন: ”কার্ল মার্কস এখানেই নিদ্রাগত।”
কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিক এঙ্গেলসে’র রচনাবলি ইংরেজি ভাষায় ৫০ খণ্ড (Marx & Engels Collected Works (English ) 50 Volume ) প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ, Economic and Philosophic Manuscript of 1844, Critique of Hegel’s Philosophy of Right, The Holy Family, The Condition of the Working Class in England, The Communist Manifesto, The Poverty of Philosophy, Principal of Commnism, The Class Struggles in France 1848-1850, Revolution and Conter-Revolution in Germany, The Civil War in the United States, First International, Price and Profit, Socialism: Utopian and Scientific, Anti- Duhring, Dialectis of Nature, A Contribution to the Critique of Political Economy, Theories of Surplus Value, Capital (1,2,3 volume),
Marx-Engels-Gesamtausgabe (MEGA) বৃহৎ সংগ্রহের মাধ্যমে ১৯২৭-১৯৪১ সালের মধ্যে ১২ খণ্ড রচনাবলি, ১৯৭৫- বর্তমান পর্যন্ত ৬২ খণ্ড রচনাবলি প্রকাশিত হয়েছে । MEGA-র ১৯৬৯ সালে তাঁর রচনাসংগ্রহকে ১৪২ খণ্ডে প্রকাশের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ২০২৬ সালে সংশোধিত পরিকল্পনা অনুযায়ি ১১৪ খণ্ডে রচনাসংগ্রহ প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। তারমধ্যে ৬২ খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে International Marx-Engels Foundation (1990) প্রকাশনা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
কার্ল মার্কসের দার্শনিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা যায়–
“এখন আমার প্রসঙ্গ ধরলে, বর্তমান সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীর অস্তিত্ব আবিষ্কারের, বা তাদের মধ্যে সংগ্রাম আবিষ্কারের কৃতিত্ব আমার নয়। আমার বহুপূর্বে বুর্জোয়া ঐতিহাসিকেরা এই শ্রেণী-সংগ্রামের ঐতিহাসিক বিকাশের ধারা এবং বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদেরা বিভিন্ন শ্রেণীর অর্থনৈতিক শরীরস্থান বর্ণনা করেছেন। আমি নতুন যা করেছি এইটে প্রমাণ করা যে, ১) উৎপাদনের বিকাশের বিশেষ ঐতিহাসিক স্তরের সঙ্গেই শুধু শ্রেণীসমূহের অস্তিত্ব জড়িত, ২) শ্রেণী সংগ্রাম অবশ্যসম্ভাবীরূপেই প্রলেতারিয়েত একনকয়কত্বে পৌঁছয়, ৩) এই একনায়কত্বটাও হল সমস্ত শ্রেণীর বিলুপ্তি ও একটি শ্রেণীহীন সমাজে উত্তরণ মাত্র….।”
(কার্ল মার্কসের পত্রাবলি, ইয়ো. ভেইমিয়ার সমীপে, লন্ডন, ৫ মার্চ, ১৮৫২; ১৯৩৩ সালে Jungsozialitsche Blatter পত্রিকায় পূর্ণ আকারে প্রকাশিত। মার্কস-এঙ্গেলস রচনাবলি, খণ্ড-৪, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৭৯.)
অর্থাৎ শ্রেণীহীন রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য একাধারে তাত্ত্বিক মতবাদ উপস্থাপন করেছেন, ঐতিহাসিক ব্যাখা বিশ্লেষণ করেছেন। আন্তর্জাতিক সংগঠন সৃষ্টির মাধ্যমে বিশ্বের সকল শ্রমজীবীর ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন।
২. মহান বিপ্লবী দার্শনিক কার্ল মার্কস ১৮১৮ সালের ০৫ মে প্রুশিয়ার রাইন অঞ্চল ত্রিয়া শহরে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মগতভাবে তাঁর বাবা ইহুদি হলেও ১৮২৮ সালে প্রটেস্টান্ট ধর্ম গ্রহণ করেন। কার্ল মার্কস পারিবারিক বলয়ে সমৃদ্ধ উদার সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে বেড়ে ওঠেন। জার্মানির বন ও বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, ইতিহাস ও দর্শনে অধ্যয়ন এবং ১৮৪১ এপিকউরাস তত্ত্বের উপর গবেষণা করে থিসিস উত্থাপন করেন। ছাত্রজীবনে দার্শনিক হেগেলের দ্বারা অনুপ্রাণিত হন। হেগেলীয় দর্শনের মধ্য থেকে বিপ্লবী যুক্তিবাদ-নাস্তিক বিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধ্যাপক ব্রুনো ব্রাউনিং-র দ্বারা পরিচালিত ‘বামপন্থী হেগেলবাদী’ গোষ্ঠীর কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হন। অপর দার্শনিক অধ্যাপক ল্যুদভিখ ফয়েরবাখের ‘ভবিষ্যৎ দর্শনশাস্ত্রের মূলসূত্র’ গ্রন্থটি ১৮৪৩ সালে প্রকাশিত হয়। ফয়েরবাখের গ্রন্থপাঠের পর মার্কস ও তাঁর পূর্বের গোষ্ঠীর সদস্যরা ফয়েরবাখপন্থী হয়ে যান। মার্কসের ইচ্ছে ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা করার, কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীলরা বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফয়েরবাখকে ১৮৩২ সালে বিতাড়িত করে এবং ১৮৪১ সালে তরুণ শিক্ষক ব্রুনোর বক্তৃতা করার অধিকার নিষিদ্ধ করে। এই অবস্থায় মার্কস বন ছেড়ে কলোন শহর থেকে প্রকাশিত সরকার বিরোধী ‘ রাইনিশ গেজেট ‘ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। পত্রিকাটি প্রকাশিত হলে সরকারের রোষানলে পড়ে, কঠিন সেন্সর আরোপ করে। ১৮৪৩ সালে পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। মার্কস ১৮৪৩ সালে ক্রুয়েজনাখ শহরে অভিজাত পরিবারের জেনি ফন ভেস্তফালেনকে বিবাহ করেন। ১৮৪৩ সালে ‘জার্মান-ফরাসী বার্ষিকী’ নামক সংকলন প্রকাশের জন্য প্যারিসে গমন করেন। ১৮৪৪ সালের সেপ্টেম্বরে এঙ্গেলস প্যারিসে আসেন। মার্কসের সাথে পরিচয় এবং বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এই সময়কালে মার্কসের সাথে প্যারিসের বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলির সাথে পরিচয় হয় এবং তাদের নিয়ে বিপ্লবী প্রলেতারীয় সমাজতন্ত্রের জন্য তত্ত্ব প্রদান ও রণকৌশল নিয়ে মতামত প্রদান করেন। ১৮৪৭ সালে প্রকাশিত ‘দর্শনের দারিদ্র্য’ গ্রন্থে মার্কসের মতামত তরুণ সমাজে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে।
১৮৪৫ সালে মার্কসকে বিপজ্জনক বিপ্লবী হিসেবে প্রুশীয় সরকার ঘোষণা করে এবং প্যারিস থেকে বহিষ্কার করা হয়। মার্কস ব্রাসেলসে আশ্রয় নেন। ১৮৪৭ সালে এঙ্গেলসসহ ‘কমিউনিস্ট লীগ’ নামক একটি গোপন সংগঠনে যোগ দেন। ১৮৪৭ সালের নভেম্বরে কমিউনিস্ট লীগের দ্বিতীয় কংগ্রস লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয়। এই কংগ্রেসে মার্কস-এঙ্গেলস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৮৪৮ সালে মার্কসের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ প্রকাশিত হয়। এই ইশতেহার এক ‘নতুন বিশ্ববীক্ষা, সর্বাঙ্গীণ ও সুগভীর মতবাদ’।
কার্ল মার্কস বিশ্বের প্রলেতারিয় ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রধান হয়ে ওঠেন। যার ফলে তাঁর উপর প্রতিক্রিয়াশীলদের চক্রান্ত অব্যাহতভাবে চলতে থাকে। ১৮৪৮ সালে বেলজিয়াম, ১৮৪৯ সালের ১৬ মে জার্মানি, ১৮৪৯ সালের ১৩ জুন প্যারিস থেকে নির্বাসিত হন। ১৮৪৯ সালের জুনের শেষে লন্ডনে আসেন এবং বাকি জীবন অতিবাহিত করেন। মার্কস লন্ডনে থাকাকালীন সময়ে বন্ধু এঙ্গেলস অকৃত্রিম সহযোগী ছিলেন। নিরন্তর কঠিন সাধনার মাধ্যমে বিশ্ব ব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে ১৮৫৯ সালে ‘ অর্থশাস্ত্রের সমালোচনা প্রসঙ্গে’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। ১৮৬৪ সালে ২৮ সেপ্টেম্বর লন্ডনে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংঘ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। মার্কস এই সংগঠনের ঘোষণা, প্রস্তাব, নিয়মাবলি লেখেন এবং সংগঠনের অধিবেশনে প্রথম ‘অভিভাষণ’ দেন। বিভিন্ন দেশে শ্রমজীবী আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মার্কস হয়ে ওঠেন তাত্ত্বিক এবং সফল সংগঠক। ১৮৬৭ সালে তাঁর অর্থনৈতিক মতবাদের প্রথম খণ্ড ‘পুঁজি’ প্রকাশিত হয়। জীবনের প্রত্যেকটি মুহূর্তকে তিনি কাজে লাগিয়েছেন। কঠোর ও কঠিনতর পরিশ্রম করে পুঁজি’র অনুবাদ, বিভিন্ন গ্রন্থের প্রকাশ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমজীবী মানুষের সংগঠন গড়ে তোলার প্রধান ব্যক্তি হয়ে ওঠেন।
তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে জার্মান দর্শনশাস্ত্র, বৃটিশ অর্থশাস্ত্র, ফরাসী বিপ্লবী মতবাদ প্রধান হয়ে ওঠে। মার্কসের দর্শনের ভিত্তি এই তিন দেশের ভাবধারার একটি পরিপূর্ণ সমগ্রতা লাভ করে। যার নাম ‘মার্কসবাদ’। দার্শনিক বস্তুবাদ, দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব, ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারণা, শ্রেণী সংগ্রাম, অর্থনৈতিক মতবাদ, মূল্য-মুনাফা-উদ্বৃত্ত মূল্য-পুঁজির ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে স্বতন্ত্র ও পরিপূর্ণ একটা মতবাদ সৃষ্টি হয়। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ও তার রণকৌশলের ক্ষেত্রে মার্কসবাদ আধুনিক বিশ্বে সর্বশ্রেষ্ঠ মতবাদ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। মহান বিপ্লবী দার্শনিক ১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ লন্ডনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
দার্শনিক এঙ্গেলসের (১৮৮৩, ১৭ মার্চ) ভাষায় বলতে হয়– “… মার্কস ছিলেন তাঁর কালের সবচয়ে বেশি বিদ্বেষের পাত্র, সবচেয়ে জঘন্য কুৎসা রটনার উপলক্ষ। একচ্ছত্র রাজতন্ত্রী ও প্রজাতন্ত্রী উভয় ধরনের গভর্নমেন্ট তাঁকে তাদের ভূখন্ড থেকে বিতাড়িত করেছে। রক্ষণশীল অথবা অতিগণতন্ত্রী যা-ই হোক না কেন বুর্জোয়ারা একে অন্যের প্রতিযোগিতায় মেতেছে তাঁর বিরুদ্ধেে মিথ্যা কুৎসাবর্ষণে। আর এ-সব কোনো কিছুতে ভ্রুক্ষেপ করেন নি তিনি, মাকঠসার জাল বা জঞ্জাল গণ্য করে উপেক্ষা করেছেন এদের, অত্যন্ত প্রয়োজনে বাধ্য হলে মাঝেসাঝে জবাব দিয়েছেন এইমাত্র। …. যুগে-যুগে স্থায়ী হবে ওঁর নাম, কীর্তিত হবে ওঁর কৃতি!”




