১৩ জুন ১৯৭১: সৈয়দপুর ও গোলাহাট গণহত্যা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সৈয়দপুর ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর অন্যতম শক্ত ঘাঁটি। শহরটির উর্দুভাষী বিহারি মুসলমানদের একটি বড় অংশ সরাসরি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করেছিল। ফলে সৈয়দপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি শক্তিশালী সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকেই সৈয়দপুরে বাঙালি নিধন শুরু হয়। ২৩ মার্চ রাত থেকে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর বিহারিরা শহরে হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং নেতৃস্থানীয় বাঙালিদের নির্বিচারে হত্যা করে। ২৪ মার্চের পর শহরের বাঙালি পরিবারগুলো কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

সৈয়দপুরে তখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করতেন। তাঁদের অনেকেই দেশ বিভাগের বহু আগেই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে এই বাণিজ্যিক শহরে এসে স্থায়ী হয়েছিলেন। মাড়োয়ারি সমাজের অনেক সদস্য সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের জন্যও পরিচিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সমাজসেবী তুলসীরাম আগারওয়ালা, যিনি ১৯১১ সালে সৈয়দপুরে একটি মেয়েদের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে বিদ্যালয়টির নাম হয় তুলসীরাম বালিকা উচ্চবিদ্যালয়।

১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে রংপুর সেনানিবাসের অদূরে নিসবেতগঞ্জ বধ্যভূমিতে বিশিষ্ট মাড়োয়ারি সমাজসেবী তুলসীরাম আগারওয়ালা, যমুনাপ্রসাদ কেডিয়া এবং রামেশ্বরলাল আগারওয়ালাসহ আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ড মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এর পরপরই বিহারিরা মাড়োয়ারিদের বাড়িঘর, দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক লুটপাট চালায়।

এমন পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ৫ জুন থেকে পাকিস্তানি বাহিনী সৈয়দপুর শহরে মাইকযোগে ঘোষণা দিতে শুরু করে যে, শহরে আটকে থাকা হিন্দু মাড়োয়ারিদের নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেওয়া হবে। তাঁদের জন্য একটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঘোষণায় বলা হয়, ট্রেনটি ১৩ জুন সকালে সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে যাত্রা করে চিলাহাটি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের জলপাইগুড়ি বা শিলিগুড়ি অঞ্চলে পৌঁছাবে। দীর্ঘদিনের ভয়, অনিশ্চয়তা ও নির্যাতনের মধ্যে থাকা মাড়োয়ারি পরিবারগুলোর মধ্যে এই ঘোষণায় আশার সঞ্চার হয়। লুটতরাজের পর যা কিছু সম্বল অবশিষ্ট ছিল, তা নিয়ে তারা প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

১৩ জুন ১৯৭১ সকালে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা থেকে একটি বিশেষ ট্রেন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এনে রাখা হয়। সকাল থেকেই শত শত হিন্দু মাড়োয়ারি পরিবারের বৃদ্ধ, যুবক, নারী ও শিশুরা গাদাগাদি করে ট্রেনে উঠতে থাকেন। কিন্তু ট্রেনে ওঠার আগেই পাকিস্তানি বাহিনী কমপক্ষে ২০ জন তরুণী ও নববধূকে আলাদা করে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে যায়। পরে জানা যায়, তাঁদের সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গিয়ে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

সকাল প্রায় ১০টার দিকে ট্রেনটি সৈয়দপুর স্টেশন ত্যাগ করে। ট্রেনে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী তপন কুমার দাস কাল্ঠুর ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রেন ছাড়ার পর যাত্রীরা কিছুটা স্বস্তি অনুভব করেছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর একে একে ট্রেনের জানালা ও দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে যাত্রীদের মনে আতঙ্ক তৈরি হলেও কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাননি।

ট্রেনটি খুব ধীরে ধীরে শহর ছেড়ে রেলওয়ে কারখানা অতিক্রম করে প্রায় দুই মাইল দূরে গোলাহাট এলাকায় পৌঁছায়। হঠাৎ ট্রেনটি থেমে যায়। কৌতূহলী যাত্রীরা বাইরে তাকিয়ে দেখেন, পুরো এলাকা পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঘিরে রেখেছে। সৈন্যদের হাতে ছিল রাইফেল ও ভারী আগ্নেয়াস্ত্র। তাঁদের সঙ্গে ছিল সশস্ত্র বিহারিরা, যাদের হাতে ছিল ধারালো রামদা।

প্রত্যক্ষদর্শী গোবিন্দ চন্দ্র দাসের বর্ণনা অনুযায়ী, পাকিস্তানি সেনারা ট্রেনের কামরায় ঢুকে উর্দুতে চিৎকার করে বলতে থাকে, “একজন একজন করে নেমে আসো। তোমাদের মারতে এসেছি। তোমাদের জন্য পাকিস্তানের মূল্যবান গুলি খরচ করা হবে না।” অন্য প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, বিহারিরা চিৎকার করে বলছিল, “মালাউনকা বাচ্চা! তুমলোগকো মারনে কি লিয়ে সারকারকা কিমতি গোলি কিউ খারচ্ কারু?” অর্থাৎ, “বিধর্মীর বাচ্চা! তোদের মারার জন্য সরকারের মূল্যবান গুলি কেন খরচ করব?”

এরপর শুরু হয় এক বিভীষিকাময় হত্যাযজ্ঞ। ট্রেনের প্রতিটি কামরায় রামদা হাতে বিহারিরা প্রবেশ করে। যাত্রীদের একজন একজন করে নামিয়ে এনে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। শিশু, নারী, বৃদ্ধ, কেউই রেহাই পাননি। গলা কেটে এবং কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় নিরস্ত্র মানুষদের। পাকিস্তানি বাহিনী এই হত্যাকাণ্ডের নাম দিয়েছিল “অপারেশন খরচাখাতা”।

গোলাহাট গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্নতা দেখা যায়। বিভিন্ন সূত্রে এ হত্যাযজ্ঞে ৪৩৭ জন হিন্দু নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে কিছু সূত্রে নিহতের সংখ্যা ৪৪৮ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষক শর্মিলা বসু সাইদপুরের মারোয়াড়ি ব্যবসায়ী দ্বারকা প্রসাদ সিংহানিয়ার বর্ণনা উদ্ধৃত করে নিহতের সংখ্যা ৩৩৮ জন উল্লেখ করেছেন। তবে স্থানীয় স্মৃতিচারণা, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং স্মরণসভাগুলোতে সাধারণত ৪৩৭ জন শহীদের কথা উল্লেখ করা হয়।

এই হত্যাযজ্ঞ থেকে মাত্র প্রায় ১০ জন যুবক প্রাণে বাঁচতে সক্ষম হন। তাঁরা ট্রেন থেকে নেমে প্রাণপণে দৌড়ে দিনাজপুর হয়ে ভারতে পালিয়ে যান এবং সেখানে আশ্রয় নেন।

স্বজন হারানো প্রত্যক্ষদর্শী শ্যামলাল আগারওয়ালা বহু বছর পরও সেই দিনের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁর ভাষায়, মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের মানুষরা বিশ্বাস করেছিল যে তারা নিরাপদে ভারতে পৌঁছাতে পারবে। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী সেই বিশ্বাসকে ব্যবহার করে তাদের একত্র করেছিল মৃত্যুর ফাঁদে ফেলার জন্য।

১৩ জুন ১৯৭১-এর গোলাহাট গণহত্যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নৃশংস ও পরিকল্পিত গণহত্যা হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে। নিরাপদ আশ্রয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে শত শত নিরীহ হিন্দু মাড়োয়ারিকে মৃত্যুর ফাঁদে ফেলে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল সেদিন। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও গোলাহাটের সেই রক্তাক্ত স্মৃতি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক শোকাবহ অধ্যায় হয়ে আছে।

তথ্যসূত্র:
১। সংগ্রামের নোটবুক। “১৯৭১.০৬.১২ | সৈয়দপুর ও গোলাহাট সংখ্যালঘু গণহত্যা, নীলফামারী”।
২। সংগ্রামের নোটবুক। “১৯৭১.০৬.১৩ | গোলাহাট গণহত্যা (সৈয়দপুর, নীলফামারী)”।
৩। বসু, শর্মিলা। Dead Reckoning: Memories of the 1971 Bangladesh War। London: Hurst & Company, 2011।

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!