নারী সমাজের সংস্কৃতিতে অপ্রতিরোধ্য অবদানকে প্রাচ্য ভারতে যুগ যুগ ধরে বাহিত হয়েছে। অস্ট্রিক-দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর বঙ্গের ভূমিতে গ্রাম ভিত্তিক প্রাগৈতিহাসিক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। সমুদ্র ও নদী পথে বিচরণ, উপকূলে বসতি স্থাপন, ভূমি কর্ষণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন, বনে জঙ্গলে শিকার, তুলার মাধ্যমে সেলাই ছাড়া পোশাক তৈরির নানা নিদর্শনে নারী ও পুরুষের সমউপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। বৈদিক আর্যপূর্ব ভারতের বঙ্গে নারীর অবস্থান নিয়ে ভেদাভেদ পরিলক্ষিত হয় না। তবে বৈদিক উত্তর নানা বিধি আচারে নারীর অবস্থান সামাজিক প্রথার কারণে নিম্নপর্যায়ে চলে যায়। তথাপি নৃত্যকলা, লোক নৃত্য, লোক সংগীতের সাথে নারীর অবস্থান সুদৃঢ় ছিলো বলে জানা যায়। যদিও ইতিহাসের নানা নিরিখে নারীর সামাজিক মর্যাদা পর্যায়ক্রমে প্রাক আধুনিক যুগে দাসত্বে পরিণত হয়েছে। সমকালে নারীর উপর ভয়াবহ পাশবিক নির্যাতনের অসংখ্য তথ্য পত্রিকা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সামাজিক অবক্ষয়ের সাথে সমাজে সীমাহীন দুর্দশা, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, মব ভায়োলেন্স, উগ্রতাসহ যেসব পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, তা রীতিমতো ভয়ংকর। বিরোধ, দ্বন্দ্ব, ভাংচুর, অগ্নিকান্ড, ধ্বংসযজ্ঞের ধারাবাহিকতায় বহু শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। শ্রম বাজারে কর্মহীন নারী পুরুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে, আইনের শাসনের দুর্বলতার কারণে যথেচ্ছার বলপ্রয়োগ অব্যাহত আছে। সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সংকটপূর্ণ সময়ে দৃশ্যমান ভয়াবহতা, যার সাথে বিশ্বব্যাপি ঘটনার অন্তর্নিহিত যোগসূত্র আছে। এমন পরিস্থিতির ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘের থিম নিয়ে পালিত হচ্ছে নারী দিবস।
বিগত সময়ে নারী দিবস নিয়ে কিছু লিখেছি। সেইসবের পুনর্পাঠে সংক্ষেপিত অংশটুকু উপস্থাপন করছি।
আদি ভারতের ঋষি নারীরাই শক্তি, সমতা, ঐশ্বর্যের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। প্রাচ্যের নারীর ইতিহাস বিশ্ব নারী দিবসের প্রধান ঐতিহ্য বিবেচনা করা যেতে পারে। আধুনিক কালে নারী জাগৃতির উত্তরণ ফরাসির রেনেসাঁ, রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লবে, ভারতের কলকাতার নবজাগরণে, জার্মান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের নারী আন্দোলনের মাধ্যমে হয়েছে।
বিশ্বের ঐতিহাসিক পরম্পরায় আদি ভূখণ্ড ভারতের ‘ বঙ্গ-রাঢ়-পুণ্ড্রা-গৌড়’ কোমে; পুন্ড্রু-গৌড়-তাম্রলিপ্তি-সমতট-বঙ্গ-বঙ্গাল-হরিকেল’ ইত্যাদি অখণ্ড ভৌগোলিক সীমায় বৈদিক যুগের প্রবাহ ছিল। সেই যুগে ৩০ জন নারী ঋষি পণ্ডিত আলো প্রজ্জ্বলিত করেছেন। বিশেষ করে বেদের ৭জন ঋষি নারী বিশ্ববারা, লোপামুদ্রা, অপলা, সাবিত্রী সূর্যা, ঘোষা, ইন্দ্রানী, বাকৃ আদি নারীর শিক্ষা, ধর্ম, ব্রহ্মচর্চায় পাণ্ডিত্য পুরুষের সাথে সমানভাবে স্বীকৃত হয়েছে। উপনিষদের যুগে গার্গী, মৈত্রিয়ী উল্লেখযোগ্য। নারীশিক্ষায় সমান অধিকার অথর্ববেদ (১১.৫.১৮)তে পাই, ‘ব্রহ্মচর্যেন কন্যা যুবানং বিন্দতে পতিম’ অর্থাৎ যুবকেরর মতো যুবতীরা ব্রহ্মচর্য শেষ করে বিদ্বান যুবককে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করবে। ঋগ্বেদে ‘চেতন্তি সুমতিনাম যজ্ঞম দধে স্বরসতী’ অর্থাৎ নারী শিক্ষিকাকে জ্ঞান ও প্রেরণার জন্য শ্রদ্ধা করার কথা বলা হয়েছে। পাণিনির ব্যাকরণে পাই, অধ্যাপক আচার্যানী (মাতুলাচার্যাণামানুক্ত, ৪.১.৪৬) এবং ছাত্রীশালা (ছাস্যাদয়ঃছাত্রীশায়াম, ৬.২.৭৬)।
উত্তররামচরিতামানসে নারী ঋষি মৈত্রেয়ী আদি ভারতে বিশেষ অবদান রেখেছেন। বিশ্ব ইতিহাসে আদি প্রাচ্যের নিদর্শন ও গ্রন্থসমূহের নানা তথ্যে নারীর মর্যাদা পুরুষের সাথে পরিপূরক বলে দেখা যায়।
বহুকাল-যুগ সময়ের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন ধর্মের আগমন, বহু শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। যার ফলে পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা, রাষ্ট্র, সমাজের উদ্ভব ঘটেছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রধানভাবে পুরুষরা দায়িত্ব পালন করেন। আর নারীদের গৃহকর্ম, সন্তান লালনপালনের জন্য নিয়োজিত রাখা হয়। রাষ্ট্রের উৎপাদন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নারী জীবন অধঃপতিত হয়ে যেতে থাকে। লক্ষ্য করা যায়, নারীর মর্যাদা আর দাসের মর্যাদা সমান হয়ে পড়ে। সাম্রাজ্যের বিস্তারের জন্য যুদ্ধ বিগ্রহ প্রতিনিয়ত ছিলো। প্রত্যেক যুদ্ধের পর বিজিতদের দ্বারা সর্বোচ্চ পীড়নের শিকার হতেন নারী সমাজ।
আধুনিক কালে নারীর বিষয়ে ফরাসী দার্শনিক জঁ জ্যাক রূশো তাঁর এমিলি (১৭৬২) গ্রন্থে নারীর সমানাধিকার সমর্থন করেন। ‘ Man is born free but everywhere he is in chains. মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন, কিন্তু সমাজ তাকে শৃঙ্খলিত করে।’ বিশেষ করে ‘লা কস্তা সোসিয়েল’ গ্রন্থে ‘জনতার অধিকার রয়েছে বিপ্লবের দ্বারা রাজতন্ত্রের পতন ঘটানো’ মর্মবাণী নারীদের উৎসাহিত করো আন্দোলনে। এই উদ্দীপনা ফরাসী বিপ্লবের (১৭৮৯-১৭৯৯) মন্ত্ররূপে সামনে আসে, Liberte`, E`galite`, Fraternite`, ou la mort; স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব অথবা মৃত্যু।
ফরাসীর পউলিন লিয়ন (২৮ সেপ্টেম্বর ১৭৬৮– ৫ অক্টোবর ১৮৩৮) এবং থেরওয়ান দ্য মেরিকুয়ো (১৩ আগস্ট ১৭৬২–৯ জুন ১৮১৭), তারা নারীর পূর্ণ অধিকার নিয়ে আন্দোলন করেন। ১৭৯২ সালের ৬ মার্চ ৩১৯ নারীর স্বাক্ষর নিয়ে আবেদন পত্র দেন জাতীয় সভায়। যার মূলকথা নারী অনুশীলন, প্যারিস রক্ষার জন্য নারী রক্ষী বাহিনী গঠন। কিন্তু আবেদন বাতিল করা হলেও তাঁরা থেমে থাকেননি। ১৭৯২ সালে নারী সৈন্যবাহিনী গঠনের আহবান জানান মেরিকুয়ো। তারা গড়ে তোলেন ১৭৯৩ সালে ১০ মে Society of Revolutionary Republican Women সংগঠন। এই সংগঠনের মাধ্যমে খাদ্য শস্যের অবৈধ মজুত ও মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ, নারীর পূর্ণ অধিকার নিয়ে আন্দোলন এবং সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হন। ১৭৯৩ সালের ৩০ অক্টোবর সংগঠনকে সরকার বিলুপ্ত করে। গ্রেফতার করা হয় তাদের। সকলকে ভর্ৎসনা, তিরস্কার, প্রকাশ্যে আঘাত করা হয়। আর মেরিকুয়োকে আজীবন কারাগারে আটকে রাখা হয়। ইতিহাসের এই মহান বিপ্লবীর কারাগারে নির্যাতন, মানসিক পীড়নে অকাল মৃত্যু হয়।
কলকাতায় নারী সমাজের মুক্তির পথে রাজা রামমোহন রায়ের প্রচেষ্টায় সতীদাহ প্রথা ১৮২৯ সালে বিলুপ্ত হয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টায় বিধবাদের অবস্থা উন্নয়নে বিধবা বিবাহের পুর্নবিবাহের আইন পাশ হয়। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে নারী শিক্ষার জন্য।
বিশ্বব্যাপী নারী জাগরণের জন্য নারী, পুরুষ লেখকরা এগিয়ে আসেন। রূশ লেখক আলেক্সজান্দার পুশকিন (৬ জুন ১৭৯৯–১০ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৭) নারীর সমতা নিয়ে লেখেন। বিশেষ করে ১৮৫৭ সালের নিউইয়র্কে কারখানার নারী শ্রমিকদের বিক্ষোভ বিশ্বকে নাড়া দেয়। ব্রিটিশ দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল ১৮৬১ সালে লেখেন এবং তা প্রকাশ করেন ১৮৬৯ সালে ‘দ্য সাবজেকশন অব উইমেন’ নামে।
নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ভোটাধিকার প্রাপ্তি ঘটে নিউজিলান্ডে ১৮৯৩ সালে, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় ১৮৯৫, অস্ট্রেলিয়ায় ১৯০২। তবুও নারীর উপর বিশ্বের অধিক দেশ সমতা, অধিকার ইত্যাদি দেয়নি। আর এই সময় জার্মানির সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিন (৫ মে ১৮৫৭–২০জুন ১৯৩৩)-এর নেতৃত্বে ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯০৯ সালে নিউইয়র্কেঐতিহাসিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। মজুরি বৈষম্য, কাজের অমানবিক পরিবেশ বিলোপ, কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করার দাবী উঠে আসে।
১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে ১৭ টি দেশের ১০০ প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেন। এই সম্মেলনে ৮ মার্চকে ক্লারা নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা দেন। ১৯১৪ সাল থেকে সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহ নারীদিবস পালন করে। ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় অক্টোবর বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভিযাত্রা নতুন যুগান্তকারী অধ্যায় সূচিত হয়। এই বিপ্লবে বৃহৎ অংশীদার ছিলেন কারখানার নারী শ্রমিক। রুশ বিপ্লবের মহান নেতা লেনিনের পদক্ষেপে নারীর সমতা প্রতিষ্ঠা পায়।
পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যের বিস্তারের ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যে ভয়াবহতা, তা সভ্যতার বিপণ্ন ইতিহাস। বিশ্বযুদ্ধ উত্তর গঠিত ইউনাইটেড নেশন্স, বাংলায় পরিভাষা করা হয়েছে জাতিসংঘ। নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার অভিযাত্রায় ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘে নারী পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণাপত্র গৃহিত হয়।
নারীর জাগরণের ইতিহাসে ১৯২৭ সালে ভারতের পুণেতে অনুষ্ঠিত All India Women Education Conference.অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। এছাড়াও ভারতের জাতীয় কংগ্রেসে বাঙালি নারী লেখক, সংগঠক স্বর্ণকুমারী দেবীর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল যোগ দেন। ১৯৩৫ সালে ক্যালকাটা কাউন্সিল হাউসে শামসুন নাহার মাহমুদ (১৯০৮-১৯৬৪)এর (নারী জাগৃতির বেগম রোকেয়ার উত্তরসূরী) নেতৃত্বে ভোটাধিকারের প্রস্তাব দেয়া হয়।
বহুদেশে নারীর মর্যাদা, ভোটাধিকার প্রয়োগ বিভিন্ন সময়ে হলেও ভারতে ১৯৩৬ সালে, যুক্তরাজ্যে ১৯১৮, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯২০, কানাডায় ১৯১৭, নরওয়ে ১৯১৩, স্পেনে ১৯৩১, ফ্রান্সে ১৯৪৪, ইতালিতে ১৯৪৬, লাতিন আমেরিকায় ১৯৪০ দশকে দেয়া হয়। মুসলিম দেশ সৌদি আরবে ২০১৫ সালে নারীরা পৌরসভায় ভোটাধিকার পায়। এ এক দীর্ঘ ইতিহাস।
১৯৭৫ সালের পর থেকে জাতিসংঘের দেশসমূহ বিশ্ব নারীদিবস পালন করছে। বিশ্ব নারী দিবসের ঐতিহ্য আদি ভারতের উজ্জ্বল ইতিহাসকে মর্যাদার সাথে বিবেচনা করতে পারলে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ফলপ্রসূ হতে পারে।
আরও পড়ুন: নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক
যুগ যুগ ধরে মানব শান্তি, বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পুরুষ ও নারীর সম অধিকার সর্বত্র নিশ্চিত করতে হবে। ব্রিটিশ ভারতে নারী আন্দোলনের পথিকৃত রাজা রামমোহন রায়কে বিবেচনাকরা হয়। মুসলিম নারীদের পথিকৃত বেগম রোকেয়া (১৮৮০-১৯৩২), নওয়াব ফয়জুন্নেসা (১৮৩৪-১৯০৩)। নওয়াব ফয়জুন্নেসার অসামান্য অবদান স্বীকৃত, কুমিল্লায় প্রাথমিক বিদ্যালয়, বালিকা বিদ্যালয়, হাসপাতাল, দাতব্য প্রতিষ্ঠান, মসজিদ নির্মাণ, মক্কায় মুসাফির খানা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৭৬ সালে গদ্য-পদ্যে লেখা ‘রূপজালাল’ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ‘ সঙ্গীত লহরী, সঙ্গীত সার’ এখন দুষ্প্রাপ্য। সম্পদ ‘ওয়াকফ’ করেন। এজন্য তিনি ব বিখ্যাত হয়ে আছেন । তাঁর অবদান বাঙালি সমাজের অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। কলকাতার স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৫-১৯৩২) কবি, প্রথম মহিলা উপন্যাসিক, সংগীতজ্ঞ, সমাজ সংস্কারক হিসেবে বিশেষ অবদান রেখেছেন। ১৮৯৬ সালে গঠন করেন ‘ সখী সমিতি’, যা অনাথ ও নারীদের কল্যাণে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। ‘ভারতী’ পত্রিকার সম্পাদক, জাতীয় কংগ্রেসে প্রথম মহিলা হিসেবে যোগদান, ১৯২৯ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতিত্ব সহ বহু হিতৈষী কার্যক্রমে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন।
বেগম রোকেয়া কলকাতায় ১৯১১ সালে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল, ১৯১৬ সালে আঞ্জুমান-ই-খাওয়াতুন-ই- ইসলাম নামক সংগঠন গড়ে তোলেন। এই পথে সরলা দেবী (১৮৭২-১৯৪৫), সরোজ নলিনী দত্ত ( ১৮৮৭-১৯২৫) ভূমিকা ব্যাপক। যাঁদের কথা বলতে হয়, কৃষ্ণভামিনী দাসী, কামিনী সুন্দরী, মোক্ষদা দায়িনী, মাতঙ্গিনী হাজরা, উর্মিলা দেবী, আশালতা সেন, কমলা দেবী, প্রভাবতী বসু, লীলা নাগ, দৌলতুননেসা খাতুন, জোবেদা খাতুন চৌধুরী, সরোজিনী নাইডু, লতিকা ঘোষ, নূরজাহান বেগম, শামসুননাহার মাহমুদ, প্রীতিলতা, ইলা মিত্র, কল্পনা দত্ত, হেনা দাস, সুফিয়া কামাল, শহীদ জননী জাহানারা বেগম, মালেকা বেগম, নীলিমা ইব্রাহিম, সানজীদা হক, নভেরা আহমেদ, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, সেলিনা হোসেন প্রমুখ। তাঁদের অবদান নারী উন্নয়নের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যযুগে শ্রী চৈতন্য নারীদের তীর্থস্থানে ভ্রমণ, নারী পুরুষের সমতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখেন। এ এক দীর্ঘ ইতিহাস।
রাজা রামমোহন রায় সতীদাহপ্রথা বিলোপ, নারী শিক্ষা, সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, কর্মক্ষেত্রে নারী ইত্যাদি নিয়ে যুক্তিপূর্ণ লেখা লেখেন। আত্মীয় সভা, ব্রাহ্ম সমাজ সংগঠনের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সমর্থ হন। আধুনিক ভারতবর্ষে নারী আন্দোলনের পথিকৃত রামমোহন রায়। তিনি নারী শিক্ষা, সম্পত্তিতে অংশীদারসহ সমাজে নারীর সমতা প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। ১৯৩০ সালে বাংলা ভাষা সাহিত্যের সংগঠন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের প্রথম নারী সভাপতি হিসেবে কবি কামিনী রায় দায়িত্ব পালন করেন। তিনি একাধারে কবি ও সংগঠক ছিলেন। নারী তার পূর্ণতার সুযোগ পেলে অসাধ্য সাধন করতে পারে। মহাভারতে দ্রোপদীর বস্ত্রহরণের সময় পুরুষরা নির্বাক থাকলেও গান্ধারী তেজোদীপ্তভাবে তার প্রতিবাদে নেমে ছিলেন । এই তো দীর্ঘদিন পথ পরিক্রমা।
কথিত আছে, আদি পুরাণ বা নানা উপাখ্যানে পঞ্চকন্যা সীতা সাবিত্রী,দ্রোপদী, অহল্যা ও অরুন্ধতী, তাঁদের নাম জপলেই অশুভ বিনাশ হয়। এই উপাখ্যান কাল অতিবাহিত হয়েছে। ঠিক তাঁদের সাথে যুক্ত করে বলি, তারা বা গান্ধারী, কুন্তী কিংবা দুর্গা সকলেই পরিপূর্ণ যুক্তিবাদী সাহসী নারী ছিলেন। পৌরাণিক সীতা সাবিত্রী এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম, তারা স্বামী ভক্ত, সংসার অনুরাগী। কিন্ত অহল্যা স্বাধীনচেতা তেজোদীপ্ত নারী, দ্রোপদী দ্রোহী, দুর্গা বা তারা মহাশক্তিশালী, অশুভ শক্তি বিনাশকারী, সৌন্দর্যের নারী দেবী। নারীর এ রূপ এবং কর্ম প্রাচীন সাহিত্যে অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
বাংলা সাহিত্যে প্রথম মহিলা কবি খনা, তাঁর লেখা মুখে মুখে কাল অতিক্রম করেছে খনার বচন হিসেবে। দ্বিতীয় কবি রামী বা রজকিনী, তৃতীয় মাধবী, চতুর্থ কিশোরগঞ্জের চন্দ্রাবতী। এভাবে যদি দেখি নারী লেখক সমাজের শক্তিশালী একটি ধারা আছে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোয় সেই ধারা উপেক্ষিত থেকেছে। ইতিহাসের বিচারে সেই গর্বিত অববাহিকায় কামিনী রায় (১৮৬৪-১৯৩৩) , স্বণর্কুমারী দেবী (১৮৫৫-১৯৩২), গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী (১৮৫৮-১৯২৪), মানকুমারী বসু (১৮৬৩-১৯৪৩), প্রিয়ম্বদা দেবী (১৮৭১-১৯৩৪) সহ বহু নারী কবি সাহিত্যিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
বেগম রোকেয়া (১৮৮০-১৯৩২) নারী জাগরণের লক্ষ্যে ১৯০৮ সালে Sultana’s Dream ইংরেজি ভাষায় লেখা গ্রন্থটি তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। নারী সমাজের অপরিসীম শক্তির কথা বিধৃত করেছেন, যা বিশ্বের নারী উন্নয়ন ভাবনায় এক অসাধারণ সৃষ্টিকর্ম বলে বিবেচনা করা যায়। একই পথের পথিক কবি সুফিয়া কামাল (১৯১১-১৯৯৯)। ১৯৭০ সালে তিনি মহিলা পরিষদ গঠন করে মহান মুক্তিযুদ্ধ অনন্য অবদান রেখেছেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত নারীর অগ্রগতির সাথে দেশ ও সমাজের ভাবনাকে সংযুক্ত করে এক শক্তিশালী ধারা সৃষ্টি করতে সমর্থ হন।
বিশ্বের নয়া উপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় নারী সমাজ রাষ্ট্র ও জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিরল অবদান রাখছেন। নারী পুরুষ সকলে মিলে সাম্যের সমাজ, তথা পরিপূর্ণ মানবিক সমাজ গঠনে এগিয়ে যেতে হবে। পুঁজি বাজারের নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের উন্নত দেশসমূহের মধ্যে বৈরী পরিবেশ বিরাজ করছে। যুদ্ধ, সহিংসতার ফলে নারীর সমতা, ক্ষমতায়নের যে প্রচেষ্টা তা সুদূরপ্রসারি হয়নি। বরং নতুন নয়া সাম্রাজ্যের কাঠামোয় শ্রমজীবী নারী সমাজরা দুর্বিষহ জীবনে পতিত হয়েছে। এই অবস্থার উত্তরণে বিশ্বের সকল নিপীড়িত শ্রমজীবী নারীর ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন। মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্তের নারী সমাজের জাগরণ কল্পনাপ্রসূত উচ্চাভিলাষ ছাড়া আর কিছু নয়। বিশ্বের পুঁজিবাদী দেশের অসম প্রতিযোগিতা, যুদ্ধের আগ্রাসনে শরনার্থী হয়ে পড়ছে সিংহভাগ নারী ও শিশু। এর থেকে পরিত্রাণের কোন সম্ভাবনা নেই।
বাংলাদেশে সিংহভাগ শ্রমজীবী নারী, প্রান্তিক নারী কৃষিজীবীর অধিকার বাস্তবায়ন, সমাজের কুসংস্কারকে উচ্ছেদ করতে পারলে বিশ্ব নারী দিবস কিছুটা হলেও সার্থক হবে। নারীর সমতা সর্বত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করুক।#




