৭ মার্চ ১৯৭১: বাঙালির স্বাধীনতা-মুক্তি ও জাতীয়তাবোধ জাগরণের প্রেরণা

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। এদিন ঢাকার ঐতিহাসিক রমনার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন; যা বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান প্রেরণায় পরিণত হয়। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়নে জর্জরিত বাঙালি জাতির মুক্তির অঙ্গীকার, সংগ্রামের দিকনির্দেশনা এবং জাতীয়তাবোধ জাগরণের এক অমর দলিল।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ববাংলার জনগণ নানা ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের শিকার হতে থাকে। ভাষা আন্দোলন (১৯৫২), ছয় দফা আন্দোলন (১৯৬৬) এবং গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯) বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে আরও তীব্র করে তোলে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করলেও পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করতে থাকে। ফলে পুরো দেশ জুড়ে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং জাতি এক সংকটময় সময়ের মুখোমুখি দাঁড়ায়।

১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চের সপ্তম দিনে ঢাকার রমনার রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের সমাবেশ ঘটে। সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত এবং দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ মিছিল সহকারে সেখানে জড়ো হতে শুরু করে। মানুষের ঢল এতটাই ছিল যে পুরো রেসকোর্স ময়দান জনসমুদ্রে পরিণত হয়। আনুমানিক দশ লক্ষেরও বেশি মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। মানুষের হাতে উড়ছিল লাল-সবুজের পতাকা, কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিল স্বাধীনতার স্লোগান— “জয় বাংলা”, “বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো”,  “তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা”। চারদিকে ছিল উত্তেজনা, প্রত্যাশা এবং এক অদম্য মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।”

বিকেল প্রায় ৩টা ২০ মিনিটের দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মঞ্চে এসে দাঁড়ান। মুহূর্তেই সমগ্র ময়দান করতালি ও স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে। তিনি প্রায় ১৮ মিনিটের একটি ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। এই ভাষণে তিনি বাঙালি জাতির দীর্ঘদিনের শোষণ ও বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরেন এবং চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। একই সঙ্গে তিনি জনগণকে অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং দেশকে স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে আহ্বান জানান।
ভাষণের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ঐতিহাসিক অংশ ছিল তাঁর সেই অমর ঘোষণা:
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

এই আহ্বান মুহূর্তেই সমগ্র বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে। তিনি জনগণকে নির্দেশ দেন ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে এবং শত্রুর মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে। একই সঙ্গে তিনি কর প্রদান বন্ধ রাখা, সরকারি দপ্তরে অসহযোগিতা করা এবং পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। কার্যত এই ভাষণের মধ্য দিয়েই পূর্ববাংলা পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনে প্রবেশ করে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির জাতীয়তাবোধ জাগরণে এক অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে। এই ভাষণ শুনে মানুষ উপলব্ধি করে যে তাদের মুক্তি কেবল স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই সম্ভব। ফলে গ্রাম থেকে শহর, সবখানেই স্বাধীনতার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে।

ঐতিহাসিক এই ভাষণ পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিশেষ স্বীকৃতি লাভ করে। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’-এ অন্তর্ভুক্ত করে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ইউনেস্কো বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিলসমূহ সংরক্ষণ ও স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। এই স্বীকৃতির ফলে ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বমানবতার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে মর্যাদা লাভ করে।

এই স্বীকৃতির প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একে “ইতিহাসের প্রতিশোধ” বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, স্বাধীন দেশে দীর্ঘ সময় এই ভাষণের প্রচার নানা কারণে সীমাবদ্ধ ছিল; অথচ আজ বিশ্ব সম্প্রদায় এটিকে একটি অনন্য ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল মন্তব্য করেন যে, বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে স্বীকৃতি দিয়ে আসলে ইউনেস্কোই সম্মানিত হয়েছে, কারণ এখন তাদের কাছে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণটি সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে ইউনেস্কোর স্বীকৃতির মাধ্যমে এই ভাষণ কেবল একাডেমিক নয়, আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক মর্যাদাও লাভ করে।

অন্যদিকে তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ উল্লেখ করেন, বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সতর্কতা ও কৌশলের সঙ্গে এই ভাষণ প্রদান করেছিলেন। তিনি এমনভাবে বক্তব্য দেন যাতে একদিকে স্বাধীনতার সংগ্রামের আহ্বান স্পষ্ট হয়, অন্যদিকে তাঁকে সরাসরি বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে অভিযুক্ত করার সুযোগ না থাকে। এমনকি পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রতিবেদনে শেখ মুজিবকে ‘চতুর’ নেতা হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছিল— তিনি কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গেলেন, কিন্তু তাদের পক্ষে তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ছিল বাঙালি জাতির আত্মজাগরণ ও স্বাধীনতার অঙ্গীকারের দিন। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণই একটি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের পথে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। তাই এই দিনটি বাঙালির ইতিহাসে স্বাধীনতা, মুক্তি ও জাতীয়তাবোধ জাগরণের এক অমর প্রেরণা হয়ে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।#

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on print
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!