একজন প্রকৃত কবির চরিত্র কেমন হবে? তাঁর ব্যক্তিজীবন ও সৃজনজীবন কতটা সমন্বয়ী?
একজন প্রকৃত কবির চরিত্র, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সুখ-দুঃখ এবং সৃষ্টির যন্ত্রণার সমীকরণটি অত্যন্ত জটিল। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, মহান কবিদের জীবন সচরাচর মসৃণ বা তথাকথিত ‘সুখী’ হয় না। তাঁদের সংবেদনশীল মন ও সংসারের রূঢ় বাস্তবতার মধ্যে প্রায়শই এক ধরনের সংঘাত বা দ্বন্দ্ব কাজ করে। সঙ্গিনীর সঙ্গে মতপার্থক্য এবং বিচ্ছেদও এই কারণেই ঘটে। অনেক ক্ষেত্রেই উদাসীনতায় এবং একাকিত্বে জীবন কাটাতে হয়। কখনো সেজীবন নির্বাসিতের মতো। মূলত কবি একজন সাধকও। সংসার তাঁর সাধন ক্ষেত্র যেমন নয়, তেমনি সংসার ব্যতিরেকে তাঁর সৃজনীবনও পূর্ণতা পায় না। কিন্তু এর সমন্বয়ী ভাবনা কি থাকে না? অবশ্যই থাকে বলেই কবিরা অনেক কথা না বলেই এই গৃহমুখী জীবনের বাতাবরণে আবদ্ধ হয়ে থাকেন।
একজন প্রকৃত কবির চরিত্র কেমন হওয়া উচিত?
একজন প্রকৃত কবির কোনো ধরাবাঁধা ‘সিলেবাস’ বা চারিত্রিক ছাঁচ নেই, তবে বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাস ঘাঁটলে তাঁদের মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়:
তীব্র সংবেদনশীলতা:
একজন কবি সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি গভীরভাবে জগৎকে অনুভব করেন। অন্যের দুঃখ, আনন্দ বা প্রকৃতির সামান্য পরিবর্তনও তাঁদের সত্তাকে নাড়িয়ে দেয়। এর ফলেই যে অভিঘাত অন্তরে তিনি উপলব্ধি করেন তাতেই লিখতে প্রবৃত্ত হন। এই সংবেদনশীলতা না থাকলে তিনি লিখতে পারতেন না। তাই কবি কখনো নিষ্ঠুর হতে পারেন না। তাঁর একটা অতি কোমল স্পর্শকাতর হৃদয় থাকে। কবিতার মূল প্রাণই হলো সংবেদনশীলতা। বিশ্বসাহিত্যের কয়েকজন বিখ্যাত কবির সৃষ্টির দিকে নজর দিলে যেখানে এই তীব্র সংবেদনশীলতা (Intense Sensibility) পরিচয় পাই। ইংরেজি রোমান্টিক কবি জন কিটস ছিলেন তীব্র ইন্দ্রিয়পরায়ণ কবি। তাঁর কাছে সৌন্দর্য এবং বেদনা একাকার হয়ে যেত। তিনি খুব অল্প বয়সে মারা যান, তাই তার কবিতায় জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের হাহাকার তীব্র।’Ode to a Nightingale’-এ লিখেছেন:
“My heart aches, and a drowsy numbness pains
My sense, as though of hemlock I had drunk…”
অর্থাৎ আমার হৃদয় ব্যথা করছে, এবং এক তন্দ্রালু অসাড়তা যন্ত্রণাদায়কভাবে গ্রাস করছে আমার ইন্দ্রিয়কে, যেন আমি হেমলক (বিষ) পান করেছি… আত্মযন্ত্রণার বোধ এর মধ্যে ফুটে ওঠে।
চিলির এই নোবেলজয়ী কবি প্রেমের আবেগ এবং বিরহের যন্ত্রণা প্রকাশে ছিলেন অদ্বিতীয়। তার সংবেদনশীলতা সরাসরি পাঠকের হৃদয়ে আঘাত করে। ‘Twenty Love Poems and a Song of Despair’-এ তিনি লিখেছেন:
“Love is so short, forgetting is so long.”
অর্থাৎ ভালোবাসা অতি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু ভুলে থাকাটা দীর্ঘস্থায়ী। তাঁর মননজাত এই উপলব্ধির বিক্রিয়া শাশ্বত।
জার্মান ভাষার কবি রাইনার মারিয়া রিলকে মনে করতেন সৌন্দর্য আসলে ভয়েরই একটি রূপ। তার সংবেদনশীলতা ছিল দার্শনিক এবং আধ্যাত্মিক। তিনি মানুষের একাকিত্বকে খুব গভীরভাবে অনুভব করতেন। ‘Duino Elegies’ কবিতায় লিখেছেন:
“For beauty is nothing but the beginning of terror, which we are still just able to endure…”
অর্থাৎ কারণ সৌন্দর্য আর কিছুই নয়, আতঙ্কের সেই শুরু মাত্র, যা আমরা কোনোমতে সহ্য করতে পারি, কারণ এটি আমাদের ধ্বংস করতে চায় না, তাই আমরা মুগ্ধ হই। অন্তর্গত এক উপলব্ধিরই প্রক্রিয়া থেকে এই বোধ।
আমেরিকান কবি সিলভিয়া প্লাথ তাঁর মানসিক যন্ত্রণা, হতাশা এবং আত্মহননের ইচ্ছাকে কবিতার মাধ্যমে অত্যন্ত নগ্ন ও তীব্রভাবে প্রকাশ করেছেন। তার কবিতা যেন খোলা ক্ষতের মতো। ‘Elm’-এ তিনি লিখেছেন:
“I am terrified by this dark thing that sleeps in me;
All day I feel its soft, feathery turnings, its malignity.”
অর্থাৎ আমার ভেতর ঘুমিয়ে থাকা এই অন্ধকার সত্তাটিকে আমি ভয় পাই; সারাদিন আমি অনুভব করি এর নরম, পালকের মতো নড়াচড়া, আর এর বিদ্বেষ। আত্মানুভূতির আদিম ও কদর্য এক ক্রিয়া সর্বদা সক্রিয়।
ফরাসি কবি চার্লস বোদলেয়ার আধুনিক কবিতার জনক হিসেবে পরিচিত। তিনি শহরের জঞ্জাল, পাপ এবং কদর্যতার মধ্যেও তীব্র নান্দনিকতা খুঁজে পেতেন। তাঁর সংবেদনশীলতা ছিল কিছুটা অন্ধকারাচ্ছন্ন (Dark)। ‘The Albatross’-এ তিনি লিখেছেন:
“The Poet is like the prince of the clouds…
Exiled on the ground amidst jeers,
His giant wings prevent him from walking.”
অর্থাৎ কবি হলেন মেঘের রাজকুমারের মতো… (আকাশে সে স্বাধীন), কিন্তু মাটিতে উপহাসের পাত্র হয়ে যখন নির্বাসিত, তখন তার বিশাল ডানাগুলো তাকে হাঁটতে বাধা দেয়। নিজের ভিতরেই প্রতিবন্ধকেতার সংবেদন। কবির তীব্র কল্পনাশক্তি তাকে সাধারণ জীবনে অচল করে দেয়, কিন্তু সৃজনশীলতায় সে মহান।
জীবনানন্দ দাশের সংবেদনশীলতা ইন্দ্রিয়ঘন এবং পরাবাস্তব। তিনি প্রকৃতির রূপ, গন্ধ এবং স্পর্শকে এমনভাবে অনুভব করতেন যা বিরল। ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতায় তিনি লিখেছেন:
“জানি—তবু জানি
নারীর হৃদয়—প্রেম—শিশু—গৃহ—নয় সবখানি;
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয়—
আরো এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে…”
সংবেদনশীলতা বিপন্ন বিস্ময়ের মধ্যে দিয়েই তার যাপনের প্রজ্ঞাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। কবিদের প্রত্যেকের সংবেদনশীলতার ধরন আলাদা—কারও কাছে তা রোমান্টিক বেদনা, কারও কাছে অস্তিত্বের সংকট, আবার কারও কাছে মানসিক দহন।
সত্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা:
প্রকৃত কবিরা জনপ্রিয় হওয়ার চেয়ে সত্য বলার প্রতি বেশি আগ্রহী থাকেন। তাঁরা সমাজের মুখোশ খুলে দিতে ভয় পান না। সদা জাগ্রত বিবেক প্রহরীর মতো বিরাজ করে। তাই অন্যায় অবিচার অত্যাচারে তিনি কখনোই বশীভূত হতে পারেন না। সত্যের প্রতি এই অবিচল নিষ্ঠা তাঁর মাহাত্ম্যের পরিচয় বহন করে। বিশ্বের মহান কবিরা তাঁদের সৃষ্টিতে সত্যকে কেবল ঘটনার বিবরণ হিসেবে দেখেননি, বরং তাঁরা সত্যকে দেখেছেন এক চিরন্তন উপলব্ধি, সৌন্দর্য এবং কঠিন বাস্তবতা হিসেবে। কবিতায় এই সত্যের প্রকাশ বিভিন্নভাবে ঘটেছে—কখনও তা নির্মম, কখনও সুন্দর, আবার কখনও তা রহস্যময়। বিশ্বের কয়েকজন বিখ্যাত কবি, তাঁদের কবিতা এবং সত্য সম্পর্কে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় এরকমই।
রবীন্দ্রনাথের শেষ পর্যায়ের কবিতায় সত্যের রূপ অত্যন্ত নির্মোহ এবং কঠিন। তিনি রোমান্টিকতাকে সরিয়ে রেখে জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে সত্য হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। যেমন ‘শেষ লেখা’ কাব্যগ্রন্থে ‘রূপ-নারানের কূলে’ কবিতায়:
“সত্য যে কঠিন,
কঠিনেরে ভালোবাসিলাম,
সে কখনো করে না বঞ্চনা।”
এখানে সত্য কোমল বা মনভোলানো নয়। সত্য কঠিন এবং নির্মম, কিন্তু তা বিশ্বাসযোগ্য। যা সহজ বা সুন্দর আবরণে ঢাকা, তা অনেক সময় মিথ্যা হতে পারে, কিন্তু কঠিন বাস্তবতা মানুষকে ঠকায় না। এই ‘কঠিন’কে মেনে নেওয়াই হলো সত্যের প্রতি নিষ্ঠা। রবীন্দ্রনাথ এখানে জীবনের বেঁচে থাকাকে সত্যের নিরিখে বিচার করেছেন। এত শোক তাপ স্বজন হারানো মৃত্যুর যন্ত্রণা তাঁর জীবনবোধকে যেভাবে ক্লান্ত বিধ্বস্ত করেছে তাতেই এই সত্যকে অনুধাবন করেছেন। ইংরেজি রোমান্টিক কবি জন কিটস সত্যকে দেখেছেন সৌন্দর্যের সমার্থক হিসেবে। তাঁর কাছে যা কিছু সুন্দর, তাই সত্য।’Ode on a Grecian Urn’-এ লিখেছেন:
“Beauty is truth, truth beauty,—that is all
Ye know on earth, and all ye need to know.”
অর্থাৎ সৌন্দর্যই সত্য, সত্যই সুন্দর—পৃথিবীতে এটুকুই তোমরা জানো এবং এটুকুই তোমাদের জানার প্রয়োজন।
কিটসের কাছে শিল্পের সত্যই পরম সত্য। জাগতিক নশ্বরতার ঊর্ধ্বে যে শাশ্বত সৌন্দর্য শিল্পকলায় বা প্রকৃতিতে বিরাজ করে, সেটাই চূড়ান্ত সত্য। এখানে সত্য কোনো তথ্য নয়, বরং এক নান্দনিক অনুভূতি।
আমেরিকান কবি এমিলি ডিকিনসন সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সরাসরি আঘাত করার চেয়ে তির্যক ভঙ্গি বা ধীরে ধীরে সত্য উন্মোচনের পক্ষপাতী ছিলেন। কারণ নগ্ন সত্য অনেক সময় মানুষের চোখের জন্য অন্ধত্ব বয়ে আনতে পারে। তিনি ‘Tell all the truth but tell it slant’-এ লিখেছেন:
“Tell all the truth but tell it slant — Success in Circuit lies”
অর্থাৎ সব সত্য বলো, কিন্তু বলো একটু বাঁকা পথে। সাফল্যের চাবিকাঠি রয়েছে সেই চক্রাকার গতিতে।
ডিকিনসনের মতে, সত্য সূর্যের আলোর মতোই তীব্র। মানুষ হঠাৎ করে পূর্ণ সত্যের মুখোমুখি হতে পারে না, তাতে সে ভীত হতে পারে। তাই সত্যকে সহনীয় করে, একটু ঘুরিয়ে বা পরোক্ষভাবে প্রকাশ করা উচিত যাতে মানুষ তা গ্রহণ করতে পারে।
বাংলা সাহিত্যের কিশোর কবি সুকান্তের কাছে সত্য মানেই শোষিত মানুষের জীবনের রূঢ় বাস্তবতা। সেখানে কল্পনার কোনো স্থান নেই। তাঁর ‘হে মহাজীবন’ কবিতায় পাই:
“কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়:
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”
এখানে সত্য হলো ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য। যখন পেটে ভাত থাকে না, তখন চাঁদের সৌন্দর্য (রোমান্টিক সত্য) মিথ্যা হয়ে যায়, এবং চাঁদকে মনে হয় ঝলসানো রুটি (বাস্তব সত্য)। জীবনের প্রয়োজনই হলো এখানকার চরম সত্য।
জীবনানন্দের কবিতায় সত্য এসেছে ইতিহাসের বোধ এবং বিপন্ন মানবতার হাহাকার হিসেবে। ‘বোধ’ কবিতায় তিনি বলেছেন:
“আলো–অন্ধকারে যাই—মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়—কোন এক বোধ কাজ করে !
স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়!”
এখানে সত্য কোনো বাহ্যিক ঘটনা নয়, বরং মানুষের অবচেতন মনের গভীর উপলব্ধি বা ‘বোধ’। আধুনিক মানুষের অস্তিত্বের সংকট, একাকিত্ব এবং ইতিহাসের ক্লান্তি—এগুলোই তাঁর কবিতায় ধ্রুব সত্য হয়ে ধরা দিয়েছে।
মহৎ কবিরা এভাবেই ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে জীবনের ধ্রুব সত্যকে তাঁদের কবিতায় অবিচল নিষ্ঠার সাথে প্রতিষ্ঠা করেছেন
একাকিত্বের বাহক:
সংসারের ভিড়ে থেকেও একজন কবি মানসিকভাবে একাকী বা নির্জনতাপ্রিয় হন। এই নির্জনতাই তাঁদের সৃষ্টির আঁতুড়ঘর। বেশিরভাগ কবিকেই এই নির্জনপ্রিয় হতে দেখা যায়। কবিতা ও নির্জনতা যেন একে অপরের পরিপূরক। বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যে এমন অনেক কবি আছেন, যাঁদের জীবনযাপন ও সৃষ্টিশীলতার মূল সুরই ছিল গভীর একাকিত্ব বা স্বেচ্ছা-নির্বাসন। বাংলা সাহিত্যে ‘নির্জনতা’ শব্দটি উচ্চারণ করলেই সবার আগে তাঁর নাম আসে তিনি জীবনানন্দ দাশ। কবি বুদ্ধদেব বসু তাঁকে ‘নির্জনতম কবি’ আখ্যা দিয়েছিলেন। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, ইতিহাস চেতনা এবং ব্যক্তিগত বিষণ্নতা একাকার হয়ে গভীর নির্জনতার বোধ তৈরি করে। উত্তর-আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি বিনয় মজুমদার ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অত্যন্ত নিঃসঙ্গ। ঠাকুরনগরে নিজের বাড়িতে তিনি একপ্রকার স্বেচ্ছাবন্দী জীবন কাটাতেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘ফিরে এসো চাকা’ একাকিত্ব ও একপাক্ষিক প্রেমের এক অসামান্য দলিল। যদিও শক্তি চট্টোপাধ্যায় বেশ বোহেমিয়ান ও আড্ডাবাজ ছিলেন, তবুও তাঁর কবিতার অন্তরে ছিল গভীর এক হাহাকার ও একাকিত্ব। “যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো”— এই পংক্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অভিমানী নিঃসঙ্গ মানুষের ছায়া।
বিশ্বসাহিত্যে সম্ভবত এমিলি ডিকিনসন সবচেয়ে বড় ‘নির্জন’ কবি। আমেরিকার এই কবি তাঁর জীবদ্দশায় নিজের ঘর ছেড়ে খুব কমই বের হতেন। সাদা পোশাক পরতেন এবং লোকচক্ষুর আড়ালে থাকতেই পছন্দ করতেন। তাঁর কবিতায় মৃত্যু, অমরত্ব এবং আত্মার নির্জনতা বারবার ফিরে এসেছে। জার্মান ভাষার মহান কবি রাইনার মারিয়া রিলকে মনে করতেন, একজন শিল্পীর জন্য নির্জনতা অপরিহার্য। তাঁর বিখ্যাত বই ‘Letters to a Young Poet’-এ তিনি একাকিত্বকে বরণ করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। আমেরিকার এডগার অ্যালান পো কবির জীবন ছিল ট্র্যাজেডি ও বিষণ্নতায় মোড়া। তাঁর কবিতায় (যেমন: The Raven) গভীর একাকিত্ব, ভীতি এবং প্রিয়জন হারানোর বেদনা প্রবলভাবে ফুটে ওঠ। আধুনিক কনফেশনাল বা স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন সিলভিয়া প্লাথ । তাঁর কবিতায় মানসিক অবসাদ, বিচ্ছিন্নতাবোধ এবং একাকিত্বের তীব্র দহন স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।
বিদ্রোহী সত্তা:
প্রথাগত নিয়ম বা অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রকৃত কবিরা প্রায়ই বিদ্রোহী হন। কবিতার ইতিহাসে ‘বিদ্রোহ’ কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং তা জীবনবোধ, প্রচলিত কাঠামো ভাঙা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার এক শাশ্বত দলিল। বিভিন্ন সময়ে আমরা বিখ্যাত কবিদের এই বিদ্রোহী সত্তার পরিচয় পাই। বাংলা সাহিত্যে ‘বিদ্রোহ’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই সবার আগে নজরুলের নাম আসে। তাঁর বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এবং মানুষে-মানুষে অসমতার বিরুদ্ধে। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল প্রত্যক্ষ, আগ্নেয়গিরির মতো এবং চরম আত্মবিশ্বাসী। তিনি যখন উচ্চারণ করেন:
“আমি মানি না কো কোনো আইন,
আমি ভরা-তরি করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!
আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর
আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাত্রীর!”
— কবিতা: বিদ্রোহী
তখন তাঁর বিদ্রোহ কেবল রাজনৈতিক মুক্তির জন্য ছিল না, তা ছিল ‘আমি’ সত্তার জাগরণ। তিনি নিজেকে মহাবিশ্বের শক্তির সাথে তুলনা করে শৃঙ্খল ভাঙার গান গেয়েছেন। জাঁ আর্থার র্যাঁবোর বিদ্রোহ ছিল বুর্জোয়া সমাজ ও কাঠামোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। ঊনবিংশ শতাব্দীর ফরাসি সাহিত্যের এই ‘বিষ্ময় বালক’ (Enfant terrible) মাত্র ১৯ বছর বয়সে কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু তার আগেই তিনি কবিতার ভাষা ও ব্যাকরণ আমূল বদলে দেন। র্যাঁবোর বিদ্রোহ ছিল তৎকালীন ভদ্রলোকী সমাজ (Bourgeois), খ্রিস্টান নীতিবোধ এবং সনাতন কবিতার ছন্দের বিরুদ্ধে। তিনি চেয়েছিলেন ইন্দ্রিয়ের অসংযমের (Derangement of all senses) মাধ্যমে সত্যকে ছুঁতে। তাঁর কবিতায় উঠে আসে সেই কথা:
“আমি যখন নিস্পৃহ নদীর বুক বেয়ে নেমে আসছিলাম,
তখন আর নিজেকে মাঝিদের দ্বারা চালিত মনে হলো না:
উচ্ছল রেড স্কিনরা তাদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল,
রঙিন খুঁটির সাথে নগ্ন করে বিঁধে রেখেছিল তীরের ফলায়।…
তারপর থেকে আমি গোসল করেছি নক্ষত্রখচিত কবিতায়।”
— কবিতা: মাতাল তরণী (Le Bateau Ivre)
র্যাঁবোর এই বিদ্রোহ অন্তর্মুখী এবং অস্তিত্ববাদী। তিনি সামাজিক নিয়মের তোয়াক্কা না করে এক বোহেমিয়ান জীবনের মাধ্যমে প্রচলিত ‘সভ্যতা’কে অস্বীকার করেছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার কবি বেনজামিন মলওয়েজ ছিলেন বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের এক জ্বলন্ত প্রতীক। ১৯৮৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সরকার তাঁকে ফাঁসি দেয়। মৃত্যুর আগে জেলের দেয়ালে তিনি নিজের নখ দিয়ে বা কয়লা দিয়ে যে কবিতা লিখেছিলেন, তা কবিতার ইতিহাসে এক অমোঘ দলিল। তাঁর বিদ্রোহ ছিল সরাসরি রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। কবিতায় শুনি সেই আর্তনাদ:
“আমি সেই গাছ, যে ফল ধরাবে,
যে ফল তোমরা খেতে পারবে না…
পৃথিবীকে বলে দিও, ওরা আমার রক্ত ঝরাতে পারে,
কিন্তু আমার বিশ্বাসকে হত্যা করতে পারবে না।
আমার রক্ত মাটিতে পড়বে,
আর সেই মাটি থেকে জন্ম নেবে হাজারো বিপ্লবী।”
— (কারাগারে মৃত্যুর পূর্বে রচিত পংক্তি)
মলওয়েজের বিদ্রোহ ছিল আত্মত্যাগের। তিনি জানতেন তাঁর শরীর ধ্বংস হবে, কিন্তু তাঁর কবিতা সেই নিপীড়িত মানুষের হাতিয়ার হয়ে উঠবে। এখানে কবিতা এবং বিপ্লব একাকার হয়ে গেছে। ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি এবং পাবলো নেরুদা—দুজনেই বিশ্বসাহিত্যের দিগন্ত বদলে দেওয়া কবি, কিন্তু তাঁদের বিদ্রোহের ধরন ও প্রকাশের ভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। একজন ছিলেন বিপ্লবের ‘লাউডস্পিকার’ বা অগ্নিকণ্ঠ, আর অন্যজন ছিলেন নিপীড়িত মানুষের ‘মাটি ও শেকড়ের’ স্বর।ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি ফিউচারিজম ও পুরনোকে ভাঙার বিদ্রোহ শুরু করেছিলেন।রাশিয়ান বিপ্লবের এই কবি ছিলেন প্রথাগত নন্দনতত্ত্বের ঘোর বিরোধী। তাই তাঁর বিদ্রোহ ছিল একাধারে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে, প্রেমের কোমলতার বিরুদ্ধে এবং বুর্জোয়া শিল্পের বিরুদ্ধে। তিনি মনে করতেন কবিতা ড্রয়িংরুমে বসে পড়ার জিনিস নয়, তা রাজপথে মিছিলের স্লোগানের মতো গর্জে উঠবে। তিনি পুশকিন, দস্তয়েভস্কির মতো ধ্রুপদী সাহিত্যিকদের ‘আধুনিকতার জাহাজ’ থেকে ছুড়ে ফেলার ডাক দিয়েছিলেন। তাঁর কবিতায় জ্যামিতিক গঠন এবং চিৎকার করে পড়ার মতো ছন্দ (Declamatory style) লক্ষ করা যায়। যেমন:
“তোমাদের প্রেম—বেহালার মতো নরম,
আর আমার প্রেম—সে তো বন্য ঢাকের আওয়াজ!
শোনো! আমি আমার আত্মাকে টেনে বের করব,
সেটিকে মাড়িয়ে থেঁতলে এত বড় করব—
যেন তা রক্তাক্ত এক পতাকার মতো হয়,
আর সেই পতাকা আমি তোমাদের হাতে তুলে দেব।”
— কবিতা: মেঘের প্যান্ট (A Cloud in Trousers)
মায়াকোভস্কির বিদ্রোহ ছিল ‘ফিউচারিস্ট’ (Futurist) বা ভবিষ্যৎমুখী। তিনি কবিতার ভাষাকে অভিজাতদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে রাস্তায় নামিয়ে এনেছিলেন। তাঁর কাছে বিপ্লব এবং কবিতা ছিল সমার্থক।পাবলো নেরুদার ছিল সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। চিলির এই কবি পাবলো নেরুদা শুরুতে রোমান্টিক কবি থাকলেও স্পেনের গৃহযুদ্ধ এবং বন্ধুদের মৃত্যু তাঁকে আমূল বদলে দেয়। তিনি ঘোষণা করেন, “এসো, দেখে যাও রাজপথে রক্ত।” তাঁর বিদ্রোহ ছিল লাতিন আমেরিকার শোষিত মানুষ, খনি শ্রমিক এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিশেষ করে আমেরিকার ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির বিরুদ্ধে।নেরুদা মায়াকোভস্কির মতো চিৎকার করে নয়, বরং মাটির গভীর থেকে উঠে আসা ধীর কিন্তু অমোঘ স্বরে বিদ্রোহ করেছেন। তিনি ইতিহাস খুঁড়ে সাধারণ মানুষের বঞ্চনার কথা তুলে এনেছেন। যেমন:
“তোমরা জানতে চাও, আমার কবিতায় কেন লাইল্যাক ফুলের কথা নেই?
কেন সেখানে পপি ফুলের পাপড়ি বা আগ্নেয়গিরির কথা নেই?
তবে এসো, দেখে যাও রাজপথে রক্ত!
এসো, দেখে যাও—
রাজপথে রক্ত,
রাজপথে রক্ত!”
— কবিতা: আমি কিছু কথা বলছি (I Explain a Few Things)
নেরুদার বিদ্রোহ ছিল রাজনৈতিক ও মানবিক। তিনি তাঁর মহাকাব্যিক গ্রন্থ ‘কান্টো জেনারেল’ (Canto General)-এ গোটা মহাদেশের ইতিহাস নতুন করে লিখলেন, যেখানে কলম্বাস ‘আবিষ্কারক’ নন, বরং ধ্বংসকারী। তিনি কলমকে শোষকের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এই বিদ্রোহের প্রভাব বাংলা কবিতাতেও গভীরভাবে পড়েছে। বিশেষ করে সুকান্ত ভট্টাচার্য, দিনেশ দাস এবং সুভাষ মুখোপাধ্যায়-এর কবিতায় মায়াকোভস্কি ও নেরুদার ছায়া স্পষ্ট।
ব্যক্তিজীবন ও সৃজনজীবন
বিশ্বের বিখ্যাত কবিদের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ‘পারিবারিক সুখ’ এবং ‘কাব্যিক উৎকর্ষ’—এই দুটি বিষয় খুব কমই একসাথে চলেছে। এর পেছনে মনস্তাত্ত্বিক কারণ হলো, সংসার চায় স্থিতি ও নিয়ম, আর কবিতা চায় আবেগ ও মুক্তি। সাংসারিক জীবনে কখনোই একজন দার্শনিকের খুব বেশি প্রয়োজন হয় না। বরং হিসেবী ও তীব্র বাস্তববাদী ব্যক্তির প্রয়োজন বেশি হয়। কিন্তু সৃজনজীবনে একজন দার্শনিকই মোক্ষম হয়ে ওঠেন।
দু-একজন কবির জীবন নিয়ে এ বিষয়ে আলোকপাত করলে আমাদের সহজেই অনুধাবন করা যায়।
নির্জনতার কবি জীবনানন্দ দাশ:
বাংলা সাহিত্যের শুদ্ধতম কবি জীবনানন্দ দাশের সাংসারিক জীবন খুব একটা সুখের ছিল না। তাঁর দিনলিপিতে তিনি বারবার উল্লেখ করেছেন সাংসারিক জীবনের অভাব-অনটন এবং স্ত্রীর সঙ্গে মানসিক দূরত্বের কথা। তিনি লিখেছিলেন, সংসারের জন্য প্রয়োজনীয় ‘চালাকি’ বা ‘হিসাবী বুদ্ধি’ তাঁর ছিল না। তাঁর কাছে সুখ ছিল সৃষ্টিতে, কিন্তু ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন একাকী এবং বিষাদগ্রস্ত। দিনলিপির একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক অংশে তিনি লিখেছিলেন: “আমি যদি কবি না হয়ে সাধারণ কেউ হতাম, হয়তো জীবনে অনেক বেশি সুখী হতে পারতাম। এই কবিতা আমাকে ভিখারি করেছে।”
ট্র্যাজেডির রোমান্টিক কবি জন কিটস:
ইংরেজি রোমান্টিক কবি জন কিটস মাত্র ২৫ বছর বেঁচে ছিলেন। ফ্যানি ব্রন (Fanny Brawne)-এর প্রতি তাঁর তীব্র প্রেম ছিল, কিন্তু দারিদ্র্য ও অসুস্থতার অর্থাৎ যক্ষ্মার কারণে তিনি সংসার পাততে পারেননি। তাঁর চিঠিপত্রে দেখা যায়, প্রেম ও সৌন্দর্যের তৃষ্ণা তাঁকে পাগল করে রাখত। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, “A thing of beauty is a joy forever”—এই আনন্দ তিনি ব্যক্তিগত জীবনে পাননি, পেয়েছেন কাব্যে।
শোককে শক্তিতে রূপান্তরের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথের জীবন বাইরে থেকে পরিপূর্ণ মনে হলেও, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হারিয়েছেন তাঁর স্ত্রী, একাধিক সন্তান এবং অতি প্রিয় বন্ধু ও বৌঠান কাদম্বরী দেবীকে। তিনি সুখের সাগরে ভাসেননি, বরং শোককে কাব্যে রূপান্তর করেছেন। তাঁর চরিত্র ছিল ঋষিতুল্য। তিনি দেখিয়েছিলেন যে, একজন কবি সংসারের প্রচণ্ড আঘাত সহ্য করেও স্থিতপ্রজ্ঞ থাকতে পারেন। তাঁর ক্ষেত্রে সুখের চেয়েও বড় ছিল ‘প্রশান্তি’।

টেড হিউজ ও সিলভিয়া প্লাথ:
আমেরিকান কবি সিলভিয়া প্লাথ এবং ব্রিটিশ কবি টেড হিউজের দাম্পত্য জীবন ছিল সাহিত্যের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ও ট্র্যাজিক অধ্যায়। প্লাথের মানসিক বিষণ্নতা এবং হিউজের সাথে সম্পর্কের টানাপড়েন তাঁকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়। প্লাথের ডায়েরি পড়লে বোঝা যায়, একজন কবির মন কতটা ভঙ্গুর হতে পারে। তিনি লিখেছিলেন, “I desire the things that will destroy me in the end.”
মির্জা গালিব:
উর্দু কবি গালিব সারা জীবন ঋণ, অভাব এবং সন্তানের মৃত্যুশোক বয়ে বেড়িয়েছেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন ধর্মপরায়ণ ও রক্ষণশীল, আর গালিব ছিলেন উদার ও মদ্যপানে আসক্ত। তাঁদের মধ্যে মানসিক মিল ছিল না। গালিব তাঁর দুঃখকে শায়েরি বা গজলে পরিণত করেছিলেন। তিনি বলতেন, দুঃখ না থাকলে হৃদয় পরিষ্কার হয় না, আর হৃদয় পরিষ্কার না হলে কবিতা আসে না
একজন প্রকৃত কবি ব্যক্তিজীবনে ‘সুখী’ হবেন কি না, তা নির্ভর করে ‘সুখ’-এর সংজ্ঞা কী তার ওপর। যদি সুখ মানে নিরাপত্তা, অগাধ অর্থ এবং কলহহীন সংসার হয়, তবে অধিকাংশ মহৎ কবিই অসুখী।কিন্তু যদি সুখ মানে আত্মতৃপ্তি, সৃষ্টির আনন্দ এবং সত্যকে উপলব্ধি করা হয়, তবে তাঁরাই বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষ। শেলি (P.B. Shelley) যথার্থই বলেছিলেন, “Our sweetest songs are those that tell of saddest thought.” অর্থাৎ আমাদের সবচেয়ে মধুর গানগুলো সেগুলোই, যা আমাদের সবচেয়ে বেদনার কথা বলে।#



