সাতবাড়িয়া গণহত্যা: রক্তাক্ত এক সকালের ইতিহাস

১৯৭১ সালের সেই রক্তাক্ত মে মাস। বাংলার বাতাসে তখন অস্থিরতা, আতঙ্ক আর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে মিশে আছে। চারদিকে যুদ্ধের উত্তেজনা, অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুভয়। তবু পদ্মার তীরঘেঁষা ছোট্ট জনপদ সাতবাড়িয়ায় জীবন চলছিল আপন গতিতে। গ্রামের মানুষ তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনেই ব্যস্ত ছিল। কেউ ক্ষেতের কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কেউ রান্নাঘরে সকালের জলখাবার তৈরিতে ব্যস্ত।

কিন্তু ১২ মে-র সেই সকালবেলায় সাতবাড়িয়ার ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দেয়। ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় সাতবাড়িয়ায় প্রবেশ করে। ট্রাকভর্তি সেনা, নদীপথে গানবোট, হাতে আধুনিক অস্ত্র আর চোখের ভেতরে নির্মমতা। এর আগে পরিকল্পিত নীলনকশা অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ ধরে পাকিস্তানি সেনারা এলাকায় এসে প্রতিটি গ্রাম, রাস্তা, বাজার, স্কুল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানের মানচিত্র তৈরি করে গিয়েছিল। যেন সেই রক্তাক্ত দিনের সব আয়োজন আগেই গুছিয়ে রাখা হয়েছিল।

সাতবাড়িয়া ছিল রাজনৈতিকভাবে সচেতন একটি জনপদ। ছয় দফা আন্দোলন থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, প্রতিটি জাতীয় আন্দোলনে এখানকার মানুষের অংশগ্রহণ ছিল দৃশ্যমান। সাতবাড়িয়া হাই স্কুল ও স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শুধু শিক্ষার আলো ও রাজনৈতিক চেতনা জাগিয়ে তুলেছিল। এখানকার বহু তরুণ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ভারতে পাড়ি জমিয়েছিল। ফলে পাকিস্তানি বাহিনীর চোখে সাতবাড়িয়া হয়ে ওঠে বিদ্রোহের ঘাঁটি।

সেদিন পাকিস্তানি সেনারা ইউনিয়নে ঢুকেই বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একের পর এক গ্রাম ঘেরাও করা হয়। কুড়িপাড়া, নিশ্চিন্তপুর, কাঁচুরি, তারাবাড়িয়া, ফকিতপুর, ভাটপাড়া, হরিরামপুর, সাতবাড়িয়া বাজার, সবখানেই একই দৃশ্য। বাড়ির দরজা ভেঙে মানুষকে টেনে-হিঁচড়ে বাইরে বের করে আনা হয়। কারও হাতে সময় ছিল না সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নেওয়ার, কারও সুযোগ হয়নি শেষবারের মতো স্বজনের মুখ দেখার।

তারপর শুরু হয় হত্যাযজ্ঞ। খোলা মাঠে, রাস্তার পাশে, বাড়ির আঙিনায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হয়। গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে জনপদ। চিৎকার, কান্না আর মৃত্যুর আর্তনাদ মিলেমিশে এক বিভীষিকাময় পরিবেশ তৈরি করে। নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ কেউ রক্ষা পায়নি। আহতদেরও রেহাই দেওয়া হয়নি। বেয়নেট দিয়ে হত্যা নিশ্চিত করা হয়। নারীদের ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সাতবাড়িয়া রূপ নেয় এক মৃত্যুপুরীতে। রাস্তার পাশে পড়ে থাকে লাশের স্তূপ। কোথাও বাবা ও সন্তানের নিথর দেহ পাশাপাশি, কোথাও মায়ের বুকের পাশে পড়ে আছে শিশুর ছোট্ট দেহ। কেউ কেউ মৃতের ভান করে প্রাণে বেঁচে যায়। তাদের চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে যায় চিরচেনা গ্রামটি। স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সাতবাড়িয়ায় অন্তত ছয় শতাধিক মানুষকে হত্যা করে পাকসেনারা।

গণহত্যার পরও বর্বরতা থামেনি। বহু লাশ পদ্মা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। ঘরবাড়িতে লুটপাট চালানো হয়। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় অসংখ্য বাড়ি। ধোঁয়ায় ঢেকে যায় আকাশ। পদ্মার বাতাসেও মিশে যায় রক্ত আর পোড়া কাঠের গন্ধ। কিন্তু এত মৃত্যু, এত শোকও সাতবাড়িয়ার মানুষকে দমাতে পারেনি। এই গণহত্যাই তাদের মধ্যে নতুন প্রতিরোধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। স্বজন হারানোর বেদনা শক্তিতে রূপ নেয়। বহু তরুণ নতুন করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। পাকিস্তানি বাহিনী ভেবেছিল ভয় দেখিয়ে একটি জনপদকে স্তব্ধ করে দেবে, কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি শহীদের রক্ত কখনো বৃথা যায় না।

আজ সাতবাড়িয়া কলেজ চত্বরে নির্মিত স্মৃতিসৌধ নীরবে সাক্ষ্য দেয় সেই রক্তাক্ত দিনের। সেখানে মাটির নিচে এখনো যেন চাপা পড়ে আছে শত শত মানুষের না বলা গল্প, অসমাপ্ত স্বপ্ন, আর স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ।

সাতবাড়িয়া গণহত্যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার এক জ্বলন্ত প্রমাণ। অগণিত মানুষের রক্ত, কান্না, বেদনা ও আত্মত্যাগে লেখা ইতিহাস আজও বেঁচে আছে। পদ্মার ঢেউ, গ্রামের পথ, আর স্মৃতিসৌধের নীরবতা আজও যেন উচ্চারণ করে একটাই কথা, স্বাধীনতা কখনো বিনা মূল্যে আসে না।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!