১ জুন ১৯৭১: নগরকান্দা, নলছিটি ও রসুলপুর গণহত্যা

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যেমন বীরত্বগাথার ইতিহাস, তেমনি এটি অসংখ্য নিরীহ মানুষের রক্ত, কান্না ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। ১৯৭১ সালের ১ জুন তেমনই এক বেদনাবিধুর দিন। সেদিন ফরিদপুরের নগরকান্দা, ঝালকাঠির নলছিটি এবং ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের রসুলপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগীরা চালিয়েছিল নির্মম হত্যাযজ্ঞ। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই দিনের আর্তনাদ আজও ইতিহাসের পাতায় রক্তাক্ত হয়ে আছে।

নগরকান্দা গণহত্যা:
১৯৭১ সালের মে মাসের শেষ দিকে ফরিদপুরের নগরকান্দা অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষ হয়। ২৯ মে চাঁদহাট এলাকায় অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা চালায় পাকিস্তানি সেনারা। শুরুতে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠলেও আশপাশের গ্রামের সাধারণ মানুষ দা, বল্লম, লাঠিসোঁটা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ালে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়।

ঘোড়ামারা বিল, দিঘলিয়া বিল ও দমদম খাল এলাকাজুড়ে চলা সেই যুদ্ধে ২৬ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। এই পরাজয় পাকিস্তানি বাহিনী সহজে মেনে নিতে পারেনি। প্রতিশোধের আগুনে উন্মত্ত হয়ে তারা ফরিদপুর থেকে অতিরিক্ত সৈন্য এনে নগরকান্দার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে।

১ জুন ভোর থেকেই কোদালিয়া, বাগাট, ঈশ্বরদী, শেখরকান্দি, ঘোনাপাড়া, রঘুরদিয়া, পুরাপাড়া, পাইককান্দিসহ একের পর এক গ্রাম ঘিরে ফেলে তারা। এরপর শুরু হয় নির্বিচার গুলি, হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও নারী নির্যাতন। ৩০ মে থেকে ১ জুন পর্যন্ত টানা তিন দিন নগরকান্দার বিস্তীর্ণ জনপদ পরিণত হয় এক মৃত্যুপুরীতে। অনেক মানুষ আগেই গ্রাম ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেলেও বৃদ্ধ, অসুস্থ কিংবা যারা বাড়িঘর ছেড়ে যেতে পারেননি, তারা কেউই রক্ষা পাননি। ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকা মানুষকেও খুঁজে বের করে গুলি করা হয়েছে।

রঘুরদিয়া গ্রামের একটি ঘটনা সেই সময়ের নির্মম বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। চান্দ খন্দকার ও লাল খন্দকার এই দুই ভাই মনে করতেন পাকিস্তানি সেনাদের প্রতি আনুগত্য দেখালে হয়তো বাঁচতে পারবেন। পরিবারের একজন সদস্য পশ্চিম পাকিস্তানে সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। সেই পরিচয়ের ওপর ভরসা করে তারা বাড়ির সামনে পাকিস্তানি সেনাদের জন্য আপ্যায়নের প্রস্তুতি নেন। কিন্তু সেনারা গ্রামে ঢুকেই প্রথমে হত্যা করে সেই দুই ভাইকেই। তিন দিনের এই হত্যাযজ্ঞে নগরকান্দায় দুই শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান। অসংখ্য বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। বহু নারী নির্যাতনের শিকার হন। আজও কোদালিয়ার গণকবরগুলো নীরবে সেই রক্তাক্ত ইতিহাস বহন করে চলেছে।

ঝালকাঠি, নলছিটি গণহত্যা:
ঝালকাঠির নলছিটিতে নির্মম গণহত্যার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন শিক্ষিত, সচেতন এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ।

১ জুন পুলিশ ও রাজাকাররা বিরাট গ্রাম থেকে অ্যাডভোকেট জিতেন্দ্রলাল দত্ত, তাঁর পুত্র সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মিহিরলাল দত্ত, সুধীরলাল দত্তসহ আরও অনেককে ধরে নিয়ে যায়। কয়েক দিনের মধ্যেই সুধীর দত্তসহ ১১ জন তরুণকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং তাদের মরদেহ সুগন্ধা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। জিতেন্দ্রলাল দত্ত সাময়িকভাবে মুক্তি পেলেও তাঁর ছেলে মিহির দত্তকে পাঠানো হয় যশোর সেনানিবাসে। সেখানে দীর্ঘ নির্যাতনের পর তিনি মুক্তি পান। কিন্তু পরিবারের দুর্ভোগ তখনো শেষ হয়নি।

অক্টোবর মাসে আবারও বাবা ও ছেলেকে ধরে নিয়ে যায় রাজাকাররা। এবার গুলি করে হত্যা করা হয় জিতেন্দ্রলাল দত্তকে। গুরুতর আহত মিহির দত্তকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায় ঘাতকেরা। ভাগ্যক্রমে স্থানীয় মানুষ তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান এবং তিনি বেঁচে যান। স্বামীকে হারানো এবং ছেলেকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসতে দেখার মানসিক আঘাত সইতে পারেননি শোভনা দত্ত। দীর্ঘদিন শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করে তিনিও একসময় পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। নলছিটির এই ইতিহাস একটি পরিবারের ওপর নেমে আসা যুদ্ধের নিষ্ঠুরতার প্রতিচ্ছবি।

ময়মনসিংহ, গফরগাঁওয়ে রসুলপুর গণহত্যা:
ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার রসুলপুর গ্রাম ছিল তখন রাজনৈতিকভাবে সচেতন একটি জনপদ। গ্রামের কায়স্থপাড়া এলাকায় ‘ধর’ ও ‘দেব’ পরিবারের বেশ কয়েকটি বাড়ি ছিল। ইউনিয়ন পরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্ট নিশিরঞ্জন ধর এবং তাঁর ছোট ভাই শিশির রঞ্জন ধর ছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতা। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তাঁদের পরিবার মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করছিল—আশ্রয়, তথ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তার মাধ্যমে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। এই কারণেই পরিবারটি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের নজরে পড়ে। স্থানীয় রাজাকার ও আলবদর সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তার খবর পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে পৌঁছে দেয়। শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নয়, হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়ার কারণেও পরিবারটি বিশেষভাবে টার্গেট হয়।

১ জুন ভোররাতে পাকিস্তানি সেনারা তাদের সহযোগীদের নিয়ে নিশিবাবুর বাড়ি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তখনো অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ চারদিকে গোলাগুলি ও চিৎকারে পুরো এলাকা আতঙ্কে ভরে ওঠে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে মুক্তিযোদ্ধা রবীন্দ্র চন্দ্র দেব স্ত্রীসহ কয়েকজনকে নিয়ে বাড়ির পাশের জঙ্গল ও পাটক্ষেতে আশ্রয় নেন। কিন্তু ঘুমন্ত ছোট মেয়েকে নিয়ে আসতে আবার বাড়ির দিকে ফিরে গেলে তিনি বিপদের মুখে পড়েন।
এ সময় রবীন্দ্র চন্দ্র দেব, তাঁর আত্মীয় রতন কুমার রায় এবং আরও কয়েকজন পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়েন। তাদের ওপর শুরু হয় নির্মম নির্যাতন। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের একটি ঘরে আটকে রাখা হয়। বাইরে তখন স্বজনদের কান্না আর আতঙ্ক।

একপর্যায়ে পাকিস্তানি সেনারা ঘরের ভেতর আটকে থাকা মানুষগুলোর ওপর গুলি চালায়। এরপর নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য ঘরটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহূর্তেই আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। গুলিবিদ্ধ মানুষগুলো আগুনের ভেতরেই পুড়ে মারা যান। পরে দেখা যায়, দেহগুলো এতটাই পুড়ে গেছে যে অনেককে শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তবে ভাগ্যের এক আশ্চর্য পরিহাসে রবীন্দ্র চন্দ্র দেব শেষ মুহূর্তে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তাঁর বেঁচে যাওয়ার কারণেই পরবর্তী সময়ে এই গণহত্যার অনেক বিবরণ জানা সম্ভব হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা সনৎ কুমার ধরও এই হত্যাযজ্ঞের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন।

এই নৃশংস ঘটনায় অন্তত ছয়জন শহীদ হন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রতন কুমার রায়, যিনি কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং রসুলপুর হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। অন্য শহীদদের দেহও আগুনে এমনভাবে পুড়ে যায় যে অনেক ক্ষেত্রে পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। পাকিস্তানি বাহিনী চলে যাওয়ার পর গ্রামের মানুষ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে স্বজনদের দগ্ধ দেহাবশেষ সংগ্রহ করে বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে একটি গর্ত খুঁড়ে শহীদদের সমাহিত করেন। সেই গণকবর আজও ১৯৭১ সালের সেই ভয়াল সকালের সাক্ষ্য বহন করে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন অসংখ্য গণহত্যা প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে উঠেছে এই নামহীন-অখ্যাত শহীদদের আত্মত্যাগের ওপর।

তথ্যসূত্র:
বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ ৯ম খণ্ড
মুক্তিযুদ্ধ কোষ (দ্বিতীয় খণ্ড) – মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত
সংগ্রামের নোটবুক
Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!