২২ মে ১৯৭১: ভীমনালি, মধ্যপাড়া ও রুদ্রকর গণহত্যা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গণহত্যা, নির্যাতন, প্রতিরোধ আর মানুষের অসীম বেদনার ইতিহাস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পিরোজপুরের ভীমনালি এবং তৎকালীন ফরিদপুর জেলার (বর্তমান শরীয়তপুর) মধ্যপাড়া–রুদ্রকর অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদররা ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালায়। নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের লক্ষ্য করে পরিচালিত এই হামলাগুলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নির্মমতার এক কালো অধ্যায় হয়ে আছে।

ভীমনালি গণহত্যা:
২২ মে সকাল বেলা পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার ভীমনালি গ্রামে তখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। রাজাকার কমান্ডার ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বারের নির্দেশে প্রায় পাঁচশো রাজাকার গ্রামটি ঘিরে ফেলে। খবর পেয়ে গ্রামের মানুষ বারুই পরিবারের বাড়িতে জড়ো হয়েছিল। তাদের অনেকেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন, আজ হয়তো জীবন-মৃত্যুর লড়াই অপেক্ষা করছে।

গ্রামের প্রায় দুইশো হিন্দু যুবক ও সাধারণ মানুষ লাঠি, বর্শা আর যা কিছু হাতে পেয়েছেন, তা নিয়েই ওয়াপদা বাঁধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সামনের দিকে ছিল আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত রাজাকার বাহিনী, আর অন্যদিকে ছিল নিজেদের জীবন ও পরিবার বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে অসম যুদ্ধ। একসময় ভারী অস্ত্রের সামনে গ্রামবাসীর প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন অন্তত পনেরো জন। পরে আরও কয়েকজন নিহত হন। মোট আঠারো জন নিরীহ মানুষ ওই গণহত্যার শিকার হন। নিহতদের মরদেহ টেনে এনে খালে ফেলে দেয় রাজাকাররা।

হত্যাকাণ্ডের পর শুরু হয় আরেক দফা বর্বরতা। প্রায় আশিটি হিন্দু পরিবারের ঘরে লুটপাট চালানো হয়। গানপাউডার ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বাড়িঘরে। মুহূর্তেই একটি জনপদ পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। যারা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই পরে উদ্বাস্তু হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নেন।

মধ্যপাড়া ও রুদ্রকর গণহত্যা:
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ২২ মে শরীয়তপুরের মধ্যপাড়া অঞ্চলের মানুষের কাছে এক ভয়াল দিন। এদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকারদের সহযোগিতায় তৎকালীন পালং থানার হিন্দুপ্রধান আঙ্গারিয়া, কাশাভোগ, উত্তর ও দক্ষিণ মধ্যপাড়া, পশ্চিম কাশাভোগ, নীলকান্দি, মনোহর বাজার, রুদ্রকর ও ধানুকা এলাকায় সংঘটিত হয় ভয়াবহ গণহত্যা।

সকাল থেকে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় দেড় শতাধিক পাকিস্তানি সেনা রাজাকার কমান্ডার মৌলভী সোলায়মান মোল্লার নেতৃত্বে এসব গ্রামে প্রবেশ করে। তার সহযোগী ছিল কুখ্যাত রাজাকার আ. মোল্লা ও রবুল্যা মাস্টার। তারা পরিকল্পিতভাবে হিন্দু অধ্যুষিত জনপদগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়।

হানাদার বাহিনী এলাকায় ঢোকার খবর প্রথম ছড়িয়ে দেন আঙ্গারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দপ্তরি নুরুল ইসলাম। তিনি একটি গামছা ঘুরিয়ে চিৎকার করে মানুষকে সতর্ক করতে থাকেন, “পাকিস্তানি সেনারা আসছে, রাজাকাররা আসছে, তোমরা পালাও।” তার এই সাহসী ভূমিকার কারণে বহু মানুষ প্রাণে বাঁচতে সক্ষম হন। কিন্তু সবাই পালাতে পারেননি।

গ্রামগুলোতে ঢুকেই পাকিস্তানি সেনারা নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ কেউ রেহাই পায়নি। মানুষকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, চলে লুটপাট। সাড়ে তিন শতাধিক বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয় সেই দিনে।

সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য ছিল নারীদের ওপর চালানো নির্যাতন। মায়েদের সামনে সন্তান, স্বামীর সামনে স্ত্রী, ভাইয়ের সামনে বোনকে নির্যাতন করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা শিশুদের পর্যন্ত রেহাই দেয়নি; অনেক শিশুকে লাথি মেরে দূরে ছুড়ে ফেলে হত্যা করা হয়। চারদিকে তখন শুধু মানুষের আর্তচিৎকার, আগুনের ধোঁয়া আর রাজাকারদের অট্টহাসি।

মধ্যপাড়া ও আশপাশের এলাকা থেকে দুই শতাধিক নারী-পুরুষকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় মাদারীপুরের এ আর হাওলাদার জুট মিলে স্থাপিত পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে। সেখানে দিনের পর দিন নারীদের ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণ। পরে শিশু ও পুরুষদের একসঙ্গে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। অনেক মরদেহ ফেলে দেওয়া হয় জুট মিলের পেছনের আড়িয়াল খাঁ নদে।

রুদ্রকর গ্রামের ঐতিহাসিক মঠেও হামলা চালায় পাকিস্তানি সেনারা। মর্টার শেল ও ব্রাশফায়ার করেও তারা মঠটি ধ্বংস করতে পারেনি। আজও সেই মঠ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যেন এক নীরব সাক্ষী হয়ে স্মরণ করিয়ে দেয় ১৯৭১-এর সেই বর্বরতার কথা।

মুক্তিযুদ্ধে মধ্যপাড়ায় (২২ মে) গণহত্যার দিন বেঁচে যাওয়া আরতি রানি দাস ও মহাদেব দাস। ছবিঋণ: নিউজবাংলা

মধ্যপাড়া গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিতে এখনও সেই দিনের বিভীষিকা অমলিন। মধ্যপাড়ার গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী মহাদেব দাসের স্মৃতিতে এখনও সেই দিন জীবন্ত। গুলিতে আহত হয়ে প্রাণে বেঁচে গেলেও তার জীবনের সংগ্রাম থামেনি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মানুষটি এখনও জীবিকা নির্বাহ করেন পান-সুপারি বিক্রি করে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা সহায়তা খুব কমই পেয়েছেন তারা।

একইভাবে আরতি রানি দাসের মতো মানুষদের স্মৃতিতে এখনও ভেসে ওঠে লাশে ভরা গ্রাম, পচা গন্ধ আর শেয়াল-কুকুরে খাওয়া মৃতদেহের বিভীষিকাময় দৃশ্য। অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়েও অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও তাদের জীবনের কষ্ট শেষ হয়নি। অনেকেই আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, চিকিৎসা বা সহায়তা থেকে বঞ্চিত।

প্রতি বছর ২২ মে এলে মধ্যপাড়া অঞ্চলের মানুষ শহীদদের স্মরণ করেন। স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দেওয়া হয়, আয়োজন হয় আলোচনা সভার। কিন্তু সেই দিনের ক্ষত এখনও শুকায়নি। কারণ এই গণহত্যা শুধু কয়েকশ মানুষের প্রাণহানির ঘটনা নয়; এটি ছিল একটি জনপদকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার নির্মম প্রচেষ্টা।

মধ্যপাড়া গণহত্যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকারদের বর্বরতার এক জ্বলন্ত দলিল হয়ে আছে।

সূত্র:
১। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র সপ্তম, অষ্টম, নবম, দ্বাদশ, ত্রয়োদশ খণ্ড।
২। মুক্তিযুদ্ধ কোষ (দ্বিতীয় খণ্ড) মুনতাসির মামুন সম্পাদিত

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!