১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতন চালায়। এসব ঘটনার কিছু জাতীয় ইতিহাসে স্থান পেয়েছে, আবার কিছু ঘটনা স্থানীয় স্মৃতির ভেতরেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। নোয়াখালীর শ্রীপুর, সোনাপুর ও মধ্য করিমপুর এলাকায় ১৯৭১ সালের ১৫ জুন সংঘটিত গণহত্যা তেমনই একটি ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক দলিলপত্র, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এবং স্থানীয় স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, সেদিন পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা এ অঞ্চলে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতন চালায়। এতে শতাধিক মানুষ নিহত হন এবং বহু পরিবার স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে নোয়াখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা পাকিস্তানি বাহিনীর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। এপ্রিল মাসে পাকিস্তানি সেনারা কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম দিক থেকে নোয়াখালী অঞ্চলে প্রবেশের চেষ্টা শুরু করে। স্থানীয় জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন সড়ক ও সেতু ধ্বংস করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তবে পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রা তারা শেষ পর্যন্ত ঠেকাতে পারেননি।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, পাকিস্তানি বাহিনী পরিকল্পিতভাবেই শ্রীপুর-সোনাপুর অঞ্চলকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি ফ্লাইট সার্জেন্ট জহুরুল হকের বাড়ি ছিল সোনাপুরে। এ অঞ্চলের বহু তরুণ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন। এসব কারণেই পাকিস্তানি বাহিনী এলাকাটিকে সন্দেহের চোখে দেখত।
১৫ জুন ১৯৭১, মঙ্গলবার। দুপুরের খাবারের পর গ্রামবাসীরা যখন বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রায় ১৫ থেকে ২০টি যানবাহন শ্রীপুর গ্রামের প্রধান সড়কে এসে থামে। তাদের সঙ্গে স্থানীয় রাজাকাররাও ছিল। পরে পাকিস্তানি সেনারা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে তিন দিক থেকে গ্রামে প্রবেশ করে।
গ্রামে ঢুকেই তারা নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। আহম্মদিয়া স্কুল মাঠে ট্রাকের কাজে নিয়োজিত আলী হোসেনকে তারা হত্যা করে। এরপর তার বাড়িতে গিয়ে আলী করিম, আলী হায়দার এবং একজন অতিথিকে গুলি করে হত্যা করে। আলী হোসেনের পিতা সৈয়দ মুন্সি সন্তানদের প্রাণভিক্ষা চাইলেও পাকিস্তানি সেনারা তার আবেদন উপেক্ষা করে। হত্যার পর তারা বাড়িতে লুটপাট চালায় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়।
পরে হত্যাযজ্ঞ শ্রীপুর ছাড়িয়ে সোনাপুর ও মধ্য করিমপুর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বাড়ি, রাস্তা, ক্ষেত, বাজার—যেখানেই মানুষকে পেয়েছে, সেখানেই গুলি করেছে। সোনাপুর বাজারে এক হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক, ওষুধ কিনতে আসা এক নারী এবং তার দুই মাস বয়সী শিশুকন্যাও তাদের গুলিতে নিহত হন। একই সঙ্গে তারা বহু বাড়িঘরে আগুন দেয়, লুটপাট চালায় এবং নারীদের ওপর নির্যাতন করে। বিভিন্ন সাক্ষ্যে স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতার কথাও উঠে এসেছে।
আক্রমণের সময় গ্রামবাসীরা প্রাণ বাঁচাতে চারদিকে ছুটে পালিয়ে যায়। সন্ধ্যার পর অনেকে গ্রামে ফিরে এসে চারদিকে ছড়িয়ে থাকা লাশ, পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি এবং ধ্বংসস্তূপ দেখতে পান। তারা নিহত স্বজনদের দাফনের প্রস্তুতি নেন। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী আবার আসছে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই পুনরায় গ্রাম ত্যাগ করেন। পরদিন ফিরে এসে তারা নিহতদের দাফন সম্পন্ন করেন।
নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। তবে অধিকাংশ সূত্রে প্রায় ১১৫ জন মানুষের নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে আলী হোসেন, আলী করিম, আলী হায়দার, আবদুল কাদের, আবু তাহের, আলী আক্কাস, আবদুল কাইয়ুম, সাখায়েত উল্যা, ইউসুফ, জোসেফ সোয়ারিশ, মোয়াজ্জম হোসেন এবং ইয়াসিনের নাম পাওয়া যায়। সেদিন নিহত সকল মানুষের পরিচয় অবশ্য শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে সোনাপুর বাজারে বাইরে থেকে আসা বহু মানুষের নাম-পরিচয় অজানাই থেকে গেছে।
শ্রীপুর গণহত্যার ইতিহাস পুনর্গঠনে প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিচারণ গুরুত্বপূর্ণ। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ইব্রাহিম খলিলের বর্ণনা থেকে জানা যায়, পাকিস্তানি সেনারা তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে একসঙ্গে গুলি করে। তিনি নিজেও গুলিবিদ্ধ হন, তবে প্রাণে বেঁচে যান। জহির উদ্দিন, হেলাল উদ্দিনসহ অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শী আগুনে জ্বলতে থাকা গ্রাম, মানুষের আর্তচিৎকার, স্বজন হারানোর বেদনা এবং প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়ানোর অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন। এসব সাক্ষ্য গণহত্যার মানবিক অভিঘাতও তুলে ধরে।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় জাতীয় পর্যায়ে শ্রীপুর গণহত্যা খুব কম আলোচিত হয়েছে। তবে স্থানীয় মানুষ আহম্মদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ‘স্মৃতি অম্লান’ নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছেন। সেখানে গণহত্যায় নিহতদের একটি অংশের নাম সংরক্ষিত রয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের সময় নোয়াখালী অঞ্চলের কয়েকজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলাও পরিচালিত হয় এবং কয়েকজনের বিরুদ্ধে দণ্ডাদেশ ঘোষণা করা হয়।
নোয়াখালী অঞ্চলের বৃহৎ হত্যাযজ্ঞগুলোর মধ্যে শ্রীপুর গণহত্যা অন্যতম। এই ঘটনার স্মৃতি আজও প্রত্যক্ষদর্শী ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা বহন করছেন। কিন্তু নিহতদের অনেকের পরিচয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ইতিহাস এবং গণহত্যার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো নথিবদ্ধ হয়নি। শ্রীপুর গণহত্যার বহু দিক আজও গবেষণা ও তথ্যসংগ্রহের অপেক্ষায় রয়েছে।
তথ্যসূত্র:
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, সপ্তম, অষ্টম, নবম, দ্বাদশ, ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ খণ্ড।




