কাঙালিনী সুফিয়া: করতালির পরের জীবন

কাঙালিনী’ শব্দটি একসময় ছিল একজন শিল্পীর পরিচয়। আজ শব্দটি আমাদের সাংস্কৃতিক বাস্তবতারও এক নির্মম রূপক। যে কণ্ঠ বাংলার লোকগানকে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছিল, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই মানুষটিই চিকিৎসা, অর্থকষ্ট ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়ছেন। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর জরাজীর্ণ ছবি শুধু একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত দুর্দশার সংবাদ নয়; আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতারও এক অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি। বার্ধক্য, অসুস্থতা আর অর্থসংকটে যখন একটি কিংবদন্তি শিল্পীর চিকিৎসাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন আমাদের নিজেদের দিকেও তাকাতে হয়।

মানুষ একবার জন্মায় মায়ের গর্ভে, আরেকবার নিজের কর্মে। টুনি হালদারের সেই দ্বিতীয় জন্মেই জন্ম নেয় ‘কাঙালিনী সুফিয়া’। ১৯৬১ সালে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার রামদিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই কিশোরী কৈশোরে ওস্তাদ হালিম বয়াতির শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সুফিয়া খাতুন নাম ধারণ করেন। ১৯৮১ সালের এক সন্ধ্যায় ঢাকার হাইকোর্ট মাজার এলাকায় তাঁর মেঠো কণ্ঠ শুনে থমকে দাঁড়িয়েছিলেন কবি ফজল-এ-খোদা। তাঁর উদ্যোগেই বেতারে গান গাওয়ার সুযোগ আসে। পরে বিটিভিতে কাজের সূত্রে চিত্রশিল্পী ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার তাঁর নামের আগে যুক্ত করেন ‘কাঙালিনী’। সেই নামের সঙ্গে ধীরে ধীরে যুক্ত হতে থাকে বাংলার মাটি, মানুষের জীবন, লোকসংগীতের ঐতিহ্য এবং এক সংগ্রামী শিল্পীর দীর্ঘ পথচলার ইতিহাস।

কাঙালিনী সুফিয়ার শিল্পীজীবন ছিল সংগ্রামের আরেক নাম। রক্ষণশীল সমাজের বাধা, দারিদ্র্য আর প্রতিকূলতার ভেতর দিয়েই তিনি নিজের পথ তৈরি করেছেন। দেহতত্ত্ব, বাউল আর বিচ্ছেদের গান তাঁর কণ্ঠে লোকগান নতুন এক যাত্রা শুরু করেছিল। ‘পরাণের বান্ধব রে’, ‘বুড়ি হইলাম তোর কারণে’, ‘আমার ভাটি গাঙের নাইয়া’, ‘কোনবা পথে নিতাইগঞ্জে যাই’সহ অসংখ্য গান বাংলার লোকঐতিহ্যকে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, চীন ও ভারতসহ বহু দেশে তিনি বাংলাদেশের লোকসংগীতের প্রতিনিধি হয়েছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিলিয়ে অর্জন করেছেন চল্লিশটি পুরস্কার। যে কণ্ঠ একদিন গ্রামবাংলার উঠোনকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিয়েছিল, আজ সেই শিল্পীর চিকিৎসার ব্যয় বহন করার সামর্থ্য নেই।

গণমাধ্যমে কাঙালিনী সুফিয়ার বর্তমান অবস্থার খবর প্রকাশের পর কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে। চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগরের উদ্যোগে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা সম্মানী ভাতার ব্যবস্থা হয়েছে। বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষ থেকেও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগগুলো অবশ্যই মানবিক এবং প্রশংসার যোগ্য। তবু হিসাব মেলে না। একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পীর চিকিৎসা, ওষুধ কিংবা ন্যূনতম জীবনের নিশ্চয়তা কি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে? রাষ্ট্রের দায় কি কেবল সম্মাননা দেওয়া, নাকি সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার ব্যবস্থাও করা?

একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পীর ওষুধের পেছনেই যখন মাসে পনেরো হাজার টাকা ব্যয় হয়, তখন তাঁর চিকিৎসার দায় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দান-অনুদানের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। এককালীন অনুদান কোনো শিল্পীর জীবন বদলে দেয় না। অসুস্থতা, বার্ধক্য কিংবা কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেললে একজন শিল্পী নিজের চিকিৎসা বা জীবিকার জন্য বারবার অন্যের সহায়তার অপেক্ষায় থাকবেন কেন? এই দায় রাষ্ট্রেরও।

জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ শূন্য দশমিক এক শতাংশেরও কম। সেই বরাদ্দের বড় অংশ ব্যয় হয় প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও নানা আয়োজনেই। ২০২১ সালে ‘বাংলাদেশ শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্ট আইন’ পাস হলেও প্রবীণ ও অসচ্ছল শিল্পীদের চিকিৎসা, পেনশন কিংবা জরুরি সহায়তার জন্য কোনো স্থায়ী কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে একজন শিল্পী অসুস্থ হলে তাঁর ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চয়তার ওপরই নির্ভর করে।

এই অবস্থার পরিবর্তন শুধু সহানুভূতিতে হবে না, প্রয়োজন একটি স্থায়ী রাষ্ট্রীয় কাঠামো। কাঙালিনী সুফিয়ার চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। একই সঙ্গে তাঁর অবশিষ্ট জীবন যেন চিকিৎসা, ওষুধ কিংবা ন্যূনতম জীবনের নিশ্চয়তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় না কাটে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু কাঙালিনী সুফিয়ার জন্য নয়, দেশের প্রবীণ ও অসচ্ছল শিল্পীদের জন্যও শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্টকে কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক রূপ দিতে হবে। চিকিৎসা-সুবিধা, পেনশন এবং জরুরি সহায়তা কোনো অনুগ্রহ নয়, শিল্পীর ন্যায্য অধিকার।

কাঙালিনী সুফিয়ার চিকিৎসা নিশ্চিত হলে একজন শিল্পী বাঁচবেন। এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠলে বাঁচবে ভবিষ্যতের শিল্পীরাও।

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!