কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদ বিষয়ক বিচিত্র প্রসঙ্গ

ওরে ধ্বংস-পথের যাত্রীদল!
ধর হাতুড়ি, তোল্ কাঁধে শাবল।
আমরা হাতের সুখে গড়েছি ভাই
পায়ের সুখে ভাঙব চল।
ধর হাতুড়ি, তোল্ কাধেঁ শাবল॥
(শ্রমিকের গান, কাজী নজরুল ইসলাম)

কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৮-১৯৭৬) পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগরে ১৯২৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি নিখিল বঙ্গ প্রজা সম্মেলনে উদ্বোধনী সঙ্গীতরূপে উক্ত সংগীত রচনা, সুরারোপ এবং সম্মেলনে নিজেই সংগীতটি পরিবেশন করেন । সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিলো কৃষক শ্রমিক দল গঠন করা। সম্মেলন-উত্তর The Workers and Peasants Party of Bengal নামক সংগঠনের কার্যক্রমের সূত্রপাত হয়। কৃষ্ণনগরে সেইসময় বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস সম্মেলন, যুব সম্মেলন, ছাত্র সম্মেলনে কবি উদ্বোধনী সংগীত রচনা এবং সুরারোপ করেন। যুব সম্মেলনে কবি ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’, ছাত্র সম্মেলনে ‘ছাত্রদলের গান’ রচনা করেন এবং সম্মেলনের উদ্বোধনে পরিবেশিত হয়। কৃষ্ণনগরের সম্মেলনে কবি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তোলেন। অমৃতবাজার’ পত্রিকার বরাত দিয়ে কমরেড মুজফ্ফর আহমদ তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, প্রাদেশিক সম্মেলন আরম্ভ হওয়ার আগের দিন (২ শে মে, ১৯২৬) “কাজী নজরুল ইসলাম ফিল্ড মার্শালের পোশাক পরে ভলানটিয়ার বাহিনী পরিচালনা করেছিলেন।” ১৯২৬ সালে কলকাতা ও বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-বিভেদের বিরুদ্ধে কবি শ্রমজীবী ভাবাদর্শে কয়েকটি কবিতা ও প্রবন্ধ রচনা করেন, তারমধ্যে কবিতা পথের দিশা’ (যশোরের অগ্রদূত’ প্রকাশিত), ‘যা শত্রু পরে পরে’ (বর্ধমানের শক্তি’ পত্রিকায়, পরে গণবাণী’তে প্রকাশিত), হিন্দু-মুসলিম যুদ্ধ’ এবং প্রবন্ধ মন্দির ও মসজিদ’ ও হিন্দু-মুসলমান’ (গণবাণীতে প্রকাশিত) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । কবি কৃষ্ণনগরে থাকাকালিন সময়ে তাঁর বাড়ির সম্মুখে উন্মুক্ত স্থানে ‘শ্রমজীবী নৈশ বিদ্যালয়’ স্থাপন করেছিলেন। তাঁর এই কর্মযজ্ঞে সহায়তা করেন কৃষ্ণনগরের গুণীজন শ্রীহেমন্তকুমার সরকার। কবির ভাবনার মধ্যে সাম্যভাবনা প্রকট হয়ে উঠেছিলো। কবি যা চিন্তা করতেন, তার লেখা ও কর্মে বিস্ময়কর সামঞ্জস্য ছিলো।

কবির ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থ এবং ‘লাঙল’ পত্রিকা প্রকাশের শতবর্ষ-উত্তর কবির সাম্যচিন্তা ও ভাবনার সাথে একবিংশ শতকের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ঘটনাবলীর মৌলিক সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়। শতবর্ষের সময়কালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভারত বিভক্ত (দেশভাগ), পূর্ব পাকিস্তান (পূর্ব বাংলা) থেকে বাংলাদেশ সৃষ্টি, বাংলা ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থানসহ সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-প্রগতিশীল আন্দোলন হয়েছে। প্রত্যেকটি আন্দোলন সংগ্রামে কবির গান, কবিতা ও তাঁর কর্মযজ্ঞ অপ্রতিরোধ্য জাগরণ সৃষ্টি করে। কবির সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থ ও লাঙল’ পত্রিকার শতবর্ষে এসে পুনর্পাঠের মাধ্যমে কবির সাম্যবাদ’ চেতনা বাংলাদেশের গতিপ্রকৃতির সাথে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বর্তমান শতাব্দীতে অর্থনীতি ও প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির ফলে বিশ্ব ব্যবস্থায় যেসব দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, তা সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশিকতার মূল প্রবণতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। অবধারিতভাবে পুঁজিবাদের উগ্র উত্থানপর্বে সাম্রাজ্যবাদের কৌশল পরিবর্তিত হয়েছে। বিশ্ব বন্দোবস্তে প্রত্যেক উন্নয়নশীল, অনুন্নত দেশের দেশীয় শিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে, উৎপাদন ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বিধি ব্যবস্থা, অবাধে প্রবেশ করেছে পাশ্চাত্যের কল্পিত আভিজাত্য ও পুঁজিবাজার সাম্রাজ্যবাদীদের উপুর্যুপুরি বলপ্রয়োগে বিধ্বস্ত বিশ্বে ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়েছে। সাম্রাজ্যবাদীদের ভয়াল আগ্রাসন, যুদ্ধের কারণে উদ্বাস্তু ও শরনার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বে জনসংখ্যা ৮০৯ কোটি মানুষের মধ্যে চরম দারিদ্রে ১১০ কোটি মানুষ (ইউএনডিপি ২০২৪ সালের তথ্য), বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২৩.৩ মিলিয়ন মানুষ (ইউএনএইচসিআর, ২০২৪), গৃহশ্রমিক (অধিকাংশ মহিলা ও উদ্বাস্তু) ৭৫.৬ মিলিয়ন ইত্যাদি পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায় বিশ্বের অবস্থা কোন পর্যায়ে আছে। বিশ্বে ১বিলিয়ন বা তার বেশী সম্পদের অধিকারী ৩০২৮ জন, তাদের সম্পদের পরিমাণ ১৬.১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার । The World Inequality Report 2026, বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন অনুযায়ি ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান ব্যাপক, মাত্র ১০ শতাংশ ধনী ব্যক্তি বিশ্বের সম্পদের চার ভাগের তিন ভাগের মালিক। সাম্রাজ্যবাদের বর্বর যুগে ১০ ভাগ মানুষের দ্বারা বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে ৯০ ভাগ মানুষের সাথে। প্রায় ৫০ ভাগ মানুষ সম্পদ ২ শতাংশ সম্পদ ভোগ করে থাকে। বিশ্বব্যাপি যা বিদ্যমান, তা রীতিমতো ভয়াবহ। নয়া সাম্রাজ্যবাদের চূড়ান্ত উত্থান পর্বের বিধ্বংসী চিত্র, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বিশ্বকে দেখতে পাই । আঞ্চলিক সংঘাত, সামাজিক অস্থিরতা, জলবায়ুর পরিবর্তন, বাস্তুচ্যুত জনসংকটসহ বিবিধ সংকট এবং সাম্রাজ্যবাদী দেশের আগ্রাসনে জ্বালানি, খাদ্যশস্য ও অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় আর্ন্তজাতিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দশে ভয়াবহ মন্দা, দুর্ভিক্ষে পতিত হচ্ছে। একবিংশ শতকের যেসব পরিস্থিতি দৃশ্যমান হচ্ছে, তা বিশ শতকের ধারাবাহিকতার পরিণতি বলা যায়। ব্রিটিশ-ভারতের গণআন্দোলনে কবির অধিকাংশ লেখা অভূতপূর্ব গণজাগরণ সৃষ্টি করেছিল। বিশেষ করে পশ্চাৎপদ বাঙালি জাতি হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদকে অগ্রাহ্য করে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। উনিশ শতকের শেষার্ধে উপর্যুপরি নানা বিদ্রোহ যেমন- বৃহৎ বিদ্রোহ (১৮৫৭), নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-৬১), ফরাজী বিদ্রোহ (১৮৩৮-৪৭) বিবিধ বিদ্রোহ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে বিচলিত করে তোলে। ভারতের শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের সংগঠন হিসেবে বাংলায় বৃটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি (১৮৪১), বৃটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন (১৮৫১), বৃটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন আলীগড় (১৮৬৬), কলকাতার ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন (১৮৭৬), নিষিদ্ধ বিপ্লবী সংগঠন অনুশীলন সমিতি (১৯০২), যুগান্তর সমিতি (১৯০৬)সহ বেশ কয়েকটি সংগঠনের কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায়। এইসব ধারাবাহিকতায় ভারতে রাজনৈতিক দল কংগ্রেস (১৮৮৫), মুসলিম লীগ (১৯০৬), কমিউনিস্ট পার্টি (১৯২০, মতান্তরে ১৯২৫) গড়ে ওঠে। বৃটিশদের রাউলাট আইন, জালিয়ানওয়ালাবাগের নির্মম হত্যাকা- ভারতীয় রাজনীতিতে চরম অশান্তি সৃষ্টি করে। বৃটিশ উপনিবেশিকতার চরম দমন-পীড়নের সময়কালে কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম এবং বেড়ে উঠেছেন। ব্রিটিশ ভারতের বর্ধমানের আসানসোলের চুরুলিয়া নামক গাঁয়ে কবির জন্ম, কিশোরে পিতৃহীন, মায়ের সাথে সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতা এবং আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যে তাঁর জীবন সংগ্রামমুখর হয়ে ওঠে। কখনো লেটোর দলে, রুটির দোকানে, স্কুল পালিয়ে ব্রিটিশ সিপাহি দলে যোগদানের মধ্যে কবির প্রথম পর্বের জীবন অতিবাহিত হয়। বৃটিশের ৪৯তম বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙ্গে গেলে কবি ১৯২০ সালে কলকাতায় আসেন। কলকাতায় কবি নজরুল ইসলামের সাথে পরিচিতির মধ্যে শৈশবের বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, সবুজ পত্র’ পত্রিকার পবিত্র গাঙ্গুলি, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসের মুজফফর আহমদ। কলকাতায় সাংবাদিকতা দিয়ে তাঁর পথ চলা শুরু হয়। কলকাতায় এসেই তাঁর ঠিকানা বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র অফিস, কিছুদিন পরে মুজাফফর আহমদের বাসগৃহে। কবির বিচিত্র সাহিত্য সাধনার সময়কাল মাত্র (১৯১৯ খৃ. থেকে ১৯৪২ খৃ. পর্যন্ত) তেইশ বছর। সাহিত্যিক জীবনের প্রথমার্ধে চিরবিদ্রোহী, বিংশ শতকের তৃতীয় ও চতুর্থ দশকে তাঁর সৃষ্টি-সম্ভারে প্রেম সাধনার বিচিত্র প্রকাশ ঘটেছে। ১৯৪২ সালে কবির অসুস্থতা এবং দূরারোগ্য ব্যাধির ফলে জীবনের চৌত্রিশ বছর অর্থাৎ মৃত্যুপূর্ব পর্যন্ত বাক ও বোধশক্তি হারিয়ে নির্বাক থেকেছেন। তথাপি কবির সৃষ্টিসম্ভার বহুমাত্রিক অসামান্য প্রতিভার মাধ্যমে বাংলা ভাষা সাহিত্য সংগীতসহ সকল সৃজনশীল মাধ্যমের উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে আছে।

১৯১৭ সালে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ফলে বিশ্বব্যাপি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সাম্যবাদের পক্ষে বিভিন্ন দেশে গণজাগরণ, স্বাধীনতার দাবী প্রকটিত হতে দেখা যায়। কবি নজরুল ইসলাম প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়েই প্রগতির পথে, মুক্তির সংগ্রামে অভাবনীয় সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় কবি লেখালেখির সাথে ১৯২০ সালে নবযুগ (প্রতিষ্ঠাতা ও মালিক: শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, যুগ্ম-সম্পাদক: মুজফ্ফর আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম) পত্রিকায় যুক্ত হন। এই পত্রিকায় কবি নবযুগের বার্তা দিলেন- ‘আজ মহাবিশ্বে মহাজাগরণ, আজ মহামাতার, মহা আনন্দের দিন, আজ মহামানবতার মহাযুগের মহা উদ্বোধন।’(নবযুগ)

‘নবযুগ’পত্রিকা বৃটিশ সরকারের রোষানলে পড়ে বন্ধ হয়ে যায়।‘ নবযুগ’বন্ধ হবার পর কলকাতায় সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দেন। তিনি রচনা করেন ভাঙার গান’ বিদ্রোহী’আনোয়ার পাশা’কামাল পাশা’ কবিতা। কবি-মানস ক্রমান্বয়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে থাকে।

“আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান- বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন
আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ-হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ছিন্ন।”

কবির এই বিদ্রোহ সত্যিকার দ্রোহে রূপ নেয় ধূমকেতু’পর্বে। ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আর্শীবাণী’তে অর্ধ সাপ্তাহিক পত্রিকা ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। কবি ঘোষণা করলেন, সর্বপ্রথম ধূমকেতু ভারতের স্বাধীনতা চায়।”

ধূমকেতু’র ১২শ সংখ্যায় আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা প্রকাশের জন্য কবির উপর সমন জারি এবং কুমিল্লা থেকে কবিকে গ্রেফতার করা হয়। কবি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে অভিনব কালজয়ী বক্তব্য দেন । কবির সশ্রম কারাদন্ড হয়। কবি নজরুলের কারাগরে অন্তরীনের সংবাদে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসন্ত’ নাটক তাঁর নামে উৎসর্গের মাধ্যমে সহমর্মিতা জানালেন। কবি নজরুলের মুক্তির দাবীতে কলকাতায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের নেতৃত্বে লালদীঘির ময়দানে সমাবেশ হয়। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন। কবি নজরুল হয়ে উঠলেন রাজবিদ্রোহী জনকবি।’ বিশ শতকের আন্দোলন-সংগ্রাম, বিপ্লবী ভাবনার, সৃজনশীলতার মাধ্যম কবির জনপ্রিয়তা তৎকালে ভারতবর্ষে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কাজী নজরুল ইসলামের ধূমকেতু পর্ব পর্যন্ত প্রচণ্ডভাবে জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং জেল থেকে বের হবার পর তাঁর লেখা ও কর্মে সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শের প্রতিফলন দেখা যায়।

১৯২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে কবি ভারতীয় কংগ্রেসের অধিভু শ্রমিক প্রজা স্বরাজ দল’ গঠন করেন । ১৩৩২ বঙ্গাব্দের মাঘ মাস থেকে স্বতন্ত্র স্বাধীন সংগঠন র‘বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দল’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ‘শ্রমিক-কৃষক-স্বরাজ’ সম্প্রদায়ের মুখপত্র হিসেবে লাঙল’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়- (প্রথম খণ্ড, বুধবার ১লা পৌষ, ১৩৩২, ইং ১৬ ডিসেম্বর, ১৯২৫) বিশেষ সংখ্যা’ প্রকাশিত হয়। পত্রিকার প্রথম পাতায়- প্রধান পরিচালক- নজরুল ইসলাম, সম্পাদক- মণিভূষণ মুখোপাধ্যায় এবং লাঙলে কি কি থাকিবে? – ১) বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের কবিতা। ২) ম্যাক্সিম গর্কীর জগৎবিখ্যাত রোমাঞ্চকর উপন্যাস ‘মা’-র ধারাবাহিক অনুবাদ । ৩) কাল মার্কসের জীবনী। ৪) প্রজাসত্ত্ব আইনের ধারাবাহিক আলোচনা। ৫) গণ-আন্দোলন সম্বন্ধীয় পুস্তকের আলোচনা ও সঙ্কলন । ৬) প্রতি সংখ্যায় একখানি করিয়া ছবি।

লাঙলের শিরোনামে যেসব উদ্ধৃত ছিল তার মধ্যে চন্ডীদাসের কবিতার চরণ-
শুনহ মানুষ ভাই-
সবার উপরে মানুষ সত্য
তাহার উপরে নাই।

স্বরাজ দল ও লাঙল পত্রিকাকে বাংলা ভাষার প্রথম শ্রেণী সচেতন পত্রিকা বলা হয়। এই দলের উদ্দেশ্য ও নিয়মাবলী’র সাথে তা মার্কস-এঙ্গেলস’ প্রণীত কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ এবং লেনিনের বলশেভিক পার্টি’র উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্য রয়েছে। দলের বার্তা– “নারী-পুরুষ-নির্ব্বিশেষে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের পূর্ণ-স্বাধীনতাসূচক স্বরাজ্য লাভই এই দলের উদ্দেশ্য।”

চরম দাবী’তে উল্লেখ আছে-
১। আধুনিক কলকারখানা, খনি, রেলওয়ে, টেলিগ্রাফ, স্টীমার প্রভৃতি হিতকারী জিনিস, লাভের জন্য ব্যবহৃত না হইয়া দেশের উপকারের জন্য ব্যবহৃত হইবে এবং সংক্রান্ত কর্ম্মীগণের তত্ত্বাবধানে জাতীয় সম্পত্তি রূপে পরিচালিত হইবে।
২। ভূমির চরম স্বত্ত্ব আত্ম-অভাব-পূরণ-ক্ষম স্বায়ত্ত্ব-শাসন-বিশিষ্ট পল্লীতন্ত্রেও উপর বর্ত্তিবে- এই পল্লী-তন্ত্রে ভদ্র শূদ্র সকল শ্রেণীর শ্রমজীবীর হাতে থাকিবে।” (লাঙল ও গণবাণী; ১১-১৩)

লেনিনের নেতৃত্বাধীন রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি (বলশেভিক পার্টি) ১৯১৭ সালের অক্টোবরে প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত করে। সারা বিশ্বকে অক্টোবর বিপ্লব দেখিয়েছে মূল সামাজিক সমস্যাদি সমাধানের নিদর্শন, যথা: শোষকদের ক্ষমতা উচ্ছেদ করে মেহনতীদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা , ব্যক্তিগত মালিকানাকে সামাজিক মালিকানায় পরিবর্তন, কৃষকদের স্বার্থে কৃষি সমস্যার ন্যায্য সমস্যার সমাধান, ঔপনিবেশিক ও জাতীয় পীড়ন থেকে পরাধীন জাতিদের মুক্তি দান, সমাজতন্ত্র নির্মাণে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পূর্বশর্ত গঠন । রাশিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক-অর্থনৈতিক চেহারার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে অক্টোবর বিপ্লব, যা আর্ন্তজাতিক মুক্তি আন্দোলনের ওপর নির্ণয়ক প্রভাব ফেলে তাকে নতুন একটা উচ্চতর মাত্রায় তুলে দিয়েছে,যা সমস্ত বিশ্বকে দেখিয়েছে সমাজতন্ত্রের পথ, আর বুর্জোয়াকে দেখিয়ে দিয়েছে যে তার সমারোহের সমাপ্তি ঘনিয়ে আসছে, বলেছেন লেনিন। শুরু হল মানবজাতির ইতিহাসে নতুন যুগ ।” (লেনিন নির্বাচিত রচনাবলী, প্রথম খ-, ভূমিকা, পৃ. ২৫-২৬)।

স্বরাজ দলের ঘোষণা, কর্ম পরিকল্পনার সাথে বলশেভিক পার্টির নীতি-আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে । লাঙল’ পত্রিকার প্রথম খণ্ড, বিশেষ সংখ্যা’য় সাম্যবাদী’ মূল শিরোনামে সাম্যবাদী, ঈশ্বর, মানুষ, পাপা, চোর-ডাকাত, বারাঙ্গনা, মিথ্যাবাদী, নারী, রাজা-প্রজা, সাম্য, কুলি-মজুর’ মোট ১০টি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল।

১. গাহি সাম্যের গান–
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান! (মানুষ)

২. সাম্যের গান গাই–
যত পাপী তাপী সব মোর বোন, সব হয় মোর বোন।—
হেথা সবে সম পাপী
আপন পাপের বাট্খারা দিয়ে অন্যের পাপ মাপি। (পাপ)

৩. রাজার প্রাসাদ উঠিছে প্রজার জমাট রক্ত-ইঁটে
ডাকু ধনিকের কারখানা চলে নাশ করি ভিটে। (চোর ডাকাত)

৪. শোনো মানুষের বাণী
জন্মের পর মানব মানব জাতির থাকে নাক কোন গ্লানি! (বারাঙ্গনা)

৫. সাম্যের গান গাই
আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।
বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণ-কর
অর্দ্ধেক তার করিয়াছ নারী, অর্দ্ধেক তার নর।

৬. জনগণ হ’ল যুদ্ধ বিজয়ী, রাজার গাহিল জয় ।– (রাজা-প্রজা)

৭. আজ নিখিলের বেদনা-আর্ত্ত পীড়িতের মাখি খুন
লালে লাল হয়ে উদিছে নবীন প্রভাতের নবারুণ।—
সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি,
এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শুন এক মিলনের বাঁশী। (কুলি-মজুর)

সাম্যবাদী’ কবিতা প্রকাশিত হলে বিভিন্ন পত্রিকায় কবিকে নিয়ে যেমন বিষোদগার ছিল, তেমনি প্রশস্তির প্রতিবেদনও পাওয়া যায়। তার কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো-

১. লাঙল, ১৫ই এপ্রিল, ১৯২৬, রবীন্দ্রনাথের আশীর্ব্বচন
জাগো জাগো বলরাম
ধরো তব মরু-ভাঙা হল।
বল দাও ফল দাও
স্তব্দ করো ব্যর্থ কোলাহল।

এই পত্রিকায় কবির বিখ্যাত কবিতা ‘সর্বহারা’ প্রকাশিত হয়। কবিতার পাশাপাশি সংগীত, প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাসে কবির পরিচিতি বহুমাত্রিকতায় পর্যবসিত হয়েছে । বর্তমান বিশ্ব সাহিত্যে’ প্রবন্ধে কবির সাহিত্য বিষয়ক ভাবনার প্রগাঢ় চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

২. মাসিক মোহাম্মদী, পৌষ, ১৩৩৫
ইসলাম ও নজরুল কাব্য-সাহিত্যঃ এম, আজিজার রহমান
সাম্যবাদী’ কবিতায় তিনি চোর’ডাকাত’ মিথ্যাবাদী’ বারাঙ্গনা’- প্রভৃতির যাবতীয় দুর্নীতিমূলক কার্যকেই জায়েজ বলিযা ফতোয়া দিয়াছেন।—- তিনি সেখানে সাম্যবাদী’, সকলকেই তিনি সমানভাবে চোখে দেখেন। ইসলাম সাম্যবাদেরই ধর্ম, সন্দেহ নাই; কিন্তু এমন অদ্ভুত সাম্যবাদ সে কখনও অনুমোদন করে না। — এ সাম্যবাদ’ রুশিয়ার বলশেভিক সাম্যবাদ- যেখানে ধর্ম্ম ও নীতির কোন বালাই নাই। এ সাম্যবাদ লম্পট ও উচ্ছৃঙ্খলদিগেরই সাম্যবাদ।” (মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, পৃ. ১২০)

৩. প্রবাসী, জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৪
পুস্তক পরিচয়। সর্বহারা (কবিতা পুস্তক)— নজরুল ইসলাম প্রণীত–
আজ পাঁচ বৎসর ধরিয়া তিনি যে আমাদিগকে যে বিদ্রোহ, বিপ্লব, স্বাধীনতা ও রক্তপাতের গান শুনাইয়া আসিতেছেন ‘সর্বহারা’ তাহারই নূতনতম কিস্তি। প্রথম বারে অগ্নিবীণা’র গর্জন শুনিয়া তাঁহার বিস্মিত ও চমকিত দেশবাসীরা ভাবিয়াছিল যে, এত দিনে আমাদের দেশেও বুঝি আ্যাঙ্গোরার বিজয়বাদ্য অথবা মস্কোর রণভেরী বাজিয়া উঠিল।— এই সাম্যবাদী কবির মতে সব মানুষ সমান।- তাঁহার কাছে চোরডাকাত’, মিথ্যাবাদী বারাঙ্গনা’, কুলীমজুর’নারী, রাজা-প্রজা’, সাধারণ মনুষ্য সকলেই মাসতুতো ভাইবোন। (প্রাগুক্ত)

৪. সওগাত, পৌষ, ১৩৩৩
কাব্য সাহিত্যে বাঙ্গালী মুসলমানঃ আবুল কালাম মোহাম্মদ শামসুদ্দীন
এই যুগ প্রবর্তক কবি-প্রতিভা কাজী নজরুল ইসলাম। অন্যান্য যুগ-প্রবর্তক প্রতিভার যেমন উদয় হইয়াছে, নজরুল ইসলামের সময়েও তাহাই হইতেছে।—– নজরুল ইসলাম বাংলার জাতীয় কবি। জাতির বেদনার কথাই তাঁহার কাব্যের ভিতর দিয়া প্রকাশ পাইতেছে। হিন্দু ও মুসলমান লইয়া বাঙ্গালী জাতি। সুতরাং এ জাতির বেদনার কথা প্রকাশ করিতে হইলে রচনায় ইসলামী এবং হিন্দুয়ানী উভয় জাতীয় ভঙ্গীরই ছাপ দিতে হইবে।’ (প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৫)

কাজী নজরুল ইসলামের মানসপ্রকৃতির মধ্যে স্বাধীনতা ও সাম্য প্রকটভাবে ফুটে ওঠে। লাঙল’ পত্রিকা ১৫শ সংখ্যা, ১৫ এপ্রিল, ১৯২৬ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিলো। ১৯২৬ সালের ১২ আগস্ট বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দলের সাপ্তাহিক মুখপত্র হিসেবে ‘লাঙল’ পত্রিকার নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘গণবাণী’ নামে ১ম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দল গণবাণী”র প্রকাশ ভার গ্রহণ করেছেন। এই দলের পূর্ব্ব প্রকাশিত “লাঙল” গণবাণী”র সহিত একীভূত হয়ে গেছে। ((প্রাগুক্ত, ২৫১)। পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় মার্কস-এঙ্গেলসের ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ এর সারানুবাদ প্রকাশিত হয়। কবির সাম্যচিন্তা সত্যিই বিস্ময়কর। শতবর্ষ পরে এসেও তা মানুষের জয়গানে উজ্জীবীত করে। ‘ওড়াও ওড়াও লাল নিশান, ওরে ধ্বংস পথের যাত্রীর দল, ওঠরে চাষী জগদ্বাসী, চল চল চল, জাগো অনশনবন্দী উঠরে যত, কারার ঐ লৌহকপাট ইত্যাদি সংগীতে বাঙালিসহ সকল জাতি, সকল দেশের জনমানুষের জাগরণ সৃষ্টি করে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বিশ্ব-জাগৃতির সাম্যভাবনার কবিও বলা হয়। কবির দ্রোহ-জাগরণ, শ্রেণী ও মানবিক চেতনার নান্দনিক প্রকাশ বাংলা সাহিত্যে অনন্য শিল্প সুষমায় উদ্ভাসিত হয়ে থাকবে।

‘জাগো জনশক্তি!.. ভাঙো ঐ উৎপীড়কের প্রসাদ-ধুলায় লুটাও অর্থ-পিশাচ বলদর্পীর শির।’ (রুদ্র-মঙ্গল)

কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যভাবনার বিচিত্র প্রসঙ্গ নবকালের রাষ্ট্র পরিচালকদের জ্ঞান-গরিমায় পৌঁছবে কিনা , তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে তাঁর আশাবাদ ভাবীকালের নবউত্থানে পর্যবসিত হবে।

“তারাই মানুষ, তাবাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান,
তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব-উত্থান!…

সকলের সাথে পথে চলি যার পায়ে লাগিয়াছে ধূলি!
আজ নিখিলের বেদনা-আর্ত পীড়িতের মাখি’ খুন,
লালে লাল হয়ে উদিছে নবীন প্রভাতের নবারুণ! (কুলি-মজুর)

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!