ছোটবেলায় পড়া কোনো কোনো কবিতা বড় হওয়ার পরও আমাদের সঙ্গে থেকে যায়। বয়স বাড়লে কবিতার কথাগুলোর অর্থ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কামিনী রায়ের ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ তেমনই একটি কবিতা। নিজের কোনো ইচ্ছা প্রকাশ করতে গিয়ে থেমে যাওয়া, ভুল হওয়ার ভয়ে কাজ শুরু না করা কিংবা কারও পাশে দাঁড়াতে চেয়েও পিছিয়ে আসার মধ্যে কথাটি ফিরে আসে। ‘আলো ও ছায়া’ কাব্যগ্রন্থের এই কবিতায় কামিনী রায় লিখেছেন,
“করিতে পারি না কাজ,
সদা ভয়, সদা লাজ,
সংশয়ে সংকল্প সদা টলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।”
এখানে মানুষ থেমে যায় অন্যের নিন্দা বা উপহাসের ভয়ে। পরিচিত মানুষের নিন্দা কিংবা উপহাসের আশঙ্কাই সংকল্পকে দুর্বল করে দেয়। স্নেহভরা দুটো কথা বললে কিংবা পাশে থেকে উৎসাহ জোগালে কারও কষ্ট কমতে পারে, অথচ লোকের নিন্দার ভয়ে মানুষ সেটুকুও করে না। চোখের জল লুকিয়ে রাখতে হয়, ভালো কাজে একত্র হওয়া মানুষের সঙ্গেও যোগ দেওয়া যায় না। প্রতিটি স্তবকের শেষে ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ কথাটি ফিরে এসে এই সংকোচকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। অন্যের চোখে নিজেকে দেখতে দেখতে মানুষ কতখানি নিজের ইচ্ছা থেকে দূরে সরে যায়, কামিনী রায় এই কবিতায় মানুষের সেই দ্বিধা ও সংকোচের কথা তুলে ধরেছেন।
১৮৬৪ সালের ১২ অক্টোবর তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার বাসণ্ডা গ্রামে কামিনী রায়ের জন্ম। বাবা চণ্ডীচরণ সেন ছিলেন বিচারক ও লেখক। যেসময়ে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত, সেই সময়ে তিনি বেথুন স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৮৮০ সালে এন্ট্রান্স এবং ১৮৮৩ সালে এফ.এ. পাস করার পর ১৮৮৬ সালে বেথুন কলেজ থেকে সংস্কৃতে অনার্সসহ স্নাতক হন। ওই বছরে তিনি সেখানে শিক্ষকতা শুরু করেন। যে কলেজে তিনি পড়াশোনা করেছিলেন, সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করে মেয়েদের শিক্ষায় অবদান রাখেন। সংস্কৃত সাহিত্য পড়ার প্রভাবও তার কবিতার ভাষা ও ভাবনায় প্রকাশ পেয়েছে।
১৮৮৯ সালে প্রকাশিত হয় কামিনী রায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আলো ও ছায়া’। এর ভূমিকা লিখেছিলেন কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। কবিতাগুলোর ভাবের গভীরতা ও ভাষার সরলতায় তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। এই গ্রন্থে ব্যক্তিগত বিষাদের পাশাপাশি মানুষের প্রতি মমতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধও প্রকাশ পেয়েছে। কামিনী রায়ের কাছে নিজের অনুভূতির মূল্য ছিল, তবে মানুষের জীবনকে তিনি কেবল ব্যক্তিগত সুখদুঃখের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখেননি।
‘আলো ও ছায়া’র ‘সুখ’ কবিতায় কামিনী রায় বিষাদের মধ্য দিয়েই জীবনের সার্থকতা খুঁজেছেন। সূচনার প্রশ্নগুলোতে মানুষের জন্ম ও যন্ত্রণার সম্পর্ক নিয়ে সংশয় রয়েছে। পৃথিবী যদি কেবল দুঃখময় হয়, তবে মানুষের বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি সংসারকে সমরাঙ্গনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ‘বীরবেশে’ রণক্ষেত্রে যাওয়ার আহ্বানে দুঃখের মুখোমুখি হওয়ার সাহস প্রকাশ পেয়েছে। তবে এই সংগ্রামে জয়ী হওয়ার অর্থ অন্যকে পরাজিত করা নয়। পরবর্তী স্তবকে নিজের স্বার্থ বিসর্জনের কথা বলে কবি সংগ্রামটিকে মানুষের অন্তরে নিয়ে এসেছেন। আত্মসুখের আকাঙ্ক্ষা অতিক্রম করে অন্যের জন্য নিজেকে নিবেদন করার মধ্যেই তিনি সুখের সম্ভাবনা দেখেছেন।
“আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
আসে নাই কেহ অবনী ’পরে,
সকলের তরে সকলে আমরা,
প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।”
‘আপনারে লয়ে বিব্রত’ কথাটির মধ্যে নিজের সুখদুঃখে আবদ্ধ থাকার ক্লান্তি ধরা পড়ে। সেই আবদ্ধতা থেকে কবিতার ভাষা ধীরে ধীরে ‘আমরা’র কাছে পৌঁছেছে। ‘সকলে’ ও ‘প্রত্যেকে’ শব্দের পাশাপাশি ব্যবহারে সমষ্টির মধ্যে ব্যক্তির দায়িত্বও স্পষ্ট হয়েছে। সকলের মঙ্গল একটি সামগ্রিক আকাঙ্ক্ষা, অথচ তার জন্য কাজ করার দায় প্রত্যেকের। এই উপলব্ধিতে ব্যক্তিগত জীবনের সার্থকতা অন্য মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। কবিতার শুরুতে যে বিষাদ মানুষকে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করতে বাধ্য করেছিল, শেষ পর্যন্ত সেই মানুষই অন্যের জন্য বেঁচে থাকার মধ্যে নিজের প্রয়োজনীয়তা খুঁজে পায়।
একই কাব্যগ্রন্থের ‘দিন চলে যায়’ কবিতায় সময় ফুরিয়ে যাওয়ার অনুভূতি এসেছে। মনের মধ্যে কত আশা জন্ম নেয়, কত আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়ার আগেই মিলিয়ে যায়। দিন তবু চলে যেতে থাকে। ‘পাছে লোকে কিছু বলে’তে যে মানুষ কাজের আগে দ্বিধায় থামে, এই কবিতা পড়তে গিয়ে তার হারিয়ে যাওয়া সময়ের কথাও ভাবা যায়। ‘মা আমার’ কবিতায় আবার ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা মিশেছে। দুঃখিনী দেশকে মায়ের মতো সম্বোধন করে কবি নিজের জীবন নিবেদন করার কথা বলেছেন। একই গ্রন্থে কামিনী রায় মানুষের অন্তরের সংকোচ, সময়ের বেদনা ও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ প্রকাশ করেছেন।
কবিতার পাশাপাশি কামিনী রায় শিশুসাহিত্য, নাট্যকাব্য ও অনুবাদেও তার সাহিত্যপ্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। ‘নির্মাল্য’, ‘পৌরাণিকী’ ও ‘মাল্য ও নির্মাল্য’র সঙ্গে শিশুদের জন্য রচিত ‘গুঞ্জন’ মিলিয়ে পড়লে তার কাব্যচর্চার বিষয় ও পাঠকপরিসরের বৈচিত্র্য বোঝা যায়। ‘অম্বা’য় তিনি নাট্যকাব্যের মাধ্যমে পৌরাণিক চরিত্রের জীবনকে তুলে ধরেছেন, আর ‘ধর্মপুত্র’ অনুবাদে অন্য রচনাকে বাংলা ভাষার পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। ‘অশোকসংগীত’ ও ‘জীবনপথে’র সনেটগুলোতে অনুভূতি প্রকাশের সঙ্গে সংহত কাব্যরূপ নির্মাণের আগ্রহও লক্ষ করা যায়। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি ‘বালিকা শিক্ষার আদর্শ’ গ্রন্থে মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে নিজের ভাবনা প্রকাশ করেছেন। তার রচনাসম্ভারে ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি পৌরাণিক কাহিনি ও নারীশিক্ষা বিষয়ে সামাজিক চিন্তাও প্রকাশ পেয়েছে।
১৮৯৪ সালে কেদারনাথ রায়ের সঙ্গে কামিনী রায়ের বিয়ে হয়। ১৯০৯ সালে স্বামীর মৃত্যু তার জীবনে গভীর শোক নিয়ে আসে। সেই বেদনা তার কবিতাতেও প্রকাশ পেয়েছে। ‘অশোকসংগীত’-এ সন্তান হারানোর শোকের মধ্যে একদিকে রয়েছে ঈশ্বরবিশ্বাস, অন্যদিকে রয়েছে মাতৃহৃদয়ের আকুলতা। ঈশ্বরের দেওয়া ও ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা স্বীকার করেও তিনি সন্তানকে হারানোর দুঃখ মেনে নিতে পারেন না। বিশ্বাসের কাছে সমর্পিত হতে চাইলেও স্মৃতি ও ভালোবাসা তাকে হারানো সন্তানের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এই অন্তর্দ্বন্দ্বে শোকের গভীরতা ধরা পড়ে। অন্যের জন্য জীবন নিবেদনের যে আদর্শ তার কবিতায় রয়েছে, ব্যক্তিগত শোকের কবিতাগুলোয় তার সঙ্গে বিচ্ছেদের অসহনীয় বেদনা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
মেয়েদের শিক্ষা ও সামাজিক অধিকার নিয়ে তার আগ্রহ লেখার বাইরেও বিস্তৃত ছিল। ১৯২২ থেকে ১৯২৩ সালে তিনি নারী শ্রমিক অনুসন্ধান কমিশনের সদস্য ছিলেন। নারীর ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও কামিনী রায় যুক্ত হন। বঙ্গীয় নারী সমাজের কর্মকাণ্ডে তার সঙ্গে ছিলেন কুমুদিনী বসু ও মৃণালিনী সেনসহ অন্য সংগঠকেরা। ১৯২১ সালে বাংলার ব্যবস্থাপক পরিষদে নারীর ভোটাধিকারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। আন্দোলন চলতে থাকে। ১৯২৫ সালে সীমিত নারী ভোটাধিকার অনুমোদিত হলে পরের বছর যোগ্যতাপূরণকারী নারীরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। সকল নারী তখনও এই অধিকার পাননি। তবু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নারীর অংশগ্রহণের দাবি প্রতিষ্ঠার পথে এটি ছিল একটি অগ্রগতি।
সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯২৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে জগত্তারিণী পদক দেয়। ১৯৩০ সালে তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের সাহিত্য বিভাগের সভাপতি এবং ১৯৩২ থেকে ১৯৩৩ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সহসভাপতি ছিলেন। ১৯৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু হয়।
‘দীপ ও ধূপ’ কাব্যগ্রন্থের ‘গীতস্পর্শ’ কবিতায় কামিনী রায় নিজের সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার কথা বলেছেন,
“যশ আমি চাহি নাই, চেয়েছিনু স্নেহ,
চেয়েছিনু একখানি শান্তিভরা গেহ।”
যশের চেয়ে স্নেহ এবং জনসমাগমের চেয়ে শান্ত গৃহের আকাঙ্ক্ষায় তার অন্তর্জীবনের পরিচয় পাওয়া যায়। অন্যের জন্য নিজেকে নিবেদনের কথা বলা কবিও ভালোবাসার আশ্রয় চান। এই চাওয়া তার মানবিক আদর্শকে আরও গভীর করে। মানুষ অন্যকে ভালোবাসা দেয়, আবার নিজেও ভালোবাসা পেতে চায়। নীরবে ছবি রচনা কিংবা গান গাওয়াকে জীবনের ‘দান-প্রতিদান’ বলার মধ্যে সৃষ্টির সঙ্গে এই সম্পর্কের যোগ রয়েছে। কবিতা তার কাছে নিজের অনুভূতি অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এবং সেই আদানপ্রদানে জীবনের পূর্ণতা খোঁজার একটি পথ।#



