চোরাবালি

ষড়ভূজদের কে না চেনে? বাঘা, চুনি, লাল্টু ,ভোকো, কেবো আর নোচো– এই ছয় বন্ধু মিলে বিচ্ছুদের দল ষড়ভূজ। শুরুতে অবশ্য দলটা ষড়ভুজ ছিল না, ছিল পঞ্চভূত। পাঁচজনেই পড়ত একই স্কুলের একই ক্লাসে। ফলে স্কুলতুতো বদমাইশিগুলো ভালোই চলত। কিছু পরে নোচো সেই দলে যোগ দেয়। সে তো নিজেই একটা মহা ওস্তাদ! যত রকম বাঁদরগিরি, উচ্চিংড়েপনা, উদ্ভট কাজ সবেতেই হাতযশ তার। রীতিমতো তারকা বলতে যা বোঝায় আরকি। কাজে কাজেই পঞ্চভূত স্বাভাবিক কারণেই ষড়ভূজে পরিণত হয়। তারপর তো ষড়ভুজের জয়জয়কার। যেখানেই যাক না কেন সবাই একসঙ্গে, একজোট হয়ে। একটু সুযোগ পেলেই অবধারিতভাবে ষড়ভূজের এক একটা নতুন অভিযান পাক্কা । ওদের জ্বালায় পাড়ার লোক একেবারে অতিষ্ঠ। আজ এর বাগান, কাল ওর পুকুর, পরশু অন্য কারও খেত– ষড়ভূজের অভিযান মানেই সব তছনছ, ক্ষয়ক্ষতি! এক্ষেত্রে আগাম সতর্ক হয়েও লাভ নেই। কখন এবং কীভাবে যে ওরা অপকর্ম করে বেরিয়ে যাবে তা বোঝা শিবেরও অসাধ্য।
এহেনও ষড়ভূজ সিদ্ধান্ত নিল, বারবার গ্রামের মধ্যেই অভিযান করায় মজা নেই, এবার নদীর ওপারে গিয়ে কিছু একটা করে আসতে হবে।
যেই ভাবা সেই কাজ। একটা রবিবার দিন ধার্য করা হল। ঠিক হল কোনও একটা ছোট নৌকা আঘাটা থেকে চুরি করে ওপারে যাওয়া হবে। তারপর শুরু হবে সাফাই অভিযান……..
রবিবার সকাল সকাল তৈরি হয়ে বেরল ওরা। কিন্তু নদীর ধারে গিয়ে যখন ওরা উপস্থিত হল তখন নদীকে দেখে তাজ্জব বনে গেল। নদীটা গেল কোথায় ? জল, জলের স্রোত? নদীর বুক জুড়ে শুধু বালি আর বালি! দূরে একটা জায়গায় দিয়ে শুধু তির তির করে সরু জলধারা চলেছে। তাও বড়জোর হাঁটু জল। সুতরাং নৌকা ক্যান্সেল। হেঁটে হেঁটেই নদী পার হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। আর নদীর বুকে বালির উপর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে আর এক মজা। দলদলে নরম বালিতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেই পা দেবে যাচ্ছে । আর পা নড়ানো চড়ানো যাচ্ছে না। কী মজা! এই খেলাটাই মনে ধরল সকলের। প্রথমে গোড়ালি, তারপরে পা, ক্রমশ হাঁটু পর্যন্ত বালির ভেতরে দাবিয়ে ওরা মজা করতে লাগল। হাঁটু পর্যন্ত পা দেবে যাবার পর তো আর নিজে নিজে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়, তখন নানা কসরত করে, অন্যদের টানাটুনিতে, এমনকি শুয়ে পড়ে বুকে হেঁটে বেরিয়ে আসা। আহা! মজার উপরে মজা!
ভালোই চলছিল ছয় বন্ধু মিলে। হঠাৎ একটা অদ্ভুত শব্দ। শব্দটা আসছিল সম্ভবত নদীর বাঁকের ওদিক থেকে। ও দিকটা বাঁকের কারণেই ওরা দেখতে পাচ্ছিল না।
কয়েকটা মুহূর্ত। তারপরেই ওরা পিছন ফিরে দেখল এক মানুষ সমান প্রবল জলরাশি বাঁকটা পেরিয়ে ছুটে আসছে ওদের দিকে। দাবানো পা-গুলো কোনওরকমে বালির বাইরে এনে ওরা প্রাণপনে দৌড়তে লাগল পাড়ের দিকে।
হঠাৎ ওদের খেয়াল হল, নোচো এখন ওদের সঙ্গে নেই। নদীর দিকে ফিরে তাকাতেই ওরা দেখতে পেল এখনো সে বালির মধ্যে হাঁটু দাবিয়ে আটকে আছে, আর তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ওকে এক্ষুনি সাহায্য করা দরকার। না হলে ওখানেই ওই অবস্থাতেই ও মারা পড়বে। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে । এ কথা ভাবতে ভাবতেই বানের জল ওদের পায়ের কাছে এসে পড়ল। লাফিয়ে ডাঙ্গায় উঠে পড়ল ওরা। আর নোচো সেই বিপুল জলরাশির তলায় কোথায় হারিয়ে গেল। চিৎকার করে কাঁদতে লাগল ওরা। একটা তীব্র অপরাধ বোধে সকলেই মনে মনে খুবই কষ্ট পেতে লাগল। সেই সঙ্গে একটা সাংঘাতিক ভয়ও করতে লাগলো ওদের। গ্রামে ফিরে গিয়ে নোচোর বাড়ির লোকেদের প্রশ্নের কী জবাব দেবে ওরা? কী বলবে? ওদের চোখের সামনেই নোচো বানের জলে ভেসে গেল? এসব ভেবে রীতিমতো কুঁকড়ে গেল ওরা। ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে যেতে লাগল। তাই কোন উপায় বের করতে না পেরে শুকনো নদীর হঠাৎ করে ভয়ংকর হয়ে ওঠা স্রোতের দিকে তাকিয়ে নদীর পাড়েই থুম মেরে বসে থাকল ওরা।
বেশ কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ অনেকটা দূরে প্রবল জলের স্রোতের উপরে একটা মাথা যেন দেখতে পেল ওরা। হ্যাঁ, মাথা-ই তো! একটা মানুষের মাথা। তারপরে পুরো শরীরটা। কী আশ্চর্য ব্যাপার! কলস্বরে চিৎকার করে উঠল ওরা,”ওই তো নোচো! নদীর স্রোতের টানে ভেসে চলেছে। আর সাঁতরে পাড়ের দিকে আসার চেষ্টা করছে।”
এবার প্রবল বেগে নদীর পাড় ধরে দৌড়ল ওরা। অনেকক্ষণের চেষ্টায় নোচোও নদীর কিনারে পৌঁছাতে পারল। ওরা পরস্পরের হাতে হাত বেঁধে নদীর কিনার থেকে তুলে আনল নোচোকে।
বেশ কিছুক্ষণ নদীর চড়ায় আচ্ছন্নের মতোই শুয়ে থাকল সে। বন্ধুরা খুব করে করে তার হাত ও পায়ের চেটোতে হাত ঘসে যেতে লাগল। ওরা দেখেছে কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলে এমনটাই করে সকলে। এতেই জ্ঞান ফেরে।
ওদের সেবা শুশ্রূষায় সত্যি সত্যিই কাজ হয়। ধীরে ধীরে উঠে বসে নোচো। তারপর কথাও বলে।
ওকে সুস্থ হয়ে কথা বলতে দেখে সবাই খুব স্বস্তি পায়। সবার মুখে তখন একই প্রশ্ন। সবার হয়ে সেই প্রশ্নটা করে বাঘা-ই —
” আমরা তো ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিলাম রে ভাই। ভেবেছিলাম হয়তো তুই মরেই গেছিস। আচ্ছা, পা দাবানো অবস্থায় অমন উঁচু জলে তোড়ের মধ্যে নিজেকে তুই বাঁচালি কী করে?”
ওদের উৎসুক প্রশ্নের জবাবের সে বলে যে–
“প্রথমে অনেক চেষ্টা করেছিলাম শুয়ে, টান মেরে পা দুটোকে ছাড়িয়ে নেওয়ার। কিন্তু কিছুতেই পা দুটোকে ছাড়াতে পারলাম না। এদিকে বানের জল এসে পড়েছে। তখন উপায়ান্তর না দেখে আমি বুদ্ধি করে জলের প্রবল ধাক্কাকে বুক দিয়ে আগলে চোরাবালি থেকে নিজেকে উদ্ধার করেছি। তারপর তো জলের তোড়ে এতখানি পর্যন্ত ভেসে এলাম।”
সবার চোখে-মুখে স্বস্তি। শেষে বাঘা সরদার বলল,
“যাক, ষড়ভূজ এ যাত্রায় অন্তত অক্ষত রইল! বাব্বা, চোরাবালি নমস্কার!”

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!