বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পে ভাটা বা পৌন

বাংলার মৃৎশিল্প হাজার বছরের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। নদীমাতৃক বাংলার পলিমাটি, কারিগরের দক্ষ হাত এবং আগুনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এই শিল্পের দীর্ঘ ইতিহাস। মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলসি, প্রদীপ, খেলনা, প্রতিমা কিংবা গৃহস্থালির নানা সামগ্রী তৈরির পেছনে যে প্রযুক্তি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তা হলো ভাটা বা পৌন। কাঁচা মাটির তৈজসপত্রকে আগুনে পুড়িয়ে শক্ত, দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যবহারোপযোগী করে তোলার জন্য ভাটার বিকল্প নেই।

বাংলার কুমার বা মৃৎকারিগর সম্প্রদায় শত শত বছর ধরে নিজস্ব জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দেশীয় প্রযুক্তির ভিত্তিতে ভাটা নির্মাণ ও পরিচালনা করে আসছেন। এই জ্ঞান মূলত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মৌখিকভাবে সঞ্চারিত হয়েছে। ফলে ভাটার বিভিন্ন অংশ, নির্মাণপ্রক্রিয়া এবং পোড়ানোর ধাপগুলোকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক সমৃদ্ধ কারিগরি শব্দভাণ্ডার, যার অনেক শব্দই কেবল মৃৎকারিগর সমাজের ভেতরেই প্রচলিত।

পোড়ানোর আগে মৃৎপণ্য ধাপে ধাপে চুল্লিতে সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো হয়। ছবিতে সেই প্রক্রিয়া চলছে।

বাংলার ঐতিহ্যবাহী ভাটার প্রকারভেদ:
ভৌগোলিক অবস্থান, উৎপাদনের পরিমাণ, জ্বালানির প্রাপ্যতা এবং স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ভাটার গঠন ও আকারে ভিন্নতা দেখা যায়। সাধারণভাবে ধনুকাকৃতি, গোলাকৃতি এবং দেয়ালআকৃতি— এই তিন ধরনের পৌন বেশি দেখা যায়। প্রতিটি ভাটার নির্মাণশৈলী আলাদা হলেও মূল উদ্দেশ্য একই— কাঁচা মাটির পাত্রকে আগুনে পুড়িয়ে ব্যবহারোপযোগী করে তোলা।

ভাটা বা পৌনের কাঠামো ও স্থানীয় পরিভাষা:
একটি পূর্ণাঙ্গ পৌনের গঠনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে। ভাটার মাঝখানের ফাঁকা বা ফুটো অংশকে বলা হয় ‘জাঁত’। জাঁত সাধারণত দুই ধরনের— ‘জোড়জাঁত’ এবং ‘টোপর জাঁত’।

জাঁতের সঙ্গে যুক্ত থাকে ‘পায়া’ বা পা, যার ভেতর দিয়ে আগুন প্রবেশ করে। পায়ার পেছনের ফাঁকা অংশকে বলা হয় ‘আবলা’। ইট বা হাঁড়ি দিয়ে সাজানো অংশের ওপরের তলাকে বলা হয় ‘বাটা’ এবং পৌনের দেয়ালঘেরা ওপরের অংশকে বলা হয় ‘কাঁথি’।

চুল্লিতে সুশৃঙ্খলভাবে সাজানোর পর মৃৎপণ্য কাদামাটির প্রলেপ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।

ভাটার ভেতরে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত খড়ি বা লাকড়িকে বলা হয় ‘পাড়ন’ অথবা ‘ভর্ণা’। জাঁতের নিচে যেখানে ছাই জমা হয়, সেই অংশকে বলা হয় ‘মৌলেগাঁড়া’ বা ছাইঘর। যে মুখ দিয়ে আগুন দেওয়া হয়, তাকে বলা হয় ‘মুহ্যান’। কোনো কোনো ভাটায় একাধিক মুহ্যানও থাকতে পারে।

সাধারণত বাঁশের খুঁটি, মাটির দেয়াল, খড়, টালি কিংবা ঢেউটিন দিয়ে ভাটার চাল বা ছাউনি তৈরি করা হয়। এটি ভাটাকে বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করে এবং পোড়ানোর কাজ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে সাহায্য করে।

মাটির পাত্র সাজানো ও ভাটা প্রস্তুতকরণ:
মাটির পাত্র পোড়ানোর আগে ভাটার ভেতরে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মাল সাজানো হয়। এই কাজের ওপর পোড়ানোর সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে। ভাটার ভেতরে তাপ সঠিকভাবে সঞ্চালিত না হলে পাত্র ফেটে যেতে পারে অথবা সমানভাবে পোড়ানো সম্ভব হয় না।

মাল সাজানো শেষ হলে প্রথমে খড়, কচুরিপানা কিংবা অনুরূপ উপাদান দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ছাওয়া’। এরপর ছাওয়ার ওপর পাতলা মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়, যাকে বলা হয় ‘লেপ’। ভাটার একেবারে পেছনের দিকে ধোঁয়া বের হওয়ার যে পথ থাকে, তাকে বলা হয় ‘গালা’।

সাঁতা, আউট ও হাতনা: কারিগরদের ভাষায় পোড়ানোর পর্যায়:
পোড়ানোর সময় ধীরে ধীরে ভাটার তাপমাত্রা বাড়ানো হয়। নির্দিষ্ট মাত্রায় উত্তাপ দেওয়ার সময়কালকে বলা হয় ‘সাঁতা’। অভিজ্ঞ মৃৎকারিগরেরা ভাটার ভেতরের অবস্থা দেখে সাঁতার অগ্রগতি বুঝতে পারেন। পায়ার কালচে ভাব কেটে গিয়ে টোপর জাঁতে সাদা ছাই দেখা দিলে সাঁতা সম্পন্ন হয়েছে বলে ধরা হয়।

পোড়ানোর একপর্যায়ে ভাটার ভেতরের আগুন অত্যন্ত তীব্র হয়ে ওঠে। আগুনের শিখা ও তাপের তীব্রতা বিশেষ একটি অবস্থায় পৌঁছালে মৃৎকারিগরেরা সেই পর্যায়কে ‘আউট’ বলে অভিহিত করেন। ভালো মানের মৃৎপণ্য উৎপাদনের জন্য এই পর্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পোড়ানোর সময় দীর্ঘক্ষণ ধরে ঢিমে আঁচে ভাটাকে সচল রাখতে হয়। মৃৎকারিগরদের ভাষায় এই ধাপকে বলা হয় ‘হাতনা’। একটি বড় ভাটার ক্ষেত্রে হাতনা প্রায় পুরো একদিন বা তারও বেশি সময় ধরে চলতে পারে।

প্রায় পাঁচ মণ জ্বালানি কাঠ পোড়ানোর পর ভেতরের কাঠ আরও প্রায় চার ঘণ্টা জ্বলে। এরপর সারারাত চুল্লি ঠান্ডা হয়। পরদিন সকালে চুল্লি থেকে মৃৎপণ্য নামানো হয়।

লাল ও কালো পাত্র তৈরির কৌশল:
মাটির পাত্র সাধারণত লাল এবং কালো— এই দুই রঙে পোড়ানো যায়। কালো রঙের পাত্র তৈরি করতে তুলনামূলক বেশি দক্ষতা ও শ্রমের প্রয়োজন হয়। কারণ এ ক্ষেত্রে পোড়ানোর সময় বাতাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

অন্যদিকে লাল রঙের পাত্র তৈরির জন্য পোড়ানোর শেষ পর্যায়ে শুকনো মাটির প্রলেপে ছোট ছোট ছিদ্র করা হয়, যাতে বাতাস প্রবেশ করতে পারে। বাতাসের প্রবাহের ফলে পাত্রগুলো সমানভাবে লাল রঙ ধারণ করে।

জ্বালানি, শ্রম ও সময়:
একটি মাঝারি আকারের ভাটায় প্রায় পাঁচ মণ লাকড়ি ব্যবহার হতে পারে। জ্বালানি দেওয়া শেষ হওয়ার পরও ভাটার ভেতরের লাকড়ি ও অঙ্গার আরও কয়েক ঘণ্টা ধরে জ্বলতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি জ্বালানি প্রয়োগ বন্ধ হওয়ার পরও প্রায় চার ঘণ্টা পর্যন্ত পোড়ানোর প্রক্রিয়া চলতে থাকে।
এরপর ভাটা ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হয়। সাধারণত সারারাত অপেক্ষা করার পর পরদিন সকালে ভাটার মুখ খুলে প্রস্তুত মৃৎপণ্য বের করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় মৃৎকারিগরের অভিজ্ঞতা, ধৈর্য ও দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পোড়ানোর শেষ পর্যায়ে চুল্লির মাটির প্রলেপে ছিদ্র করা হয়, যাতে তাপ সমভাবে ছড়িয়ে মৃৎপণ্য ভালোভাবে পুড়ে।

আধুনিক চুল্লি ও ঐতিহ্যবাহী ভাটার পার্থক্য:
বর্তমানে বাংলাদেশে মাটির জিনিসপত্র পোড়ানোর জন্য প্রধানত তিন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়— ম্যানুয়াল বা কাঠচালিত ভাটা, গ্যাসচালিত ভাটা এবং বৈদ্যুতিক ভাটা।

তবে দেশের অধিকাংশ মৃৎকারিগর এখনো ঐতিহ্যবাহী ম্যানুয়াল পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। এই পদ্ধতিতে প্রথমে পাত্রগুলো সযত্নে সাজিয়ে খড়কুটা, মাটির প্রলেপ এবং ‘সন’ দিয়ে ঢেকে আগুন ধরানো হয়। ধোঁয়া উঠতে শুরু করলে এবং বাইরের অংশ গরম হয়ে এলে দ্বিতীয় দফায় আবার কাদামাটি দিয়ে হাতে লেপ দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ সময় ধরে ঢিমে আঁচে পোড়ানোর কাজ।

গ্যাস ও বৈদ্যুতিক ভাটায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক সহজ এবং সময়ও কম লাগে। তবে এসব প্রযুক্তি স্থাপন ও পরিচালনার ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় বাংলাদেশের অধিকাংশ মৃৎকারিগরের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।

পোড়ানো শেষে চুল্লি থেকে মৃৎপণ্য নামানো হচ্ছে।

বাংলাদেশের মৃৎশিল্পের বর্তমান সংকট:
বাংলাদেশের মৃৎশিল্প বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল এবং শিল্পোৎপাদিত পণ্যের প্রসারের ফলে মাটির তৈজসপত্রের ব্যবহার কমে এসেছে। একই সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, দক্ষ শ্রমিকের সংকট এবং নতুন প্রজন্মের পেশা পরিবর্তনের প্রবণতা এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে আরও সংকুচিত করছে।

অনেক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করা পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। এর ফলে শুধু একটি পেশাই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু প্রজন্মের কারিগরি জ্ঞানও হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

ভাটা বা পৌন বাংলার লোকপ্রযুক্তি, কারিগরি জ্ঞান এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাঁত, পায়া, আবলা, মুহ্যান, মৌলেগাঁড়া, সাঁতা, আউট কিংবা হাতনার মতো পরিভাষাগুলো মৃৎকারিগরদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফসল এবং বাংলার লোকজ প্রযুক্তিগত জ্ঞানের মূল্যবান সম্পদ।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ ঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে মৃৎশিল্পের এই দীর্ঘ ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আরও শক্তভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বাংলার মৃৎশিল্প দেশীয় সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ পরিচায়ক হিসেবে নতুন সম্ভাবনার দ্বারও উন্মোচন করতে পারবে।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!