৫ মার্চ ১৯৭১: জয় বাংলার জয়

ক্ষমতার দুর্গ নয়, জনগণই যে দেশের সত্যিকার শক্তির উৎস—বাংলাদেশের বিগত চারদিনের ঘটনাবলী নিঃসন্দেহে প্রমাণিত। একাত্তরের উত্তাল মার্চে ৫ তারিখটি ছিল সংগ্রামী জনতার ঐক্য ও প্রত্যয়ের এক উজ্জ্বল দিন। সেদিন দৈনিক দৈনিক ইত্তেফাক-এর ব্যানার হেডলাইন ছিল—‘জয় বাংলার’ জয়। পত্রিকায় প্রকাশিত শেখ মুজিবুর রহমান-এর এক বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলার মানুষের দুর্জয় আন্দোলন পশ্চিম পাকিস্তানেও নতুন করে চিন্তা-ভাবনার জন্ম দিয়েছে। সংগ্রামী জনতার প্রতি নেতার অভিনন্দন জানিয়ে তিনি আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল রাখার আহ্বান জানান।

সন্ধ্যায় সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়, ঢাকায় মোতায়েনকৃত সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে হরতালের পর সীমিত পরিসরে ব্যাংক খোলা থাকবে, যাতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয়। ঢাকাসহ সারাদেশে প্রতিবাদ সভা ও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। কবি, সাহিত্যিক ও শিক্ষকরা বিকেলে মিছিল নিয়ে রাজপথে নামেন। শহীদ মিনারে আহমদ শরীফের নেতৃত্বে এক সভায় স্বাধীনতার শপথ উচ্চারিত হয়। ছাত্রলীগের উদ্যোগে ঢাকায় লাঠি মিছিলও বের হয়, যা জনতার প্রতিরোধস্পৃহাকে আরও দৃঢ় করে।

এই দিনেই টঙ্গীতে সেনাবাহিনীর গুলিতে চারজন নিহত ও ১৪ জন শ্রমিক আহত হন। দেশের বিভিন্ন জেলায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়, যা ছিল আসন্ন মুক্তিযুদ্ধের এক সুস্পষ্ট পূর্বাভাস। আন্দোলনে নিহতদের গায়েবানা জানাজা লাহোরেও অনুষ্ঠিত হয়, যা ব্যাপকভাবে পরিস্থিতির গভীরতাও ইঙ্গিত দেয়।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও দিনটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান-এর সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে পিপলস পার্টির মুখপাত্র আবদুল হাফিজ পীরজাদা মন্তব্য করেন, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া অবাঞ্ছিত। অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল আসগর খান করাচি থেকে ঢাকায় এসে রাতে ধানমণ্ডির বাসভবনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

এ সময় ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমদ ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দান থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করতে ঢাকা বেতারের প্রতি আহ্বান জানান। একই রাতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ এক বিবৃতিতে জানান, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনীর গুলিতে নিরীহ মানুষ নিহত হচ্ছে। তিনি এই হত্যাকাণ্ডকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

৫ মার্চ ১৯৭১ ছিল এক অনিবার্য পরিণতির দিকে এগিয়ে চলা জাতির দৃঢ় সংকল্পের দিন। সেদিন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তির কাছে দমননীতি টিকতে পারে না। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার অদম্য প্রত্যয়ের প্রতীক।#

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on print
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!