১৯৭১ সালের ৬ অক্টোবর রাতে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার আঙ্গুলকাটা ও সংলগ্ন এলাকায় স্থানীয় রাজাকার বাহিনী হিন্দু বাঙালিদের বাড়িতে হামলা চালায়। লুটপাট ও নির্যাতনের পাশাপাশি বিভিন্ন বাড়ি থেকে ৩৭ জনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের মধ্যে সাতজনকে আলাদা করে আটকে রাখা হয়। বাকি ৩০ জনকে সূর্যমণি গ্রামের ওয়াপদা বেড়িবাঁধ এলাকায় নিয়ে গুলি করা হয়। ৬ অক্টোবর রাতে শুরু হয়ে ৭ অক্টোবর সকাল পর্যন্ত সংঘটিত এই হত্যাযজ্ঞ সূর্যমণি গণহত্যা নামে পরিচিত।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মঠবাড়িয়া তৎকালীন বরিশাল জেলার পিরোজপুর মহকুমার অন্তর্গত ছিল। সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী সক্রিয় ছিল। মঠবাড়িয়া থানা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন আবদুল জব্বার ইঞ্জিনিয়ার। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে উঠে এসেছে, তার পরিকল্পনা ও নির্দেশে রাজাকার কমান্ডার ইসকান্দার মৃধার নেতৃত্বে আঙ্গুলকাটা ও মঠবাড়িয়া গ্রামের হিন্দু বাসিন্দাদের ওপর অভিযান চালানো হয়।
আঙ্গুলকাটা গ্রামের বাসিন্দা ও মুক্তিযোদ্ধা সুনীল মিত্রের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন রাজাকার তাদের বাড়িতে হামলা করে। তাদের বাড়িতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হতো এবং মুক্তিকামী মানুষ সেখানে সমবেত হতেন। হামলাকারীরা বাড়িতে লুটপাট চালায়, নারীদের মারধর করে এবং সুনীল মিত্র, তার বাবা ও ছোট ভাইসহ অন্যদের ধরে নিয়ে যায়।
তাদের বাড়িতে পৌঁছানোর আগে রাজাকাররা এলাকার আরও কয়েকটি বাড়িতে অভিযান চালিয়েছিল। মাঝি, বালা, হাওলাদার, হালদার ও কীর্তনীয়া পরিবারের সদস্যদের ধরে পিছমোড়া করে বেঁধে রাস্তার ওপর রাখা হয়। আটক ব্যক্তিদের পাহারায় রাজাকারদের দাঁড় করিয়ে রেখে দলটি পরবর্তী বাড়িতে হামলা চালাতে থাকে। এভাবে একের পর এক বাড়ি থেকে মানুষ ধরে এনে একত্র করা হয়।
আটক ব্যক্তিদের রাতে মঠবাড়িয়া শহরের বর্তমান পৌরসভার শহীদ মিনারের কাছাকাছি রাস্তার ওপর বসিয়ে রাখা হয়। সুনীল মিত্রের ছোট ভাই শৈলেন নাথ মিত্র তখন কে এম লতিফ ইনস্টিটিউটের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। বড় ভাইয়ের পাশে বসে সে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল, তাদের সবাইকে মেরে ফেলা হবে। সেই আশঙ্কাই তার জীবনে সত্য হয়ে আসে। সুনীল মিত্র পরে বাড়ি ফিরলেও শৈলেন আর ফিরে আসেনি।
রাজাকারদের মধ্যে থাকা পরিচিত একজন সুনীল মিত্রকে চিনতে পারে। পরে তাকে ও তার বাবাসহ সাতজনকে আলাদা করে থানার সামনে ওয়াপদার একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। অন্যদের থানায় নেওয়ার কথা বলে সূর্যমণি বেড়িবাঁধের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি চালানো হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে অনেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। কয়েকজন আহত অবস্থায় প্রাণে বেঁচে যান।
পরদিন সকালে সুনীল মিত্র রাজাকারদের কাছ থেকেই হত্যাকাণ্ডের খবর পান। তার ছোট ভাইসহ আটক স্বজনদের অনেকে তখন নিহত হয়েছেন। সুনীল মিত্র ও তার বাবাকে দুদিন পর চার হাজার টাকার বিনিময়ে ছাড়িয়ে আনা হয়।
এই অভিযানে হালদার পরিবারেরও একাধিক সদস্যকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালে দেওয়া বকুলী রানী হালদারের সাক্ষ্য অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর মধ্যরাতে রাজাকাররা তাদের বাড়িতে হামলা করে লুটপাট চালায়। তার শ্বশুর মধুসূদন হালদার ও স্বামীর বড় ভাই প্রিয়নাথ হালদারকে আটক করা হয়। কেন তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে রাজাকাররা আবদুল জব্বার ইঞ্জিনিয়ারের নির্দেশের কথা বলে। পরদিন সকালে বকুলী রানী তাদের হত্যার খবর পান। গুলিবিদ্ধ হয়ে বেঁচে যাওয়া সন্তোষ কুমার মিত্রও নিজের আটক হওয়ার এবং বাবা ও ভাইকে হারানোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
ট্রাইব্যুনালের রায় ও সুনীল মিত্রের স্মৃতিচারণে ২২ জন নিহত এবং আটজন গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা থাকলেও স্থানীয় বিবরণে ২৫ জন নিহত ও পাঁচজন বেঁচে যাওয়ার কথা পাওয়া যায়। কিছু পুরোনো সূত্রে নিহতের সংখ্যা ২৪ জনও বলা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রায় অনুযায়ী, ঘটনাটি ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে ৭ অক্টোবর সকালের মধ্যে সংঘটিত হয়।
সূর্যমণি গণহত্যায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। বেঁচে যাওয়া মানুষেরা সেই রাতের ভয়, স্বজনদের ধরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য এবং পরদিন মৃত্যুর খবর পাওয়ার স্মৃতি বহন করেছেন। এই স্মৃতির মধ্যেই রয়ে গেছে নিহত মানুষদের জীবন এবং স্বজন হারানো পরিবারগুলোর দীর্ঘ শোকের ইতিহাস।




