লোকটাকে দেখে একেবারে ভক্তি হল না রিঙ্কুর। গায়ে একটা সাদা হাফ শার্ট। শার্টটায় অসংখ্য ভাঁজ পড়া। দেখে মনে হয় কোনও কালেও ইস্তিরি করা হয়নি। পাজামার অবস্থা তো আরও খারাপ! মনে হয় ফেলে দেওয়া কাপড় কুড়ুনির কাছ থেকে বিনে পয়সায় চেয়ে নেওয়া হয়েছে। আর নামেরও কী ছিরি, দেবু! এই পাগল পাগল ভিখিরি গোছের লোকটা নাকি বাবার বন্ধু! কোনও মানে হয়? স্ট্যান্ডার্ড বলে কি কোনও কথা নেই! সেটা মেইনটেইন করতে হবে না! বাবাটা যেন কেমন। যতসব ভুলভাল লোককে না বুঝেই এলাও করে দেয়। যাচ্ছেতাই ব্যাপার একটা…
কিন্তু কী আর করা যাবে? বাবার বন্ধু বলে যখন পরিচয় দিয়েছে, তখন দরজা খুলে ভরসা করে বসতে দেওয়াটাই ভদ্রতা। কিন্তু মনে মনে সে ভীষণ বিরক্তই। কত ভালো ভালো লোকের সঙ্গে তার বাবার বন্ধুত্ব। কত বড় বড় শিল্পী, সাহিত্যিক। তারা কী সুন্দর করে কথা বলে, তার জন্য ভালো ভালো গিফ্ট আনে। স্কুলে গিয়ে তাদের কথা ফলাও করে বলে রিঙ্কু নিজের প্রেস্টিজ বাড়িয়ে নেয়।
লোকটা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। তারপর সোফার উপরে আলতো করে শরীরটা এলিয়ে দেয়। যেন কোনও তাড়া বা কাজকর্ম নেই তার। ভাবটা এমন যে যেন এমনি করে অনন্তকাল বসে থাকতেও তার কোনও আপত্তি নেই।
রিঙ্কু ভাবে, সত্যিই ইনি যেন কেমন কেমন। যেমন উস্কোখুস্কো চুল-দাড়ি, তেমনই পোশাক-আশাক। বাবা যে কেন এইসব যার-তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, আবার আদর করে তাদের বাড়িতে আসতে বলে, কিছুতেই বুঝতে পারে না সে। মনে মনে ভাবে, বাড়িতে এলে এ নিয়ে বাবাকে বেশ করে কথা শুনিয়ে দেবে।
লোকটা নির্বিকারভাবে সোফায় বসে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। কিছু একটা অজুহাত দিয়ে যে রিঙ্কু বাড়ির ভেতরে চলে যাবে, তার উপায়ও নেই। কারণ এই মুহূর্তে বাড়িতে সে ছাড়া আর কেউ নেই। বলছে বটে লোকটা বাবার বন্ধু, যদি না হয়? যদি কিছু চুরি-চামারি করে চম্পট দেয়? তাই লোকটাকে চোখে চোখেও রাখা দরকার। নিরুপায় হয়ে লোকটার উল্টোদিকে চেয়ারে বসে পড়ে সে।
“তোমার নাম রিঙ্কু তো?”
আশ্চর্য হয় রিঙ্কু। লোকটা তার নাম জানে! পরক্ষণেই ভাবে, হয়তো বাবা বলেছে লোকটাকে। সে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ায়।
লোকটা আবার কথা বলে,
“তোমার বিজ্ঞান কেমন লাগে খুকু?”
“ভালোই তো লাগে। আমি তো ক্লাসে ফার্স্ট হই, বিজ্ঞান বিভাগের সব বিষয়ে আমার হায়েস্ট নাম্বার থাকে।”
“বাহ্! খুব ভালো। তা বড় হয়ে তুমি কী হতে চাও?”
“আমি বড় হয়ে মিসাইল ম্যানের মতো বিজ্ঞানী হতে চাই। মিসাইল ম্যানকে চেনেন তো?”
“আমি মানে ওই আরকি… আচ্ছা, মিসাইল ম্যানকে তুমি চেনো নাকি?”
“সে কী কথা! মিসাইল ম্যানকে কে না চেনে? মিসাইল ম্যান হল আমাদের রাষ্ট্রপতি, পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানী ড. এ পি জে আব্দুল কালাম, আপনি জানেন না?”
লোকটার অজ্ঞতায় রিঙ্কু অবাক হয়ে যায়। সে নিজে একটা বাচ্চা মেয়ে হয়ে যা জানে, এত বড় লোক হয়েও লোকটা তো জানে না!
লোকটা এবার মুচকি হেসে বলে,
“শোনো খুকু, মিসাইল ম্যান ড. এ পি জে আবদুল কালামকে সকলেই চেনে। কিন্তু আমি এটুকু বলতে পারি, তিনিও আমাকে বিলক্ষণ চেনেন।”
“কী যা-তা বলছেন! মিসাইল ম্যান দেশের রাষ্ট্রপতি, চিনবেন আপনাকে? আপনার মতন এমন একজন…”
“বোকাসোকা বাউন্ডুলেকে? তাই তো?”
“না না, আমি কিন্তু তা বলিনি।” এবার আমতা আমতা করে রিঙ্কু। সত্যি কথাটা ফাঁস করে দিচ্ছে যে!
“বলোনি, কিন্তু ভেবেছো তো নিশ্চয়।”
“না না, মানে, ইয়ে আরকি…”
“শোনো, আমি যা বলেছি তার একটি কথাও মিথ্যে নয়। সত্যিই মিসাইল ম্যান অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি ড. এ পি জে আবদুল কালাম সাহেব আমার খুব কাছের মানুষ। কারণ, আমরা দু’জনই একই মিসাইল গবেষণার অংশীদার কিনা। দীর্ঘদিন ধরেই একসঙ্গে কাজ করে চলেছি আমরা। সেই কারণে খুব কাছের বন্ধুও।”
রিঙ্কুর গালে মাছি ঢুকে যাওয়ার অবস্থা। তার বাবা তাকে তবে এনার গল্পই করেছিল। শুধুমাত্র দেশের সেবা করবেন বলে নাসার ব্ল্যাংক চেক ফিরিয়ে দেওয়া ইনিই সেই ভারত বিখ্যাত বিজ্ঞানী ড. দেবাশিস চক্রবর্তী, মিসাইল ম্যানের বন্ধু!




