আপামর বাঙালির জীবনে, সংস্কৃতিক ভুবনে পঁচিশে বৈশাখ ও বাইশে শ্রাবণ এই দিন দুটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সবাই জানি গ্রীষ্মের এক তপ্ত দিনে বাঙালির সাহিত্য সংস্কৃতির জগতকে আলোকময় করার জন্য এই পৃথিবীর ধূলিকণায় ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন আমাদের চিরকালীন মানসিক আশ্রয়দাতা রবীন্দ্রনাথ। বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতি জগতকে এক মহান উচ্চতায় তিনি যেমন বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছিলেন তেমনি বাঙালিকেও তিনি বিশ্বের দরবারে উপস্থিত করেন তাঁর অপার মহিমা ও উজ্জ্বলতায়। তিনি এতটাই তাঁর কর্মকাণ্ড দিয়ে আমাদের সাংস্কৃতিক জগতকে উন্নত করে তুলেছিলেন যে তিনি নিজেও সবিশেষভাবে সে ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন এবং উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলেই তিনি লিখতে পেরেছিলেন,
“আজি হতে শতবর্ষ পরে
কে তুমি পড়িছ বসে আমার কবিতাখানি
কৌতুহল ভরে—
আজি হতে শতবর্ষ পরে।”
সত্যিই তো আমরা এখনো অসীম কৌতুহল নিয়ে তাঁর কবিতা পাঠ করি তাঁর কবিতা পাঠ করে আমরা আনন্দ অনুভব করি, মানসিক বিষাদে তাঁর কবিতা ও গানকেই আমরা আশ্রয় করি। তিনি নিশ্চিত জানতেন যে তাঁর গান বাঙালির জীবনে চিরস্থায়ী হবে। শুধু গান নয় তাঁর কবিতা ও চিরকালীন হয়ে গেছে। সত্যি তিনি আমাদের কাছে এক পরম বিস্ময়। এই বিস্ময়কর প্রতিভা তাঁর ইহজাগতিক বিপুল কর্মকাণ্ড সাঙ্গ করে ‘মন কেমন করা’ এক শ্রাবণের বাইশ তারিখে অমৃত লোক যাত্রা করেন।
আমাদের হৃদয়ে নামলো শ্রাবণের ধারার মতন এক অসহনীয় বেদনার ধারা। মেনে নিতে হয়। মেনেও নিয়েছি। কিন্তু তিনি তো অহরহ আমাদের মধ্যেই আছেন। ভীষণভাবে আছেন। অনেক জীবিত মানুষের থেকেও বেশি জীবিত হয়ে আমাদের জীবন যাপনে পথনির্দেশ করে চলেছেন অহরহ। রবীন্দ্রনাথের কাছে মৃত্যু ছিল যাওয়া এবং ফিরে আসা। একটা সচল প্রক্রিয়া। তাইতো তিনি তাঁর গানের বাণীতে লেখেন,
“যেদিন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে
আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে,
চুকিয়ে দেব বেচাকেনা,
মিটিয়ে দেব গো, মিটিয়ে দেব লেনা দেনা
বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে –“
কিন্তু তিনি জানেন–এ যাওয়াই শেষ যাওয়া নয়। এই শুধু পরিবর্তন। এক জীবন থেকে জীবান্তরে। আবার ফিরে আসা। তাঁর কাছে জন্ম এবং মৃত্যুর মধ্যে ফারাক মাত্র দুটি ঘরের একটি দরজা। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাওয়া। তাইতো তিনি একই গানের শেষ পঙক্তিতে এসে বলেন,
“তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি।
সকল খেলায় করবে খেলা এই আমি–আহা,
নতুন নামে ডাকবে মোরে, বাঁধবে নতুন বাহুডোরে,
আসব যাব চিরদিনের সেই আমি।
তখন আমায় নাই বা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাই বা আমায় ডাকলে।”
তিনি নিশ্চিত একটি বাইশে শ্রাবণ তাঁর সমস্ত অস্তিত্বের শেষ কথা নয়। এখানে রবীন্দ্রনাথের জীবন ও মৃত্যু চেতনার এক গভীর তাত্ত্বিকতা আমাদের কাছে প্রতিভাত হয়ে ওঠে। জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে আমরা সচেতন হয়ে উঠি।
জীবনে তিনি অনেক স্বজন বিয়োগের যন্ত্রণা ভোগ করেছেন। ফলে মৃত্যু সম্পর্কে তাঁর মধ্যে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বোধ ও চেতনা কাজ করেছে। তবুও তিনিই লেখেন,
“মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে”
এই উচ্চারণের মধ্যেই নিহিত আছে রবীন্দ্রনাথের কবিমানস। তিনি জীবন ও জগতকে উপলব্ধি করেছেন স্রষ্টার দৃষ্টিতে। জীবনে বন্ধু, আত্মীয় ,স্বজনের মৃত্যু তাঁকে প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে বারবার, সহ্য করতে হয়েছে তীব্র অন্তর্দহন। কিন্তু তার জন্য তিনি প্রভূত মানসিক আঘাত পেলেও বিচলিত হয়ে ওঠেননি কখনো। সেই কারণেই তিনি আপাত ভয়ানক মৃত্যুকে “শ্যাম সমান” মনে করতে পারেন। একজন দার্শনিক ও বিরাট পুরুষই পারেন একথা বলতে। মৃত্যুকে তিনি কখনোই একটা জীবনের শেষ ভাবেননি, ভেবেছেন উত্তরণ।
প্রচন্ড খরতাপের বৈশাখে যাঁর আগমন তিনি তৃপ্ত হওয়ার জন্য বৃষ্টির প্রার্থনা তো করবেনই। এই বৃষ্টি তো তাঁর আকাঙ্ক্ষিত। এই বৃষ্টির মধ্যেই তো নবজীবনের অঙ্কুরোদগম হয়। তাই বোধহয় তাঁর প্রিয় ঋতু ছিল বর্ষাকাল। তিনি বর্ষার রূপ ও সৌন্দর্যে বিভোর হয়েছেন। বর্ষার ঘন মেঘ এবং অঝোর ধারা তাঁকে সন্দীপ্ত করে। বৃষ্টি সৃষ্টির পথ দেখায়। এবং আশ্চর্যজনকভাবে এক সমাপতন ঘটে যায়। তাঁর এই প্রিয় ঋতুতেই সাঙ্গ হয় তাঁর ইহজাগতিক জীবন। মৃত্যুকে তিনি চিনেছেন অত্যন্ত কাছ থেকে। তাই নিজের শেষ দিন যে সমাগত তা বুঝতে তাঁর বিন্দুমাত্র বিলম্ব হয়নি।
গবেষিকা ডঃ হেনা সিনহা লেখেন, “জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে যখন কবি মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন, অসুস্থতার মৃত্যুদূতীর আগমন প্রত্যক্ষ করছেন তখন তাঁর মৃত্যু সম্পর্কিত অনুভব হচ্ছে তীব্র ও তীক্ষ্ণ। একদম শেষ পর্যায়ের চারটি কাব্যগ্রন্থের ( রোগশয্যায়, আরোগ্য, জন্মদিনে, শেষ লেখা) কবিতা গুলিতে মৃত্যুকে তিনি দেখেছেন আত্মার বিকাশ রূপে। আর ‘প্রান্তিক’ কাব্যগ্রন্থে তাঁর ব্যক্তিক মৃত্যু অনুভব অন্যতর জীবনের সন্ধান দিচ্ছে। শীতের পরে আসে বসন্ত, মৃত্যুকেও কবি দেখেছেন বসন্তের পুর্বভাস রূপে। ‘ মহুয়া’ কাব্যের বোধন কবিতায় এই প্রকৃতি অনুষঙ্গকেই মৃত্যুর নবতর জীবন বলে আমরা মনে করতে পারি, কেননা কবি বিশ্বাস করেন মৃত্যুতে জীবনের অবসান হয় না। কবি চেতনায় মৃত্যু হল জীবন থেকে জীবান্তরে যাবার একটা রাস্তা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কবি এই বিশ্বাসে স্থির হয়েছেন। তাই প্রান্তিক কাব্যের ৭ সংখ্যক কবিতায় আমরা শুনি সেই মৃত্যু উত্তীর্ণ জীবনের গান–
“আজি বিদায়ের বেলা
স্বীকার করিব তারে সে আমার বিপুল বিস্ময়।
গাব আমি এ জীবন অস্তিত্বের সারথি আমার,
বহু রণক্ষেত্র তুমি করিয়াছ পার,আজি লয়ে যাও
মৃত্যুর সংগ্রাম শেষে নবতর বিজয় যাত্রায়।”
শুধু মাত্র নিজে নন। তিনি তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানব জাতিকে দিয়ে গেলেন এক নবযাত্রার দিক নির্দেশনা বা জীবনের এক গূঢ় দীক্ষা। তাই বাইশে শ্রাবণ আমার কাছে কোনো বেদনার স্মৃতির থেকেও বেশি হয়ে ওঠে এক নবযাত্রার দিক নির্দেশনা। এই চেতনা তো তাঁরই দান!#




