জনশ্রুতি রয়েছে যে, রামমোহন রায়ের সহধর্মিণী উমা দেবী একবার নাকি তাঁকে—‘ওগো, বলো তো জগতে কোন ধর্মটি সত্য?’—এই প্রশ্ন করলে তিনি হেসে উঠে তাঁকে জবাব দিয়েছিলেন— “গরু তো নানা বর্ণের। কোনটার রঙ কালো, কোনটার সাদা। কিন্তু তাহাদের দুগ্ধ একই বর্ণের। তেমনি সাম্প্রদায়িক ধর্ম নানা প্রকার, কিন্তু তাহাদের মধ্যে যা সত্য, তা একই!”
রামমোহন রায়ের ধর্মীয় জীবনের সঙ্গে পরিচিত প্রায় সকলেই অবগত রয়েছেন যে, তিনি একজন বৈদান্তিক ব্রহ্মবাদী ছিলেন; আর অসাম্প্রদায়িক, উদার ও সার্বভৌম উপাসনার ভিত্তিতেই তিনি একটি অদ্বৈত ধর্মমতের ব্যবস্থাপনা করেছিলেন। এমনকি মহানির্বাণ তন্ত্রকে স্বীকার করে নিলেও তিনি একইসাথে পরম বৈষ্ণব শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকেও সম্মান জানিয়েছিলেন। এবং ধর্মের বিষয়ে তাঁর মনের বৃত্তিসমূহের মধ্যে উদার সামঞ্জস্য ছিল বলেই তিনি যীশু, মহাপ্রভু ও মহম্মদ—এই তিন পরম পুরুষকেই সমানভাবে ভক্তি করতে পেরেছিলেন। আজও রামমোহন রায় রচিত শাস্ত্রীয়গ্রন্থগুলিতে তাঁর বিদ্যা, বুদ্ধি, তর্কশক্তি ও শাস্ত্রজ্ঞানের প্রগাঢ় পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু তা বলে রামমোহনকে বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসের শুধুমাত্র একজন ধর্ম ও সমাজসংস্কারক বলে ধরে নিলে তাঁর প্রতি অবিচারই করা হবে। বাস্তবে এই অদ্ভুতকর্মা মানুষটি সত্যিই তাঁর সময়কার ভারতবর্ষে আধুনিকতার অগ্রদূত ছিলেন। আর সেযুগে শিক্ষা, সাহিত্য, সমাজ, ধর্ম ইত্যাদি সবদিক থেকেই তিনি নবযুগের উদ্বোধক হয়ে উঠতে পেরেছিলেন বলেই ‘ভারত-পথিক’ উপাধিটি তাঁর ক্ষেত্রেই যথাযথ বলে মনে হয়।
এছাড়া সকাল দেখেই বাকি দিনটা কেমন যাবে বোঝা যায়—এই বাংলা প্রবাদটি রামমোহনের জীবনের ক্ষেত্রেও যথাযথভাবে প্রযোজ্য। তাঁর জীবনেতিহাস পাঠ করলে জানা যায় যে, তিনি যখন ষোল অথবা সতেরো বছর বয়সী একজন বালক ছিলেন, তখনই তাঁর সময়কার হিন্দুসমাজের কুসংস্কার ও পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে ফারসি ভাষায় একটি ছোট পুস্তিকা লিখে ফেলেছিলেন। এরপরে তাঁর এই পুস্তিকাটি একদিন তাঁর পিতা রামকান্ত রায়ের হাতে গিয়ে পড়েছিল, এবং সতেরো শতকের বাংলার গোঁড়া ব্রাহ্মণ রামকান্ত এটি পড়ে নিজের ছেলের জ্যাঠামো দেখে প্রবল ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন। তারপরে এবিষয়ে পিতা ও পুত্রের মধ্যে ভয়ানক তর্কের সৃষ্টি হয়েছিল, আর এসময়ে পুত্রকে পিতার মুখের ওপরে যুক্তিপূর্ণ পাল্টা জবাব দিতে দেখে রামকান্তর আত্মসম্মানে আরো বেশি পরিমাণে আঘাত লেগেছিল। এরফলে তাঁদের উভয়ের মধ্যে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হলে রামমোহন শেষপর্যন্ত পিতৃগৃহ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। কথিত রয়েছে যে, এসময়ে তিনি নাকি বাড়ি থেকে বের হয়ে ভারতের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছিলেন, এমনকি বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করবার জন্য তিব্বতে পর্যন্ত গিয়েছিলেন। আর এভাবেই এসময়ে বহু বছর বাংলার বাইরে কাটিয়ে এবং নানা শাস্ত্রে পারদর্শী হয়ে তারপরে তিনি কলকাতায় ফিরে ধর্ম সংস্কার করবার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।
তবে কথিত আর বাস্তব ইতিহাসের মধ্যে বরাবরই কিছু পার্থক্য থাকে, আর রামমোহনের জীবনেতিহাসেও এই পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। বস্তুতঃ রামমোহনের জীবনী আলোচনা করলে কোনমতেই এই সিদ্ধান্তে আসা যায় না যে, নিজের প্রথম জীবন থেকেই একজন ধর্মসংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার কোন বাসনা তাঁর মনে জেগে উঠেছিল। কিন্তু অতীত থেকেই তাঁর বাল্য ও কৈশোরকালের এমন কিছু কাহিনী লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, যেগুলো থেকে মনে হতে পারে যে, খুব অল্প বয়সেই তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের ধর্মে নিজের আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাছাড়া ধর্মের ব্যাপারে নিজের পিতার সঙ্গে মনান্তরের ফলে তাঁর গৃহত্যাগ, এবং বহু দেশ-পর্যটনের, এমনকি তিব্বত গমনের কাহিনীও সেই সুদূর অতীত থেকে লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে রামমোহনের আত্মজীবনী বলে যে রচনাটি ১৮৩৩ সালের ৫ই অক্টোবর তারিখে বিলাতের ‘Atheneum’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, এবং যেটিকে এসব কিংবদন্তির প্রমাণরূপে আজও অনেকে গণ্য করে থাকেন, রামমোহনের প্রথম জীবনীকার শ্রীমতী কলেট সেটিকে রামমোহনের রচনা বলে কখনোই স্বীকার করেন নি। এমনকি আধুনিকযুগের গবেষকদের মধ্যে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ও বহু গবেষণা করে অতীতে একথা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, রামমোহনকে নিয়ে প্রচলিত এসব জনশ্রুতির পিছনে সত্যতার অবকাশ খুবই কম রয়েছে। বস্তুতঃ ব্রজেন্দ্রনাথের মতে রামমোহন প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত—
“সে যুগের সকল সমৃদ্ধ ভদ্রসন্তানের মত স্বগ্রামে থাকিয়া পিতার ও নিজের সম্পত্তির তত্ত্বাবধানে ব্যাপৃত ছিলেন। হয়ত বা তখন তাঁহার সাধারণ ভদ্রলোক অপেক্ষা ফার্সী ও সংস্কৃত জ্ঞান বেশী ছিল, কিন্তু তখনো তিনি দেশাচার বা প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে কোনরূপ বিদ্রোহ করেন নাই।” (রাজা রামমোহন রায়, সাহিত্যসাধকচরিতমালা – ১৬; পৃ- ৪৭)
এমনকি এর আগেও রামমোহনের শিক্ষার আরম্ভ তাঁর জন্মভূমি রাধানগর গ্রামেই হয়েছিল। তখন নবাব দরবারে চাকরি করতে গেলে আরবি-ফারসি শিক্ষার প্রয়োজন ছিল বলে এরপরে সময়মত রামমোহনকে পাটনায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে আরবি-ফারসিতে রামমোহন শুধু বিদ্যাচর্চাই নয়, একেবারে মজে গিয়েছিলেন। আর দুই ভাষাকে তিনি এমনভাবে আয়ত্ত করেছিলেন যে, এসব ভাষায় কথা বলতে, আলোচনা করতে, এমনকি চিন্তাভাবনা করতেও তাঁর কোনো অসুবিধাই হত না। এছাড়া তিনি যে কোন কঠিন জিনিসকে পর্যন্ত সহজ করে আরবি ও ফারসিতে বলতে ও লিখতে পারতেন। কিন্তু পাটনায় তিনি কতদিন ছিলেন, একথা আজও জানা না। তারপরে রামমোহনকে সংস্কৃতশিক্ষা করবার জন্য কাশীতে চলে যেতে হয়েছিল। আর সেখানেও তিনি কতদিন ছিলেন তা আজও অজ্ঞাত। তবে অ্যাডাম (রামমোহনের বন্ধু) সাহেব অবশ্য লিখেছিলেন যে, রামমোহন কাশীতে দশবছর অবস্থান করেছিলেন। সেযুগে কাশী ভারতে সংস্কৃতচর্চার বিখ্যাত কেন্দ্র ছিল। সেসময় এখানে বড় বড় সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতদের বাস ছিল। তবে এই দশ বছরে রামমোহন নিশ্চিতভাবেই সংস্কৃত সাহিত্যভাণ্ডার লুঠ করে নিতে পেরেছিলেন। ফলে বেদ, বেদান্ত, মীমাংসা, স্মৃতিশাস্ত্র ও কাব্যশাস্ত্র তখন তাঁর নখদর্পণে চলে এসেছিল। এরপরে দুই ভাষায় বিদ্বান রামমোহন যে সমাজে ও রাজদরবারে সম্মানিত ব্যক্তিরূপে পরিচিত হয়েছিলেন, এবিষয়ে ঐতিহাসিকদের কোনও সন্দেহ নেই। আর এই পড়াশোনার সময়েই ধর্ম সম্পর্কে রামমোহনের মনে প্রথম জিজ্ঞাসা জেগে উঠেছিল। এবং তা নিয়েই এরপরে ষোল বছর বয়সেই তিনি নাকি একটি ছোটো পুস্তিকাও লিখে ফেলেছিলেন, যার কথা আগেই বলা হয়েছে। সুতরাং রামমোহন নিজের প্রথম জীবনের চোদ্দ বছর নিশ্চিতভাবেই বাড়িতে কাটিয়েছিলেন। এসময়ে তিনি নন্দকুমার বিদ্যালঙ্কারকে পেয়ে গিয়েছিলেন, যিনি তখন সংস্কৃতের অধ্যাপক হলেও পরে একজন তন্ত্রসাধক হয়েছিলেন। তখন তাঁর নাম হয়েছিল হরিহরানন্দ তীর্থস্বামী কুলাবধৃত। আর এঁর কাছ থেকেই রামমোহন তন্ত্রবিদ্যায় আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। কথিত রয়েছে যে, এরপরেই নাকি রামমোহন ও তাঁর পিতার মধ্যে ধর্ম নিয়ে বিবাদ, তাঁর গৃহত্যাগ এবং তিব্বত যাত্রার ঘটনাগুলি ঘটেছিল। কিন্তু বাস্তবে এসময়েও রামমোহনের মধ্যে ধর্ম নিয়ে কোন ধরণের সংশয় দেখা দেয়নি। কারণ, ১৭৯৬ খৃষ্টাব্দে বাইশ বছর বয়সে তিনি নিজের পারিবারিক বিগ্রহ-সেবার ভারবহন করবার অঙ্গীকার করে তাঁর পিতার কাছ থেকে সম্পত্তি গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি এরপরে ১৮০৩ খৃষ্টাব্দে নিজের পিতার মৃত্যুর পরে রামমোহন কলকাতায় হিন্দুপ্রথানুসারে পিতৃশ্রাদ্ধও করেছিলেন। অবশ্য এর আগেই রামমোহন যে শিক্ষাদীক্ষা লাভ করেছিলেন, সেটার মধ্যেই যে তাঁর ভবিষ্যৎ ধর্মমতের বীজ নিহিত ছিল, একথা অস্বীকার করবার কোন উপায় নেই। কারণ, তা না হলে পঁচিশ বছর বয়সী রামমোহন এবং চল্লিশ বছর বয়সী রামমোহনের মধ্যে এতটা পাৰ্থক্য কখনই সম্ভব হত না। সুতরাং পঁচিশ বছর বয়সের মধ্যেই রামমোহন যে সংস্কৃত, আররি ও ফারসি ভাষা শিক্ষা করেছিলেন, এবং মোটামুটিভাবে হিন্দু দর্শনশাস্ত্র, বিশেষতঃ বেদান্ত, স্মৃতি, তন্ত্র ও পুরাণ, কিছু বৌদ্ধ (মহাযান) ও জৈন দর্শন, ও ইসলাম ধর্মের মূলতত্ত্বকে অধিগত করেছিলেন—একথা ইতিহাসগতভাবে সত্যি। অন্যদিকে বিপিনচন্দ্র পালের মতে, তিনি মুসলমানদের ভিতরে চিন্তাস্বাতন্ত্রের জন্য এসময়ের মধ্যেই বিখ্যাত মুতাজিলা সম্প্রদায়ের দার্শনিক মতবাদও আয়ত্ত করেছিলেন। আর ১৭৯৭ খৃষ্টাব্দ থেকে রামমোহন বৈষয়িক কার্যের জন্য কলকাতায় যাতায়াত আরম্ভ করেছিলেন, এবং এসময়ে অল্পদিনের মধ্যেই কলকাতার সদর দেওয়ানি আদালত ও ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের পণ্ডিতদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। খুব সম্ভবতঃ কলকাতায় পৌঁছানোর পরেই রামমোহন সম্পূর্ণ এক নতুন জগতের সন্ধান পেয়েছিলেন, এবং এরপরেই তাঁর মনে সংশয় ও বিদ্রোহের সূচনা ঘটেছিল। এর পরবর্তীসময়ে ১৮০৫ খৃষ্টাব্দ থেকে ১৮১৫ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত, প্রায় দশ বছর ধরে ইংরেজ রাজকর্মচারী জন ডিগবীর সান্নিধ্যে বসবাসের ফলে তাঁর ইংরেজি শিক্ষা ও পাশ্চাত্য ভাবধারা গ্রহণের সুযোগ ঘটেছিল। আর এসময় থেকেই ধর্মের ক্ষেত্রে যুক্তিবাদের আদর্শ এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে জাতীয়তার আদর্শ তাঁকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছিল। তখন একদিকে যেমন আমেরিকার স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাস ও বিখ্যাত ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস তাঁর রাজনৈতিক মতবাদ গঠনে সহায়তা করেছিল, অপরদিকে তেমনি বেকন, লক, হিউম, গিবন ও ভলটেয়ারের রচনাবলী তাঁকে দার্শনিক যুক্তিবাদের দিকে আকৃষ্ট করেছিল। প্রথমদিকে সেই পাশ্চাত্য প্রভাবের ফলে তিনি কিছুটা সংশয়বাদী হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু পরে আবার ভারতীয় বেদান্তদর্শনে তাঁর আস্থা ফিরে এসেছিল। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, ১৮১২ খৃষ্টাব্দ থেকে ১৮১৪ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত রঙপুরে প্রবাসকালে রামমোহন হরিহরানন্দ তীর্থস্বামীর সাহচর্যে হিন্দুদর্শনের, বিশেষতঃ তন্ত্রশাস্ত্রের রীতিমত চর্চা করেছিলেন। এরপরে ১৮১৪ খৃষ্টাব্দে রামমোহন ডিগবীর চাকরি পরিত্যাগ করে কলকাতা স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চলে এসেছিলেন, এবং তারপর থেকেই তাঁর ধর্মসংস্কার প্রচেষ্টার ঐতিহাসিক সূচনা ঘটেছিল। অর্থাৎ, রামমোহনের জীবনের প্রায় ষাট বছরের মধ্যে শেষের মাত্র কুড়ি বছরই তিনি বিশেষভাবে ধর্মসংস্কারের চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন বলে দেখতে পাওয়া যায়।
তবে অবশ্য একথাও ইতিহাসগতভাবে সত্যি যে, রামমোহন যখন বেদ-উপনিষদের চর্চা আরম্ভ করেছিলেন, তখন বাংলায় এসব বিষয়ে শাস্ত্রচর্চা প্রায় লোপ পেয়ে গিয়েছিল। বস্তুতঃ রামমোহনই তাঁর সময়কার বাংলায় নতুন করে বেদান্ত আলোচনার পত্তন করেছিলেন, এবং তিনিই আধুনিকযুগের বাংলায় বাংলা ভাষায় বেদান্তের প্রথম ভাষ্যকার ছিলেন। কিন্তু তিনি মূলতঃ নিজের ধর্মমতের সমর্থনে আর প্রতিপক্ষের যুক্তি খণ্ডনের উদ্দেশ্যেই তখন বেদান্ত আলোচনায় মেতে উঠেছিলেন বলে মনে করা হয়ে থাকে।
যাই হোক, রামমোহনের লিখিত ‘বেদান্ত গ্রন্থ’ ১৮১৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। তখন ১৭ পৃষ্ঠার ভূমিকাসহ এই গ্রন্থের মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ১৮৩। গবেষকদের মতে, তাঁর এই ‘বেদান্ত গ্রন্থ’ আসলে বেদব্যাসের সংস্কৃত ভাষায় রচিত বেদান্তসূত্রের প্রথম কোন বঙ্গানুবাদ ছিল। এতে ভূমিকা ও অনুষ্ঠানপর্ব ছাড়া মোট চারটি অধ্যায় ছিল। এরমধ্যে প্রথম অধ্যায়ের বিষয়বস্তু ছিল—
(১) ব্রহ্মবোধক শ্রুতির সমন্বয়; (২) উপাস্য ব্রহ্মবাচক শ্রুতির সমন্বয়; (৩) জ্ঞেয় ব্রহ্ম প্রতিপাদক শ্রুতির সমন্বয়; (৪) অব্যক্তাদি পদ সকলের সমন্বয়।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে ছিল—
(১) সাংখ্য ইত্যাদির সঙ্গে বেদান্ত মতের বিরোধ পরিহার; (২) সৃষ্টি ও ব্রহ্মবিষয়ক নানা মতের বিচার; (৩) মহাভূত ও জীববিষয়ক শ্রুতি-বিরোধ ভঞ্জন; (৪) ইন্দ্রিয়, প্রাণ ও জীবের সম্বন্ধ বিচার।
তৃতীয় অধ্যায়ে ছিল—
(১) জীবের জন্মাদি প্রকরণ; (২) জীবের চেতন, স্বপ্ন ও অচেতন অবস্থা; (৩) নানা প্রকার উপাসনা; (৪) জ্ঞানসাধনের শ্রেষ্ঠত্ব।
এবং চতুর্থ অধ্যায়ে ছিল—
(১) ব্রহ্মোপাসনার প্রকরণ; (২) মৃত্যু; (৩) মরণের পর জীবের গতি; (৪) মুক্তি।
অতীতে রামমোহনের এই ‘বেদান্ত গ্রন্থ’ সম্বন্ধে চন্দ্রশেখর বসু বলেছিলেন—
“তিনি (রামমোহন) তাঁহার (বেদান্তের) যে প্রকার বাঙ্গালা অনুবাদ দিয়াছেন, তাহা যদিও অতি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে তিনি বেদান্তের সমুদয় সার তাৎপর্য্যই তদ্দ্বারা প্রকাশ করিয়াছেন। সর্ব্বশাস্ত্রে পারদর্শী না হইলে কিছুতেই ঐরূপ ভাষ্য করা যায় না। তিনি যে সহজ প্রণালীতে শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত করিয়া গিয়াছেন, তাহা যেমন শাস্ত্রানুমোদিত, তেমনি হৃদয়গ্রাহী। বিচারতঃ তাঁহাকে একজন হিন্দু-শাস্ত্রীয় দর্শনকার বলিয়া গণ্য করা যাইতে পারে।”
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, পরবর্তীসময়ে এই বেদান্ত দর্শনকে মূলভিত্তি করেই রামমোহন হিন্দু পণ্ডিতদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে শাস্ত্রীয় বিচারে মেতে উঠেছিলেন। তবে বেদান্ত শাস্ত্রের মর্মার্থের সঙ্গে সমকালীন সাধারণের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যই তিনি বাংলা ভাষায় নিজের ‘বেদান্ত গ্রন্থ’টি রচনা করেছিলেন। এমনকি সমকালীন খৃষ্টান পাদ্রীদের জন্য তিনি এই গ্রন্থের একটি ইংরেজি অনুবাদও যেমন প্রকাশ করেছিলেন, ঠিক তেমনি হিন্দুস্থানী ভাষায় এর একটি অনুবাদ করে বিনামূল্যে এই ভাষাভাষী জনসাধারণের মধ্যেও নাকি বিতরণ করেছিলেন। আর রামমোহনের এই ‘বেদান্ত গ্রন্থ’ই তাঁর প্রথম কোন প্রকাশিত বাংলা বই ছিল। তবে এরপরে কঠিন ও দুর্বোধ্য ‘বেদান্ত গ্রন্থ’ জনসাধারণের বুঝতে অসুবিধে হবে বলে তিনি ‘বেদান্ত সার’ নাম দিয়ে নিজের এই গ্রন্থের একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণও প্রকাশিত করেছিলেন।
আসলে প্রয়োজনবোধই ছিল রামমোহনের সাহিত্য রচনার গোড়ার কথা ছিল। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, খৃষ্টীয় ঊনিশ শতকের প্রথম দিকের বাংলা গদ্যসাহিত্য সৃষ্টির মূলেও কিন্তু এই প্রয়োজনবোধই ছিল। এসময়ে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ম কলেজকে কেন্দ্র করে বিদেশ থেকে এদেশে আগত সিভিলিয়ানদের বাংলা ভাষার সঙ্গে পরিচয় করে দেওয়ার জন্য একদিকে যেমন বাংলা গদ্যের অনুশীলন চলেছিল, অন্যদিকে সমকালে রামমোহনও তেমনি লোকশিক্ষার জন্যই প্রতিপক্ষের সঙ্গে শাস্ত্রবিচারের হাতিয়ার হিসেবে বাংলা সাহিত্য রচনায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। তবে রামমোহনের আমলে বাংলা গদ্যসাহিত্যের সঙ্গে বাঙালি পাঠকের বোধহয় খুব একটা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল না; কারণ, না হলে রামমোহন তাঁর এই ‘বেদান্ত গ্রন্থে’ বাংলা গদ্য কিভাবে পড়তে হয়, সেযুগের পাঠকদের এর নিয়মকানুন শেখানোর নির্দেশ দিতেন না। এছাড়া এখনকার মত তখনকার বাংলায় কমা বা সেমিকোলন প্রভৃতি বিরাম-বিরতি চিহ্নের বালাই খুব একটা ছিল না। বস্তুতঃ রামমোহনই আধুনিক বাংলা গদ্যে সর্বপ্রথম এগুলির প্রচলন চালু করেছিলেন। এছাড়া তিনিই ঊনিশ শতকের বাংলার প্রথম শিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন, যিনি তখন কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের পণ্ডিতদের লেখা সংস্কৃত ঘেঁষা পণ্ডিতী বাংলা আর পাদ্রীদের লেখা চলতি বাংলার মধ্যে একটা সামঞ্জস্য বিধান করবার চেষ্টা করেছিলেন। এরফলে তাঁর গদ্যের ভাষা অন্যদের তুলনায় তখন সহজ-সরল ও ছিম-ছাম বক্তব্যের উপযোগী হয়ে উঠেছিল। আর একারণেই পরবর্তীসময়ে কবি ঈশ্বর গুপ্ত রামমোহনের বাংলা গদ্যের প্রসঙ্গে লিখেছিলেন— “দেওয়ানজী জলের ন্যায় সহজ ভাষা লিখিতেন, তাহাতে কোন বিচার ও বিবাদ ঘটিত বিষয় লেখায় মনের অভিপ্রায় ও ভাব সকল অতি সহজে স্পষ্টরূপে প্রকাশ পাইত। এজন্য পাঠকেরা অনায়াসেই হৃদয়ঙ্গম করিতেন, কিন্তু সে লেখায় শব্দের বিশেষ পরিপাট্য ও তাদৃশ মিষ্টতা ছিল না। …”
কিন্তু রামমোহন আদৌ বাংলা গদ্যসাহিত্যের জনক ছিলেন কি ছিলেন না—এটা এখন আর বড় কথা নয়। বরং এটা কিছুতেই ভুললে চলবে না যে, আঠারো-ঊনিশ শতকের বাংলার এই অদ্ভুতকর্মা মনীষীটিই, ডঃ সুকুমার সেনের ভাষায়— “ঊনবিংশ শতাব্দীতে পাঠ্য-পুস্তকের বাইরে বাঙ্গলা গদ্যের ব্যবহার করেন সর্বপ্রথম।”
এবারে আলোচনা প্রসঙ্গে এখানে রামমোহনের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ—‘বেদান্ত গ্রন্থ’–-থেকে আধুনিক বাংলা গদ্যের কিছু নমুনা উপস্থাপিত করা যেতে পারে, যা নিম্নরূপ—
(১) “অনুষ্ঠান
কেহো কেহো এ শাস্ত্রে প্রবৃত্তি হইবার উৎসাহের ভঙ্গ নিমিত্ত কহেন যে বেদের বিবরণ ভাষায় করাতে এবং শুনাতে পাপ আছে এবং শূদ্রের এ ভাষা শুনিলে পাতক হয় তাহাদিগ্যে জিজ্ঞাসা কর্তব্য যে যখন তাঁহারা শ্রুতি স্মৃতি জৈমিনিসূত্র গীতা পুরাণ ইত্যাদি শাস্ত্র ছাত্রকে পাঠ করান তখন ভাষাতে তাহার বিবরণ করিয়া থাকেন কি না আর ছাত্রেরা সেই বিবরণকে শুনেন কি না আর মহাভারত যাহাকে পঞ্চম বেদ আর সাক্ষাৎ বেদার্থ কহা যায় তাহার শ্লোক সকল শূদ্রের নিকট পাঠ করেন কি না এবং তাহার অর্থ শূদ্রকে বুঝান কি না শূদ্রেরাও সেই বেদার্থের অর্থ ও ইতিহাস পরস্পর আলাপেতে কহিয়া থাকেন কি না আর শ্রাদ্ধাদিতে শূদ্র নিকটে ঐ সকল উচ্চারণ করেন কি না যদি এইরূপ সর্ব্বদা করিয়া থাকেন তবে বেদান্তের এ অর্থের বিবরণ ভাষাতে করিবাতে দোষের উল্লেখ কিরূপে করিতে পারেন। …”
(২) “অথাতো ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা॥১॥
চিত্তশুদ্ধি হইলে পর ব্রহ্মজ্ঞানের অধিকার হয় এই হেতু তখন ব্রহ্ম-বিচারের ইচ্ছা জন্মে॥১॥ব্রহ্ম লক্ষ্য এবং বুদ্ধির গ্রাহ্য না হয়েন তবে কিরূপে ব্রহ্মতত্ত্বের বিচার হইতে পারে এই সন্দেহ পরসূত্রে দূর করিতেছেন॥”
(৩) “জন্মাদ্যস্য যতঃ॥২॥
এই বিশ্বের জন্ম স্থিতি নাশ যাহা হইতে হয় তিনি ব্রহ্ম। অর্থাৎ বিশ্বের জন্ম স্থিতি ভঙ্গের দ্বারা ব্রহ্মকে নিশ্চয় করি। যেহেতু কাৰ্য্য থাকিলে কারণ থাকে। কার্য্য না থাকিলে কারণ থাকে না। ব্রহ্মের এই তটস্থ লক্ষণ হয় তাহার কারণ এই জগতের দ্বারা ব্রহ্মকে নির্ণয় ইহাতে করেন। ব্রহ্মের স্বরূপ লক্ষণ বেদে কহেন যে সত্য সর্বজ্ঞ এবং মিথ্যা জগৎ যাহার সত্যতা দ্বারা সত্যের ন্যায় দৃষ্ট হইতেছে। যেমন মিথ্যা সর্প সত্যরজ্জুকে আশ্রয় করিয়া সর্পের ন্যায় দেখায়॥২॥শ্রুতি এবং স্মৃতির প্রমাণের দ্বারা বেদের নিত্যতা দেখি অতএব ব্রহ্ম-বেদের কারণ না হয়েন। এ সন্দেহ পরসূত্রে দূর করিতেছেন॥ …”
তাহলে উপরোক্ত ঐতিহাসিক তথ্যাবলী বিশ্লেষণ করে একথা নিঃসংশয়ে বলা যেতে পারে যে, রামমোহন রায়ই যে আধুনিকযুগের বাংলায় বেদ-বেদান্ত চর্চার সূচনা করেছিলেন, এবিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। বস্তুতঃ, এর আগে যে বেদ কোন শূদ্র উচ্চারণ করলে, শাস্ত্রানুসারে তাঁকে শাস্তি দেওয়ার পাকাপাকি ব্যবস্থা ছিল, রামমোহনই তাঁর সময়ে এই বেদকে আপামর জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। সুতরাং এক্ষেত্রে আধুনিক বাংলা ও বাঙালি হিন্দুর জাতীয় জীবনে তাঁর অবদান নেহাৎ কম বলা চলে না। আর এরফলে তখন হিন্দুসমাজের টনক নড়ে উঠেছিল বলেই তাঁকে বিস্তর নির্যাতন ও নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছিল। এমনকি এসময়ে একাধিকবার তাঁর জীবননাশ করবার চেষ্টা করাও হয়েছিল। এগুলো সবই ঐতিহাসিক সত্যি। তবে সবথেকে বড় ব্যাপার হল যে, এসবের ফলে তিনি তখন কোনমতেই দমে যাননি। আর একারণেই পরবর্তীসময়ে তিনি যখন ইংরেজি ভাষায় তাঁর এই ‘বেদান্ত গ্রন্থ’টি অনুবাদ করেছিলেন, তখন এর ভূমিকায় নিঃসংকোচে লিখতে পেরেছিলেন— ‘আমি ব্রাহ্মণবংশে জন্মগ্রহণ করে বিবেক ও সরলতার আদেশে যে পথ অবলম্বন করেছি, তাতে আমার প্রবল কুসংস্কারাচ্ছন্ন আত্মীয়গণেরও তিরস্কার ও নিন্দার পাত্র হতে হয়েছে। কিন্তু এটা যতই বেশি হোক না কেন, আমি এ বিশ্বাসে ধীরভাবে সব সহ্য করতে পারি যে, এমন একদিন আসবে, যখন আমার এই সামান্য চেষ্টা মানুষ ন্যায় দৃষ্টিতে দেখবেন, আর হয়ত কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকারও করবেন।’
এখানে বলাই বাহুল্য যে, রামমোহনের এই ভবিষ্যদ্বাণী ব্যর্থ হয়ে যায়নি।#




