বিচারহীনতার কারাগারে বন্দী নারী

আজ আমরা যখন আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করবো তখনও হয়তো দেশের আনাচে-কানাচে বা প্রশাসনের নাকের ডগায় কোনো কন্যাশিশু ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়ে পড়ে থাকবে কোনো ডোবা নালায় বা ঝোপে জঙ্গলে। অথবা সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলবে কোনো নারীর দেহ। হয়তো হত্যার পর লাশ ঝুলিয়ে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার অতি পুরনো এই কৌশল করবে পরিবার। গত ৪ মার্চ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপিকা নৃশংসভাবে খুন হলেন তার অধীনস্থ একজন কর্মচারীর হাতে বিশ্ববিদ্যালয়েরই ভেতরেই। সীতাকুন্ডের কুমিরার জঙ্গল থেকে ধর্ষণের পর গলাকাটা শিশুকন্যাটি যে বাঁচার তীব্র আকুতি নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল সেও মারা গেছে। ভোলায় কীর্তনের আসর থেকে গৃহবধুকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে। পাবনায় বাড়ির উঠানে দাদির, সরিষাক্ষেতে নাতনির বিবস্ত্র মৃতদেহ। গাইবান্ধায় স্কুল শিক্ষিকাকে ধর্ষণের পর মেরে ফেলেছে ধর্ষকরা, নরসিংদীতে একবার ধর্ষণ করে আবার তুলে নিয়ে ধর্ষণ করার পর মেরে ফেলা হয়েছে। এখন শোনা যাচ্ছে সৎবাবাই তাকে খুন করেছে। সৎবাবা তো সৎ বাবা, সংবাদে প্রকাশ পেয়েছে, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে নিজ কন্যাকে ধর্ষণের অভিযোগে বাবা গ্রেপ্তার। চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে আপন বাবা কর্তৃক ধর্ষণের ফলে গর্ভবতী এক কিশোরী কন্যা। দেবর, ভাসুর, শ্বশুর, দুলাভাই, মামা, চাচা, খালু, ফুপা– পরিবারের নিকট আত্মীয় দ্বারা ধর্ষণের সংখ্যা অনেক। নিরাপদ নয় শিক্ষক, প্রতিবেশী কিংবা বন্ধুর কাছেও। আর কত তালিকা করবো? এ তালিকা লিখলে শেষ হবে না। এভাবে একটার পর একটা এরকম নারকীয় ঘটনা ঘটতে থাকলে সচেতন মানুষ, প্রতিবাদী মানুষ, নারী অধিকার কর্মী কত আর প্রতিবাদ করবে? কতগুলো ঘটনার প্রতিবাদ করবে? কিন্তু এতসব ঘটনা ঘটছে কেন? আমরা দেখেছি অতীতেও অনেক ঘটনা ঘটেছে। একটা দুটোর আধাখেচড়া বিচার হয়েছে। বিচারের নামে প্রহসন ও দীর্ঘসূত্রিতায় সুবিচার পায়নি নির্যতিত নারী ও তার পরিবার। ধর্ষণের শিকার নারী বিচারের আশায় আদালতের দ্বারস্ত হলে, ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষিতা নারীর বিয়ে দিয়ে রায় দেওয়া হয়েছে। দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে অনেকদিন থেকে। যা মানুষকে আরো বেশি অপরাধ করতে সাহস যুগিয়েছে।

কিন্তু ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর থেকে বিচারের দায়িত্ব চলে গেছে মব সন্ত্রাসীদের হাতে। তারাই অপরাধ করে তারাই বিচার করে। আগেত ছিল বিচারহীনতা এখন যারা অপরাধ করে তারাই আবার মিছিল নিয়ে থানা ঘেরাও করে ভিক্টিমকে পুলিশের হাতে তুলে দেয় আর পুলিশ প্রশাসন আদালত অপরাধীকে মাথায় তুলে নাচে। একজন তরুণী যার দ্বারা যৌন হয়রানী শিকার হলো তার অভিযোগের প্রেক্ষিতে যদিওবা ধরা হয়েছিল সেই লম্পটকে কিছুক্ষণের মধ্যেই একদল থানা ঘেরাও করে তাকে ছাড়িয়ে এনে ফুলের মালা পরিয়ে বিজয় মিছিল করতে করতে নিয়ে গেল সেসব দৃশ্যত ভুলে যাওয়ার কথা নয়! প্রকাশ্যে নারীকে শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করা যুবক গ্রেপ্তার হলেও তাকেও জামিনে মুক্ত করে ফুলেল শুভেচ্ছা দিয়ে বরণ করে। এক সন্ত্রাসী যুবক থানায় বসে বললো সে পুলিশ হত্যা করেছে। পুলিশ বসে বসে শুনল। জনগণ আওয়াজ তোলায় তাকেও ধরতেই তার মুরুব্বিরা আবার চেচামেচি শুরু করে দিল। চব্বিশ ঘন্টার আগে তাকেও পুলিশ ছেড়ে দিল্ তাকেও ফুলের মালা পরিয়ে বরণ করে নিল তার সাঙ্গাৎরা। এসবতো মিডিয়ায় প্রকাশিত ঘটনা। প্রকাশ হয়নি এরকম কত ক্ষমতাবানদের আস্ফালন সবাই নিজ নিজ এলাকায় বসে দেখেছে গত আঠারো মাসে। নতুন সরকার এসে ঘোষণা দিয়েছিল পুলিশ হত্যার বিচার হবে। তাতেই জোঁকের মুখে চুণ পড়ার মত অবস্থা হলো পুলিশ হত্যাকারীদের। কিন্তু জোঁক চুপ করে থাকলেও এই পুলিশ হত্যাকারীরা তো আর জোঁক নয়, তারা আবার চেঁচামেচি শুরু করতেই নতুন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ঘোষণা দিলেন পুলিশ হত্যার তদন্ত করা হবে না। তাহলে যে দেশে পুলিশ হত্যারই বিচার হয় না সেদেশের একটা গোষ্ঠী যারা আবার সদ্য অতীতে বেনামে ক্ষমতায় ছিল এবং এখনও ক্ষমতার খুব কাছাকাছিই আছে তারা এবং তাদের ক্রমশ বাড়তে থাকা অনুগামীর দল নারীকে দ্বিতীয় তৃতীয়ও নয় চতুর্থ শ্রেণীর নাগরিকও ভাবে কিনা সন্দেহ, সেখানে সাধারণ দরিদ্র প্রান্তিক কিংবা যেকোনো নারীর হত্যা ধর্ষণ ও লাঞ্চনার বিচার হবে সে আশা করা কেবল দূরাশাই নয় তা অবিশ্বাস্য এবং অকল্পনীয় মনে হয়।

আরও পড়ুন: নারী জাগরণ ইতিহাসের পাঠ 

যাই হোক এ তো গেল আমাদের দেশের কথা্। আমাদের দেশের মত উন্নয়নশীল দেশ বলি অনুন্নত দেশ বলি যেসব দেশে নারী পুরুষের মাঝে বিরাজমান আছে পাহাড় সমান বৈষম্য সেসব দেশে কোথায়ও নারী নির্যাতন থেমে নেই। এমন কি উন্নত দেশগুলোতেও নারী নির্যাতন বা বৈষম্য যে নেই তা নয়। তবে আশার কথা সেসব দেশে বিচার ব্যবস্থা শক্তিশালী, আইনের শাসন কার্য্কর সেজন্য নারী নির্যাতনকারীর বিচার হয়। এবং নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা আছে তাই জীবনমান খুব বেশি খারাপ হয় না বলে পুরুষতান্ত্রিকতা ও বৈষম্যর বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজেদের অধিকার আদায় করতে পারে। কিন্তু আফগানিস্থানে যখন নারীদের ক্লাস ফাইভের বেশি পড়ারই অধিকার নেই আর ঘর থেকে বের হতে হয় বাপ ভাই বা নিজস্ব পুরুষকে সঙ্গে করে সেসব নারীর জীবনে বৈষম্যের সংজ্ঞা কেমন করে নির্ণিত হবে?

স্বদেশে বিদেশে ঘরে বাইরে যখন অন্যায়ের বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে মানুষ তখন আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে জাতিসংঘের থিম শ্লোগানে নারীর জন্য অধিকার ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কেন জানি ন্যায়বিচার শব্দটিকেই এখন সুদূরপরাহত বলে মনে হয়। জাতিসংঘের কথা এখন কে শোনে? নাকি জাতিসংঘই তার লক্ষ্যে স্থির থাকতে পেরেছে! যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের দখলদারিত্বের নেশায় মানুষ ও জাতির ওপর ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা অমানবিকতার বিরুদ্ধে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই দখলদারিত্বের নেশা, যুদ্ধ বর্বরতা অমানবিকতা কি থেমেছে? এখনো তো জোর যার মুল্লুক তার এই নীতিই চলছে। পরিবর্তন শুধু -সেই জোর শক্তি এখন পেশি শক্তির পরিবর্তে অস্ত্র ও প্রযুক্তির শক্তি। প্রযুক্তি ও বুদ্ধির শক্তিতে বলিয়ান রাষ্ট্র দূর্বল রাষ্ট্রের সম্পদ দখল বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে নিচ্ছে আর জাতিসংঘ কেবল চেয়ে চেয়ে দেখছে। এই যে যুদ্ধ চলছে ইরানে, ফিলিস্থিনে, ইউক্রেনে, সিরিয়ায়- একটা থামলে আরেকটাতে শুরু হচ্ছে। যুদ্ধ থামছে না। চলছে তো চলছে। আর যুদ্ধ মানেই তো মানবাধিকার লঙ্ঘন। যুদ্ধ মানেই নারী ও শিশুর মৃত্যু, লাঞ্চনা, অবর্ণণীয় নিপীড়ন ও যন্ত্রণা। ন্যায় বিচার কোথায়? এখন ইরানে ইসরাইল ও মার্কিন হামলা,ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরানের পাল্টা হামলা চলছে। নারী ও কন্যাশিশুরা কি সেখানে নিরাপদ? কিছুদিন আগে ইরানের সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে সরকার যে নিজ দেশের ত্রিশহাজার মানুষ মেরে ফেলল তার মাঝে নারীও ছিল, অনেক নারী ধর্ষণের শিকার হলো এবং কয়েক বছর আগে একজন মাইশা আমিনীর কয়েক গোছা চুল দেখা গিয়েছিল বলে তাকে কী নির্মম অত্যাচারে মেরে ফেলে দিয়েছিল পুলিশ! আর তার প্রতিবাদ করতে গিয়ে আরও অসংখ্য নারী প্রাণ হারিয়েছিল, লাঞ্চিত হয়েছিল, জেল হয়েছিল অনেকের। আমরা তো জাতিসংঘের কোনো ভূমিকা দেখতে পাইনি সেখানে। জাতিসংঘ নখদন্তহীন হয়েছে। তার কারণ জাতিসংঘ যারা পরিচালনা করে তাদের অনেকেই বিশ্বমোড়ল যারা দখলবাজিতে ব্যস্ত। আপনি আপনারা যখন নিজেরাই দখলবাজি করে মানবাধিকার লঙ্ঘন করবেন তখন আপনাদের পক্ষে অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার পদক্ষেপ গ্রহণ কিভাবে সম্ভব?

আবার আমাদের দেশে ফিরে আসি। আমাদের সংবিধানে নারীর সমঅধিকারের কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের সকল নারী ধর্ম বর্ণ লিঙ্গ নির্বিশেষে সমান সুযোগ লাভের অধিকারী। আমাদের রাষ্ট্র সিডও সনদে স্বাক্ষর করেছে কয়েক দশক পার হয়ে গেল। সিডও সনদে কী আছে? নারীর প্রতি বিরাজমান সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ করার কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রের পক্ষে সরকার জাতিসংঘের সাথে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে সে নিজ দেশের নারীদের প্রতি বৈষম্য করবে না। বৈষম্য বিলোপের জন্য সব করবে। তা কী করলো? শিক্ষা, স্বাস্থ্যর উন্নয়নসহ যোগ্যতা অনুযায়ী নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করল। যদিও অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের সাথে তার মজুরি বৈষম্য খুবই প্রকট। তবু নারীরা অনেক এগিয়ে গেল। শিক্ষায় কর্মসংস্থানে এগিয়ে গিয়ে সে নিজেকে পরিবারকে এবং রাষ্ট্রকেও এগিয়ে দিল উন্নয়নের অনেক সূচকে। ত্রিশ দশকের নারী শাসনও দেশকে অনেকটা এগিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্র বা সরকার আমাদের সংবিধানে যে সমতার কথা ব সিডও সনদের কথা বলা আছে সেই সমতা প্রতিষ্ঠা করতে যেসব কথা লেখা আছে যেমন সম্পদ সম্পত্তিতে সম অধিকার,সন্তানের অভিভাবকত্বে সম অধিকার, বিবাহ বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে সম অধিকার যা তাকলে নারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ করতে পারে সেসব বিষয়গুলো বাস্তবায়ন না করে সংরক্ষণ করে রেখে দিয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ নেই। একটা দল যারা বলে শীর্ষ পদে নারী নেতৃত্ব হারাম তারাও এদেশে রাজনীতি করার ম্যান্ডেট পায়।

আরও পড়ুন: নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক 

মানুষের মাথায় এরকম পশ্চাপদ চিন্তা ভাবনার গার্বেজ রেখে নারীর জন্য অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কীভাবে সম্ভব? বৈষম্য বজায় রেখে ন্যায়বিচার? ন্যায়বিচারের জন্য বৈষম্য বিলোপ করতে হবে আগে। তাহলে পদক্ষেপ নিতে হবে মানুষের মননে মগজে নারীকে মানুষ না ভাবা, সমঅধিকারের বিরোধিতা করার যে পশ্চাপদ চিন্তাভাবনা আছে তা ঝেটিয়ে দূর করার। তার জন্য প্রথমেই শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে। সিডও সনদের সংরক্ষিত ধারা অনুমোদন করতে হবে। অভিন্ন পারিবারিক আইন চারু করে সম্পদ সম্পত্তিতে সমান অধিকার দিতে হবে। কে করবে এতসব? অবশ্যই সরকার। কিন্তু এর জন্য আমাদের সম্মিলিত আওয়াজ তুলতে হবে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস হচ্ছে সম্মিলিতভাবে আওয়াজ তোলার দিন। বছরে একদিনের জন্য হলেও লক্ষকোটি কন্ঠে নারীর জন্য আওয়াজ তোলা হয়। আসুন আমরা সেই আওয়াজকে আরও প্রলম্বিত করি। যতদিন না সমঅধিকার সমতা ন্যায়বিচারের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন না হয় আমরা আওয়াজ তুলতেই থাকবো।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!