রবি একটু দ্রুত হেঁটে যাচ্ছিল। সকাল সাড়ে নটার মধ্যে তার দোকান খোলার কথা। এখন দশটা বাজতে চল্ল। অবশ্য মালিক বংশীবদনবাবু ঢোকেন এগারোটা সাড়ে এগারোটায়। আজকে অবশ্য বংশীবাবু ব্যাংক হয়ে আসবে বলেছেন। তবু! আসলে রেশন দোকানে আজ জব্বর লাইন পড়েছিল। আর জল তোলা তো ছিলই। সব মিলিয়ে! কলেজ স্ট্রীটে বান্ধব প্রকাশনিতে কাজ করে রবি। ওর টাইটেল হল রুদ্র। ঠাকুর্দা হরিচরণবাবু নাতির নাম রুদ্রর সঙ্গে মিলিয়ে রেখেছিলেন রবি। বাড়ির লোকেরা বলে এ হল অস্তগামী রবি। পাড়ার লোকেরাও ওই একই কথা বলে। সে সর্বদাই যেন স্তিমিত হয়েই আছে। অনেক সময় সে নিজেই নিজেকে গালাগাল দেয়। এ জীবনে তার বল নিয়ে ঢুকে গোল করা আর হল না! নিজের গোল আটকাতে আটকাতেই কেটে যাবে। হাঁটতে হাঁটতে সে হোঁচট খায় এবং চটির স্ট্র্যাপটা ছেঁড়ে। কোন রকমে পা টেনে টেনে হাঁটতে থাকে। আজকাল মাঝে মাঝে মালিকের ছেলে কাজু এসে দোকানে বসছে। ভাল ছেলে। লেখা পড়ায় খুব মেধাবী। যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে আবার কি সব পড়ছে। এর মধ্যে এসে যদি দেখে দোকান বন্ধ তাহলে বেচারাকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। রোদটাও কেমন চাড়িয়ে উঠেছে! কলেজস্ট্রীট পাড়া নটা বাজতে না বাজতেই গরম হয়ে ওঠে। রবি পা ঘষটে ঘষটে চলেছে। উল্টো দিক থেকে হন্তদন্ত হয়ে হেঁটে আসছিল উমেশ। কলেজ স্ট্রীটে তার চালু ডিটিপির দোকান। ছজন লোক এক নাগারে কাজ করে কুলিয়ে উঠতে পারে না।
“মাল রেডি হয়ে পড়ে আছে! আজকে এসে নিয়ে যাস।“ কথাগুলো ছুঁড়ে দিয়ে উমেশ চলে যায়। ব্যস্ত মানুষ। রবির ভাগ্য ভাল দোকানে আপাতত কেউই এসে পড়ে নি। সে তালা খুলে জল টল ছিটিয়ে ঠাকুরকে ধূপ ধুনো দেখিয়ে দোকানের পাশেই টিউকল থেকে বোতলে জল ভরে এনে রাখে। এবং সঙ্গে সঙ্গে বংশীবাবুর ফোন বেজে ওঠে।
“চলে এসছো!”
“হ্যাঁ।“
“ঠিক আছে। আমার একটু দেরী হবে। রাখছি।“
রবি মোবাইলটা অফ করে। বান্ধব প্রকাশনী স্কুল কলেজের আর ধর্মীয় বই ছাপে। ভালই কাটতি। মাঝে মাঝে রবিকে গা গঞ্জের স্কুলে যেতে হয়। যাকে বলা হয় ক্যানভাসিং করতে। রবি বিএ পাস। কোন পরীক্ষাতেই খুব অসাধারন ফল না হলেও সে কোন দিন ফেল করে নি। উতরে গেছে। রবি জানে মানুষের কৌতূহল উদ্রেককারী বিশেষ কোন যোগ্যতা তার নেই। তবে মাঝে মাঝে সে মাউথ অরগ্যান বাজায়। তখন তার একমাত্র শ্রোতা রেশমি। এরকম একটা উদ্দেশ্যহীন বিবর্ন জীবন যাপনের মধ্যেও রবি মনে করে সে বেশ আছে। রাস্তা দিয়ে পথ চলতি ব্যস্ত মানুষের ছবি দেখতে দেখতে রবি কেমন অন্য মনস্ক হয়ে পড়ে। তার থাকার মধ্যে আছে এক দাদা আর বৌদি। আর একটি ভাইঝি। রেশমি। রবির একটু ন্যাওটা। এবার মাধ্যমিক দিয়েছে। রবির দাদা সুগত একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করে। বৌদি মালতি সংসারের হাজারটা ঝক্কি সামলে সেলাইএর কাজ করে। কয়েকটা দোকান তার ধরা আছে। বাড়িটা পৈতৃক। মোটামুটি তালে গোলে চলে যাচ্ছে। একটু বেলা করেই বংশীবাবু এলেন। রবি দোকান ছেড়ে বাইরে বেরোয়। টুকি টাকি কাজ সারে। উমেশের ওখান থেকে টাইপ হয়ে যাওয়া লেখা গুলো নিয়ে আসে। এরই মধ্যে ছেঁড়া চটিটা সারিয়েও নেয়। ঘনশ্যাম মুচি এবারও তাকে চটিটা ফেলে দিতে বলে। কিন্তু রবি জানে চটি কেনবার ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই। সামনেই বৌদির চোখের ছানি অপরেশন হবে। তখন দাদা যদি টাকা চায়! এখন ফালতু খরচা করার সময় নয়! তার চে জোড়া তাপ্পি দিয়ে যতদিন চলে চলুক। পরে একেবারে অচল হয়ে গেলে তখন দেখা যাবে। বিকেলে মুড়ি খেতে খেতে বংশীবাবু রবিকে বলেন,
“কালকে একবার বেলেতোর চলে যাও। ওখান কার মোক্ষদা হাই স্কুলের হেড মাস্টার রামজীবনবাবুর সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে। আর তার পাশেই সোনামুখি আর পখন্নাটা একেবারে মেরে দিয়ে চলে এসো। তোমাকে আমি সব লিখে দিচ্ছি।’
সন্ধ্যে বেলায় রবি বাড়ি ফিরে এসে আলমারির মাথা থেকে তার কাল রঙের রেক্সিনের ব্যাগটা নামিয়ে আনে। টুকিটাকি জিনিস পত্র তাতে ভরতে থাকে। রেশমি আসে।
“তুমি যে বললে ভোরে গিয়েই আবার বিকেলে চলে আসবে তাহলে গামছা পায়জামা নিচ্ছ কেন!”
“যদি কোন বিপদে পড়ে যাই! বলা তো যায় না! তখন থাকতে হতেও তো পারে !”
“তুমি আগে ওখানে গিয়ে মানুষগুলোর সঙ্গে ভাল করে ভাব করে আসবে। তারপর আমরা একদিন যাব। আমরা গিয়েই কিন্তু চলে আসব না। একদিন থাকবো। জায়গাটা ভাল করে দেখবো।“
“নিশ্চয়ই।“
তাকের এককোণে পড়ে থাকা মাউথ অরগানটা কি খেয়াল হয় তুলে নিয়ে বাজাতে থাকে রবি। রেশমির মুখ হাসিতে ভরে ওঠে। খানিকক্ষণ বাজিয়ে ব্যাগে ভরে নেয় সেটা। মাউথ অর্গানটা রবির বন্ধু বুবুনের ছিল। আচমকাই মারা যায়। বুবুনের দিদি শিপ্রাদি রবিকে সেটা দিয়ে দেয়। গোছগাছ শেষ করে রবি তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে। কাল তাকে খুব ভোরে উঠতে হবে।
দুই
ট্রেনটা একটু দেরী করে ফেলেছিল। এখন বাজছে দশটা কুড়ি। স্টেশন লাগোয়া বাস স্ট্যান্ড। সেখানে হরেক রকমের দোকান। একটা দোকানে ঢুকে রবি কচুরি আর চা খেয়ে নেয়। তারপর মোক্ষদা হাই স্কুলের হেড মাস্টার রামজীবনবাবুকে ফোন করে। রামজীবনবাবু তাকে স্কুলে চলে আসতে বলে। রবি বাসে উঠে বসে। একটু বাদেই বাস ছেড়ে দেয়। বাসটা প্রাইভেট। ফলে ঘন ঘন দাঁড়ায় আর লোক তোলে। একটা বুড়ি তার ছাগল ছানা নিয়ে রবির পাশে বসে আছে। জানলা দিয়ে আসা মাটি মাখা বাতাসের গন্ধ রবির মনটা ভরিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল। এর মধ্যে বাচ্ছা ছাগলটি প্রাতঃকৃত্য করে ফেলে। রবি পাটা একটু সরিয়ে বসার চেষ্টা করে। খানিকবাদে কন্ডাক্টরের সুতীব্র চীৎকার “ বেলেতোর! বেলেতোর!” কানে আসে রবির। রবি সিট ছেড়ে উঠে ভীড় ঠেলে গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বাসটা থামে। অনেক কসরত করে নামতে হয় তাকে। তারপর সামনে পায়ে চলা পথটা ধরে হাঁটা লাগায় সে।
তিন
মোক্ষদা হাইস্কুল থেকে বেরুতে বেরুতে রবির একটু বেলাই হয়ে যায়। কেননা রামজীবনবাবু একটু গপ্পে লোক। তিনি এক সময় বঙ্গবাসীতে পড়তেন। মির্জাপুর স্ট্রীটে একটা মেসবাড়িতে থাকতেন। সেই ইতিহাস রবিকে না শুনিয়ে ছাড়েন না। তিনি কথা দেন যথাসাধ্য করবেন তবে নতুন সেক্রেটারি মশাইটি নাকি একটু সবজান্তা। রবি ওখান থেকে বেড়িয়ে উর্দ্ধশ্বাসে ছোটে সোনামুখি বিমলেন্দু বিদ্যা নিকেতনে। এখানকার হেড মাস্টারটি বেশ কম কথার মানুষ। রবির বইগুলো উল্টে পাল্টে দেখেন। কাটা কাটা কয়েকটি প্রশ্নও করেন। রবি যথাসাধ্য সন্তুষ্ঠ করার চেষ্টা করলেও মনে হয়না উনি খুশি হলেন। তবু নিরাশ করেন না। বলেন স্কুলের গভর্নিং বডির সঙ্গে কথা বলবেন। রবি যখন বাস রাস্তায় এসে দাঁড়ালো তখন বিকেল হয়ে এসছে। জায়গাটা বেশ জমজমাট। তার ক্ষিধেও পেয়ে গেছিল খুব। একটা সস্তার হোটেলে ঢুকে ভাত ডাল আর তরকারির ফরমাস করে সে। খেয়েদেয়ে বাইরে বেড়িয়ে দেখে আকাশটা কেমন মেঘলা হয়ে আছে। উল্টো দিক থেকে আসা পখন্না গামী একটা বাসে রবি তড়িঘড়ি করে উঠে পড়ে। ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দূরে কোথাও ভীষণ বাজ পড়ার শব্দ পায়।
চার
বাস থেকে রবি যখন নামলো তখন সন্ধ্যে পেড়িয়ে গেছে। মেঘে মেঘে আকাশ ভরে আছে। চারিদিকে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। শহরের মত জায়গায় জায়গায় ল্যাম্প পোস্ট নেই। অন্ধকারে ঠিক ঠাহর করতে না পেরে রবি পথ চলতি দু একজন মানুষকে জিজ্ঞেস করে দ্রুত চলতে থাকে। একটা পুকুরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে ওই অন্ধকারেই স্কুলটাকে দেখতে পায় রবি। কেমন ভূতের মত দাঁড়িয়ে আছে। লোহার গেট পেড়িয়ে রবি স্কুলের ভেতর ঢোকে। ছাত্রদের কলরব নেই। কারন স্কুল অনেক আগেই ছুটি হয়ে গেছে। সিঁড়ি ভেঙে সে দোতলায় হেড মাস্টারের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। আস্তে করে পর্দা সরিয়ে দেখে হেড মাস্টার নিকুঞ্জবাবু নিবিষ্ট মনে একটা ফাইল দেখছেন। রবি নিকুঞ্জবাবুকে ফোনে জানিয়েছিল তিনি যেন দয়া করে একটু থাকেন । সে এক্ষুনি আসছে।
“স্যার! আমি রবি! আপনাকে ফোন করেছিলাম।“
“হ্যাঁ হ্যাঁ আসুন।“
রবি ভেতরে ঢোকে।
“বসুন। “
রবি চেয়ার টেনে বসে।
“বলুন।“
“আপনাকে বোধ হয় বংশীবদনবাবু কিছু জানিয়ে থাকবেন।”
“হ্যাঁ। বলেছেন। আপনি বই টই কিছু নিয়ে এসছেন!”
“হ্যাঁ। স্যার। নিয়ে এসছি। দেখাচ্ছি আপনাকে।“
বলে মাটিতে নামিয়ে রাখা ব্যাগটা থেকে রবি বেশ কয়েকটি বই বের করে নিকুঞ্জুবাবুর সামনে টেবিলে নামিয়ে রাখে। নিকুঞ্জুবাবু তুলে নিয়ে দেখতে থাকেন। রবি বলে ওঠে,
“আমাদের স্যার প্রতিটি বই বোর্ডের অনুমোদন পেয়েছে।“
“হ্যাঁ। সে কথা আমাকে বংশীবাবু জানিয়েছেন।“
“সে সঙ্গে স্যার আমাদের ইতিহাস আর ভূগোল বইতে আপনি অনেক বেশী রেফারেন্স পাবেন। এবং স্যার ইতিহাসের প্রতিটা টপিকে মানচিত্র রয়েছে স্যার। যাতে করে ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে একটা আগ্রহ জন্মাবে।“
“হুম।“
রবি আর কথা বাড়ায় না। নিকুঞ্জবাবুকে বইগুলো ভাল করে দেখার সুযোগ দেয়। নিকুঞ্জুবাবুর পেছনে জানলার ওপাশে কাল আকাশটায় বিদ্যুৎ খেলে যায়।
“ঠিক আছে। আমি কি এগুলো রেখে দিতে পারি!”
“নিশ্চয়ই স্যার! এটা আপনারই জন্য।“
স্কুলের দারোয়ান ট্রেতে করে দুটো চা রেখে দিয়ে চলে যায়।
“নাও। চা খাও।“
“হ্যাঁ”
রবি কাপটা তুলে নেয়।
“তুমি কি এখন কলকাতাতে ফিরে যাবে!”
“সেরকমই তো ইচ্ছে আছে। কিন্তু আকাশের অবস্থা ভাল ঠেকছে না। দেখা যাক।“
রবি দ্রুত চাটা শেষ করার চেষ্টা করতে থাকে।
পাচঁ
স্কুল ছাড়িয়ে কিছুটা যেতেই তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। একটা গাছের তলায় আশ্রয় নিলেও রবি বুঝতে পারে এখানে আরো খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে সে স্নান করে যাবে। কোন উপায় না দেখে স্কুলের দিকে দৌড় লাগায় রবি। বাঁচোয়া স্কুলের গেটে তালা দিয়ে দেয়নি দারোয়ানটা। রবি ছুটে গিয়ে স্কুলের বারান্দায় আশ্রয় নেয়। নিকুঞ্জবাবু আগেই চলে গেছেন। কতক্ষণে এই বৃষ্টি থামবে সেটা অজানা। থামার পরেও সে কলকাতা ফেরার ট্রেন বা বাস পাবে কি না সেটাও অজানা। রবি কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। দারোয়ানটা কি চলে গেছে ! তাহলে স্কুলটা কি রাত্রে খোলাই পড়ে থাকে! তা তো হওয়ার কথা নয়! রবি নিকুঞ্জবাবুকে ফোন করে। বেশ খানিকক্ষণ বাজার পর ফোনটা ধরেন তিনি।
“হ্যালো! আমি রবি বলছি! একটু আগে!”
“হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন বলুন।“
“আমি বেশ মুশকিলে পড়ে গেছি। খানিকটা গিয়ে এমন বৃষ্টি শুরু হল যে আমাকে আবার স্কুলে এসে আশ্রয় নিতে হয়েছে। বৃষ্টি ধরলেও কলকাতা ফেরার ট্রেন বা বাস পাবো কি না জানি না! মানে কি করবো কিছু মাথায় আসছে না! তাই আপনাকে ফোন করছি আর কি!”
“ও। ওই পাশেই তো সুদামা থাকে। দারোয়ান। আপনি দেখতে পাবেন। আমি সুদামাকে বলে দিচ্ছি।”
বলে ফোনটা অফ করে। রবি পকেটে ফোনটা রেখে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে সুদামাকে খুঁজতে থাকে। বারান্দা পেড়িয়ে রবি স্কুলের শেষ সীমায় এসে পড়ে। সেখানে অন্ধকারের মধ্যে যতদূর চোখ যায় সে বুঝতে পারে একটা বাগান মত করা আছে। আর তার পাশে একটা ঘরের বন্ধ জানলা দিয়ে খুবই ক্ষীণ একটা আলোর রেখা বাইরে এসে পড়েছে। রবি ভাবে ওটাই বোধহয় সুদামার ঘর। যেভাবে বৃষ্টি হচ্ছে ওই ওবদি যেতে গেলেই তো সে ভিজে একেবারে একসা হয়ে যাবে! চারিদিকে বৃষ্টির দাপটে কোন কিছুই ভাল করে চোখে পড়ছে না। বৃষ্টির আক্রমণটা আরো যেন নতুন উৎসাহে বাড়লো মনে হল রবির। রবি দোতলায় ওঠার একটা সিঁড়ি দেখতে পায়। বৃষ্টি কমলে গিয়ে পাত্তা লাগানো যাবে এই ভেবে রবি সিঁড়ির উপরে গিয়ে বসে। কতক্ষণ এক নাগাড়ে বসেছিল জানে না সে। চারিদিকে যেন গভীর রাত নেমে এসছে। হঠাৎই টের পায় ঘাড়ের খুব কাছে কে যেন একটা নিঃশ্বাস ফেল্ল। বেশ ঘাবড়ে গিয়ে পাশে তাকিয়ে কাউকেই দেখতে পায় না সে। গাটা একটু ছম ছম করে ওঠে রবির। সে উঠে দাঁড়ায়। সুদামার ঘরের দিকে দ্রুত এগিয়ে যেতে চায়। কিন্তু পারে না। মেঝের ফাটলে চটি আটকে গিয়ে হোঁচট খায় সে। উল্টে পড়ে। মুখ তুলে দেখে সামনে এক জোরা নাগরা পড়া পা। লোকটার মুখটা ভাল করে এই অন্ধকারে বুঝতে পারে না রবি। তবে তার পোশাকআশাক দেখেই মালুম হয় মানুষটা বেশ হোমরা চোমরা। লোকটি অদ্ভুত তো! উল্টে পড়ে আছে দেখেও হাতটা বাড়ালো না! যাই হোক রবি কোন রকমে উঠে দাঁড়ায়। খেয়াল করে লোকটি বেশ বেঁটে খাটো। পরনে জমকালো পোশাক। গলায় মতির মালা। পাথরগুলো এই অন্ধকারেও বেশ ঝিলিক মারছে। লোকটা এলইবা কোত্থেকে! লোকটার মুখটা পরিষ্কার বোঝা না গেলেও ঠোটের কোনে মিচকে হাসিটা রবির চোখ এড়ায় না।
“কোনঠে আসা হচ্ছে!” লোকটি সরু গলায় জিজ্ঞেস করে।
“কলকাতা।“
“গড়ের মাঠ! ঘোড়া ঘোরে!”
“জানিনা। ওদিকটা অনেকদিন যাওয়া হয় না। তা আপনি কোত্থেকে এলেন!”
“এখানেই আবাস। আবার কোনঠে যাব!” কথা শেষ হতে না হতেই “ চামুন্ডারে!” বলে হাঁক ছাড়ে। ধুমকেতুর মত একটা ছোট্ট সিংহাসন নিয়ে আবির্ভুত হয় কালো মত দশাসই দুজন লোক। আর সিংহাসনটা রাখতে না রাখতেই চারটে পলায়ন মার্কা লোক একটা সুন্দর কার্পেটের মত জিনিস বিছিয়ে দিয়ে চলে যায়। রবি তাকিয়ে দেখে বেঁটে নাগরা পড়া লোকটা কখন সিংহাসনে বসে পায়ের উপর পা তুলে কানে হাত চাপা দিয়ে একটা কালোয়তি গান শুরু করে দিয়েছেন। আর তার পাশে বসে মৃদঙ্গ বাজাচ্ছে তাদের পাড়ারই হারান মাঝি। ব্যাটা সুদের কারবারি! এখানে এল কি করে! আর কবে থেকেই বা মৃদঙ্গ বাজানো শুরু করলো! অবশ্য ওর নাতিটা কি যেন একটা বাজায় শুনেছে রবি। কিন্তু হারান মাঝি দিব্যি মৃদঙ্গ বাজিয়ে চলেছে! আশ্চর্যের ব্যাপার! একজন আবার সারেঙ্গী বাজাচ্ছে। ব্যাপারটা কি! রবির মনে পড়ে যায় গত মাসে হারান মাঝির কাছ থেকে সে পাঁচশো টাকা ধার নিয়েছিল! এখানে যদি টাকাটা চেয়ে বসে! বেশ চিন্তায় পড়ে রবি। কিন্তু এসব সে কিছুই করল না। ঘাড় গোজ করে মৃদঙ্গ বাজিয়েই যেতে থাকে। সবাই গান বাজনা নিয়ে জমে গেছে! রবির কি মনে হয় সেইবা চুপ করে থাকে কেন! ব্যাগটা হাতড়ে মাউথ অর্গানটা বের করে আনে। তারপর কোন দিকে দৃকপাত না করে দু চোখ বন্ধ করে সেও বাঁজাতে আরম্ভ করে দেয়। অনেকক্ষণ বাজিয়ে সে চোখটা খোলে । দেখে সবাই হা করে ওর দিকে চেয়ে বসে আছে। বেঁটে লোকটি সিংহাসন থেকে উঠে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে
“কঠিন বাজালে বটে!” তারপর পকেট থেকে ছোট্ট কাপড়ের বটুয়া বের করে তার থেকে কি একটা জিনিস রবিকে দেয়। অল্প আলোয় রবির চোখে সেটা বেশ চকচকে লাগে।
“বাবু! বাবু!” কার ডাকে ঘুমটা ভেঙে যায় রবির। দেখে সামনে একজন খেটো ধুতি পড়া গামছা কাঁধে লোকটা ওর দিকে বেশ অবাক হয়েই চেয়ে আছে। রবি বেশ খানিকক্ষণ লোকটির দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে।
“আপনি এখানে!” রবি বুঝতে পারে তার শরীরটা বেশ খারাপই লাগছে। সে ওঠার চেষ্টা করে। চোখে কেমন অন্ধকার লাগে। সিঁড়িতেই আবার বসে পড়ে। লোকটা তার কপালে হাত দিয়ে দেখে।
”আরি বাবা! প্রচুর তাপ! আপনি আসেন! আমার হাতটা ধরেন! বাবু !” কোন কথাই রবির কানে পৌছয়না।
ছয়
সুদামা মানুষটি বেশ। একাই থাকে। রান্না বান্না করে সে স্কুলে চলে যায়। মাঝে টিফিনের সময়ে একবার আসে। দুজনে মিলে খেতে বসে। সন্ধ্যে বেলায় সুদামা রুটি আর ডাল বানায়। নিকুঞ্জবাবু বেশ কয়েকবার এসে রবির খবর নিয়ে গেছেন। হোমিওপ্যাথি ওষুধও দিয়ে গেছেন। রবির শরীরটা দুর্বল হলেও আগের থেকে কিছুটা সুস্থ হয়েছে। এরই মধ্যে দুদিন থাকা হয়ে গেল তার। এইবার চলে যেতে হবে। কিন্তু সুদামা তাকে যেতে দিচ্ছে না। বলছে আরো দু একদিন থেকে শরীরটা একদম ফিট করে তবেই যেন সে যায়। রবিরও জায়গাটা মন্দ লাগছে না। সবুজ আদি দিগন্ত প্রসারিত মাঠ। উধাও আকাশ। ভোর না হতে হতেই গরুর মুরগীর ডাক। সেই সঙ্গে পাখীদের কলতান। রেশমির কথা তার খুব মনে পড়ে যাচ্ছে। রেশমি তাকে ফোনে অভিমান করে বলছিল তুমি আমাকে ফেলে ওখানে বেশ আছ! এইবার গরমের ছুটিতে আমাকে যদি পখন্না না নিয়ে যাও তাহলে তোমার ঘাড় আমি একেবারে মটকে দেব। তাদের অভাবী জীবনে ঘোরাটোরা বিশেষ হয়ে ওঠে না। হয় তো কিছু দিন বাদে রেশমি পখন্নার কথা ভুলে যাবে। জীবনে কত কিছুই হারিয়ে যায়। আর যেগুলো আসে হয়তো তার মধ্যে অনেক কিছুই কাম্য থাকে না। কিন্তু অবস্থা গতিকে মেনে নিতে হয়। রবি হাঁটতে হাঁটতে দামোদর নদীর কাছাকাছি চলে এসেছিল। সামনে একটা কালি মন্দির। কালির ঘোর কৃষ্ণবর্ন রুপটা দেখতে দেখতে রবির কেমন ঘোর ধরে যায়। বেশ কিছুটা দূরে দাহ হচ্ছে। বোধ হয় শ্মশান হবে। রবি নদীর পারে গিয়ে বসে। জল স্নাত বাতাসের গন্ধ তার নাকে এসে লাগে। দামোদর এখন শুকনো। তবু কিছু কিছু জায়গা জলমগ্ন হয়ে আছে। দূরে বিন্দুর মত মানুষগুলো শুকনো জায়গা গুলো দেখে পারাপার করছে। মোবাইল ফোনটা বেজে ওঠে। দেখে নিকুঞ্জবাবুর ফোন।
“হ্যাঁ স্যার।“
“শরীর ঠিক আছে!”
“আপনার ওষুধের গুনে স্যার এখন আগের থেকে অনেকখানি সুস্থ।“
“একবার আমার কাছে এসো।“
“আপনি স্কুলে আছেন তো!”
“হ্যাঁ। স্কুলেই আছি।”
“আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই যাচ্ছি।”
“ঠিক আছে। এসো।“
রবি তাড়াতাড়ি ফোনটা অফ করে স্কুলের দিকে হাঁটা লাগায়।
সাত
সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে রবি দেখল বারান্দায় দাঁড়িয়ে সুদামা খইনি বানাচ্ছে।
“আমাকে মাস্টার মশাই আসতে বলল। যাব!”
“একটু সবুর করো। ঘরে লোক আছে। তুমি অফিস ঘরে গিয়ে বসো। আমি ডেকে নেব।“
রবি পাশেই অফিস ঘরে গিয়ে বসে। একজন প্রৌঢ় কর্মচারী বসে বসে কি সব কাজ করছে। রবির দিকে ফিরেও তাকায় না। রবি কি আর করবে চুপ করে বসে থাকে। তার চোখ বরাবর একটা তৈল চিত্র দেয়ালে ঝুলছে। ছবিটা খুব পুরোন। জায়গায় জায়গায় ঝুল জমেছে। রংটাও চটে গেছে। খুবই অনাদরে পড়ে থাকলেও ছবিটা দেখতে দেখতে মানুষটাকে তার কেমন চেনা চেনা ঠেকতে থাকে। কোথায় দেখেছে! মনে আসে না। কিন্তু সে নির্ঘাত দেখেছে। এমনি সময় সুদামা এসে তাকে বলে “ফাঁকা হয়েছে। এসো।” রবি নিকুঞ্জবাবুর ঘরের দিকে যায়। খবরটা সুখবরই ছিল। ইতিহাস বইটা ওরা অন্তর্ভুক্ত করেছে। নিকুঞ্জবাবু বললেন কালকেই তিনি চিঠি করে রবির হাতে দিয়ে দেবেন। ঘর থেকে বেড়িয়ে আসার সময় রবির কি মনে হয় নিকুঞ্জবাবুকে জিজ্ঞেস করে বসে,
“আচ্ছা অফিস ঘরে দেয়ালে একটা ছবি ঝুলছে। দেখে মনে হল কোন রাজার ছবি! খুব পুরোন। ওই ছবিটা কার!”
“যার নামে এই স্কুল ওনারই ছবি। রাজা বিনোদ নারায়ন কুণ্ডু।“
“উনি কে ছিলেন?”
“উনি এই অঞ্চলের একজন সামন্ত রাজা ছিলেন। তখন বাংলায় নবাবী আমল চলছে।”
“তাহলে তো সেটা আজকের কথা না।“
“সে তো নয়ই।“
“ওনার কেউ আছে এখানে!”
“একজন আমার কাছে আসে মাঝে মধ্যে। বলে তো ওদেরই বংশধর। কালিচরন। ও এখানকার এই জায়গাটা নিয়ে একটা বইও লিখেছে। বেশ সুখ পাঠ্য।”
“বইটা আছে আপনার কাছে!”
“আছে বোধ হয়। দেখতে হবে একটু। আমি হাতের কিছু কাজ সেরে নি। তারপর তোমাকে নিয়ে বাড়িতে যাব। যদি পেয়ে যাই তোমাকে পড়তে দেব।’
“ঠিক আছে স্যার। আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।“
বলে রবি ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে।
আট
নিকুঞ্জবাবুর বাড়িটা বেশ বড়ই। সিমেন্টের বাঁধান উঠোনে ধান ঝাড়াই করে করে মনিষরা রাখছে। ঘুঁটে পোঁড়ার গন্ধ ভেসে আসছে। সেই সঙ্গে ভেসে আসছে পুজোর ঘণ্টার ধ্বনি।
“ওরে পালান বাইরে দুটো চেয়ার পেতে দে। তুমি একটু বস। চা মুড়ি খাও। ততক্ষণে আমি দেখছি।” বলে নিকুঞ্জবাবু বাড়ির ভেতরে ঢুকে যান। একটু বাদে একজন লোক এসে রবিকে মুড়ি দিয়ে যায়। বেশ সুন্দর করে মুড়কি দিয়ে মাখা। খেতে খেতে রবির আচমকা মনে পড়ে সে স্বপ্নে রাজা বিনোদ নারায়ণকেই দেখেছিল। কিন্তু ঘটনাটা হল রাজা বিনোদ নারায়নকে তো সে আগে কোন দিন দেখেনি। তো না দেখে থাকলে স্বপ্নে তার মুখটা ভেসে উঠবে কি করে! না কি দেখে ছিল! কি করে দেখবে! সে তো সটান বাস থেকে নেমেই নিকুঞ্জবাবুর ঘরে ঢুকে গেছিল। তাহলে স্বপ্নে দেখল কি করে! মুড়ি খেয়ে বাটিটা সে নীচে নামিয়ে রাখে। খানিক বাদে হাতে একটা চটি বই নিয়ে নিকুঞ্জবাবু ঘর থেকে বেড়িয়ে আসেন।
“এই নাও।” বলে বইটা এগিয়ে দেয় রবির দিকে। দেখলেই বোঝা যায় বেশ পুরনো বইটা। মলাটের উপর লেখা গ্রামটির নাম পখন্না। লেখক কালিচরন কুন্ডু। চেয়ারে বসে নিকুঞ্জবাবু বলেন
“পখন্নার আগে নাম ছিল পুষ্করন। তার থেকেই পোখরণা বা পখন্না। কোন এক সময় এই জায়গা রাজধানীর সম্মান পেয়েছিল। খুবই প্রাচীন এই জায়গা। মহারাজা চন্দ্রবর্মার সময়কার। এখান কার শুশুনিয়া পাহাড়ের গায়ে লিপিতে এসবের সন্ধান পাওয়া গেছে। আলিবর্দির সময় বর্গীরা দলে দলে এখানে ঢুকে পড়ে লুঠ পাট চালায়। তখনই রাজা বিনোদ নারায়নের পুর্ব পুরুষেরা এ গায়ে ঢুকে পড়ে। “
“ওরাও কি বর্গী ছিল!”
“ঠিক। জোর করে জায়গা জমি ছিনিয়ে নেয়। তারপর এখানে রয়ে যায়। রাজা বিনোদ নারায়ন ওদেরই বংশধর। তার সময় থেকেই এই কুন্ডু বংশের বোলবোলা একেবারে তুঙ্গে ওঠে। আমাদের স্কুলটাই ছিল রাজ বিনোদ নারায়নের বাগান বাড়ি। শোনা যায় ওখানে সে প্রতি রাত্রে নাচ গানের আসর বসাত।“
একটি কিশোরী মেয়ে থালায় করে দুবাটি চা আর টোস্ট বিস্কুট দিয়ে চলে যায়। বিস্কুটে কামড় দিয়ে রবি নিকুঞ্জবাবুকে জিজ্ঞেস করে,
“কিন্তু কুন্ডু টাইটেলটা আসলো কি করে!”
“ওটা এসছে কুন্দ্রা থেকে। রাজা বিনোদের পুর্ব পুরুষদের উপাধি ছিল কুন্দ্রা। তার থেকেই কুন্ডু।“
আরো খানিকক্ষণ কথা বলে রবি হাঁটা লাগায়। ঝিঁঝি ডাক শুনতে শুনতে ফাঁকা পুকুর পাড় দিয়ে যেতে যেতে রবি ভাবতে থাকে রাজা বিনোদ নারায়ন তাকে দেখা দিলেনইবা কেন! তাও একেবারে স্বপ্নে! সুদামা বারান্দায় বসে রান্না করছিল। ভেতর থেকে মোড়াটা বের করে রবি সুদামার সামনে বসে।
“আচ্ছা! তুমি তো এখানে একাই থাকো। কিছু কি টের পাও!”
“কি টের পাব!”
“মানে কিছু !”
“ভূত প্রেত!”
“ওই আর কি। ”
“না। কেন তুমি টের পেয়েছ!”
“ঠিক সেই ভাবে না অন্য ভাবে।“
“সেটা কি রকম!”
“না মানে এই ধরো ঘুমের ঘোরে বা স্বপ্নে !”
“ঘুমের ঘোরে!”
“হুম।” বলে রবি চুপ করে যায়। তারপর বলে
“আজ কি রান্না করছ !”
“রুটি আলুচোখা আর মুসুর ডাল।”
“ওঃ। জমে যাবে !”
রবি ঘরে ফিরে এসে জানলার সামনে দাঁড়ায়। জানলার ওপাশটা বাঁশ ঝার। অন্ধকার। জোনাকিরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। জানলা ছেড়ে সে চৌকিতে উঠে বইটা খুলে বসে। বইটার মধ্যে বেশ কয়েকটা ছবি দেখতে পায় । তার মধ্যে রাজা বিনোদ নারায়নের ছবিটাও ছিল। ছবিটা আরেকবার ভাল করে পরখ করে। না কোন ভুল নেই। রাজামশাইকেই সে স্বপ্নে দেখেছে। যাই হোক বইটায় মন দেওয়ার চেষ্টা করে। প্রথম পাতাটা খুলে পড়তে আরম্ভ করে রবি।
“পুরো নাম ছিল মীর হাবিব ইসস্ফাহানি। ইরানের মানুষ । বাংলার সুবেদারের কাজ করতেন। তখন ছিল মুর্শিদকুলি খার রাজত্ব। পরে আলিবর্দির সময় এই মীর হাবিব কম্যান্ডর পর্যন্ত হয়ে যায়। কিন্তু হলে কি হয় আলিবর্দি তার মোটেই মাইনে বাড়ায় না। এর ফলে মীর হাবিবের মনের মধ্যে প্রতিশোধের স্পৃহা জেগে ওঠে। মারাঠা ডাকাত ভাস্কর পণ্ডিত যখন বাংলা আক্রমণ করে তখন মীর হাবিব তাকে সাহায্য করে। বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে সেই বর্গীদের দৌরাত্ম। তারা বাঁকুড়াতেও ধেয়ে আসে। শুরু করে লুঠপাট। আর সেটা এক আধবার না। ঘন ঘন। আর তখনই এই বাঁকুড়াতে বেশ কিছু বর্গী রয়ে যায়। জমি জায়গা দখল করে এরা বেশ সম্পদশালী হয়ে ওঠে। এদের বলা হত কুন্দ্রা। পরে এই কুন্দ্রা থেকে কুন্ডু উপাধীর উৎপত্তি। রাজা বিনোদ নারায়ন কুন্ডুর ঠাকুর্দা রামতারন কুন্ডু ছিলেন সিরাজদৌল্লার আমলের লোক। তার ছেলে বিপদতাড়ন কুন্ডুর সময় এদেশে তখনও নবাবী আমল চলছে। এর বেশ কিছু পরে বৃটিশ রাজত্ব শুরু হয়ে যায়। সেটা অষ্টাদশ শতকের কথা। বিপদতাড়ন নবাবদের আর ইংরেজদের মোসাহেবিগিরি করে ঐশ্চর্য্য বাড়িয়ে ছিলেন। তিনি মুঘলদের শেষ নবাব মনসুর আলি খাঁনের খুব প্রিয়পাত্র ছিলেন। পুষ্করণা বা পোখরণা ছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি গ্রাম নিয়ে ছিল তার জমিদারী। এ ছাড়া কলকাতাতেও তার বেনিয়ানের অফিস ছিল। তারই পুত্র বিনোদ নারায়ন কুন্ডু। বড় লাটের বউকে হীরের হার উপহার দিয়ে রাজা উপাধি লাভ করে ছিলেন। তারই সময় এই অঞ্চলের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। সঙ্গীত প্রিয় এই মানুষটির সভা ঘরে প্রতিদিন বসতো গানের জলসা। রাজা বিনোদ নারায়ন নিজে ভাল গাইতে পারতেন। এছাড়া দেশ বিদেশের ওস্তাদরাও এসে তার জলসা আলো করে দিত। রাজা মশাই যখন গান ধরতেন তখন তাকে সঙ্গত করতেন কৃষ্ণ মাঝি। কৃষ্ণ মাঝি রাজার খুব পেয়ারের লোক ছিলেন। ঢোল খোল ঢাক ও আরো নানান বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন। শোনা যায় বেশ কয়েকটা রাগও উনি নাকি সৃষ্টি করে ছিলেন। কিন্তু কালের ছোবলে সেগুলি হারিয়ে যায়। কৃষ্ণ মাঝির এক শিষ্য খুব সম্ভবত রামশরন ভট্টাচার্য বিষ্ণুপুরে চলে যান। সেখানে গিয়ে বাহাদুর খানের কাছে ন্যাড়া বাধেন। কৃষ্ণ মাঝির বংশধরেরা আজও কয়েকজন পোখরণায় আছেন। তবে অধিকাংশই পরবর্তীকালে কলকাতায় চলে যায়। যাই হোক আমরা যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম সেই মীর হাবিবের কথাতেই আবার ফিরে যাওয়া যাক” বাইরে থেকে সুদামা হাঁক ছাড়ে “কই গো চলে এসো ! গরম গরম খেয়ে নি!” রবির ঘোরটা কেটে যায়।
নয়
পরের দিন সকাল সকাল খেয়ে রবি স্কুল থেকে অর্ডারের চিঠি পত্র নিয়ে সুদামাকে প্রতি মাসে একবার করে আসবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে হাওড়ার গাড়িতে উঠে বসে। ট্রেনে ভীড় থাকলেও কোনরকমে বসার একটা জায়গা পেয়ে যায়। বর্ধমান পৌঁছতে না পৌঁছতেই ট্রেন বেশ হালকাও হয়ে যায়। জানলার ধরে বসে বেশ ফুরফুরে মনে ভাবতে থাকে এবার বংশীবাবুকে তার মাইনে বাড়ানোর কথা বলতে পারে। একটা বাউল একতারা বাজিয়ে গান গাইছে। জানলা দিয়ে মাঠ ঘাট দেখতে দেখতে সে একটু উদাসীন হয়ে পড়ে। তারপর ট্রেনের দোলায় কখন যে তার চোখ দুটো জুড়িয়ে আসে টেরই পায় না।
দশ
বংশীবাবু দোকানেই ছিলেন। রবি ভেবেছিল দোকানে আর ঢুকবে না। কিন্তু কি মনে হয় ভাবল একবার ঘুরেই যাই।
“রাজা বিনোদ নারায়ন স্কুলের অর্ডারটা হয়েছে।” রবি ব্যাগ থেকে চিঠিটা বের করতে করতে বলে ওঠে।
“জানি। নিকুঞ্জবাবুর সঙ্গে কথা হয়েছে। এই দুদিন তুমি না আসাতে কাজুকে বেশ কয়েকটা জায়গায় যেতে হয়েছিল। ওতো এসব ঠিক পারে না! অভ্যস্তও নয়!”
“যে ভাবে ঝড়টা এলো সেই সঙ্গে বৃষ্টি! আমার কোন উপায় ছিল না! বৃষ্টিতে ভিজে খুব জ্বরও হয়ে গেছিল। আপনাকে ফোনে তো সব জানিয়ে ছিলাম!”
“ফোনে জানালেই তো আর সমস্যা মিটে যায় না! বেলেতোর আর সোনামুখি বোধহয় হবে না! কি তাই তো!”
“জানি না। সারাদিন ট্রেন জার্নি করে শরীরটাও আমার ঠিক ভাল লাগছে না। আমি এখন বাড়ি যাচ্ছি। কাল আসবো।” বলে খামটা টেবিলের উপর রেখে রবি বংশীবাবুকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা লাগায়। তার এই ভাবে আচমকা বাড়ির দিকে হাঁটা লাগানোটা নিশ্চয়ই বংশীবাবু ভাল ভাবে নেবেন না। তা নাইবা নিক যদি তাকে তাড়িয়েও দেয় এর থেকে আর কত খানি খারাপ অবস্থায় পড়বে সে ! কিছু না হোক কলেজস্ট্রীটে মুটে গিরি করবে! একটা মুটের রোজগার তার থেকে বেশী। এই সব ভাবতে ভাবতে রবি হাটে। সদর দরজাটা খোলাই ছিল। রবি ভেতরে ঢোকে। বৌদির ঘর থেকে সেলাই মেশিনের শব্দ ভেসে আসছিল। রবি ঘরে ঢুকে জামা ছাড়ে। প্যান্টটা ভালো করে ভাজ করে আলনায় রাখতে গিয়ে ঠং করে মেঝেতে কিছু যেন একটা পড়ার শব্দ পায়। দেখে টেবিলের নীচে কি একটা গোল মত চকচকে জিনিস পড়ে আছে। রবি কুড়িয়ে নেয়। দেখে জিনিসটা মুদ্রাই মনে হল তার। সোনার মত রং। বেশ ভারি। তার পকেটে এল কি করে! রবি অবাক হয়ে ভাবতে থাকে।
এগারো
সকাল বেলায় রবি বাজার থেকে পাউরুটি আর দুধ কিনে ফিরছিল। রাস্তায় হারান মাঝির সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। রবি পাস কাটিয়ে চলে যাবার চেষ্টা করলেও হারান মাঝি তাকে ধরে ফেলেন।
“দুদিন গা ঢাকা দিয়ে কোথায় ছিলে! তোমার বাড়িতে গেছিলাম!”
“গা ঢাকা কোথায়! কাজে গেছিলাম! সেই বাঁকুড়ায়।“
“বাঁকুড়ার কোথায়?”
“বেলেতোর সোনামুখি আর পখন্না।”
“পখন্না! আরে সেটা তো আমার জায়গা!”
“আপনার জায়গা!”
“ওটাই তো আমাদের ভিটে।”
“ভিটে!”
“হ্যাঁ। আমার পূর্ব পুরুষ রাজা বিনোদ নারায়ন কুন্ডুর সভাসদ ছিলেন!”
রবি কথাটা আর শেষ করতে দেয় না। মুখ ফস্কে বেড়িয়ে আসে
“কৃষ্ণ মাঝি! গান বাজনার লোক ছিলেন! কি ঠিক বলছি!”
হারান মাঝি বেশ অবাক হয়েই চেয়ে থাকে রবির দিকে।
“তুমি জানলে কি করে!”
“জেনেছি। আরেকটা কথা কি জানেন!”
“কী!”
“কৃষ্ণ মাঝিকে দেখতে একদম আপনার মত ছিল! আমি তো প্রথমে ভেবেছিলাম আপনিই বোধ হয়!” কথাটা বলে ফেলে জিব কাটে রবি।
হারান মাঝির মুখটা বেশ হা হয়ে যায়।
“তুমি কি করে জানলে!”
“জেনেছি।“
“আরে কি ভাবে জানলে সেটাই তো জানতে চাইছি!”
“পরে আপনাকে বলবো। চলি।” হারান মাঝিকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত হাঁটা লাগায় রবি। এখন সে যদি বলে স্বপ্নে দেখেছি তাহলে হারান মাঝি হাসবে কিংবা তাকে পাগল ভাববে। সুতরাং চেপে যাওয়াই ভাল। হারান মাঝি রবির দিকে খানিকক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে থেকে অন্য দিকে হাঁটা লাগান।
বারো
অন্তত অবাক করা এ ঘটনাটা সে কেবল রেশমিকেই জানিয়েছে। রেশমি মুদ্রাটা দেখতে চাইলে রবি তাকে সন্ধ্যে বেলায় দোকান থেকে ফিরে এসে দেখাবে বলেছে। দোকানে গিয়ে তার সারাক্ষন মনে মুদ্রাটার কথা ঘুর ঘুর করতে লাগলো। কাজেও মন বসাতে পারছিল না। বংশীবাবু দু তিনবার ধ্যাতানিও দিলেন। সন্ধ্যেবেলায় বাড়িতে ফিরে এসে মুড়ি চিবুতে চিবুতে আচমকাই রবির স্বপ্নটার কথা মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে তার মাউথ অরগ্যান শুনে রাজামশাই তাকে জড়িয়ে ধরেন তারপর কোমরের গেজ থেকে বটুয়া বের করে কিছু দিলেন। সেটা কি এটাই ! কিন্তু সেটা তো স্বপ্ন ছিল! স্বপ্ন কখনও সত্যি হতে পারে নাকি!
“কাকা!”
ঘরের মধ্যে রেশমি এসে ঢুকেছে। রবি আলমারি খুলে রেশমিকে মুদ্রাটা দেখায়। রেশমি হাতে নিয়ে অবাক হয়ে দেখতে থাকে। তারপর রবিকে জিজ্ঞেস করে,
“তুমি এটা কিভাবে পেলে কিছুই মনে করতে পারছ না!”
রবি মাথা নাড়ে।
“কিছুই মনে পড়ছে না!”
“না। অবশ্য একটা কথা তোকে বলা হয় নি।”
“কি!”
“আমি রাজা বিনোদ নারায়ন হাই স্কুলের সিঁড়িতে বসে একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম!”
“স্বপ্ন!”
“হ্যাঁ।”
“কি স্বপ্ন ?”
“রাজা বিনোদ নারায়ন গান গাইছে। মৃদঙ্গ বাজাচ্ছে কৃষ্ণ মাঝি। আরো অনেক বাজনদাররা বাজিয়ে চলেছে। আসর খুব জমে গেছে। আমিও আর চুপ করে না থাকতে পেরে ব্যাগ থেকে মাউথ অরগ্যানটা বের করে বাজাতে আরম্ভ করলাম!”
“তারপর!”
“তারপর রাজা বিনোদ নারায়ন মাউথ অরগ্যান শুনে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন ! কোমর থেকে বটুয়া বের করে কিছু একটা দিলেন আমার মনে পড়ছে।“
“সেটাই কি তোমার মনে হচ্ছে এই মুদ্রাটা!”
“এ ছাড়া তো ! আমি তো এমন কিছু লোক নই যে সত্যি সত্যি কেউ সাধ করে আমার পকেটে ওরকম মুদ্রা রেখে যাবে!”
“সুদামা!” রেশমি প্রশ্ন করে।
“মনে হয় না।”
রেশমি এবার গম্ভীর হয়ে যায়। রবি কি বলবে কথা খুঁজে পায় না। রেশমি বলে ওঠে ,
“আমার আর সন্দেহ নেই ওই রাজামশাইই তোমাকে এটা দিয়েছে! এটা আমি একদম হান্ড্রেড পার্শেন্ট শিওর!”
“কিন্তু! কিন্তু কেমন করে দেবে! সেটা তো !”
“আমি জানি তুমি কি ভাবছ! তবে তোমাকে এটাও বলি পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা তোমার আমার ধারনার বাইরে! কিন্তু ঘটে এটা সত্যি ! এই নিয়ে তর্ক করতে যেওনা ! কোন ফয়সালা করতে পারবে না ! এখন আমাদের মুদ্রাটার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে হবে।”
তেরো
রেশমির মনে পড়ে সুজাতার বাবা কোন কলেজে যেন ইতিহাস পড়ায়। সুজাতা রেশমির সঙ্গে মাধ্যমিক দিয়েছে। তার খুব ভাল বন্ধু। সুজাতার বাবা নির্মাল্যবাবুর সঙ্গে তার পরিচয়ও আছে। মোবাইলে রেশমি সুজাতাকে সব বাদ দিয়ে কেবল মুদ্রাটার কথাটাই জানায়। বলে এটা তারা পারিবারিক সূত্রে পেয়েছে এই মুদ্রাটার সম্পর্কে সে কিছু জানতে চায়। সুজাতা তক্ষুনি নির্মাল্যবাবু সব জানায়। নির্মাল্যবাবু রেশমিকে মুদ্রাটার ভালো করে ছবি তুলে প্রিন্ট আউটটা পরের দিন নিয়ে আসতে বলেন। তিনি এটাও বলেন যদি অসুবিধে না থাকে তাহলে সব চেয়ে ভাল হয় যদি মুদ্রাটা কোনভাবে আনা যায়। ঠিক হয় কাল মুদ্রাটা নিয়ে রবি আর রেশমি সুজাতাদের বাড়ি যাবে। সন্ধ্যে বেলায়।
চৌদ্দ
নির্মাল্যবাবু চোখে আতস কাচ দিয়ে ভাল করে পরীক্ষা করে সব দেখলেন। তারপর কার সঙ্গে ফোনে কথা বলে মোবাইলে মুদ্রার প্রিন্ট আউটটা স্ক্যান করে পাঠালেন। একটু বাদে নির্মাল্যবাবুর ফোনটা বেজে উঠল। ফোনে খানিকক্ষণ কথা বলার পর তিনি রবি আর রেশমিকে জানালেন,
“মুদ্রাটা ঔরংগজেবের ছেলে শাহ আলমের সময়কার। মুদ্রার মধ্যে সেটাই লেখা আছে। সুতরাং মুদ্রাটির ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম। আর মুদ্রাটি পুরোপুরি সোনার। বোঝাই যাচ্ছে তোমরা খুব যত্ন করে রেখেছ। তাই এখনও চকচকে আছে। যাই হোক এটার বাজারে মুল্য কয়েক লক্ষ টাকা তো হবেই। তবে তোমরা একবার মিউজিয়মে গিয়ে দেখিয়ে আনলে ভাল হয়। ওরা আরো অনেক খোঁজ খবর দিতে পারবে। আমার মনে হয় ডিটেলটা জেনে রাখা ভাল। যদি যাও তো বল আমার এক পরিচিত ওখানে কাজ করে। তোমাদের সাহায্য করতে পারবে।”
“সেটা তো ভালই হয়! অ্যাংকেল তুমি তালে বলে দাও কালকেই আমরা যাব।” “কাল কি করে যাবি! কাল তো আমাদের রেজাল্ট বেরুবে!” সুজাতা পাশ থেকে রেশমিকে বলে ওঠে।
“ঠিক আছে। আমিই নয় চলে যাব।” রবি জানায়।
“ঠিক আছে। আমি ফোন করে দিচ্ছি।“ মোবাইলটা উঠিয়ে নেন নির্মাল্যবাবু।
পনেরো
লোকটির নাম সুখময় আঢ্য । নির্মাল্যবাবুর বাল্যবন্ধু। রবিকে বসিয়ে রেখে মুদ্রাটা নিয়ে ভেতরে ঢুকে যায়। কুড়ি পচিশ মিনিট পর বাইরে আসেন হাতে একটা কাগজ নিয়ে।
“পনেরো গ্রামের মত সোনা আছে। মুর্শিদাবাদ মিন্ট থেকে এই মোহর ছাপা হয়। শাহ আলমের সময়কার। সব ডিটেল এখানে লেখা আছে।” বলে মুদ্রা আর কাগজটা রবির দিকে এগিয়ে দেয়। রবি দোকানে ফিরে আসে। বংশীবাবু রবির এই যাওয়াতে একটু ব্যাজার ছিলেন। রবি ঢুকতে না ঢুকতেই বলে ওঠে,
“যাও একবার প্রেসে গিয়ে ঢু মেরে এসো। এরকম গা ছাড়া দিয়ে ঘুরে বেড়ালে ওরাও মজা পেয়ে যাবে। একটু আগে মোক্ষদা হাই স্কুল আর বিমলেন্দু হাই স্কুল থেকেও ফোন এসছিল। ওরা ইতিহাস আর ভূগোলটা নেবে বলেছে।”
এটা শুনে রবি চটে যায়! এমন একটা খুশির খবরে বংশীবাবুর এমন ব্যাজার মুখ করে বসে থাকার অর্থ কি! এই যে তিনটে স্কুলে বই ঢুকলো এতে কি বংশীবাবুর কম লাভ হবে! ওদিকে উনি মুখটা ব্যাজার করে বসে থাকবেন! তার একটু মাইনেটাও বাড়াবে না! তাক থেকে জলের বোতলটা নিয়ে জল খায় রবি। পনেরো গ্রাম সোনার দাম কত মহিম স্যাঁকরার কাছে গিয়ে আজকেই সে জেনে আসবে। কিন্তু নির্মাল্যবাবু বলছিলেন এটা এ্যান্টিক জিনিস। কয়েক লক্ষ টাকা দাম হতে পারে! রবি চিন্তা করতে থাকে।
“কি হল বসে আছ কেন! বেড়িয়ে পড়!”
“হ্যাঁ। যাই।“ রবি দোকান থেকে বেরোয়।
ষোল
প্রতিদিন সন্ধ্যে সাতটার সময় বংকু একবার চায়ের কেটলি নিয়ে টহল দিয়ে যায়। রবি তার বাঁধা খদ্দের। চা খেয়ে দোকান বন্ধ করে সে বাড়ির দিকে হাঁটা লাগায়। আজও বংকু এসে রবিকে চা দিয়ে বলে ওঠে,
“আজ একটু আদা দিয়েছি। টেস্ট করে দ্যাখো দিকি কেমন হয়েছে!”
চুমুক মেরে খুশি খুশি মুখে রবি বলে ওঠে,
“বেঁড়ে হয়েছে!”
বংকু দাম নিয়ে চলে যায়। রবি তাড়িয়ে তাড়িয়ে চা খেতে থাকে। দোকানে এখন রবি ছাড়া আর কেউ নেই। হঠাৎ রবির মনে পড়ে রেশমির তো আজ রেজাল্ট বেরুনোর কথা ! ফোন করবে কি! যা কষ্ট করে মেয়েটা পরীক্ষা দিয়েছে! যদি খারাপ খবর আসে! ভয় খায় রবি। থাক। বাড়িতে গিয়ে তো জানতেই পারবে। চায়ে চুমুক দিতে যাবে এমন সময় জামার বুক পকেটে ফোনটা বেজে ওঠে। এই বুঝি রেশমির ফোন এল! তাড়াতাড়ি বের করে দেখে অচেনা নম্বর একটা।
“হ্যালো!”
“নমস্কার। রবিবাবু বলছেন!”
“হ্যাঁ।”
“আমি শ্রী নিবাস চক্রবর্তী বলছি। নির্মাল্য সেনগুপ্ত যখন ফোনে তার বন্ধুটির সঙ্গে আপনার মুদ্রাটি বিষয়ে কথা বলছিলেন আমি তখন সামনেই ছিলাম। ফলে আপনাদের সব কথাই আমার কানে আসে। পরে আমি নির্মাল্যবাবুকে ফোন করে আপনার নম্বরটা জেনে নি। যাই হোক আমি পুরোন জিনিস কেনা বেচা করি। আমি আপনার ওই মুদ্রাটি সম্পর্কে আগ্রহী। আপনি কি ওটা বিক্রি করতে চান!”
“এখনও পর্যন্ত ভাবিনি কিছু।”
“দেখুন ওটা শুধুমুধু রেখে দিয়ে আপনার কোন লাভ নেই। বরং ওটা বিক্রি করে দিলে আপনারই লাভ বেশী। ভাল জিনিস পেলে আমি দাম দিতে কার্পন্য করি না।”
এই কথা শুনে রবির কৌতূহল হয়। জিজ্ঞেস করে,
“কত দেবেন একটু জানতে পারি কি!”
“আমি ওই কয়েনটার জন্য আপনাকে দু লাখ টাকা দেব।”
রবি শুনে একটু থমকে যায়। তারপর আমতা আমতা করে বলে,
“ঠিক আছে। আমি চিন্তা করে আপনাকে জানাব।”
“আমি কাল আপনাকে ফোন করে নিচ্ছি। একটু ভেবে আমাকে জানাবেন। আপনি কি করেন সেটাও আমি জেনে নিয়েছি। সব মানুষই ভাল ভাবে বাঁচতে চায়। দু লাখ টাকা আপনাদের মত লোকের পক্ষে খুব কম কিন্তু নয়! যেটা বললাম ভেবে দেখবেন। নমস্কার।”
মোবাইলটা অফ করার সঙ্গে সঙ্গে আবার বেজে ওঠে। এবার রেশমির ফোন। রবি তাড়াতাড়ি ধরে।
“হ্যাঁ। বল!”
ভেসে আসে রেশমির উত্তেজিত কন্ঠস্বর,
“কাকা! আমি স্টার পেয়েছি! অংকে লেটার পেয়েছি!”
“বলিস কিরে!”
“তুমি তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলে এসো! রাখছি!”
“হ্যাঁ হ্যাঁ আমি এক্ষুনি আসছি।”
রবি তাড়াতাড়ি চাটা শেষ করতে থাকে।
সতেরো
আজ রবির মাথা আর শরীরের উপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে গেছে। মুঘল সম্রাট শা আলমের মুদ্রা তার আলমারিতে। যার দাম দু লাখ টাকা ! এটা সামলাতে তাকে এখনও হিমশিম খেতে হচ্ছে! উপরন্তু রেশমির স্টার পাওয়ার খবরটাও তার মাথাটা বেশ করে ঝাঁকিয়ে দিয়ে চলে গেছে ! আর সেই সঙ্গে ঘোরাঘুরি তো ছিলই। তাই শোওয়া মাত্রই ঘুমিয়ে পড়ে সে। আজও রাজা বিনোদ নারায়ন স্বপ্নে দেখা দিলেন। দামোদরে চলেছেন স্নানে। কোমরে গামছা জড়ানো। পায়ে নাগরা। চারিদিকে জ্যোৎস্না একেবারে ফিনিক দিয়ে উঠেছে। পিছু পিছু চলেছে রবি। কাঁধে তার রাজামশাইএর আরেকটা গামছা। যেতে যেতে কালোয়াতি গান ভাজছেন রাজামশাই। তারপর আচমকাই গান থামিয়ে রবিকে বলে ওঠেন,
“ওই যে ওই জিনিসটা ছোটো লাঠির মত বাজাচ্ছিলে বটে আরেকবার হোক ক্যানে!”
রবি মাউথ অরগ্যানটা খুঁজতে থাকে। আর রাজমশাই দামোদরের দিকে এগিয়ে চলেন। এই খোঁজাখুঁজি করতে গিয়েই রবির ঘুমটা ভেঙে যায়। রবির ঘরের দেয়ালে মান্ধাতা আমলের একটা ঘড়ি আছে। সময়টা দেখে নিয়ে আবার পাশ ফিরে শোয় সে। দুটো কুড়ি বাজছে। ‘ তেরে কেটে তাক! ধিন তাক! তাক কেরে ওরে তাক কেরে ! ধিন তাক! না কেরে কেরে তাক কেরে তাক! ধিন তাক!’ রবি পাশ ফিরে দেখে খাটের পাশে বসে কৃষ্ণ মাঝি মুখে মুখে বল কাটছে। রবি অবাক হয়।
“ইয়ে আপনি হঠাৎ!”
কৃষ্ণ মাঝি তার খ্যান খ্যানে গলায় বলে ওঠেন,
“শোভা বাজারের রাজার বাড়ির জলসায় এয়েচিনু আমার নাতির বাজনা শুনতে! এদিকেও তো আমার জ্ঞাতি গুষ্টি সব থাকে।”
“আপনার কোন পুরুষের নাতি!”
“হবেক একটা!”
“তা কেমন বাজালে!”
“তালে এখনও বিস্তর ভুল মারছে। একবার ভাবলুম দিইগে কানটা বেশ করে মুলে!”
“ভাগ্যিস করেন নি! তাহলে ওত গুলো লোকের সামনে আপনার নাতি খুব মুশকিলে পড়তো!”
“রাজামশাই বলেছিল যাচ্ছ যখন ছোড়াটার একটু খবর নিও হে। তাই তোর কাছে এনু। ওদিকেও তো আবার আসর বসার সময় হল!” এই বলে জোব্বা থেকে নস্যির কৌটো বের করে নাকে বেশ করে নস্যি গুজে দেয়।
“আসলে কি জানেন তো এখন তাল সুর ছন্দ সব অন্য রকম হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে আমরাও ঠিক বুঝতে পারি না!” এই বলে রবি চোখ বন্ধ করে খুব জোরে এক হাঁচি দেয়। চোখ খুলে দেখে কৃষ্ণ মাঝি হাওয়া হয়ে গেছে। ভোরের আলো জানলা দিয়ে এসে চোখে মুখে পড়লে রবি এপাশ ওপাশ করে উঠে পড়ে। দেখে বালিসের পাশে একটা চকচকে ছোট্টো কৌটো পড়ে আছে। কি করে এলো! কৌটোর ঢাকনা খুলে রবি দেখে তার ভেতরে নস্যিতে ভরা। রাতের স্বপ্নের কথা মনে পড়ে যায় । সারা শরীরটা আবার কাঁপুনি দিয়ে ওঠে।
আঠারো
ছাপাখানা আর দপ্তুরিদের দরবার করে রবি দোকানে এসে দেখলো বংশীবাবু কেমন মনমরা হয়ে বসে আছেন। ইদানিং উনি যখন তখন মনমরা হয়ে পড়ছেন! হঠাৎ হঠাৎ করে রেগেও যাচ্ছেন! কেন যে এরকম হয়ে গেলেন রবি ঠিক বুঝতে পারছে না! অথচ ব্যবসা এখন বেশ ভালোই চলছে। লোকটার হলটা কি!
“কাজ হল!” বংশীবাবু রবিকে জিজ্ঞেস করেন।
“হ্যাঁ ছাপার কাজ পাঁচ ছ দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। আর দপ্তুরি বলল আর দুদিন লাগবে।“
“তাহলে তুমি সামনের সপ্তাহে বেড়িয়ে পড়ো।”
রবি কিছু বলে না। আসলে তার আর বাঁকুড়া যেতে ইচ্ছে করছিল না। জায়গাটা বড়ই ভূতুড়ে! কিন্তু উপায় নেই! যেতেই হবে!
“আজ কাজু আমেরিকা চলে গেল!’ কথাগুলো হাহাকারের মত বেড়িয়ে এল বংশীবাবুর মুখ থেকে।
“আমেরিকা! ভাল চাকরি পেয়েছে বুঝি!”
“হ্যাঁ। আর মনে হয় না আসবে ! ওখানেই সেটেল্ড করে যাবে!”
“তো ভালই তো। ওখানে গেলে তো মানুষ বর্তে যায়! এটা তো ভাল খবর! আপনি চুপচাপ বসে ছিলেন ভাবলাম কি জানি কোন সমস্যা হল কিনা !”
“না সমস্যা কিছু না। ভেবে ছিলাম ব্যবসাটা দেখবে। আমারও তো বয়েস হচ্ছে। এখন ভাবছি ভাল পার্টি পেলে দোকানটা বিক্রি করে দেব। দু একজনের সঙ্গে কথাও বলেছি। কাল একজন আসবে বলেছে। দেখা যাক কি হয়!”
এ কথা শুনে রবিও কেমন মনমরা হয়ে পড়ে। সকালে রেশমিকে একবার নস্যির কৌটোটার কথা বলেওছিল সে। রেশমি তখন স্কুলে যাচ্ছিল মার্কশিট আনতে। বলল সন্ধ্যে বেলায় এই নিয়ে কথা হবে। দুপুর হয়ে এসছে। রবি তার ঝোলাটার ভেতর থেকে কৌটো খুলে চারটে রুটি আর তরকারি বের করে এক কোনে বসে খেতে থাকে। বৌদিকে সে অনেক বার বলেছে সকালে তোমার অনেক ঝামেলা থাকে আমাকে টিফিন দিতে হবে না। আমি সামনের ভুজিওলার দোকান থেকে মুড়ি টুরি যা হোক একটা কিছু খেয়ে নেব। কিন্তু বৌদি কিছুতেই শুনবেনা! খেয়ে দেয়ে টিউকল থেকে কৌটোটা যখন সে ধুচ্ছিল তখনই শ্রীনিবাসবাবুর ফোনটা আসে।
“কিছু ভাবলেন!”
“না। এখনও ভেবে উঠতে পারিনি।”
“তাড়াতাড়ি ভাবুন। বেশী দেরী করলে আবার মুশকিলে পড়ে যাবেন!”
“মুশকিল বলতে!”
“ব্যাপারটা রটে গেলে আপনি নিজেই তখন বিপদে পড়বেন! তখন কেউ তো আর চুপ করে বসে থাকবে না! আর এই সব লাইনে সবসময় ভদ্রলোক পাবেন না। তাই বলছিলাম সময় থাকতে থাকতে ডিলটা করে নিলে পারতেন!”
“আমি একটু বাড়িতে কথা বলে নি। তারপর আপনাকে জানাবো।”
“বেশী দেরী করবেন না। রাখছি। পরে আবার ফোন করবো।” লাইনটা কেটে দেয় শ্রীনিবাস। রবি দোকানে ফিরে আসে। বংশীবাবু একটু বাদে চলে গেলেন। রবির মাথায় নানান চিন্তার স্রোত বয়ে যেতে থাকে। খাচ্ছিল তাতি তাত বুনে কাল হল এঁড়ে গরু কিনে! দুঃখ দারিদ্র্য নিয়ে সে বেশ ছিল কোত্থেকে রাজা মশাই এসে মুদ্রা দিয়ে তার একদম বারোটা বাজিয়ে দিয়ে চলে গেল ! গুম হয়ে বসে থাকে রবি। আসতে আসতে সন্ধ্যে নেমে আসে। ষষ্টীপদ ঢোকে। হাতে তার লটারির টিকিট। এই বেচেই ওর সংসার চলে। মুখে অনেক দিনের না কামানো দাঁড়ি। ঢুকে রবিকে বলে,
“কি ভাবছ!”
“না। তেমন কিছু না।”
“বোতলটা একটু এগিয়ে দাও !”
রবি জলের বোতলটা ষষ্টীর দিকে এগিয়ে দেয়। ঢক ঢক করে বেশ অনেকটাই জল খেয়ে ষষ্টীপদ বোতলটা টেবিলের উপর রাখে। মলিন জামার হাতাটা দিয়ে মুখটা মুছে রবিকে বলে
“কেমন গরম পড়েছে দেখেছ! একেবারে সেদ্ধ হয়ে গেলাম!”
রবি বোতলটা নিয়ে তাকে রেখে দেয়।
“একটা নেবে নাকি! ভাল খেলা আছে!”
“আরে না! ওসব আমাদের কপালে নেই।”
“বলা তো যায় না! কখন কি হয়ে যায়!”
রবি কিছু বলে না। ষষ্টী খানিক চুপ করে থেকে বলতে থাকে,
“আর তুমি এটা দেখেছ! ভগবানের যত মার শুধু গরীবদের উপর! কেন রে! আমি কি তোর পাকা ধানে মই দিয়েছি ! ছোটো মেয়েটা কাল থেকে হাসপাতালে ! ডাক্তার বললে শরীরে নাকি হিমোগ্লোবিন নেই! আজকেই বউএর একটা মিনে করা হার ছিল! বসাকদার কাছে বন্ধক রেখে কিছু টাকা যোগার করেছি! ওদিকে মেয়ের এই অবস্থা মেয়ের মায়ের আবার সকাল থেকে ধুম জ্বর। ভয়ের চোটে আর খবরই নিইনি! নাঃ! উঠি। চলি।” বলে ব্যাগটা নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়ায় ষষ্টী। অভাবে দুশ্চিন্তায় মানুষটা কেমন কুজো হয়ে গেছে। সিঁড়ি দিয়ে ঘাড় নীচু করে ষষ্টী যখন নেমে যাচ্ছিল রবির কেমন মায়া হয়।
“ষষ্টীদা!”
ষষ্টী সিঁড়ি দিয়ে দুটো স্টেপ নেমে গেছিল। থেমে পড়ে। ঘুরে তাকায় রবির দিকে।
“কিছু বলবে!”
“হ্যাঁ।”
ষষ্টী আবার সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে আসে। রবি ততক্ষণে প্যান্টের পকেট থেকে দুশো টাকা বের করে ফেলেছে।
“এটা রাখো।” বলে টাকাটা এগিয়ে দেয়।
“কেন!”
“তোমার এখন টাকা পয়সার দরকার। রাখো।”
ষষ্টী রবির দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে।
“নাও। ধরো।”
“কিন্তু!’
“পরে সুবিধে মত দিয়ে দিও। কোন চাপ নেই।”
ষষ্টীপদ টিকিটের বান্ডিল বের করে রবির সামনে তুলে ধরে বলে,
“এর থেকে একটা তুলে নাও!”
“আরে না! বরং বেচলে তোমার এখন উপকার হবে।“
“তুমি না নিলে এই টাকাও আমি নেবো না! আমার অনুরোধ যে কোন একটা তুলে নাও।”
রবি খুব মুশকিলে পড়ে।
“কিন্তু!”
“নাও। তুলে নাও একটা।”
রবির দ্বিধা গ্রস্ত ভাব দেখে ষষ্টীপদই জোর করে একটা টিকিট রবির হাতে গুঁজে দিয়ে দোকান থেকে বেড়িয়ে যায়।
উনিশ
আজ রবিদের বাড়িতে সন্ধ্যেটা একটু অন্য রকম ছিল। দোকান থেকে ফিরে হাত মুখ ধুয়ে গামছা দিয়ে রবি যখন হাত মুখ মুচ্ছিল রান্নাঘর থেকে বৌদির গুন গুন করে গান ভেসে আসছিল। উঠোনের ভাঙ্গা দেয়ালের ওপাশে তালগাছটার সঙ্গে গোল চাঁদটা যেন কথা বলছে। গামছাটা দড়িতে মেলে দিয়ে রবি ঘরের দিকে পা বাড়াতে যাবে বৌদি বলে ওঠে,
“একটু সবুর কর। আজ বেগুনি আর ফুলুরি ভাঝছি। মুড়ি দিয়ে খাবে।”
রবি অবাক হয়। রান্না ঘরে উঁকি মেরে বলে,
“আজ হঠাৎ বেগুনি ফুলুরি !”
“তোমার দাদা ফোন করেছিল। প্রমোশন পেয়েছে। তাই ভাবলাম রোজই তো শুকনো মুড়ি চিবোয়। তাই আজ!”
“তুমি যখন গুন গুন করে গান গাইছিলে তখনই আমার মনে হল আজ সন্ধ্যেটা যেন একটু অন্য রকম! মিলে গেল দেখছি।”
বৌদি হাসে। রবি নিজের ঘরের দিকে যায়। রেশমি বাড়ি নেই। বন্ধুর বাড়িতে গেছে। চৌকিতে বসে জানলা দিয়ে আকাশটা দেখতে দেখতে রবি তাদের জীবনের কথাই ভাবছিল। দারিদ্র্য তাদের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলেও বুনো ঝোপের মধ্যে যেভাবে মাঝে মধ্যে সুন্দর সুন্দর বনফুল ফুটে ওঠে তাদের জীবনটাও খানিকটা সেরকম। সবটাই বোধহয় নিরানন্দের নয়! বৌদি বাটিতে করে মুড়ি বেগুনি নিয়ে আসে। রবি বাটিটা নিতে নিতে বলে ওঠে,
“আরে এতো! রেশমির জন্য কই!”
“সব আছে। তুমি খাও তো! ওরা এলে আবার ভেজে দেব। তুমি খাও।” এই বলে বৌদি রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ায়। রবি বলে ওঠে,
“তুমি একটু আগে রান্না ঘরে বসে গুন গুন করে গাইছিলে! আজকাল গাওনা কেন!”
“আজকাল গাইনা কেন! আমাদের গান গাওয়া কি সাজে!”
“কেন! অসুবিধের কি আছে! তোমাকে যখন প্রথম দেখতে যাওয়া হল! দাদার সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম। তোমার মনে আছে কি না জানি না! তখন তুমি!”
কথা শেষ করার সুযোগ না দিয়ে মালতি গেয়ে ওঠে “ চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে উছলে পড়ে আলো! ও মাধবীগন্ধা তোমার গন্ধ সুধা ঢালো!” মালতি গেয়ে চলে। রবি মুড়ি বেগুনি খেতে খেতে মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকে। একটু বাদে রেশমি এসে হাজির হয়। সেও অনেকদিন বাদে মায়ের গলায় গান শুনে অবাক হয়ে ওঠে। গান শেষ হলে রেশমি হাততালি দিয়ে বলে ওঠে।
“বিউটিফুল! দারুন!”
“সত্যি দারুন!” রবিও জানায়।
মালতি হেসে বলে ওঠে
”অনেক হয়েছে! হাত মুখ ধুয়ে খাবি আয়।” বলে রান্না ঘরের দিকে যায়। রেশমি রবিকে বলে ওঠে
“দাঁড়াও। এসে কথা বলছি।”
রবি চেঁচিয়ে বলে ওঠে,
“বৌদি ফুলুরিটা জব্বর হয়েছে আরেকটা হবে !”
কুড়ি
বংশীবাবু একজন ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলছিলেন। প্রিন্টিং লাইনের লোক। কলেজ স্ট্রীট পাড়ায় একটা দোকান চাইছেন। রবি লোকটির জন্য চা বিস্কুট নিয়ে এলো। লোকটি সুরুক সুরুক করে চা খেতে খেতে বংশীবাবুর সঙ্গে আস্তে আস্তে কি কথা বলতে লাগলো কিছুই কানে এল না রবির। শুধু বুঝতে পারলো কিছু দিন বাদেই তাকে পথে নামতে হবে। এদিকে আবার রেশমি তাকে যে কথা গুলো বলেছে সেটাও সে উড়িয়ে দিতে পারছে না। রেশমি তাকে বলেছে রাজামশাই ভালোবেসে তার মাউথ অরগ্যান শুনে তাকে কত দামী একটা সোনার মুদ্রা উপহার দিল সেটা বিক্রি করে দেওয়াটা মোটেই ভাল দেখায় না। রাজামশাই তাহলে খুব দুঃখ পাবে। শুধু মুদ্রাটা নয় রেশমি নস্যির কৌটোটাও কাউকে দিতে বারন করেছে। ওটাও দেখে মনে হচ্ছে সোনার! কিন্তু অভাব যে তার পিছু ছাড়ছে না! দোকানটাও হাত বদল হয়ে যাচ্ছে। নতুন মালিক তাকে রাখবে কি না তারও কোন গ্যারেন্টি নেই! অবশ্য বংশীবাবু রবিকে বলেছে যাতে রাখে সেটা উনি দেখবেন। সবটাই অনিশ্চিত। কি করবে কি করা উচিৎ কিছুই ভেবে কুল কিনারা পাচ্ছিল না রবি। তবে মুদ্রা আসার পর থেকে কিছু কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করেছে রবি। যেটা একদম ফেলে দেওয়াও যাচ্ছে না। রেশমিই তার চোখটা খুলে দিয়েছে। প্রথমত রেশমি স্টার পেয়েছে। অংকে লেটার পেয়েছে। এর আগে সে কোন রকমে কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে পাস করতো। অংকে চল্লিশের বেশী উঠতই না! এবারে একেবারে আশি! সুগত রবির দাদা রোজই বলতো না আর পারা যাচ্ছে না এবার অন্য কাজ দেখতে হবে! রাজামশাইএর মুদ্রা পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই দাদার প্রমোশন হয়ে গেল। মাইনেও অনেক বেড়ে গেছে দাদার। বৌদি আজকাল প্রায়ই গুন গুন করে গান করে। সবাইয়েরই ভাল হল! সেই শুধু যে তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে গেল! উল্টে চাকরিটা না চলে যায়! ব্যাজার হয়ে রাস্তার লোকজন দেখছিল সে। লোকটি যাবার জন্য উঠে দাঁড়ায়। রবিও দাঁড়ায়। লোকটি চলে গেলে বংশীবাবু বললেন,
“তোমার কথা বললাম। বললে কম্পুটার চালাতে পারে কি না! তুমি তো সেটা আবার জানো না! ওটা শিখে নিলে তোমারই লাভ হত! দেখা যাক কি হয়! যাক গে! তাহলে তুমি কবে যাবে! এখন একবার প্রেসে গিয়ে কিছু টাকা দিয়ে একটু চাপ দিয়ে এসো গে যাও । আমি চেকটা লিখি দিচ্ছি।” বলে বংশীবাবু চোখে চশমা এটে চেক লিখতে বসে যান।
রবি আমতা আমতা করে বংশীবাবুকে বলে ফেলে,
“মনে হচ্ছে উনি আমাকে রাখবেন না! কারন ওনার কম্পুটার জানা লোক দরকার। এখন এই অবস্থায় কি করবো কোথায় যাব কিছুই বুঝতে পারছি না!”
“চিন্তা কর না। তোমাকে যাতে রাখে আমি সেই চেষ্টা করবো।”
“আপনি কিছু যদি আমাকে দেন তাহলে ফুটপাথে আমি বই নিয়ে বসতে পারি।”
“আমি কোত্থেকে দেব! বাজারে কত টাকা লোকে পাবে তোমার সেটা ধারনা নেই ! আমি দেখছি! এখনই অত হতাশ হয়ে পড় না! এই নাও। আর মনে করে মনি রিসিট আনবে। আগেরবার খুব ঝামেলা হয়ে ছিল।”
এরপর রবির আর কিছু বলার থাকে না। বুঝতে পারে বলেও বিশেষ কিছু আর হবে না। বাইরে প্রখর দাবদাহের মধ্যে রাস্তায় নেমে সে হাঁটা লাগায়।
একুশ
অন্য দিন রাতে রবি চারটে রুটি খায় আজ মাত্র একটা খেয়েই উঠে পড়লো। বলল ক্ষিধে নেই। বিছানায় শুয়ে কিছুতেই দু চোখের পাতা এক করতে পারেনা সে। সমস্ত দিন সে দুশ্চিন্তায় ছিল। তবু কাজের মধ্যে ছিল বলে অতটা গায়ে লাগে নি। বাড়িতে ঢোকা মাত্র দুশ্চিন্তাগুলো যেন তাকে জাপটে ধরল। সে বুঝতে পারছে সামনে খুব বড় একটা দুর্যোগ এগিয়ে আসছে। কি করে সেটার মোকাবিলা করবে সে কথাই ভাবছিল সে। আর ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখটা লেগে গেছিল বুঝতে পারে নি। হঠাৎই ঘরে মশ মশ করে কে যেন হেঁটে বেড়াচ্ছে মনে হল তার। দেখে কৃষ্ণ মাঝি সারা ঘরে কি যেন হন্যে হয়ে খুঁজছে! একবার খাটের তলায় দেখছে। আরেকবার দাদুর আমলের ট্রাঙ্কটা উঠিয়ে নিয়ে দেখে নিল। সেটা রেখে দিয়ে দেয়ালের তাকের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে রবির শখের বইপত্র গুলো লন্ড ভন্ড করতে লাগলো। রবির সাধের মাউথ অরগ্যানটাও মাটিতে ফেলে দিল। লোকটা ভেবেছে কি!
“আরে! আপনি এ কি করছেন!”
খ্যানখ্যানে গলায় কৃষ্ণ মাঝি বলে ওঠে,
“আমার নস্যির ডিবেটা! কোথায় গেলে বটেক! ওটা বড় শখের আমার! রাজামশাই দিয়েছিলেক ! ওহো! ওটা কাল থেকে খুঁজে খুঁজে মরছি!”
“সেটা তো বল্লেই হয় ! দিলেন তো সব কিছু লন্ডভন্ড করে!”
রবি তড়াক করে চৌকি থেকে উঠে আলমারির খুলে নস্যির কৌটোটা বের করে কৃষ্ণ মাঝির হাতে দেয়। কৃষ্ণ মাঝি এক গাল হেসে সেটা ছোঁ মেরে নিয়ে কর্পুরের মত উবে যায়।
আধো ঘুমে আধো জাগরনে কোথা থেকে একটা কলিং বেলের শব্দ ভেসে আসছে যেন! শব্দটা কোত্থেকে আসছে বুঝতে রবির একটু সময় যায়। নাঃ এটা তো তাদেরই বাড়ির কলিং বেলের শব্দ! সে উঠে উঠোনের দরজা খুলে দাঁড়ায়। দেখে সামনে ষষ্টী দাঁড়িয়ে। ওকে দেখে বুকটা ছ্যাত করে ওঠে রবির। তবে কি ওর মেয়ের কিছু হল!
“হাঁ করে দেখচ কি! টিকিটটা কোথায়!”
“টিকিট!”
“আরে যে টিকিটটা আমি তোমায় দিয়ে ছিলাম! সবই কি ভুল মেরে দিয়েছ!”
“কেন! দেখতে হবে কোথায় আছে।” রবির ঘুমের জড়তা তখনও কাটেনি।
“আরে তাড়াতাড়ি দেখো কোথায় আছে!”
“কেন! কি হয়েছে!”
“আরে বলছি তো ওটা আগে দেখো কোথায় আছে! আমার কমিশন ঢুকে গেছে। কাল থেকে হন্যে হয়ে ভাবছি টিকিটটা কাকে বেচলাম! বেশ কিছু জায়গায় খোঁজও করলাম! ভাবতে ভাবতে শেষ রাতে তোমার মুখটা মনে পড়ে গেল। ভাবলাম দেখি তো গিয়ে একবার! যা ভেবেছি তাই! তুমি টিকিটের কথা একেবারে ভুল মেরে দিয়েছ! তাড়াতাড়ি দেখো একবার!”
রবির এবার মনে পড়ে। সে ঘরে ঢুকে জামা প্যান্ট তল্লাশি চালিয়ে কিছুই উদ্ধার করতে পারে না। বৌদি কেঁচে ফেল্লে মুশকিল! রবি বৌদিকে ডেকে তোলে। বৌদি দরজা খুলে দাঁড়ায়। মুখে তার ভয় আর উৎকণ্ঠা।
“কি হয়েছে!”
“কোন লটারির টিকিট তুমি দেখছ!”
“লটারির টিকিট!” মালতি মনে করতে থাকে।
“আমার জামার পকেটে ছিল!”
”তোমার জামা কাপড় তো কালকেই কাচলাম! এখন যদি জামার পকেটে! ও মনে পড়েছে একটা কাগজ আমি তোমার প্যান্টের পকেটে পেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা! কেন! কি হয়েছে!”
“ওটা লাগবে! খুব জরুরী!” কথাগুলো ষষ্টীই জানায়।
“দেখছি।“ বলে মালতি আবার ঘরের ভেতর ঢুকে খানিক বাদে হাতে টিকিটটা নিয়ে বেরিয়ে আসে।
“তোষকের নীচে রেখে দিয়েছিলাম ! তোমাকে দেওয়া হয়ে ওঠে নি! দেখো তো এটা কি না!”
মালতির কথা শেষ হবার আগেই ষষ্টী সেটা ছোঁ মেরে নিয়ে কাগজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে থাকে। তারপর আচমকাই রবিকে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে
“তুমি রাজা হয়ে গেছ রবিদা! তুমি রাজা হয়ে গেছ!”
বাইশ
“বলছিলাম কি ওই লোকটি ফাইন্যালি কিছু জানিয়েছে আপনাকে!”
“কোন লোকটা!”
“যিনি আপনার দোকানটা দেখে গেলেন। আমি তার কথাই বলছিলাম।“
“না। এখনও পর্যন্ত জানাই নি। বুঝতে পারছি না!”
“কত দর রেখেছেন?”
“কেন কোন পার্টি টাটি পেয়েছ নাকি!”
“ওই আর কি!”
“তিরিশ লাখ চেয়েছি। সাতাশ পেলে ছেড়ে দেব।”
“ওটা পচিশ করা যায় না!”
“পচিশ!” বংশীবাবু একটু ভাবিত হয়ে বলে ওঠেন, “ পার্টি তোমার কি খুব চেনা!”
“ওই আর কি!”
“ঠিক আছে নিয়ে এসো একদিন।”
“আনার আর দরকার নেই! পার্টি আপনার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে!”
বংশীবাবু অবাক হয়ে চেয়ে থাকেন। ছোকরা বলে কি! সকালেই গাঁজা টাজা খেয়ে এসছে নাকি! অভাবেও শোনা যায় অনেক মানুষ পাগল হয়ে গেছে। একটু অবাক হয়ে চেয়ে থাকেন উনি রবির দিকে।
“আপনার কি সেল ডিড রে্ডি আছে!”
“না ইয়ে এখনও করিনি! তুমি কি সিরিয়াস!”
“এখনও পর্যন্ত আপনি আমার মনিব। আপনার সঙ্গে ইয়ার্কি মারার স্পর্দ্ধা আমার নেই। হ্যাঁ আমি একদম হান্ড্রেড পার্শেন্ট সিরিয়াস।“
বংশীবাবু এবার একটু নড়ে চরে বসেন। কিন্তু তবু তার অবাক হওয়ার ভাবটা যায়না। তিনি আরেকবার বড় বড় চোখ করে রবির দিকে চেয়ে থাকেন।
একটা কথা বলে এই কাহিনী শেষ করবো। নস্যির ডিবেটা কিন্তু সত্যি সত্যিই আর পাওয়া যাই নি। কথাটা বিশ্বাস না হলে তোমরা ছয়ের বি কলুটোলা স্ট্রীটে গিয়ে দেখতে পারো। ওখানেই রবি থাকে।#




