২৬ মে ১৯৭১: বুরুঙ্গা, তেলিগাতি ও আঠারোগাতি গণহত্যা

১৯৭১ সালের ২৬ মে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত ও শোকাবহ দিন। এদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সিলেটের বুরুঙ্গা এবং বাগেরহাটের তেলিগাতি ও আঠারোগাতিতে ভয়াবহ গণহত্যা চালায়। নিরস্ত্র গ্রামবাসী, নারী-শিশু ও সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে পরিচালিত এসব হত্যাযজ্ঞ পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ভয়াল চিত্র তুলে ধরে।

সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার বুরুঙ্গা গ্রামে ২৬ মে দুপুরে সংঘটিত হয় এক ভয়াবহ গণহত্যা। শহীদ হন অন্তত ৯৪ জন সাধারণ মানুষ। এই হত্যাযজ্ঞ ছিল পূর্বপরিকল্পিত এবং স্থানীয় দালালচক্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সংঘটিত।

২৫ মে দুপুরে পাকিস্তানি বাহিনী এলাকায় আসছে— এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে বুরুঙ্গা ও আশপাশের গ্রামগুলোতে আতঙ্ক নেমে আসে। বিকেলে স্থানীয় চেয়ারম্যান ইনজাদ আলীর সঙ্গে দেখা করেন গ্রামবাসীরা। চেয়ারম্যান আশ্বাস দেন যে পরদিন বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে একটি শান্তি কমিটি গঠন করা হবে এবং ‘পিস কার্ড’ বিতরণ করা হবে। তাঁর নির্দেশে ঢোল পিটিয়ে গ্রামের মানুষকে সেখানে উপস্থিত হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।

মানুষের মনে ভয় থাকলেও চেয়ারম্যানের কথায় আস্থা রেখে ২৬ মে সকাল থেকেই বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জড়ো হতে থাকেন তারা। সকাল আটটার মধ্যে সেখানে এক হাজারের বেশি মানুষ সমবেত হয়। কিছুক্ষণ পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী স্থানীয় সহযোগী আব্দুল আহাদ চৌধুরী ও ডা. আব্দুল খালেককে সঙ্গে নিয়ে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আসে। তারা তালিকা মিলিয়ে উপস্থিত লোকজনের হিসাব নেয় এবং গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুরুষদের বিদ্যালয় মাঠে আসতে বাধ্য করে।

সকাল দশটার দিকে উপস্থিত মানুষদের হিন্দু ও মুসলমান— এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। হিন্দুদের একটি কক্ষে এবং মুসলমানদের অন্য কক্ষে রাখা হয়। মুসলমানদের কালেমা পাঠ ও পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত গাইতে বলা হয়। এরপর অধিকাংশ মুসলমানকে ছেড়ে দেওয়া হলেও কয়েকজনকে দিয়ে হিন্দুদের চারগাছি দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। আতঙ্কিত মানুষদের কান্না ও চিৎকারের মধ্যেই শুরু হয় পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচার ব্রাশফায়ার।

দুপুরের দিকে বন্দিদের বিদ্যালয় ভবন থেকে মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিন সারিতে দাঁড় করিয়ে মেশিনগান দিয়ে গুলি চালানো হয়। মুহূর্তেই রক্তে ভেসে যায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। হত্যাকাণ্ডের পর শহীদদের মরদেহে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, যেন অপরাধের চিহ্ন মুছে ফেলা যায়। এমনকি সিলেট জজ কোর্টের খ্যাতিমান আইনজীবী রাম রঞ্জন ভট্টাচার্যকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তিনি চেয়ারে বসা অবস্থা থেকে উঠতেই পেছন থেকে গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়।

গণহত্যার পর স্থানীয় রাজাকারদের একটি দল পুরো গ্রামে লুটপাট চালায়। এই গণহত্যাগুলো ছিল সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ও নিরপরাধ মানুষের ওপর পরিচালিত এক নৃশংস হত্যাযজ্ঞ, যেখানে মানবতা, সহমর্মিতা ও ন্যূনতম যুদ্ধনীতিরও কোনো বালাই ছিল না।

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে তেলিগাতি ও আঠারোগাতি গণহত্যা:
একই দিনে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার তেলিগাতি ও আঠারোগাতিতেও সংঘটিত হয় আরেক হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ড। তেলিগাতি ছিল আওয়ামী লীগের একটি শক্ত ঘাঁটি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সক্রিয় অবস্থান ছিল সেখানে। পাকিস্তানি বাহিনী বারবার গ্রামটি আক্রমণ করলেও ২৬ মের আক্রমণ ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ।

সেদিন পিরোজপুরে অবস্থানরত পাকবাহিনী তেলিগাতি ক্যাম্প আক্রমণ করে। যুদ্ধে দুইজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং বাকিরা আত্মরক্ষার্থে পাশের চাপড়ি গ্রামের হালদার বাড়িতে আশ্রয় নেন। কিন্তু প্রবল গোলাগুলির মুখে সেখান থেকেও তারা সরে যেতে বাধ্য হন।

মুক্তিযোদ্ধারা চলে যাওয়ার পর পাকিস্তানি সৈন্যরা হালদার বাড়ি ঘেরাও করে। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে আতঙ্কে লুকিয়ে থাকা পরিবারের সদস্যদের টেনে বের করে একে একে গুলি করে হত্যা করা হয়। শহীদ হন আমির আলী হালদারের চার পুত্র— রফিজ উদ্দিন হালদার, সাইজদি হালদার, মোক্তার উদ্দিন হালদার ও হাচেন আলী হালদার। একই সঙ্গে নিহত হন তাঁর পৌত্র সাহাব উদ্দিন হালদার ও শাহাদাৎ হালদার।

এ হত্যাযজ্ঞের এক জীবন্ত সাক্ষী ছিলেন জোবেদা খাতুন। গুলিবর্ষণের সময় তিনি পুকুরপাড়ের ঝোপে লুকিয়ে ছিলেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তিনটি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনি যখন কোনোভাবে উঠোনে পৌঁছান, তখন দেখতে পান স্বামী রফিজ উদ্দিনের নিথর দেহ। আর সেই দেহ আঁকড়ে পড়ে আছে তাঁর কিশোর ছেলে সাহাবের মৃতদেহ। একজন মা ও স্ত্রীর জন্য এর চেয়ে নির্মম দৃশ্য আর কী হতে পারে!

পাকবাহিনী সেদিন ফিরে যাওয়ার পথে কচুয়া থানার আঠারোগাতি গ্রামেও হত্যাযজ্ঞ চালায়। ইসমাইল শেখ ও ইউসুফ শেখ নামের দুই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের পর শুধু ‘তেলিগাতি’ গ্রামের বাসিন্দা হওয়ার অপরাধে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে নিহত হন সুবাস বসু, নিরঞ্জন মিত্র ও বড় মশাই। এ হত্যাকাণ্ডে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করে স্থানীয় রাজাকার হাশেম আলী দিদার ও মোসলেম আলী খান।

বুরুঙ্গা, তেলিগাতি ও আঠারোগাতির গণহত্যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক ভয়াল স্মৃতি। এসব হত্যাকাণ্ডে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের ভয়াবহ বর্বরতা এবং নিরীহ মানুষের ওপর চালানো নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের নির্মম চিত্র ফুটে ওঠে। এর মধ্য দিয়ে তারা বাঙালির অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও মানবিক সত্তাকে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা চালায়।

আজ স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও সেই রক্তাক্ত দিনের স্মৃতি আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। ১৯৭১ সালের শহীদদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছে। এসব গণহত্যার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া একটি প্রয়োজনীয় কাজ, যা জাতিগত স্মৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।#

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on print
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!