২৯ মে ১৯৭১: বরগুনা কারাগার ও নাটোরের পয়তারপাড়ার গণহত্যার ভয়াল অধ্যায়

মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত অধ্যায়গুলোর মধ্যে ১৯৭১ সালের মে মাস ছিল একের পর এক সংঘটিত হত্যাযজ্ঞে ভরপুর। ২৯ মে বরগুনা ও নাটোরের লালপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে দুইটি পৃথক এলাকায় গণহত্যা চালায়। একদিকে কারাগারের ভেতরে আটক মানুষদের হত্যা, অন্যদিকে গ্রামের সাধারণ মানুষদের ধরে নিয়ে প্রকাশ্যে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

বরগুনা কারাগারের হত্যাকাণ্ড:
১৯৭১ সালের ২৯ মে পটুয়াখালী জেলার সামরিক শাসন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বরগুনা মহকুমা কারাগারে এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়। বন্দিশালার ভেতরে থাকা নিরীহ বন্দিদের ওপর চালানো এই অভিযানে অন্তত ৫৫ জন মানুষ প্রাণ হারান। পরদিন আরও ১৭ জনকে হত্যা করা হয়।

এর আগেই ২৬ এপ্রিল পটুয়াখালী শহর দখল করে পাকিস্তানি বাহিনী। পরে ৬ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের মেজর রাজা নাদির পারভেজ খানকে জেলার সামরিক প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৪ মে গানবোটে করে তারা বরগুনা এলাকায় প্রবেশ করে এবং ১৫ মে পাথরঘাটা থেকে বহু মানুষকে আটক করে বরগুনায় নিয়ে আসে। এদের একটি অংশকে বিশখালী নদীর তীরে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়, বাকিদের কারাগারে বন্দি রাখা হয়।

পরে পাকিস্তানি বাহিনী পটুয়াখালীতে ফিরে গেলে পিস কমিটির সদস্যরা ঘোষণা দেয় যে হিন্দুরা শহরে ফিরে আসতে পারে। শান্তি কমিটির আশ্বাসে অনেক হিন্দু পরিবার বরগুনায় ফিরে আসে। সরকারি চাকরিজীবীরা অফিসে যোগ দেন, ব্যবসায়ীরা দোকানপাট খুলতে শুরু করেন। কিন্তু সেটি ছিল এক ভয়ংকর প্রতারণা।

২৮ মে বরগুনায় সামরিক প্রশাসক মেজর নাদির পারভেজ পুনরায় প্রবেশ করেন এবং পরদিন কারাগারে তথাকথিত বিচার প্রক্রিয়ার নামে বন্দিদের হত্যা শুরু হয়। কারাগারের আশপাশে প্রচণ্ড গুলির শব্দে পুরো শহর আতঙ্কে কেঁপে ওঠে। মুহূর্তেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

প্রথম দফায় ৫৫ জন বন্দিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরদিন আরও ১৭ জনকে হত্যা করে সেই হত্যাযজ্ঞ সম্পূর্ণ করা হয়। বরগুনা কারাগারের এই ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক ভয়াবহ গণহত্যা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

নাটোর লালপুরের পয়তারপাড়া গণহত্যা:
একই দিনে নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার ধুপইল, পয়তারপাড়া এবং দিলালপুর এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী একযোগে অভিযান চালায়। ভোরের দিকে গ্রাম ঘিরে ফেলে তারা সাধারণ মানুষদের ধরে নিয়ে যায়। এরপর শুরু হয় নির্মম নির্যাতন। গ্রাম থেকে প্রায় দুই শতাধিক মানুষকে আটক করে বড়াল নদীর তীরে পয়তারপাড়া এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের মধ্যে অন্তত ২৫ জনকে জবাই, গুলি এবং বেয়নেট দিয়ে হত্যা করা হয়। মুহূর্তের মধ্যে নদীর পাড় রক্তে ভেসে যায়।

এই হত্যাযজ্ঞের একজন জীবিত সাক্ষী ছিলেন মো. হায়দার মন্ডল। তিনি সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, ভোররাতে পাকবাহিনী গ্রাম ঘিরে ফেলে এবং পুরুষদের হাত-পা বেঁধে একত্রিত করে। এরপর বাড়ি বাড়ি লুটপাট চালানো হয় এবং চিহ্নিত ব্যক্তিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন করা হয়। সকালের দিকে বন্দিদের বড়াল নদীর তীরে নিয়ে গিয়ে একসঙ্গে গুলি করা হয়। চারপাশে চিৎকার আর গুলির শব্দে পুরো এলাকা স্তব্ধ হয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে নদীর তীর লাশে ঢেকে যায় এবং পানিতে রক্তের স্রোত নেমে আসে। হায়দার মন্ডল নিজেও গুলিবিদ্ধ হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে জ্ঞান ফিরে দেখেন, তিনি লাশের স্তূপের নিচে পড়ে আছেন এবং চারপাশে নিস্তব্ধতা। পরবর্তীতে স্থানীয় এক চিকিৎসকের সহায়তায় তিনি বেঁচে থাকলেও তাঁর শরীরের একটি অংশ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়।

পয়তারপাড়া গণহত্যায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন ওমর আলী বিশ্বাস, ছইর উদ্দিন প্রাং, সফি প্রাং, সুরাত আলী, সাজেদুর রহমান, সফের উদ্দিন, বাদল প্রাং, লকি প্রাং, দেবেন্দ্র নাথ কুন্ডু, নিতাইপদ কুন্ডু, তারাপদ কুন্ডু, নকুল চন্দ্র কুন্ডু, টগর চন্দ্র পাল, অরুণ চন্দ্র পাল, বৃন্দাবন চন্দ্র দাস, সুরেন্দ্রনাথ মন্ডল, উপেন্দ্রনাথ মন্ডল, সতীশ চন্দ্র মন্ডল, নরেন্দ্রনাথ মন্ডল, কার্তিক চন্দ্র মন্ডল, দেবেন্দ্রনাথ মন্ডল, গঙ্গা চরণ মন্ডল, রনিক চন্দ্র মন্ডল, রুহিনী চন্দ্র মন্ডল, মফিজ উদ্দিন, আব্দুল হাকিম মন্ডল, গোকুল চন্দ্র কুন্ডু, মন্টু মিয়া, লক্ষিন্দর চন্দ্র প্রামানিক এবং আব্দুল হাকিম প্রামানিকসহ আরও অনেকে। এছাড়া অনেক শহীদের নাম আজও অজানা রয়ে গেছে, যারা সেই দিনের হত্যাযজ্ঞে প্রাণ হারান।

স্বাধীনতার পর গণহত্যাস্থলে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হলেও দীর্ঘদিন পরিচর্যার অভাবে নামফলক পর্যন্ত স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না।

২৯ মে ১৯৭১ ছিল এমন একটি ভয়াল দিন, যেদিন দুই ভিন্ন প্রান্তে দুই ধরনের গণহত্যা সংঘটিত হয়, একদিকে কারাগারের ভেতরে বন্দিদের হত্যা, অন্যদিকে গ্রামে সাধারণ মানুষদের ধরে নিয়ে প্রকাশ্যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। এই ঘটনাগুলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য জীবনের আর্তনাদ হয়ে রয়ে গেছে।#

তথ্যসূত্র:
১। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র অষ্টম, নবম, দ্বাদশ, ত্রয়োদশ খণ্ড
২। সংগ্রামের নোটবুক

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on print
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!