বিশ্ব গণমাধ্যম দিবস: স্বাধীনতার সংকটে বাংলাদেশ

৩ মে বিশ্ব গণমাধ্যম দিবস। দিনটি এলেই আমরা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকের নিরাপত্তা এবং মানুষের তথ্য জানার অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবি। কিন্তু বাংলাদেশে এবারের বিশ্ব গণমাধ্যম দিবস এমন এক সময়ে এসেছে, যখন এই প্রশ্নগুলো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের ২০২৬ সালের বৈশ্বিক গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচক বলছে, বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা গত ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে। বিশ্বের অর্ধেকের বেশি দেশ এখন ‘কঠিন’ বা ‘অত্যন্ত গুরুতর’ পরিস্থিতিতে রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতি ১০০ জন মানুষের মধ্যে মাত্র ১ জন নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যম থেকে তথ্য পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

এই বৈশ্বিক বাস্তবতার বাইরে নয় বাংলাদেশও। বরং আমাদের অবস্থান আরও নাজুক হয়েছে। ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৫২তম, যা গত বছরের তুলনায় আরও নিচে। দক্ষিণ এশিয়ায় নেপাল ও শ্রীলঙ্কা এগোলেও বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে আছে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের সংবাদমাধ্যম নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমানে অন্তত ৪ জন সাংবাদিক কারাগারে আছেন। শ্যামল দত্ত, ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ ও মোজাম্মেল হক বাবু দীর্ঘদিন ধরে বন্দি। একইসঙ্গে লেখক, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী শাহরিয়ার কবিরও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন।

অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত ও বিচার অবশ্যই হতে পারে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। কিন্তু অভিযোগ গঠন ছাড়াই দীর্ঘ সময় কারাগারে রাখা কখনোই স্বস্তিকর বার্তা দেয় না। এতে প্রশ্ন ওঠে, বিচার কি শাস্তির আগেই শুরু হয়ে গেছে?

সংকট শুধু এখানেই থেমে নেই। দেশের দুই প্রভাবশালী সংবাদপত্র প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা আরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। মতের অমিল থাকতেই পারে, সংবাদপত্রের অবস্থান নিয়ে বিতর্কও হতে পারে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের অফিসে হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি এমন এক সংস্কৃতির ইঙ্গিত, যেখানে মতের বিরোধকে যুক্তির বদলে শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা হয়।

তবে গণমাধ্যমের সংকট কেবল রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকও। আর্থিকভাবে দুর্বল ও নির্ভরশীল সংবাদমাধ্যমের পক্ষে স্বাধীন অবস্থান ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে। বিজ্ঞাপননির্ভরতা, করপোরেট মালিকানা, বাজারচাপ এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা সম্পাদকীয় স্বাধীনতাকে প্রভাবিত করে। ফলে সংবাদমাধ্যম অনেক সময় রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপেরও মুখোমুখি হয়।

ভয় ও অনিশ্চয়তার এই পরিবেশ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকেও সংকুচিত করে। সংবেদনশীল বিষয়, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের বাড়তি ঝুঁকি নিতে হয়। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে না, আর যেগুলো আসে সেগুলোও অনেক সময় অসম্পূর্ণ থাকে।

তবে সব দায় বাইরের নয়। সংবাদমাধ্যমকেও নিজেদের ভূমিকা নিয়ে আত্মসমালোচনা করতে হবে। রাজনৈতিক মেরুকরণ, করপোরেট প্রভাব, পক্ষপাত এবং পেশাগত দুর্বলতা নিয়ে সমালোচনা নতুন নয়। স্বাধীনতার দাবি তখনই শক্ত হয়, যখন সংবাদমাধ্যম নিজেরাও পেশাগত মান ও জনআস্থা ধরে রাখতে পারে। তাই এই দিনটি আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে, সংবাদমাধ্যম আসলেই কতটা স্বাধীন।

গণমাধ্যম স্বাধীন না হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষই। কারণ স্বাধীন সংবাদমাধ্যম কোনো গোষ্ঠীর বিশেষ সুবিধা নয়, বরং মানুষের জানার অধিকার রক্ষার অন্যতম মাধ্যম।

বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটবে, ভিন্নমতকে সংকুচিত করার পথে নাকি আরও উন্মুক্ত হওয়ার পথে, সেই প্রশ্নটাই আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!