গবেষক: অবশেষ দাস
তত্ত্বাবধায়ক: ড. গোবিন্দ সরকার
বিভাগ: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ
প্রতিষ্ঠান: সিকম স্কিলস্ ইউনিভার্সিটি, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
প্রকাশনা: সময়ের শব্দ
ISSN: 2704-1387
প্রকাশের তারিখ: ১৫ জুন ২০২৬
সারসংক্ষেপ
সমকালীন বাংলা কবিতার গুরুত্বপূর্ণ অথচ তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত কবি বৃন্দাবন দাসের কাব্যচেতনা, মানবতাবাদ, প্রকৃতিদর্শন, সমাজসচেতনতা এবং ভাষার স্বাতন্ত্র্য এই গবেষণাপত্রের আলোচ্য বিষয়। চার দশকেরও অধিক সময়ব্যাপী তাঁর কাব্যসাধনা বাংলা কবিতায় একটি স্বতন্ত্র অবস্থান নির্মাণ করেছে। এই গবেষণায় তাঁর বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থ বিশ্লেষণের মাধ্যমে কবিমানসের বিবর্তন, সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রতি তাঁর গভীর সংবেদনশীলতা, প্রান্তিক মানুষের প্রতি দায়বোধ, প্রকৃতি ও জীবনের আন্তঃসম্পর্ক এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি তাঁর অটল আস্থার অনুসন্ধান করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর কবিতার ভাষা, কাব্যরীতি ও সমাজদৃষ্টির বৈশিষ্ট্যও আলোচিত হয়েছে। গবেষণায় প্রতীয়মান হয় যে, বৃন্দাবন দাস মানুষের জীবন, মাটি, স্মৃতি, সময় ও মানবমুক্তির স্বপ্নকে কেন্দ্র করে এক স্বতন্ত্র কাব্যভুবন নির্মাণ করেছেন। প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান না করেও তিনি সমকালীন বাংলা কবিতায় একজন গুরুত্বপূর্ণ মানবতাবাদী কবি হিসেবে স্বীকৃতি লাভের যোগ্য।
মূল শব্দ:
বৃন্দাবন দাস, বাংলা কবিতা, মানবতাবাদ, প্রকৃতিচেতনা, সমাজসচেতনতা, কাব্যভাষা, সমকালীন বাংলা সাহিত্য।
ভূমিকা
বাংলা কবিতার ইতিহাসে এমন বহু কবির নাম রয়েছে, যাঁরা প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও তাঁদের সৃজনশীলতা, জীবনবোধ এবং ভাষাগত স্বাতন্ত্র্যের মাধ্যমে বাংলা সাহিতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁরা কোনো সাহিত্যিক ক্ষমতাকেন্দ্রের আশ্রয়ে নয়, বরং জীবন ও সমাজের গভীর অভিজ্ঞতার ভিতর দাঁড়িয়ে নিজেদের কবিতার ঘরবাড়ি,উঠোন ও জগত নির্মাণ করেছেন। কবি বৃন্দাবন দাস এই ধারার একজন উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধি। আশির দশকে তাঁর কবিজীবনের সূচনা হলেও তাঁর সৃজনযাত্রা আজও অব্যাহত। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি একনিষ্ঠভাবে কবিতা লিখে চলেছেন এবং তাঁর কাব্যচর্চা বাংলা কবিতার পরিসরে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করেছে। বৃন্দাবন দাস আধুনিক বাংলা কবিতার বহু পঠিত,বহু চর্চিত কবি নন, তিনি একপ্রকার অনাবিষ্কৃত, অধরা উচ্চাঙ্গের এক কবি। রাজসভার সম্মোহন তাঁর ব্যক্তিত্ব ও বৈভবে নয়, তিনি যথার্থ জনসভার কবি। সাধারণ জীবনের প্রতিভূ হিসেবে নিজেকে আজীবন ছড়িয়ে রাখলেও তিনি বাংলা কবিতায় যথার্থ প্রতিষ্ঠিত। ‘আমি ‘-র নাবিক হিসেবেও তিনি পাঁচটি দশক পাড়ি দিয়েছেন। মঙ্গলকাব্যের চাঁদ সওদাগরের নিঃসীম পাড়ি অপেক্ষা তা কম কিছু নয়। দারিদ্র্য-মনসার কঠিন ছোবলে জেরবার হয়েও তিনি আজীবন কবিতা চর্চার পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি বাংলা কবিতার জন্যে নিজেই নতুন এক পথ নির্মাণ করেছেন।
কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায় প্রায় দুই দশক আগে কবি বৃন্দাবন দাস সম্পর্কে বেশ সচেতনভাবে লিখেছিলেন,” বাওয়ালি গ্রামের ভিতর একটি টালির চালার ঘরে বসে, শুধু টিউশন সম্বল করে সংসার চালিয়ে কবিতা লিখছেন আর, ‘আমি’ পত্রিকা বের করছেন ছত্রিশ বছর ধরে, নিরবচ্ছিন্নতার তাঁর কবিতা চর্চা,হয়, নির্ভীক, স্পষ্ট কবিতাগুলি বুকের ভেতরে হাত রাখে।” ১
জীবন ও জগতের পরিক্রমায় তিনি সত্যিই কবিতাময়, কবিতা তাঁর সঙ্গে সংসার করে। কবিতার পঞ্চভূতে তাঁর আজীবন বসবাস।
বাংলা কবিতার সমকালীন ইতিহাসে বৃন্দাবন দাসের গুরুত্ব নির্ধারণ করতে গেলে প্রথমেই লক্ষ্য করতে হয় তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যসাধনা। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মানুষের পাশাপাশি’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে। কবি বৃন্দাবন দাসের দীর্ঘ চার দশকেরও অধিক কাব্যসাধনার ফলস্বরূপ বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে এক উল্লেখযোগ্য কাব্যভাণ্ডারে। জীবন, মানুষ, প্রকৃতি, সময়, সমাজচেতনা এবং অস্তিত্ববোধ তাঁর কাব্যসৃষ্টির প্রধান উপজীব্য। আশির দশক থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত তাঁর কাব্যগ্রন্থসমূহ কবির মনন, শিল্পবোধ ও জীবনদর্শনের ক্রমবিকাশের পরিচয় বহন করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল— ‘মানুষের পাশাপাশি’ (১৯৮৬), ‘পৃথিবীর জয়ের ঘোড়া’ (১৯৮৮), ‘আগাম বলে রাখছি’ (২০০১), ‘খুব পরিচিত গন্ধ’ (২০০১), ‘সোনারোদের প্রার্থনা’ (২০০৬), ‘আমরণ ঘ্রাণের ভিতর’ (২০১০), ‘সবুজে মুড়েছি এই গা’ (২০১১), ‘এ ‘ক’ দিন মানুষ মহারাজ’ (২০১১), ‘দেয়াললিখনী’ (২০১১), ‘দেয়াললিখন’ (২০১১), ‘এবং আত্মকথা’ (২০১৩), ‘সত্যি সত্যি’ (২০১৫), ‘জন্মভূমির মানুষ মৃত্যুহীন’ (২০১৬), ‘নিবিড় অন্ধকারের ভিতর’ (২০১৬), ‘নিরক্ষর বাংলার দৃন্ময় উঠোন’ (২০১৮), ‘শুধু মাটির যা আকাল’ (২০১৯), ‘ইউকের জানালা দিয়ে’ (২০২০), ‘দুই নদী এক মোহনা’ (২০২১), ‘সুজনেষু’ (২০২১), ‘একই পৃথিবী’ (২০২১), ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ (২০২২), ‘দীর্ঘকবিতার যুগলবন্দী’ (২০২৩), ‘কানে বাজে, ফিরে পেতে চাই’ (২০২৩), ‘দীর্ঘকবিতার যুগলভাষ্য’ (২০২৪) , ‘তুমি পলাশপ্রিয়া’ (২০২৪) সহ অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ।
সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর কবিতা ইংরেজিসহ অন্যান্য ভাষাতেও অনূদিত হয়েছে। এই দীর্ঘ সৃজনপথ কেবল সংখ্যার বিচারে নয়, বিষয়বৈচিত্র্য ও অভিজ্ঞতার গভীরতার কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রতিটি কাব্যগ্রন্থের নামকরণ খুবই আত্মঘনিষ্ঠ ও বলিষ্ঠ, ক্ষুরধার, গভীরভাবে জীবন ঘেঁষা।
বৃন্দাবন দাসের কবিতাকে বুঝতে হলে তাঁর জীবনবাস্তবতার দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। তিনি এমন এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে জীবন অতিক্রম করেছেন, যেখানে অভাব, অনিশ্চয়তা এবং সংগ্রাম ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু এই প্রতিকূলতাই তাঁর কবিতার শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তাঁর কবিতায় দারিদ্র্য কোনো অলংকার নয়, কোনো কাব্যিক অভিনয়ও নয়; বরং তা জীবনযাপনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। তাঁর জীবনসংগ্রাম তাঁর কবিসত্তার যথার্থ নির্মাতা। বাংলা কবিতায় প্রায়ই দেখা যায়, প্রান্তিক মানুষের জীবনকে অনেক কবি দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করেন। কিন্তু বৃন্দাবন দাস সেই জীবনকে ভেতর থেকে চেনেন। তিনি শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট, গ্রামীণ বাংলার অনটন, নিম্নবিত্ত মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই এবং সমাজের উপেক্ষিত মানুষের বেদনা প্রত্যক্ষ করেছেন। ফলে তাঁর কবিতায় যে মানবিকতা দেখা যায়, তা কোনো কৃত্রিম সহানুভূতি নয়; বরং জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতার ফসল।
তাঁর কবিতার অন্যতম শক্তি এই সত্যনিষ্ঠা। তিনি কখনও জীবনকে রোমান্টিকভাবে সাজিয়ে তোলেন না, আবার নৈরাশ্যের অতলে ডুবিয়েও দেন না। বাস্তবকে যেমন দেখেছেন, তেমনই প্রকাশ করেছেন। এই কারণে তাঁর কবিতায় এক ধরনের নৈতিক দৃঢ়তা লক্ষ করা যায়।
কবির সমগ্র কবিতাবিশ্ব জুড়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি মানুষ।
এপ্রসঙ্গে বলতে হয়, কোনো কবির প্রকৃত মূল্যায়ন করতে গেলে তাঁর পৃথক পৃথক কাব্যগ্রন্থের ভেতর দিয়ে কবিমানসের বিবর্তনকে অনুসরণ করা প্রয়োজন। বৃন্দাবন দাসের ক্ষেত্রেও এই সত্য সমানভাবে প্রযোজ্য।কাব্যগ্রন্থসমূহের আলো ও পদচারণায় বৃন্দাবন দাসের কবিতার বিবর্তন গভীরভাবে গোচরে আনবার প্রয়োজন রয়েছে। সে প্রয়োজন প্রকৃত পাঠক ও সমালোচক সিদ্ধ করতে বদ্ধপরিকর। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময়ব্যাপী তাঁর কাব্যসাধনার দিকে তাকালে দেখা যায়, বিষয় ও অভিজ্ঞতার বিস্তার ঘটলেও তাঁর মূল মানবিক অবস্থান কখনও পরিবর্তিত হয়নি। মানুষ, মাটি, সময় এবং জীবন—এই চারটি উপাদান তাঁর সমগ্র কাব্যবিশ্বের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করেছে। কবি বৃন্দাবন দাসের কাব্যজগৎ মূলত মানুষকে ঘিরেই নির্মিত, আবর্তিত। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মানুষের পাশাপাশি'(১৯৮৬) নামটিই যেন তাঁর সমগ্র কাব্যদর্শনের পরিচয় বহন করে। তিনি বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন প্রকৃতি, সমাজ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সহ বিভিন্ন অনুষঙ্গ কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর মূল উপজীব্য হিসেবে ধরা দিয়েছে মানুষ। কবি বৃন্দাবন দাসের কবিতার মানুষ কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। তাঁরা শ্রমিক, কৃষক, পথচারী, বাজারের দোকানি, চটকলের কর্মী, গ্রামীণ নারী, বৃদ্ধ, শিশু—অর্থাৎ আমাদের চারপাশের সাধারণ মানুষ। কবি তাঁদের জীবনসংগ্রাম, স্বপ্ন, বেদনা এবং ভালোবাসাকে কবিতার উপাদানে পরিণত করেছেন। কবিতার আত্মা ও পরমাত্মায় পরিণত করেছেন।
বলাবাহুল্য, এই মানবমুখী চেতনা বাংলা কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যের সঙ্গে আত্মঘনিষ্ঠ, গভীরভাবে সম্পৃক্ত। কবি জীবনানন্দ দাশ যেমন বাংলার প্রকৃতির মধ্যে মানুষকে খুঁজেছেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় যেমন শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বরকে কবিতায় স্থান দিয়েছেন, তেমনি বৃন্দাবন দাসও সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাকে সুদৃঢ়ভাবে কবিতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন। তবে তাঁর স্বাতন্ত্র্য এই যে, তিনি মানুষকে কোনো মতাদর্শের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, একজন জীবন্ত অস্তিত্ব হিসেবে অন্বেষণ করেছেন ও প্রতিষ্ঠা করেছেন। বলাবাহুল্য , কবির প্রথম প্রকাশিত ‘মানুষের পাশাপাশি’ (১৯৮৬) কাব্যগ্রন্থ থেকেই তাঁর কবিসত্তার প্রধান অভিমুখ নির্ধারিত হয়ে যায়। এই গ্রন্থে কবি মানুষকে কেন্দ্র করে তাঁর কাব্যদর্শনের ভিত্তি নির্মাণ করেন। আশির দশকের বাংলা কবিতায় যখন নানা ধরনের ভাষাগত ও নন্দনতাত্ত্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল, তখন বৃন্দাবন দাস মানুষের জীবনবাস্তবতার দিকে ফিরে তাকিয়েছিলেন। তাঁর কবিতার ভিত গড়ে উঠেছিল জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতার উপর। অনুরূপভাবে, ‘পৃথিবীর জয়ের ঘোড়া’ কাব্যগ্রন্থে সেই জীবনবোধ আরও বিস্তৃত রূপ লাভ করে। এখানে ব্যক্তি থেকে সমষ্টির দিকে, অভিজ্ঞতা থেকে ইতিহাসের দিকে তাঁর দৃষ্টি প্রসারিত হয়েছে। পৃথিবী, মানুষ এবং সময়ের বৃহত্তর সম্পর্ককে বোঝার চেষ্টা এই গ্রন্থে লক্ষ করা যায়। ‘নির্জনতার গভীর কন্দরে’, ‘সোনা রোদের প্রার্থনা’, ‘খুব পরিচিত গন্ধ’, ‘সবুজে মুড়েছি এই গা’, প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থে কবি চারপাশের সাধারণ মানুষ, গ্রামীণ জীবন এবং অস্তিত্বের ছোট ছোট অভিজ্ঞতাকে কবিতার বিষয় করে তুলেছেন। লোকায়ত জীবনবোধের কবি বৃন্দাবন দাসের কবিতার মূল শক্তি জটিল প্রতীক বা বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশলে নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবন, গ্রামবাংলার বাস্তবতা এবং সহজ অথচ গভীর মানবিক অনুভূতিতে।
‘মানুষের পাশাপাশি’ কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতার দৃষ্টান্ত থেকেই তাঁর কবিতার মূল দর্শন অন্বেষণ করা যায়।
“যে কবিতা লেখার জন্য তোমার এত একাগ্রতা
তা’ হয়তো একদিন
তুমি পেয়ে যাবে।” ২
খুব সচেতনভাবে দাবি করা যায়, কবি বৃন্দাবনদাসের সমগ্র কবিজীবনের প্রতীক এই ক্ষুরধার পংক্তি। কবিতা তাঁর কাছে কোনো সহজলভ্য বিষয় নয়; বরং দীর্ঘ সাধনা ও অপেক্ষার ফসল।
কবি রাণা চট্টোপাধ্যায় বৃন্দাবন দাসের উদ্দেশ্যে বলেছেন,
“আমরা চলে যাব কিন্তু একজন ভালো কবি তোমার মতোই কৃচ্ছসাধন করে যাবে জীবনভোর।” ৩
( ‘বৃন্দাবন-এর কবিতা পাঠ’ , রাণা চট্টোপাধ্যায়,’আমি ‘ ৮৫ সংখ্যা, ২০১৯)। আমিও এবিষয়ে সহমত।
এই বাক্যেই রাণা চট্টোপাধ্যায়ের দৃষ্টিতে বৃন্দাবন দাসের কবিসত্তার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও যথার্থ পরিচয় বিধৃত হয়েছে।
‘সোনারোদের প্রার্থনা'(২০০১) কাব্যগ্রন্থে কবির আশাবাদী জীবনদর্শন বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। জীবনসংগ্রামের মধ্যেও তিনি আলো ও সমগ্র প্রত্যয় খুঁজেছেন। এই আলো কোনো অলৌকিক মুক্তির প্রতীক নয়; বরং মানুষের ভেতরে নিহিত সম্ভাবনার প্রতীক। দুঃসময়ের মধ্যেও তিনি বিশ্বাস হারান না। ফলে তাঁর কবিতায় এক ধরনের ইতিবাচক মানবতাবাদ গড়ে ওঠে। একথা অতিশয় সত্য যে,প্রকৃত কবিরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হন, ক্ষমতার আশীর্বাদ থেকেও বহু দূরে থাকেন। কিন্তু তবু তাঁরা আজীবন কবিতা লিখে যান।
এই প্রসঙ্গে কবি বৃন্দাবন দাসের ‘মহাভারত’ কবিতা থেকে কয়েকটি পংক্তি তুলে দেওয়া যায় –
“খুদকুঁড়োর দেশে জন্মেছো বিদুর
তোমার জন্য ধার্য্য কৃচ্ছসাধন…” ৪
উদ্ধৃত কবিতার পংক্তি গুলো শুধু একজন ব্যক্তির নয়, বরং সমাজের সমস্ত বঞ্চিত মানুষের ইতিহাসকে ধারণ করে। এমন অজস্র ক্ষুরধার পংক্তি এই কাব্যগ্রন্থের পাতায় পাতায় মণিমুক্তোর মতো ছড়িয়ে আছে।
‘খুব পরিচিত গন্ধ’ (২০০৪) কাব্যগ্রন্থে কবি স্মৃতি, মানুষ এবং পরিচিত জীবনের উপাদানগুলিকে নতুন তাৎপর্যে আবিষ্কার করেন। ‘গন্ধ’ এখানে শুধু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতি নয়; এটি স্মৃতি, শিকড় এবং আত্মপরিচয়ের প্রতীক। পরিচিত জীবনের মধ্যেই তিনি গভীর জীবনসত্য খুঁজে পান।
‘সবুজে মুড়েছি এই গা'(২০১১) কাব্যগ্রন্থটি একজন সংবেদনশীল, জীবনমুখী ও মানবতাবাদী কবির অন্তর্জগতের পরিচয় বহন করে। একথা অনস্বীকার্য যে,বৃন্দাবন দাসের কবিতা কোনো কৃত্রিম শিল্পচর্চার ফল নয়; বরং জীবনের কঠিন বাস্তবতা, সংগ্রাম, বঞ্চনা, অপমান ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অর্জিত গভীর জীবনবোধের শিল্পিত প্রকাশ।
আলোচ্য কাব্যগ্রন্থের পাতায় পাতায় বিধৃত হয়েছে প্রকৃতি ও অস্তিত্বের কবিতা। এই গ্রন্থে কবির প্রকৃতিচেতনা, জীবনদর্শন এবং আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। গ্রন্থের নামটিই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘সবুজ’ এখানে জীবনের প্রতীক, আর ‘গা’ শব্দটি মানুষের অস্তিত্বকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে কোনো বিভাজন নেই; তারা পরস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। এই ভাবনা আধুনিক পরিবেশচেতনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই কবিতা ভুবনে কবি প্রকৃতির মধ্যে আশ্রয় খুঁজেছেন, কিন্তু বাস্তবতা থেকে পালিয়ে যাননি। বরং প্রকৃতির মধ্য দিয়েই জীবনকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন। মাটি, ঘাস, নদী, বৃষ্টি এবং সবুজের পুনরাবৃত্ত উপস্থিতি তাঁর কবিতাকে এক বিশেষ সংবেদনশীলতা প্রদান করেছে।
এই কাব্যগ্রন্থে ব্যক্তিমানুষের আত্মসংগ্রামও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কবি উপলব্ধি করেন যে জীবনের সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষকে এগিয়ে যেতে হয়। এই উপলব্ধিই তাঁর কবিতাকে শক্তি ও প্রাণশক্তি প্রদান করেছে। ‘সবুজে মুড়েছি এই গা’ কাব্যগ্রন্থের নাম থেকেই কবির প্রকৃতিনির্ভর জীবনবোধের পরিচয় কষ্ট করে অন্বেষণ করতে হয় না, বরং সহজেই করতলে এসে ধরা দেয়। এখানে ‘সবুজ’ শুধু রঙ নয়, জীবন ও পুনর্জন্মের প্রতীক। মাটি, ঘাস, নদী, ধুলো, গাছ, বৃষ্টি সহ অজস্র উপাদান তাঁর কবিতায় ভিড় করে আছে। এইসব উপাদানের সমবেত উপস্থিতি এক ধরনের অস্তিত্বদর্শনের রূপ ধারণ করেছে। তিনি প্রকৃতিকে মানুষের বাইরের কোনো সত্তা হিসেবে দেখেন না; বরং মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে এক অন্তরঙ্গ সম্পর্ক আবিষ্কার করেন। একথা অনস্বীকার্য যে,গ্রামীণ বাংলার প্রকৃতি তাঁর কবিতার প্রধান অবলম্বন। একথা মনে রাখতে ইচ্ছে হয়,এই প্রকৃতি রবীন্দ্রনাথের নন্দনচেতনার প্রকৃতি নয়, জীবনানন্দের স্বপ্নময় নিসর্গও নয়। এটি শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃতি; যে প্রকৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবনধারণের সংগ্রাম, ক্ষুধা, বন্যা, খরা এবং তীব্র অনিশ্চয়তা, আশঙ্কা ও বৈষম্য। ফলে প্রকৃতি তাঁর কবিতায় একাধারে সৌন্দর্যের এবং বাস্তবতার প্রতীক। তাঁর প্রকৃতিচেতনার মধ্যে একটি গভীর মানবিকতা কাজ করে। প্রকৃতিকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে তিনি মানুষকেও ভালোবাসতে শেখেন। মাটির প্রতি তাঁর অনুরাগ আসলে মানুষের প্রতি তাঁর আস্থারই যথার্থ প্রতিরূপ। তাই তাঁর কবিতায় প্রকৃতি ও মানুষ কখনও বিচ্ছিন্ন নয়; তারা পরস্পরের পরিপূরক, সমগোত্রীয়।
‘তবুও’ কবিতায় তিনি লিখেছেন—
“এখনও ঘুমের ভিতর নির্লজ্জ স্বপ্নের চোরকাঁটা
এখনও অ-নিদ্রার ভিতর ম্রিয়মাণ অপূর্ব শিশু
এখনও উদ্যমের ভিতর শ্রমের অমূল্য চালাকি।”৫
এখানে কবি মানুষের অবচেতন মন, স্বপ্ন, শ্রম ও জীবনীশক্তির মধ্যে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছেন। কাব্যগ্রন্থের নাম-কবিতা ‘সবুজে মুড়েছি এই গা’ কবির জীবনদর্শনের এক অনন্য প্রকাশ। এখানে প্রকৃতি কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; বরং জীবনের অন্তর্নিহিত শক্তি ও আশ্রয়ের প্রতীক।
“কী সুখ শেখাবে আমায়
কিম্বা ভয়;
মরণ বাঁচন—যা খুশি
দেখাও,
সবুজে মুড়েছি এই গা।” ৬
এই পঙ্ক্তিগুলিতে জীবনের সুখ-দুঃখ, ভয়-মৃত্যু—সবকিছুকে অতিক্রম করে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকার দৃঢ় মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে। সমকালীন সমাজের মিথ্যাচার, হিংসা, বিদ্বেষ ও মূল্যবোধের অবক্ষয় কবিকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। ফলে বৃন্দাবন দাসের কবিতায় বারবার প্রতিবাদের সুর উচ্চারিত হয়েছে। যেমন—
“অসম্ভব মিথ্যাচার ও সভ্যতা হয়ে যাচ্ছে স্পার্টাকাস।” ৭
অথবা—
“যেখানেই পা ফেলি
রক্ত আর রক্ত।” ৮
আবার ‘কবর কিংবা আড়াল’ কবিতায় তিনি লিখেছেন—
“প্রকাশ্যে প্রেম আর গোপনে বিদ্বেষ
ছড়াতে ছড়াতে
অলৌকিক আড়াল তৈরি করে নিচ্ছো
নিজেরই কবর ঘিরে।” ৯
এই পংক্তিগুলিতে সমাজের দ্বিচারিতা, ভণ্ডামি এবং মানবিক সংকটের তীব্র সমালোচনা ধ্বনিত হয়েছে। তবে বৃন্দাবনের কবিতা কেবল প্রতিবাদের কবিতা নয়; এটি মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধেরও কবিতা। নিপীড়িত, অবহেলিত ও সত্যনিষ্ঠ মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম সহানুভূতি রয়েছে।
‘আবর্জনা’ কবিতায় কবি লিখেছেন—
“তুমি দেখলে
একটা মানুষ সত্যি বলতে গিয়ে
কেমন আবর্জনা হয়ে গেলো…” ১০
সত্য বলার কারণে মানুষের সামাজিক অবমূল্যায়নের এই চিত্র কবির মানবিক বেদনাবোধকে স্পষ্ট করে। তবুও তিনি হতাশ নন। মানুষের মধ্যেই তিনি মুক্তি ও আশার সন্ধান করেন। সব মিলিয়ে, ‘সবুজে মুড়েছি এই গা’ কাব্যগ্রন্থে বৃন্দাবন দাস একদিকে যেমন সময়ের সংকট, হিংসা ও অবক্ষয়ের নির্মম চিত্র এঁকেছেন, অন্যদিকে তেমনি মানুষ, প্রকৃতি ও ভালোবাসার শক্তির ওপর অবিচল বিশ্বাসও ব্যক্ত করেছেন।
আবার, ‘এবং আত্মকথা’ (২০১৩) কাব্যগ্রন্থটি ব্যক্তি থেকে সমষ্টির যাত্রাকে ঘোষণা করেছে। ‘এবং আত্মকথা’ কবিরা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ। নাম থেকে মনে হতে পারে এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কাব্য; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি সমকালীন মানুষের আত্ম-উদ্বোধন, চরাচর অন্বেষণ। এই গ্রন্থে কবি নিজের জীবন, অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধির কথা বলেছেন। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা কখনও ব্যক্তিগত গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যক্তিগত বেদনা এখানে সামাজিক বেদনায় রূপান্তরিত হয়েছে, ব্যক্তিগত স্মৃতি পরিণত হয়েছে সমষ্টিগত স্মৃতির আধার।
এই কাব্যগ্রন্থের অন্যতম বৈশিষ্ট্য অকপটতা। কবি কোনো মুখোশ ব্যবহার করেন না। তিনি নিজের দুর্বলতা, ব্যর্থতা এবং স্বপ্নের কথাও নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করেন। ফলে এই আত্মকথা আত্মপ্রচারের দলিল নয়; বরং আত্ম-উন্মোচনের সার্থক শিল্প নির্মাণ। বাংলা কবিতায় আত্মকথনধর্মী কবিতার একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। এক্ষেত্রে বৃন্দাবন দাসের আত্মকথার বিশেষত্ব এই যে, সেখানে ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়ভাবে যুক্ত। ফলে তাঁর আত্মকথা পাঠ করতে গিয়ে পাঠক নিজের জীবনকেও আবিষ্কার করতে পারেন।
বলাবাহুল্য, আলোচ্য কাব্যগ্রন্থটি এই প্রবণতার এক উজ্জ্বল নিদর্শন । কিন্তু তাঁর আত্মকথনকে আত্মজীবনীমূলক সংকীর্ণতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা যাবে না। প্রকৃত কবির আত্মকথা কখনও কেবল ব্যক্তিগত থাকে না। তা সময়, সমাজ এবং মানুষের বৃহত্তর অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে। বৃন্দাবন দাসের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। তাঁর ব্যক্তিগত বেদনা, অভাব, সংগ্রাম এবং স্বপ্ন ধীরে ধীরে সমষ্টিগত মানবজীবনের অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয়েছে। তাঁর কবিতায় আত্মপ্রকাশের ভঙ্গি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সাবলীল। তিনি নিজেকে লুকিয়ে রাখেন না, আবার অহেতুক আত্মপ্রচারও করেন না। জীবনের সুখ-দুঃখ, ব্যর্থতা, হতাশা কিংবা আশা—সবকিছুকেই তিনি অকপটে প্রকাশ করেন। এই সততাই তাঁর কবিতাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। বরণীয় করে তোলে স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে। আধুনিক কবিতায় আত্মকথন অনেক সময় আত্মকেন্দ্রিকতায় পরিণত হয় কিন্তু বৃন্দাবন দাসের কবিতায় সেই দুর্বিপাক অনুপস্থিত। কারণ তাঁর আত্মকথার ভিতর দিয়ে পাঠক নিজের জীবনকেও আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা একসময় পাঠকের অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয়। এই রূপান্তরের মধ্যেই তাঁর কবিতার সার্থকতা নিহিত।
‘জন্মভূমির মানুষ মৃত্যুহীন’ (২০১৬) কাব্যগ্রন্থে কবি তাঁর শিকড়ের দিকে ফিরে তাকিয়েছেন। এখানে জন্মভূমি কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি স্মৃতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং মানুষের সম্মিলিত অস্তিত্বের প্রতীক।
কবি উপলব্ধি করেছেন যে মানুষ মৃত্যুবরণ করে, কিন্তু তার শ্রম, ভালোবাসা, স্মৃতি এবং সংস্কৃতি বেঁচে থাকে। এই কারণেই তিনি জন্মভূমির মানুষকে মৃত্যুহীন বলে অভিহিত করেছেন। এই কাব্যগ্রন্থে এক ধরণের গভীর মানবতাবাদ কাজ করে। সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামকে তিনি ইতিহাসের মর্যাদা দিয়েছেন। তাঁদের নীরব অস্তিত্বের মধ্যেই তিনি সভ্যতার প্রকৃত শক্তি খুঁজে পেয়েছেন।
এখানে কবির দৃষ্টিভঙ্গি শুধু ব্যক্তিগত নয়; বরং সাংস্কৃতিকও। তিনি জন্মভূমির মানুষের মধ্যে জাতির আত্মপরিচয় খুঁজেছেন। ফলে এই কাব্যগ্রন্থ এক অর্থে মাটি ও মানুষের প্রতি কবির গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
ভূমি ও ভূমি সত্ত্বাধিকারীর প্রতি কবির অবিচল আস্থা ও সমর্থন।
আবার, অসামান্য সৃজন ভাবনায় সমুজ্জ্বল ‘নিবিড় অন্ধকারের ভিতর’ (২০১৬) কাব্যগ্রন্থকে একজন আত্মসচেতন, নিঃসঙ্গ, প্রশ্নমুখর এবং গভীর জীবনবোধসম্পন্ন কবির অন্তর্জগতের দলিল হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এ যেন আত্মবিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্বের কাব্য হয়ে ঝরে পড়েছে।
গ্রন্থের শুরুতেই কবির আত্মঅন্বেষী সত্তা ধরা পড়ে।
‘এখন’ কবিতায় কবি লিখেছেন, –
“আমি/এই আমি/ক্রমশই সংসারে অকেজো হয়ে যাচ্ছি” ১১
কবিতার সমগ্র উচ্চারণে আধুনিক মানুষের অস্তিত্বসংকট ও অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ার বেদনা বিধৃত হয়েছে। নিঃসীম একাকীত্ব বিধৃত হয়েছে। হতে পারে কবির একাকীত্ব, হতে পারে বিচ্ছিন্ন নাগরিক জীবনের একাকীত্ব কিংবা সভ্যতার একাকীত্ব। একইভাবে ‘একাই’ কবিতার বিধৃত হয়েছে, –
“একাই হেঁটেছো দীর্ঘ সীমানা” ১২
একটি পংক্তি বিশাল মহাকাব্যের মতো ওজস্বী ও বিস্তীর্ণ। জীবনের নিঃসঙ্গ যাত্রার প্রতীক। আবার ‘মানুষের দলে’ কবিতায়—
“আকাশ দেখতে শেখার পর থেকেই/কোন দলে বেশি লাভ বুঝতে পারিনি…” ১৩
বলাবাহুল্য,এইভাবে একের পর এক কবিতায় স্বাধীন চেতনার উৎসেচক সমগ্র কাব্যের মূল উপজীব্য হয়ে উঠেছে।
উচ্চারণের মধ্যে দলগত স্বার্থের বাইরে স্বাধীন চেতনার পরিচয় মেলে।
সময় ও সমাজ সম্পর্কে তীক্ষ্ণ বোধ ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে।
আবার, ‘নিঃসঙ্গ’ কবিতায় কবি যেন নিজের শিল্পসাধনার ব্যর্থতা ও জীবনের অপূর্ণতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। কবিতার একেবারেই শেষ বিন্দুতে পৌঁছে কবি লিখেছেন, –
“আসলে নিঃসঙ্গ আজ/শুধুই মানুষ” ১৪
সমগ্র কাব্যগ্রন্থের কাব্যগ্রন্থের মূল সুর এই পংক্তি। এখানে নিঃসঙ্গতা কোনো ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; বরং সমগ্র মানবসমাজের অস্তিত্বগত বাস্তবতা।
কাব্যগ্রন্থের আর এক কবিতা ‘আজ আবার’-এ জীবনের অপূর্ণতা, অসমাপ্ত স্বপ্ন ও সময়ের নির্মম প্রবাহ ধরা পড়েছে—
“আমার অনেককিছুই করার ছিল” ১৫
এই স্বীকারোক্তির মধ্যে একজন কবির ব্যক্তিগত আক্ষেপ যেমন আছে, তেমনি আছে সমগ্র মানবজীবনের অপূর্ণতার সুর।
আলোচ্য কাব্যগ্রন্থ মূলত আত্মঅন্বেষণ, নিঃসঙ্গতা, সামাজিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানবিক বেদনা এবং অস্তিত্বের গভীর প্রশ্নের কাব্য। বৃন্দাবন দাস এখানে কোনো চূড়ান্ত উত্তর দেন না; বরং প্রশ্নের ভেতর দিয়েই জীবনকে দেখতে শেখান। ফলে এই কাব্যগ্রন্থ পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী চিন্তার জন্ম দেয় এবং তাকে নিজের অন্তর্জগতের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
কবি জীবনের মধ্যগগন পেরিয়ে জীবনের বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে কবিতা চর্চার ক্ষেত্রেও বিপুল বাঁক নিয়েছেন। তাঁর কবিতা পরিণত দিনে দিনে হয়েছে। কিন্তু একথাও ঠিক যে তাঁর প্রথম দিকের বেশকিছু রচনা শ্রেষ্ঠত্ব শিরোপা মাথায় নিয়ে বসে থাকবার দাবিদার। একথা বেশ জোরের সঙ্গে বলতে হয় যে, কবি বৃন্দাবন দাসের ‘শুধু মাটির যা আকাল’ (২০১৯) কাব্যগ্রন্থ দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ, মানবিক ও সমাজসচেতন এক কবির পরিণত সৃষ্টির পরিচয় বহন করে। প্রায় পাঁচ দশকের জীবনসংগ্রাম, সমাজবাস্তবতার অভিজ্ঞতা এবং গভীর মননশীলতা এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলিকে অন্য মাত্রায় ধ্রুপদী করে তুলেছে ক। সমকালীন সময়ের পরিবর্তিত বাস্তবতা বৃন্দাবনের কবিতায় নতুন মাত্রা এনেছে। ‘মেঘ, তোমাকে’ কবিতার শেষ পংক্তি —
“যাও মেঘ… ডেকে আনো ফলবতী মাটি” ১৬
পুরাণ ও ঐতিহ্যের আধুনিক ব্যবহারের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। আবার, ‘জানেন’ কবিতায় কবি লিখেছেন— “প্রত্যহ সকালে সীতা সাবিত্রী দময়ন্তীর নাম করি আমরা” ১৭
যেখানে সমাজের ভণ্ডামি ও নারীর অবস্থান নিয়ে জোরালো প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এই কাব্যগ্রন্থের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিবাদ, বিদ্রূপ ও প্রশ্নমুখরতা। ‘প্রিয় আলোক তোমাকে’ কবিতায় কবি বলেন— “দু-চার কথা মিথ্যে লিখতেই হয়” ১৮
অন্যদিকে ‘বৃদ্ধ প্রাজ্ঞকে’ কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে— “আমরা কি শ্বাপদের দেশে… মনুষ্যত্বের দাবি করব না আর”১৯
ফলে আলোচ্য কাব্যগ্রন্থের সমগ্র পদচারণায় সমাজবাস্তবতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে।
একইসঙ্গে গভীর মানবতাবাদী চেতনা সমগ্র কাব্যগ্রন্থে ঢেউয়ের মতো প্রবাহিত হয়েছে।
বৃন্দাবন দাসের ‘শুধু মাটির যা আকাল’ কাব্যগ্রন্থে মানুষ, প্রকৃতি, রাজনীতি, ধর্ম, সংবিধান, গ্রামজীবন ও বিশ্ববাস্তবতা—সবকিছুই কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছে। ‘দেবতা’ কবিতায় মানুষকে দেবতার আসনে বসানো হয়েছে, আবার ‘নর্দমা’ কবিতায় সেই মানুষই সামাজিক অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে। আবার, ‘বাবা বলছে কবিতা’ কবিতার বিখ্যাত পংক্তি — “খোকা, অনেক কিছুই পাওয়া যাবে/শুধু মাটির যা আকাল” ২০
সমগ্র কাব্যগ্রন্থের কেন্দ্রিয় বোধকে ধারণ করে। এখানে ‘মাটি’ শুধু ভূমি নয়, মানবিকতা, শিকড় ও মূল্যবোধের প্রতীক। এই কারণেই কবি এই পংক্তিকেই গ্রন্থের নাম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। আলোচ্য কাব্যগ্রন্থটি সার্থক, মানবিক ও সুদূরপ্রসারী কাব্যগ্রন্থ, যা সমকালীন বাংলা কবিতায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
কবির ‘সুজনেষু’ ( ২০২০)কাব্যগ্রন্থ মহামারির সময়ের মানবিক দলিল হিসেবে ভূমিষ্ঠ হয়েছে। তাঁর কাব্যজীবনে ‘সুজনেষু’ একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন। কোভিড-১৯ মহামারির ভয়াবহ সময়ে রচিত এই গ্রন্থ মূলত পত্রকাব্যের আঙ্গিকে নির্মিত। মহামারির সময় মানুষ শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। সামাজিক দূরত্ব, অনিশ্চয়তা এবং মৃত্যুভয় মানুষের জীবনকে আচ্ছন্ন করেছিল। এই পরিস্থিতিতে বৃন্দাবন দাস পত্রকে আশ্রয় করে মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। গ্রন্থটির প্রধান শক্তি সুউচ্চ মানবিকতা। এখানে কবি কোনো মহৎ তত্ত্ব নির্মাণ করেননি; বরং মানুষের দুঃখ, উদ্বেগ এবং আশাকে ভাষা দিয়েছেন। বিচ্ছিন্নতার সময়েও মানুষের প্রতি তাঁর আস্থা অটুট থেকেছে। ‘সুজনেষু’ কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়; এটি এক ঐতিহাসিক সময়ের মানসিক নথি। ভবিষ্যতের পাঠকের কাছে এই গ্রন্থ মহামারিকালের মানবিক অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ‘শুধুই অপেক্ষা ‘ কবিতায় কবি লিখেছেন,
“অপেক্ষা অপেক্ষা অপেক্ষা /
শুধুই অপেক্ষা…” ২১
উল্লেখ্য, কবি গণেশ বসুকে নিবেদন করে লেখা এই পত্রকবিতা। আসলে পৃথিবীর সব সুজনেষুকে লক্ষ্য করেই লেখা হয়েছে এই উত্তরণের কবিতা। আরোগ্যের কবিতা।
‘ইউ কে-র জানালা দিয়ে’ (২০২০) কাব্যগ্রন্থের অন্দরমহলে প্রবেশ করে দেখা যায়, কবি বৃন্দাবন দাস প্রবাসে থেকেও স্বদেশের কবি। তাঁর জীবনবোধ, মানবচেতনা ও স্বদেশানুরাগ জীবনের করতলে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাঁর কবিতা বিশ্বের মূল উপজীব্য প্রথমত মানুষ,শেষপর্যন্ত মানুষ; মানুষ-ই সর্বেসর্বা। গ্রামীণ জনজীবন, শ্রমজীবী মানুষের বেদনা, প্রকৃতির অন্তর্লীন সৌন্দর্য, সামাজিক বৈষম্য এবং মানবিক সম্পর্কের অমলিন বন্ধন তাঁর কবিতার চরাচর নির্মাণ করেছে। সময়ের সঙ্গে তাঁর জীবন-অভিজ্ঞতার পরিধি বিস্তৃত হয়েছে, দেশ ও দেশের বাইরের বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু মানুষ হিসেবে তিনি একটুও বদলাননি। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আরও বিশ্বমুখী হয়েছে, কিন্তু হৃদয়ের কেন্দ্রটি রয়ে গেছে স্বদেশ ও মানুষের কাছেই। ‘ইউ কে-র জানালা দিয়ে’ কাব্যগ্রন্থ সেই পরিণত চেতনারই এক অনন্য দলিল।
এই কাব্যগ্রন্থের সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, কবি ইংল্যান্ডে অবস্থান করেও ক্রমাগত ফিরে যাচ্ছেন ভারতবর্ষে, বাংলায়, তাঁর শিকড়ের কাছে। ভৌগোলিক দূরত্ব তাঁর মধ্যে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি সৃষ্টি করেনি; বরং স্বদেশকে নতুনভাবে আবিষ্কারের সুযোগ করে দিয়েছে।
‘ইংল্যান্ডের মাটি থেকে ভারতবর্ষ’ কবিতায় তিনি লিখছেন—
“আজও আমার অর্ধেক ভারতবর্ষ আকাশ কী তাই বোঝেনি।”২২
এই উচ্চারণে কোনো অবজ্ঞা নেই; বরং রয়েছে গভীর মমত্ববোধ, আত্মিক আহ্বান। রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো বা বিশ্বরাজনীতির জটিলতা না-জানা মানুষের মধ্যেই তিনি ভারতবর্ষের প্রকৃত মুখ খুঁজে পান। তাই তিনি প্রশ্ন করেন—
“এখনও বুঝে উঠতে পারেনি কাকে বলে মুখ্যমন্ত্রী
কাকে বলে প্রধানমন্ত্রী
কেনই বা রাষ্ট্রপতির এতশত সৈন্যসামন্ত…”২৩
এই প্রশ্ন আসলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়; রাষ্ট্রের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতি কবির গভীর দায়বোধের প্রকাশ।
প্রবাসে দাঁড়িয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, উন্নয়ন ও আধুনিকতার চেয়েও বড় সত্য হলো মানুষ। তাই একই কবিতায় তিনি স্মরণ করেন—
“বিদ্যাসাগরের ভারতবর্ষ
রামমোহনের ভারতবর্ষ
দ্বারকানাথের ভারতবর্ষ
রাসমণির ভারতবর্ষ
বিবেকানন্দের ভারতবর্ষ
নেতাজীর ভারতবর্ষ…”২৪
এই নামগুলি কেবল ইতিহাসের স্মারক নয়; এগুলি ভারতীয় মানবতাবাদ, সমাজসংস্কার, আত্মমর্যাদা ও জাগরণের প্রতীক। কবি যেন স্মরণ করিয়ে দেন, প্রকৃত ভারতবর্ষ এই ঐতিহ্যের মধ্যেই বেঁচে আছে। এই ঐতিহ্য ও পরম্পরা স্বদেশের সঞ্জীবনী সুধা, অমৃত বাণী।
‘ইউ কে-র জানালা দিয়ে’ কাব্যগ্রন্থে কবির সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হল মানুষের প্রতি মানুষের আকর্ষণ এবং স্মৃতির অমোঘ শক্তি। ‘খোলা চিঠি সবার নাম জড়িয়ে, তার পাতায় পাতায়’ কবিতায় তিনি একের পর এক বন্ধু, কবি, শিক্ষক, আত্মীয়, শুভানুধ্যায়ীর নাম উচ্চারণ করেছেন। প্রথম দৃষ্টিতে এটি স্মৃতিচারণ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি তাঁর মানসিক ভূগোলের নির্মাণ। ক্যানলি লাইব্রেরিতে বসে তিনি যখন দিব্যেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, পঙ্কজ মান্না, রাণা চট্টোপাধ্যায়, পবিত্র মুখোপাধ্যায়, শুভেন্দু বারিক কিংবা অদীপ ঘোষদের স্মরণ করেন, তখন ব্যক্তিনামগুলি প্রতীকে রূপান্তরিত হয়। এগুলি আসলে তাঁর অখণ্ড প্রশ্বাস, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, তাঁর মানসিক ভারতবর্ষ।
এই কবিতার মধ্যেই তিনি লিখেছেন—
“কত মুখ, কত কত শুভানুধ্যায়ী
বঙ্গের মাটি
এই দূরদেশেও
কী অমলিন ভেসে ওঠে…”২৫
এই কয়েকটি পংক্তির মধ্যেই প্রবাসী কবির অন্তর্জগত উন্মোচিত হয়ে যায়। তিনি আসলে বিদেশে নন; স্মৃতির মধ্য দিয়ে সর্বক্ষণ নিজের মানুষদের সঙ্গেই বসবাস করছেন।
কাব্যগ্রন্থের আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ‘ইংল্যান্ড ছেড়ে যেতে যেতে দুটো কথা’। ২৩ আগস্ট ২০১৯-এ, Coventry-এর 4 Grafton Court, Mayors Croft-এ বসে রচিত এই কবিতায় কবি যেন একজন পিতা, শিক্ষক ও জীবনদ্রষ্টা। আত্মজ অভিষেক ও সায়নীকে উদ্দেশ্য করে লেখা এই কবিতাটি আসলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মানবিক মূল্যবোধের উত্তরাধিকার অর্পণের দলিল। তিনি লিখছেন—
“মানুষ পোষাকে নয়,
মনই তার চির অগ্রপথিক।”২৬
আবার, তিনি লিখছেন—
“সংযম, সততা আর সত্যের সন্ধান
ধরণীর তাবৎ সম্পদ…”২৭
এবং আরও গভীরভাবে ঘোষণা করছেন –
“তোমরা যে তাঁদেরই ‘অমৃত সন্তান’
এটুকু ভুল হবার নয়।”২৮
চৈতন্যের ‘তৃণাদপি সহিষ্ণু চ’, বিবেকানন্দের ‘জীবে প্রেম’, বুদ্ধের করুণা এবং বিশ্বমানবতার শিক্ষা এখানে একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। ফলে কবিতাটি ব্যক্তিগত বিদায়বার্তা হয়েও এক সর্বজনীন জীবনদর্শনের রূপ পরিগ্রহ করেছে। এই কাব্যগ্রন্থটির একটি বিশেষ তাৎপর্য নিহিত রয়েছে কবিতাগুলির স্থান-নির্দেশে। Canley Library Reading Room, Prior Dream Park, Coventry, Warwick, Mayors Croft কিংবা 4 Grafton Court সহ একাধিক স্থাননাম কেবল ভৌগোলিক তথ্য নয়; এগুলি কবির সৃষ্টিশীল মানসিক অবস্থানেরও পরিচায়ক। পার্কে বসে লেখা কবিতায় প্রকৃতি ও আত্মমননের সুর প্রবল হয়েছে, লাইব্রেরিতে বসে লেখা কবিতায় চিন্তা, স্মৃতি ও সাহিত্যচর্চার আবহ তৈরি হয়েছে, আর আবাসনের জানালার ধারে বসে লেখা কবিতাগুলিতে স্বদেশস্মৃতি ও মানবিক অন্বেষণ সবচেয়ে তীব্রভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ফলে স্থান এখানে কেবল পটভূমি নয়; কবিতার অন্তর্গত অর্থ নির্মাণেরও অংশ।
‘অনবদ্য সবকথাই লিখে রাখতে ইচ্ছে করে’ কবিতায় কবি তাঁর সাহিত্যদর্শনও ব্যক্ত করেছেন। Canley Library-তে বসে তিনি সংযম ও সান্ত্বনার অক্ষরে লিখেছেন,
“কেউ কী কম
কেউ কী বেশি
এ ভাবনায় কোনোকাল হেলদোল নেই।”২৯
এই পংক্তি তাঁর আজীবনের মানবিক বিশ্বাসের সারকথা। ক্ষমতা, খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা বা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করার প্রবণতা তাঁর মধ্যে নেই। তিনি বিশ্বাস করেন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার মনুষ্যত্বে। এই সমগ্র কাব্যগ্রন্থের দার্শনিক ভিত্তি খুঁজতে গেলে ফিরে আসতে হয় সেই অনন্য উচ্চারণে—
“কোথাও স্বস্তি নেই
আপাত সৌন্দর্যে ভরে আছে দুর্গম অনুভূতি।”৩০
এই পংক্তি যেন ‘ইউ কে-র জানালা দিয়ে’ কাব্যগ্রন্থের মূল চাবিকাঠি। ইংল্যান্ডের সুশৃঙ্খল নাগরিক জীবন, উন্নত সভ্যতা, বাহ্যিক সৌন্দর্য—সবকিছুর অন্তরালে কবি যেন শতাব্দীর রোদ্দুর ও জ্যোৎস্নায় বসে উপলব্ধি করেছেন মানুষের নিঃসঙ্গতা, অনিশ্চয়তা, স্মৃতির টান এবং অস্তিত্বের জটিলতা। তাই তাঁর দৃষ্টি শেষ পর্যন্ত ফিরে যায় ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষের দিকে, বাওয়ালির মাটির ঘরের দিকে, বাংলার কবিবন্ধুদের দিকে। সর্বভূতেষু স্বভূমি ও স্বজনদের দিকে তাঁর হৃদয় ও মন নিবেদিত হয়ে ওঠে। একথা অনস্বীকার্য যে, ‘ইউ কে-র জানালা দিয়ে’ কাব্যগ্রন্থে কবি বৃন্দাবন দাস এক নতুন জীবনবোধের আবিষ্কারক। তিনি উপলব্ধি করেছেন, মানুষকে বোঝার জন্য ভূগোলের চেয়ে হৃদয়ের প্রয়োজন বেশি; ঝাঁ চকচকে সভ্যতার চেয়ে বড় হল মানবিকতা; আর স্মৃতি, ভালোবাসা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে প্রবাসে থেকেও স্বদেশকে ধারণ করা সম্ভব । এই কারণেই তিনি বিশ্বদৃষ্টিসম্পন্ন হয়েও শিকড়হীন নন, আধুনিক হয়েও ঐতিহ্যবিমুখ নন, প্রবাসী হয়েও অন্তরে চিরকাল স্বদেশের কবি, মানুষের কবি, আরোগ্যের কবি।
বৃন্দাবন দাসের কবিতার সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য তাঁর ভাষার স্বাতন্ত্র্য ও কাব্যরীতি। আধুনিক বাংলা কবিতার ভাষা ও বয়ন অনেক ক্ষেত্রে যেখানে জটিল, ক্রমশ দুর্বোধ্য, অনতিক্রম্য,প্রতীকনির্ভর এবং সাংকেতিক হয়ে উঠেছে, সেখানে বৃন্দাবন দাস সহজ, স্বচ্ছ এবং কথোপকথনধর্মী ভাষাকে সাবলীল ও স্বচ্ছন্দে গ্রহণ করেছেন।
এই ভাষা সাধারণ পাঠকের কাছে সহজবোধ্য হলেও এর ভেতরে গভীর ব্যঞ্জনা ও রহস্য ক্রিয়াশীল থাকে। চর্যাপদের ভেতর ও বাইরের ভিন্নধর্মী অর্থের মতোই এই ভাষা, চলমান সময়ের যন্ত্রণা ও মনন যৌথভাবে ক্রিয়াশীল। কবির শব্দ চয়ন ও জীবন দর্শনের অনুরণন বলে দেয়, কবিতার শক্তি ভাষার দুরূহতায় নয়, অনুভূতির আন্তরিকতায়। এখানেই তাঁর গভীর বিশ্বাস ও আস্থা। তাই তাঁর কবিতায় দেখা যায় দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহৃত শব্দ, পরিচিত বাক্যরীতি এবং স্বাভাবিক উচ্চারণভঙ্গি।
তাঁর কবিতার ছন্দও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ছন্দসচেতন কবি হলেও প্রচলিত অন্ত্যমিলনির্ভর ছন্দে আবদ্ধ নন। অক্ষরবৃত্তের প্রবহমানতা, অসমপংক্তির ব্যবহার এবং কথোপকথনের স্বাভাবিক গতি তাঁর কবিতাকে স্বতন্ত্র রূপ দিয়েছে। ফলে তাঁর কবিতা পাঠের সময় মনে হয় যেন একজন মানুষ আরেকজন মানুষের সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় মগ্ন। আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার কথোপকথন। এই সহজ ভাষার মধ্যেই তিনি গভীর জীবনদর্শন প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর কবিতায় এমন অনেক পংক্তি রয়েছে, যা আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত সাধারণ মনে হলেও পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী অভিঘাত সৃষ্টি করে। এখানেই তাঁর কাব্যিক সাফল্য।
প্রসঙ্গত বলতে হয়, বাংলা সাহিত্যে সহজ ভাষায় গভীর কথা বলার একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। লালন ফকির, রবীন্দ্রনাথের অনেক গান, জসীমউদ্দীন কিংবা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় আমরা তার সম্যক সাক্ষাৎ পাই।বৃন্দাবন দাস এই ঐতিহ্যের উত্তরসূরি। সহজতার নন্দনতত্ত্ব তাঁর জীবন ও যাপনের করতলে আবদ্ধ। তাঁর কবিতার সহজতা কোনো সরলীকরণ নয়। বরং এই সহজতার মধ্যেই তিনি জটিল জীবনসত্যকে ধারণ করেন। তিনি কৃত্রিম অলংকার, দুর্বোধ্য প্রতীক কিংবা অতিরিক্ত বৌদ্ধিক নির্মাণের উপর নির্ভরশীল নন। তাঁর কবিতার সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে গভীর উপলব্ধি ও আশ্চর্য আন্তরিকতায়। এই কারণে তাঁর কবিতা পাঠকের সঙ্গে দ্রুত সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়। পাঠক প্রত্যক্ষ করেন, এ যেন কবিতার দর্পণে নিজেকে খুঁজে পাওয়া। কবি তাঁরই ভাষায়, তাঁরই জীবনের কথা আওড়ে চলেছেন। আধুনিক বাংলা কবিতায় এই ধরনের যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষমতা খুব বেশি কবির মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না। ফলে বৃন্দাবন দাসের কবিতার সহজতা আসলে একটি সচেতন শিল্পকৌশল ; যা তাঁর কাব্যদর্শনের অংশ এবং তাঁর সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্যের অন্যতম ভিত্তি।
মরমী কবি হিসেবে বৃন্দাবন দাসের কবিতার বৈশিষ্ট্যের কেন্দ্রে রয়েছে প্রকৃতিচেতনা। মাটি, সবুজ ও জীবনের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের গভীর সমীকরণ।তবে তাঁর প্রকৃতিবোধ নিছক প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের জীবন, শ্রম, স্মৃতি ও অস্তিত্বের সঙ্গে একাত্ম এক শক্তি ও সম্মেলন হিসেবে তিনি প্রকৃতিকে দেখেছেন। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি কখনও পটভূমি নয়; বরং একটি সক্রিয় চরিত্রের মতো উপস্থিত।
বৃন্দাবন দাসের কবিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর আত্মকথনধর্মিতা। তাঁর কবিতা সম্মিলিত আত্মকথন ও আত্মউন্মোচনের শিল্প হয়ে উঠেছে। একইসঙ্গে সন্দিহান শূন্য হয়ে বলা যায়, বৃন্দাবন দাসের কবিতার একটি শক্তিশালী দিক তাঁর সমাজসচেতনতা। তিনি সমাজকে বাইরে থেকে দেখেন না; সমাজের ভেতরে বাস করেই তার অসঙ্গতি, বৈষম্য এবং অবক্ষয়কে উপলব্ধি করেন। সমাজদৃষ্টি ও প্রতিবাদী চেতনার সক্রিয়তা তাঁর কবিতার আর এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
সমকালীন সমাজে ভণ্ডামি, অসত্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, শোষণ এবং নৈতিক অবক্ষয় তাঁকে ব্যথিত করেছে। তিনি সরাসরি রাজনৈতিক স্লোগানের আশ্রয় কখনোই নেননি। তাঁর প্রতিবাদ এসেছে কবিতার ভাষায়, ব্যঞ্জনায় এবং মানবিক অবস্থান থেকে। এই কারণে তাঁর কবিতার প্রতিবাদ দীর্ঘস্থায়ী অভিঘাত সৃষ্টি করে। তিনি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রচারক নন; বরং মানুষের মর্যাদার পক্ষে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে একজন শিল্পীর সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
তাঁর কবিতায় প্রান্তিক মানুষের বেদনা যেমন আছে, তেমনি আছে শাসনব্যবস্থার প্রতি সংশয়ও। তিনি দেখেছেন সমাজে সত্যিকারের মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। মিথ্যা, প্রতারণা এবং আত্মপ্রবঞ্চনা ক্রমশ মানুষের জীবনকে গ্রাস করছে। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর কবিতায় তীব্র সামাজিক বোধ জন্ম নিয়েছে। তবে তাঁর প্রতিবাদ কখনও ধ্বংসাত্মক নয়। বিস্ফোরক নয়, মিনমিনেও নয়, বেশ ধারালো। প্রতিষেধকের মতো সক্রিয়। তিনি বিশ্বাস করেন, পরিবর্তন সম্ভব। মানুষ এখনও তার মানবিক শক্তিকে পুনরুদ্ধার করতে পারঙ্গম। এই বিশ্বাসই তাঁর সমাজদৃষ্টিকে ইতিবাচক মাত্রা দিয়েছে।
বাংলা কবিতায় প্রান্তিক মানুষের জীবন বহুবার উঠে এসেছে। বহুধাবিভক্ত ও বহু ধারায় বিধৃত হয়েছে কিন্তু বৃন্দাবন দাসের কবিতায় এই মানুষগুলো কেবল বিষয়বস্তু নয়; তারা কবিতার প্রাণ। কবির কবিতা প্রান্তিক মানুষের জোরালো কণ্ঠস্বর। তিনি শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের নিরাপদ দূরত্ব থেকে প্রান্তিক মানুষের কথা বলেননি। বরং তাঁদের জীবনযন্ত্রণাকে ভেতর থেকে অনুভব করেছেন। শ্রমিক, কৃষক, দিনমজুর, দরিদ্র মানুষ, সামাজিকভাবে উপেক্ষিত মানুষ—এঁরাই তাঁর কবিতার প্রধান চরিত্র। এই মানুষদের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি করুণার নয়, সম্মানের। তিনি তাঁদের সংগ্রামকে মহিমান্বিত করেন না; আবার অবহেলাও করেন না। বরং তাঁদের জীবনকে তার বাস্তব রূপে তুলে ধরেন। ফলে তাঁর কবিতায় সাধারণ মানুষের জীবন এক নতুন মর্যাদা লাভ করে। এখানেই তাঁর কবিতার মানবতাবাদী শক্তি নিহিত। তিনি বিশ্বাস করেন, সভ্যতার প্রকৃত ইতিহাস রচিত হয় সাধারণ মানুষের শ্রম ও ত্যাগের উপর। তাই তাঁদের জীবনকে কবিতায় স্থান দেওয়া তাঁর কাছে নৈতিক দায়িত্বের সমান। সভ্যতার পিলসুজ ধরে রাখার গৌরব।
বৃন্দাবন দাসের কবিতায় একটি গভীর দার্শনিক বোধ কাজ করে। কিন্তু এই দর্শন কোনো তাত্ত্বিক দর্শন নয়; এটি বহু বিস্তৃত জীবন অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত উপলব্ধির দর্শন। জীবনের অনিত্যতা, মানুষের সীমাবদ্ধতা, সময়ের প্রবাহ, মৃত্যু, স্মৃতি এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন তাঁর কবিতায় বারবার আবর্তিত, পরিক্রমা রত। কিন্তু তিনি কখনও বিমূর্ত চিন্তার জগতে হারিয়ে যান না। বাস্তব অভিজ্ঞতার মাটিতেই দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নগুলির মুখোমুখি হন। উত্তর খুঁজে বেড়ান। তারিয়ে তারিয়ে মহাজাগতিক জীবন ও পদধ্বনি উপভোগ করেন। তাঁর কবিতাবিশ্বের দ্যুলোক গোলক ভেদ করে দেখা যায়, তাঁর কবিতায় সুগভীর মৃত্যুচেতনা আছে, কিন্তু মৃত্যুভয় নেই। তিনি জানেন মৃত্যু অনিবার্য, তবু জীবনকে ভালোবাসতে হবে। কারণ জীবনের মধ্যেই রয়েছে সমস্ত সৃষ্টির সম্ভাবনা। এই উপলব্ধি তাঁকে এক ধরনের স্থিতধী মনোভাব দিয়েছে। সময়ের পরিবর্তন, মানুষের সম্পর্কের জটিলতা এবং জীবনের অনিশ্চয়তা সম্পর্কে তিনি গভীরভাবে সচেতন। কবির এই সচেতনতা তাঁকে নৈরাশ্য কিংবা বৈরাগ্যের দিকে নিয়ে যায় না , বরং তিনি উপলব্ধি করেন যে, পরিবর্তনই জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। যথার্থ ব্যাকরণ। তাই তিনি ক্ষয়কে স্বীকার করেন, কিন্তু সৃষ্টির সম্ভাবনাকে কখনও অস্বীকার করেন না। এই বহুস্তরীয় দার্শনিকতা তাঁর কবিতাকে একটি বিশেষ উচ্চতায় উন্নীত করেছে। ফলে তাঁর কবিতা কেবল আবেগের প্রকাশ নয়; তা হয়ে উঠেছে জীবন সম্পর্কে এক গভীর চিন্তার ক্ষেত্র।
বৃন্দাবন দাসের কবিতার সবচেয়ে উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য সম্ভবত তাঁর আশাবাদ। বর্তমান সময়ে যখন হতাশা, বিচ্ছিন্নতা এবং অনিশ্চয়তা মানুষের জীবনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তখনও তিনি মানুষের উপর আস্থা হারান না, আশাবাদ ও মানববিশ্বাস কবি জীবনের মস্ত বড় অবলম্বন। তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে আসে নতুন ভোরের প্রতীক্ষা, নতুন আলোর সম্ভাবনা এবং মানুষের পুনর্জাগরণের স্বপ্ন। এই আশাবাদ কোনো সরল আবেগ নয়; বরং দীর্ঘ জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত এক গভীর বিশ্বাস। কোভিড মহামারির মতো ভয়াবহ সময়েও তিনি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের শক্তির উপর ভরসা রেখেছেন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি জীবনের পক্ষে কথা বলেছেন। এই কারণেই তাঁর কবিতা পাঠকের মনে সাহস জাগায়। আসলে তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের সমস্ত দুর্বলতার মধ্যেও এক অমিত সম্ভাবনার বীজ থেকে গেছে। কবির কাজ সেই সম্ভাবনাকে অঙ্কুরিত করে পত্র-পুষ্পে বিকশিত করে দেওয়া।তাঁর কবিতার আশাবাদ তাই কোনো কৃত্রিম সান্ত্বনা নয়; এটি মানবসভ্যতার প্রতি এক গভীর আস্থা ও অবলম্বন। এই মানববিশ্বাসই তাঁকে সমকালীন বাংলা কবিতার ভিড়ে স্বতন্ত্র করে তুলেছে এবং তাঁর কবিতাকে দীর্ঘস্থায়ী তাৎপর্য প্রদান করেছে।
কবি বৃন্দাবন দাসের কাব্যভাষার স্বাতন্ত্র্য ও শিল্প সাফল্যের বিষয়টিও এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাঁর কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর ভাষা। তিনি প্রমাণ করেছেন যে গভীর কবিতা রচনার জন্য দুর্বোধ্যতা অপরিহার্য নয়। সহজ ভাষার মধ্য দিয়েও গভীর জীবনবোধ প্রকাশ করা সম্ভব। তাঁর ভাষায় কথোপকথনের স্বাভাবিকতা রয়েছে। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার মধ্যেই কবিত্বের দীপ্তি লুকিয়ে থাকে। তিনি শব্দের বাহুল্যের উপর নির্ভর করেন না; বরং শব্দের অন্তর্গত শক্তিকে ব্যবহার করেন। তাঁর কবিতায় চিত্রকল্পও সহজ ও পরিচিত। কিন্তু সেই পরিচিতির মধ্যেই নতুন অর্থের জন্ম হয়। ফলে পাঠক তাঁর কবিতার সঙ্গে সহজেই সংযোগ স্থাপন করতে পারেন। এই সহজতা আসলে দীর্ঘ সাহিত্যসাধনার ফসল। অনেক কবি জটিলতার আড়ালে নিজেদের ভাবকে লুকিয়ে রাখেন; বৃন্দাবন দাস সেখানে স্বচ্ছতাকে বেছে নিয়েছেন। এই স্বচ্ছতাই তাঁর শিল্পসাফল্যের অন্যতম কারণ।
সবমিলিয়ে সমকালীন বাংলা কবিতায় বৃন্দাবন দাসের স্থান নির্ধারণ করতে গেলে প্রথমেই তাঁর দীর্ঘস্থায়ী সাহিত্যসাধনার কথা স্মরণ করতে হয়। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি অবিচলভাবে কবিতা লিখে চলেছেন। কোনো সাহিত্যিক গোষ্ঠীর প্রচার নয়, কোনো প্রতিষ্ঠানের আশ্রয় নয়—নিজস্ব শক্তিতেই তিনি তাঁর অবস্থান নির্মাণ করেছেন।
তিনি এমন এক মেধাবী কবি, যিনি বাংলা কবিতাকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে এসেছেন। তাঁর কবিতায় যেমন মাটি আছে, তেমনি মননও আছে; যেমন বাস্তবতা আছে, তেমনি স্বপ্নও আছে; একইসঙ্গে প্রতিবাদ ও অটল ভালোবাসাও আছে। বাংলা কবিতার ইতিহাসে তিনি হয়তো তথাকথিত মূলধারার প্রচারিত নামগুলির মধ্যে নন, কিন্তু তাঁর কবিতার মানবিক গভীরতা, ভাষার স্বচ্ছতা এবং জীবনঘনিষ্ঠতা তাঁকে স্বতন্ত্র মর্যাদা প্রদান করেছে। তাঁর কবি প্রতিভার উচ্চতা সমকাল অপেক্ষা মহাকাল নির্ণয় করতে সর্বাধিক সক্ষম হবে। তাহলেও তিনি যে জাত কবি সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, তিনি ক্ষণকালের নন, তিনি চিরকালের কবি। তাঁর কবিতাবিশ্ব সে দাবি বেশ জোরের সঙ্গে রাখতে পারে। একজন অনুজ হিসেবে অগ্রজের নিছক কোনো প্রশংসা নয়, বরং একজন সামান্য পাঠক হিসেবে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়েছে যে, পাঠকের উচিত এই কবিতার বৃন্দাবনে পরিভ্রমণ করা। কবিকে আবিষ্কারের সামর্থ্য সবার থাকে না। মহাবিশ্বের সব নক্ষত্র আবিষ্কৃত হয়নি, একথা ঠিকই কিন্তু নক্ষত্রের অস্তিত্ব অস্বীকার করবার উপায় কোথায়? প্রকৃত পাঠকের কাছে কবি বৃন্দাবন দাস প্রথম দিন থেকেই পৌঁছে গিয়েছিলেন। তিনি সস্তা জনপ্রিয়তার হাত ধরে কখনোই চলতে চাননি, সূক্ষ্ম স্পর্শের মতো সুদৃঢ়ভাবে ছুঁয়ে যেতে তিনি চেয়েছেন।
মহাকালের গর্ভে তিনি কতখানি নিজের জায়গা করেছেন,সে গাদা গাদা সময়ের বিষয়। কিন্তু তাঁর কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কবিতার প্রকৃত শক্তি মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর ক্ষমতায়। সেই অর্থে বৃন্দাবন দাস বাংলা কবিতার একজন গুরুত্বপূর্ণ মানবতাবাদী কবি, যিনি সময়কে ধারণ করেছেন মানুষের ভাষায় এবং মানুষের জীবনকে রূপ দিয়েছেন কবিতার ভাষায়।
বাংলা কবিতার দীর্ঘ ইতিহাসে এমন অনেক কবি আছেন, যাঁরা প্রচারের আলোয় সর্বদা অবস্থান করেননি, কিন্তু তাঁদের সৃষ্টিশীলতা নীরবে সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। কবি বৃন্দাবন দাস তাঁদের মধ্যে অন্যতম একজন। তিনি এমন এক কবিসত্তা, যিনি জীবন ও সাহিত্যের মধ্যে কোনো কৃত্রিম বিভাজন স্বীকার করেন না। তাঁর কবিতা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অন্তরঙ্গ দলিল, বৃহত্তর সমাজজীবনেরও বিশ্বস্ত প্রতিফলন। দীর্ঘ চার দশকের অধিক সময় ধরে অবিচল কবিতাচর্চার মাধ্যমে তিনি বাংলা কবিতায় একটি স্বতন্ত্র অবস্থান নির্মাণ করেছেন। তাঁর কাব্যজীবনের দিকে তাকালে প্রথমেই যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হল তাঁর অনমনীয় জীবনসংগ্রাম। অর্থনৈতিক অনটন, সামাজিক অবহেলা, সাংস্কৃতিক প্রান্তিকতা কিংবা প্রতিষ্ঠানের উপেক্ষা—কোনো কিছুই তাঁকে কবিতার পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। বরং জীবনের এই প্রতিকূল অভিজ্ঞতাগুলিই তাঁর কবিতার অন্তর্গত শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তিনি অভাবকে রোমান্টিক করে তোলেননি, আবার হতাশার কাছেও আত্মসমর্পণ করেননি। তাঁর কবিতায় জীবনসংগ্রাম এক ধরনের সৃজনশীল শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই কারণেই তাঁর কবিতা পাঠকের কাছে কেবল সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা নয়, জীবনজিজ্ঞাসারও এক মূল্যবান উৎস হয়ে ওঠে।তাঁর কবিতার কেন্দ্রে সর্বদাই মানুষ স্থান পেয়েছে। এই মানুষ কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; রক্তমাংসের বাস্তব মানুষ। শ্রমিক, কৃষক, প্রান্তিক মানুষ, গ্রামীণ সমাজ, বাজারের সাধারণ মানুষ, জীবনের সঙ্গে লড়াই করে চলা অখ্যাত মুখগুলোই তাঁর কবিতার প্রকৃত নায়ক, নায়িকা। তিনি অবহেলা ও বঞ্চনা বিক্ষুব্ধ জীবনকে করুণার চোখে দেখেননি; বরং তাঁদের মধ্যে মানবমর্যাদার এক অনন্য দীপ্তি আবিষ্কার করেছেন। ফলে তাঁর কবিতা মানবতাবাদের এক গভীর ও আন্তরিক দলিলে পরিণত হয়েছে।
বাংলা কবিতার ইতিহাসে বৃন্দাবন দাসকে মূল্যায়ন করতে গেলে তাঁকে মূলধারার প্রচারপ্রাপ্ত কবিদের সঙ্গে তুলনা করে বিচার করার প্রয়োজন নেই। তাঁর শক্তি অন্যত্র। তিনি বাংলা কবিতার সেই ধারার উত্তরসূরি, যেখানে কবিতা মানুষের জীবন থেকে জন্ম নেয় এবং আবার মানুষের কাছেই ফিরে যায়। তাঁর কবিতায় লোকজ সংবেদন আছে, আধুনিক জীবনের জটিলতাও আছে; ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সমষ্টিগত চেতনাও আছে। এই সমন্বয়ই তাঁকে শক্তিমান কবি হিসেবে স্বতন্ত্র করে তুলেছে।
আজকের সময়ে, যখন সাহিত্য অনেক ক্ষেত্রেই বাজার, প্রচার এবং তাৎক্ষণিক খ্যাতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তখন বৃন্দাবন দাসের কাব্যসাধনা আমাদের একটি ভিন্ন পথের কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃত সাহিত্যিকের আসল শক্তি তাঁর সততা, মানবিকতা এবং সৃষ্টিশীল নিষ্ঠায়। দীর্ঘ সময় ধরে নিরলসভাবে লিখে যাওয়ার মধ্যেই একজন কবির প্রকৃত পরিচয় নির্মিত হয়। সেই অর্থে বৃন্দাবন দাস কেবল একজন কবি নন; তিনি বাংলা কবিতার এক নিরবচ্ছিন্ন সাধক।
প্রখ্যাত কবি সুখেন্দু মল্লিক অনুজ কবি বৃন্দাবন দাসের প্রতি গভীর বিশ্বাস ও আস্থা রেখে বলেছেন, “একজন সত্যিকারের কবিকে প্রতিকূল স্রোতে চলতে হয়। কেন চলতে হয় সঠিক বলা যায় না। কিন্তু তাঁকে এমনই চলতে দেখি। প্রতিষ্ঠা, সুখ, আরাম, তৈলচিক্কণ নধর জীবন কতোখানি তিনি ত্যাগ করেছেন বা কতোখানি তাঁকে ত্যাগ করেছে তিনি খেয়াল করেন না। ফোড়হীন অদোষদর্শিতাই এমনই এক তাঁকে ভাসিয়ে রাখে, চলমান কবি। স্পষ্টতা স্বচ্ছতা বৃন্দাবনের তাঁর কবিতা মানুষের মনের ভাষায় লেখা। কে এর গভীরতার ভাষার জটিলতার অন্বেষণ করেননি। এই কবিতা লেখা বড়ো সহজ নয়। বৃন্দাবনকে আমার আলিঙ্গন। যে পূর্ণতা তাঁর লক্ষ্য সেখানে তিনি পৌঁছবেনই, আমার বিশ্বাস।” এ বিশ্বাস আমারও রয়েছে গভীরভাবে, নক্ষত্রের আলোর মতো দীপ্তিময় সে বিশ্বাস, তিনি তাঁর লক্ষ্যে নিশ্চয়ই পৌঁছবেন। তাঁর সেই দীর্ঘ পরিক্রমার বেশিরভাগটাই তিনি ইতিমধ্যে অতিক্রম করে ফেলেছেন।
সবশেষে বলা যায়, বৃন্দাবন দাসের কবিতার মূল সুর হল মানুষ, ভূমি সংলগ্নতা, আশা ও উত্তরাধিকার। যা আগেও বলা হয়েছে। তাঁর কবিতা আমাদের শেখায় যে জীবনের সমস্ত অন্ধকারের মধ্যেও আলো খুঁজে পাওয়া সম্ভব; সমস্ত বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অটুট থাকে; সমস্ত ক্ষয় ও মৃত্যুর মধ্যেও সৃষ্টি এবং মানবতার শক্তি অবিনশ্বর। তাই তাঁর কবিতা কেবল সমকালীন বাংলা সাহিত্যের একটি মূল্যবান সম্পদ নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ মানবিক উত্তরাধিকার। তাঁর কাব্যভুবন আমাদের সচেতনভাবে জানান দেয় যে, সময়ের পরিবর্তন ঘটে, মানুষ চলে যায়, কিন্তু সত্যিকারের কবিতা থেকে যায় মানুষের হৃদয়ের গভীরে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।
তথ্যসূত্র:
১. পার্থ শর্মা, ‘ আত্মজনের কাব্যকথা : এবং আত্মকথা ‘, ‘আমি ‘ পত্রিকা, সম্পাদক: বৃন্দাবন দাস, বজবজ, ২০১৩
২. বৃন্দাবন দাস, ‘মানুষের পাশাপাশি ‘ কাব্যগ্রন্থ, অর্কিড, কলকাতা,১৯৮৬
৩. রাণা চট্টোপাধ্যায়, ‘বৃন্দাবন-এর কবিতা পাঠ’ , ‘আমি ‘ সম্পাদক: বৃন্দাবন দাস, ৮৫ সংখ্যা, বজবজ, ২০১৯
৪. বৃন্দাবন দাস, ‘সোনারোদের প্রার্থনা ‘ কাব্যগ্রন্থ, ‘আমি ‘, বজবজ, ২০০১
৫. বৃন্দাবন দাস, ‘ সবুজে মুড়েছি গা ‘ কাব্যগ্রন্থ, কবিপত্র প্রকাশ (পবিত্র মুখোপাধ্যায়), কলকাতা,২০১১
৬. তদেব, ২০১১
৭. তদেব, ২০১১
৮. তদেব, ২০১১
৯. তদেব, ২০১১
১০. তদেব, ২০১১
১১ বৃন্দাবন দাস, ‘জন্মভূমির মানুষ মৃত্যুহীন’ কাব্যগ্রন্থ, ‘আমি’, বজবজ, ২০১৬
১২. তদেব, ২০১৬
১৩. তদেব, ২০১৬
১৪. তদেব, ২০১৬
১৫. তদেব, ২০১৬
১৬. বৃন্দাবন দাস, ‘ মাটির যা আকাল ‘ কাব্যগ্রন্থ , সারঙ্গ প্রকাশনী, হাওড়া , ২০১৯
১৭. তদেব, ২০১৯
১৮. তদেব, ২০১৯
১৯. তদেব, ২০১৯
২০. তদেব, ২০১৯
২১. বৃন্দাবন দাস, ‘সুজনেষু ‘ পত্রকাব্য / কোভিড এলিজি, ‘আমি’ বজবজ ,২০২০
২২. বৃন্দাবন দাস, ‘ ইউ. কে. – র জানালা দিয়ে’, ইচ্ছেকথা, বজবজ, ২০২০
২৩. তদেব, ২০২০
২৪. তদেব, ২০২০
২৫. তদেব, ২০২০
২৬. তদেব, ২০২০
২৭. তদেব, ২০২০
২৮. তদেব, ২০২০
২৯. তদেব, ২০২০
৩০. তদেব, ২০



