১৬ জুন ১৯৭১: বরিশালের বাগদা দাসপাড়া গণহত্যা

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা বরিশালের বিভিন্ন এলাকায় হত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ চালায়। আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগদা দাসপাড়া সেই ধরনের একটি আক্রমণের শিকার হয়। ১৬ জুন ১৯৭১ পাকিস্তানি বাহিনী স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় এ গ্রামে হামলা চালায়। হামলায় বহু মানুষ নিহত হন, ঘরবাড়ি লুট হয় এবং এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

বাগদা দাসপাড়া আগৈলঝাড়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এলাকার অনেক মানুষ পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের আশঙ্কায় অনিরাপদ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিলেন। ১৬ জুন বিকেল প্রায় ৪টার দিকে স্থানীয় রাজাকার কমান্ডার আক্কেল আলী বালী, সাত্তার এবং তাদের সহযোগীদের সহায়তায় পাকিস্তানি সেনারা বাগদা দাসপাড়ায় প্রবেশ করে। গ্রামে ঢুকেই তারা লুটপাট শুরু করে এবং সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালায়।

আক্রমণের খবর ছড়িয়ে পড়লে গ্রামের মানুষ প্রাণ বাঁচাতে আশপাশের বিল ও জলাভূমিতে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানেও তারা নিরাপদ থাকতে পারেননি। রাজাকাররা বিলের পানিতে লুকিয়ে থাকা মানুষদের খুঁজে বের করে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেয়। অনেককে ঘটনাস্থলেই হত্যা করা হয়। কেউ কেউ পালানোর চেষ্টা করলেও রক্ষা পাননি।

গণহত্যায় নিহতদের মধ্যে বাগদা গ্রামের সুরেন ধুপি, অমূল্য ধুপি, সুধীর ধুপি, হরিপদ ধুপি, গণেশ দাস, দেবু চক্রবর্তী, সুরেন মুখার্জী, কেষ্ট শীল, সতীশ সমদ্দার, কালু সমদ্দার এবং রাইচরণ হুর ছিলেন। এছাড়া কোটালীপাড়া থেকে বেড়াতে আসা ললিত কীর্তনীয়া ও তার ছেলে অনিল কীর্তনীয়াও নিহত হন। বিভিন্ন সূত্রে অন্তত ১৫ জন নিহতের পরিচয় পাওয়া যায়। দাসপাড়ার নরেনের স্ত্রী এবং তার শিশুপুত্রও এ হত্যাযজ্ঞের শিকার হন। তবে স্থানীয় স্মৃতিতে নিহতের সংখ্যা আরও বেশি বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

হামলার লক্ষ্য শুধু মানুষ হত্যা ছিল না। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা এলাকার সম্পদ লুট করে এবং বসতিগুলো ধ্বংস করে। এর ফলে জীবিতদের অনেকেই গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও বহু পরিবার তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দীর্ঘ সময় নেয়।

গণহত্যার পর স্থানীয় মানুষ নিহতদের মরদেহ সংগ্রহ করেন। পরে তারা নীলকান্ত ধুপীর বাড়ি এবং নারায়ণ ধুপীর বাড়ির কাছে গণকবরে শহীদদের সমাহিত করেন। এই গণকবর আজও এলাকার মানুষের কাছে ১৯৭১ সালের সেই দিনের স্মৃতি বহন করে।

বাগদা দাসপাড়া গণহত্যা বরিশাল অঞ্চলে সংঘটিত অসংখ্য স্থানীয় হত্যাযজ্ঞের একটি। জাতীয় পর্যায়ে এ ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হলেও স্থানীয় স্মৃতি, গণকবর এবং শহীদ পরিবারের বয়ান এ ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে। নিহতদের পরিচয় সংরক্ষণ, গণকবরের ইতিহাস নথিবদ্ধ করা এবং স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এ গণহত্যার স্থান নির্ধারণ করা এখনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

তথ্যসূত্র:
বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৬ষ্ঠ খণ্ড।

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!