১৯৭১ সালের ১৭ জুন ঝালকাঠির জগদীশপুরে সংঘটিত হয় মুক্তিযুদ্ধের এক নির্মম গণহত্যা। সেদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী স্থানীয় রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যদের সহযোগিতায় জগদীশপুর, খাজুরা, রামপুর, মিরাখালি ও বেতরা গ্রামের বহু হিন্দু পরিবারকে হত্যা করে।
মার্চের পর থেকেই দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযান, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রাণ বাঁচানোর আশায় অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে পেয়ারা বাগান ও নির্জন স্থানে আশ্রয় নিয়েছিল। ১৭ জুন সকালে পাকিস্তানি সেনারা স্থানীয় দোসরদের সহায়তায় সেইসব আশ্রয়স্থলে পৌঁছে মানুষজনকে আটক করতে শুরু করে।
আটক ব্যক্তিদের জগদীশপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠের পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় ব্রাশফায়ার। একের পর এক মানুষ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সেদিন প্রায় ৬০ জন নিরীহ মানুষ শহীদ হন। নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন সাধারণ গ্রামবাসী। তাদের অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে লুকিয়ে ছিলেন, যুদ্ধ করার জন্য নয়, বেঁচে থাকার জন্য।
গণহত্যার পর এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যেসব পরিবার প্রাণে বেঁচে যায়, তারা আরও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। বহু ঘরবাড়ি জনশূন্য হয়ে পড়ে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে জগদীশপুরের মানুষ সেই দিনের স্মৃতি বহন করে চলেছে।
একই দিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। টাঙ্গাইলের বাসাইল থানার পশ্চিমে কামুটিয়া নর্থখোলা খেয়া পাড়ে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। এতে পাকিস্তানি বাহিনীর পাঁচজন সৈন্য নিহত হয়।
চট্টগ্রামে মুক্তিবাহিনীর চাঁদগাজী ঘাঁটির ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ব্যাটালিয়ন ট্যাঙ্ক, আর্টিলারি ও মর্টারসহ আক্রমণ চালায়। ক্যাপ্টেন অলি আহমদ, ক্যাপ্টেন শামসুল হুদা ও ক্যাপ্টেন মতিউর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।
ফেনীর বিলোনিয়ায় মুক্তিবাহিনীর অবস্থানের ওপরও পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ চালায়। প্রথম দিকে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তুললেও পরে বিমান সহায়তা নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ তীব্র করলে মুক্তিযোদ্ধারা চিথলিয়া গ্রামে সরে গিয়ে পুনরায় অবস্থান নেন।
অন্যদিকে দিনাজপুরের ঠনঠনিয়াপাড়ায় পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানের ওপর আক্রমণের প্রস্তুতি নেয় মুক্তিবাহিনী। মেজর নাজমুল হক ও সুবেদার মেজর এ রবের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পরিকল্পিতভাবে নিজেদের অবস্থান গ্রহণ করেন।
১৭ জুনের ঘটনাগুলো মুক্তিযুদ্ধের দুই ভিন্ন বাস্তবতাকে পাশাপাশি তুলে ধরে। একদিকে জগদীশপুরে নিরস্ত্র মানুষ হত্যার ঘটনা, অন্যদিকে বিভিন্ন রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ ও লড়াই। স্বাধীনতার ইতিহাসে দুটিই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র:
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, অষ্টম, নবম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড।




