বাঁচার জন্য
আকাশকে বললাম ছবি আঁকতে, মেঘের ছবি;
শৈশবের সেই কল্পছবি, কৈশোরের সেই গল্পছবি;
অনেক অনেক, অনেক ছবি…
আকাশ বলল—আঁকছি তো আমি রাতদিন,
তুমি তো দেখেছো না আর…
আমি বললাম—সে কি কথা!
তাকাই তো তোমার দিকে সময় পেলে,
তোমার দেখার ইচ্ছা হলে;
—সময় কি সেভাবে পাও কখনও?
মুচকি হেসে বলল আকাশ;
সত্যি তো, সময় সেভাবে পাচ্ছি কোথায়;
নিজের বলে কিছুই নেই, সবটাই যে পরিবারের;
কিচ্ছুই নেই নিজের জন্য, দেশের জন্য,
দশের জন্য, বাঁচার জন্য;
বাঁচব আমি কেমনভাবে!
আকাশ বলল—এখনও অনেক সময় আছে,
আবেগটাকে আঁকড়ে ধরো;
বুকের মধ্যে শ্বাস ভরো;
ইচ্ছামতো মেলতে থাকো রূপকথার-ডানা;
হঠাৎ কী মনে হলো, আকাশের দিকে যেই তাকালাম,
আকাশ জুড়ে মেঘ জমল,
ঝাঝমিয়ে বৃষ্টি নামল বুকের মধ্যে, মনের মধ্যে;
ভিজেই গেলাম আপন সুখে বর্ষার রাতে;
আশেপাশে তাকিয়ে দেখি, ভিজছে সবাই মেঘ-মল্লারে।
মূক ও বধির
ন-দশ বছরের ছেলেটাকে পিটিয়ে পিটিয়ে
মেরে দিল ওরা;
সেটাও আবার ঘটা করে ছড়িয়ে দিল
সমাজমাধ্যমে;
ছড়িয়ে দিতে চাইলো নতুন আরেক ভয়…
এই অন্ধকার বাতাবরণে;
ছেলেটির নাকি অপরাধ, খিদের জ্বালায়
খাবার চুরি করে ছিল;
আরও নাকি বড় অপরাধ, সে অন্য ধর্মের;
সে বুঝলো না ধর্ম কী! বিদ্বেষ কী!
কাকে বলে স্বদেশ!
আট-ন বছরের মেয়েটির মুখে কাপড় গুঁজে
কাঁধে নিয়ে দৌড় দিল, ওরা…
নদীর পাড়ে, ঝোপের আড়ালে;
মেয়েটি চিৎকার করতে চাইলো,
পারলো না;
দু-এক জনের লক্ষ্য পড়ল;
তারাও পিছু নিলো, ভাগ নিতে;
শরীরের ভাগ, কিশোরীর শরীরের ভাগ;
বিধর্মী নাবালিকা মেয়ের শরীরের স্বাদ…
সে কী উল্লাস, সে কী উচ্ছ্বাস;
মেয়েটি জানলো না ধর্ম কাকে বলে!
কাকে বলে বিধর্মী!
ওরা বাদ দিল না মৃত্যুর পরেও!
একের পর এক মৃত দেহগুলি
কেবল মাত্র ছবি হয়ে ঘুরছে
এক ভূখণ্ড থেকে আরেক ভূখণ্ডে;
এক সমাজ থেকে আরেক সমাজে,
সমাজমাধ্যমে;
কিসের বার্তা দিতে!
এতো কিসের উল্লাস!
যারা এতো দিন মানবতার গল্প শোনাতো
তারা হঠাৎ করে দু চোখে কিছুই দেখতে পেলো না;
চারিদিকে যে ভীষণ অন্ধকার;
যারা এতো দিন সম্প্রীতির বুলি আওড়াতো
তারা হঠাৎ করেই কথা বলা বন্ধ করে দিল;
চারিদিকে যে বাতাস ভীষণ ভারী
অসহায় মানুষের বুকফাটা কান্নার শব্দে;
যারা এতো দিন এপার… ওপার… করতো,
উৎসবে মেতে উঠতো,
তারা এখনও অপেক্ষা করছে
রক্তাক্ত মৃত দেহগুলির উপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে
গলায় আত্ম-অহংকারের উত্তরীয় পরে
বাড়ি সাজানোর স্মারক ও মানপত্র
মাথায় তুলে নেওয়ার;
যারা চির নিন্দুক তারা
এদের বা ওদের কাজকর্মগুলিকে
কোনও ভাবেই প্রশংসায় ভরিয়ে দিতে পারলো না;
এটাই দুঃখ থেকে গেল এ মূক ও বধির সমাজের।
গুরু পরম্পরায় আমরা
গুরু ব্রহ্মা, গুরু বিষ্ণু, গুরুদেব মহেশ্বর…
গুরু পরম্পরায় আমাদের জীবনাচার,
আমাদের প্রাণশক্তি, মুক্তির পথ;
গুরুকুল আমাদের কৃষ্টি, ঐতিহ্য…
হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের ইতিহাস,
আমাদের বৈদিক মন্ত্র,
আমাদের দিয়েছে উদারতা, মানবতা,
বিশ্ব প্রকৃতির পাঠ;
সে কারণে প্রথম সকালে সূর্য প্রণাম করি;
উচ্চারণ করি—
জবা কুসুম সঙ্কাশং…
পুজো করি প্রকৃতির প্রতিটি শক্তিকে;
আকাশ, বাতাস, আগুন, নদী, গাছ-গাছালি,
গবাদি পশু, মানুষকেও…
আমাদের গুরুকুল আমাদের দিয়েছে
বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত,
গীতার বাণী—
যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত…
গুরুকুল আমাদের দিয়েছে আর্যভট্ট, বরাহমিহির;
গণিতশাস্ত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞান, শূন্য তত্ত্ব, বিন্দু…
গুরুকুল আমাদের দিয়েছে
নালন্দা, তক্ষশীলা, বিক্রমশীলা,
দেবনাগরী অক্ষর…
সে কারণেই আমাদের গোত্র আছে;
উপাসনা পদ্ধতি আছে;
আছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জ্ঞান,
শাস্ত্র ও শস্ত্র শিক্ষা;
তাই আমরাই বলতে পারি—
মধু বাতা ঋতায়তে, মধু ক্ষরণতি সিন্ধুব…
বলতে পারি—
বসুধৈব কুটুম্বকম;
যুগ ও যুগান্তর ধরে আজও
আমাদের গুরুকুলের শিক্ষা পদ্ধতি
বিশ্বকে দেখিয়ে চলেছে আলোর পথ;
দিয়ে চলেছে সভ্যতার মন্ত্র—
ওম্ সর্বেসাং স্বস্তির ভবতু। সর্বেসাং শান্তির ভবতু…
সূর্য-জাত
এ মাটিকে ছুঁয়ে আছি শত সহস্র বছর ধরে;
এ মা-টিকে প্রণাম করি পরম্পরায়;
এখানেই আমার ভৈরব রাগ,
সূর্যমন্ত্র—ওম জবা কুসুম সংকাশম…
সূর্য আমাদের উপাস্য দেব;
সূর্যের তেজ আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে;
আমি, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারি
সকল অশুভ শক্তিকে;
ভাসিয়ে দিতে পারি গঙ্গার জলে
সাদা সাদা ছাই;
মৃত্যুর পরেও মুখে আগুন জ্বলে;
অথচ, পোড়ে না নাভিকুণ্ড…
যেখানে থেকে উচ্চারিত হয়—ওম… ওম…
আমার সাধনায় শাস্ত্র, সরস্বতী নদী;
আমার সাধনায় শস্ত্রবিদ্যা,
বিজয় কেতন…
সূর্য-বংশ-জাত সনাতনী ধর্মাবলম্বী আমি;
আমার ধমনীতে রামায়ণ, মহাভারতের
কাহিনী সকল;
আজও কুরুক্ষেত্র প্রান্তরে বাজাই
পাঞ্চজন্য শঙ্খ;
শোনাই গীতার বাণী—
যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির ভবতি ভারত…
আমি-ই সনাতন, আমি ধর্ম, আর্যাবর্ত;
আমার মধ্যে তুমি, তোমরা, অসুরনিধন,
দশ হাত দুর্গা…
এ মাটিকে ছুঁয়ে একান্নপীঠ, চারধাম,
নটরাজ, রণচণ্ডি, মহাকাল…
সনাতনী মানবিক, উদার, সহনশীল,
তার মানে কাপুরুষ নয়, যোদ্ধার উত্তরসূরী;
যেকোনও মুহূর্তে পুনরুদ্ধার করতে পারি
আমাদের পূর্বপুরুষের ভিটে-মাটি, অধিকার।
স্বরাজ-পরব
মাদলে ধিরতা ধিতাং ধিরতা ধিতাং…
বোল উঠলে কীভাবে পা দুটো চুপ থাকে বলো!
পা যে আমার নাচের,
রাঙামাটির ধুলো মাখা পা;
আমার এ শাল-মহুয়ার জঙ্গল,
আমার এ সিধু-কানুর জঙ্গল,
কীভাবে আর চুপটি করে বসে থাকতে পারে,
স্বরাজ-পরব এলে!
আমাদের ছেলে-মেয়েরা এখন স্কুলে যায়,
দুপুরে পেট ভরে ভাত পায়,
বই-পত্তর, নতুন জামা-কাপড়, ব্যাগ পায়…
লেখা-পড়া শিখে তোমাদের মতো বাবু হবে গো,
তোমাদের মতো বাবু…
আজ সকালে স্কুলে স্বরাজ-পরব হবে;
বাঁশের ডগায় তিন রঙের পতাকা উঠবে,
ছেলে-মেয়েরা লজেন্স-বিস্কুট পাবে,
গাইবে—
জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে…
মাঝেমধ্যেই হাতির দলের মতো হুটহাট করে গ্রামে ঢুকে পড়ে পুলিশ,
লাঠি চালায়, লণ্ডভণ্ড করে যায় ঘর-দোর…
একে ওকে তুলে নিয়ে যায়;
মারধর করে লেখাপড়া না জানা মানুষগুলোকে;
আমাদের ছেলে-মেয়েরা যে দিন বাবু হবে, পুলিশ হবে, সরকারি বাবু হবে,
সে দিন আমরাও স্বরাজ-পরব করবো;
স্বরাজ-পরব…
সে দিন থেকে পাথর খাদান আর শহরের বাবুদের দখলে থাকবে না;
আমাদের হবে;
সে দিন থেকে জঙ্গলের গাছ আর শহরের বাবুদের দখলে যাবে না;
এভাবে গাছ কেটে ফাঁকা হবে না;
খুন হবে না জঙ্গল বাঁচাও কমিটির মানুষগুলো;
সে দিনই আমরা স্বরাজ-পরব করবো;
বাঁশের আগায় তিন রঙের পতাকা তুলবো;
যে ভাবে আমাদের বাপ-ঠাকুরদারা বাঁশের আগায়
জঙ্গলের পতাকা তুলতো;
আজ আমরা টিলা পেরিয়ে ওপারে যাবো;
যাবো স্কুল মাঠে;
যেখানে পরব হবে, স্বরাজ-পরব…
দেখে আসবো কীভাবে পরব করে মাস্টার;
কীভাবে স্বরাজ-পরব করতে হয়।




