ঐতিহাসিকদের মতে, খৃষ্টীয় ঊনিশ শতকের বাংলার সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতির নবজাগরণ বা রেনেসাঁস কোনো একক রৈখিক স্রোত ছিল না; বরং, তা বহুবিধ আদর্শ, সমাজবীক্ষা এবং মতাদর্শগত সংঘাতের এক জটিল তন্তুজাল ছিল। আর তখন এ বৌদ্ধিক আলোড়নের কেন্দ্রবিন্দুতে যে দু’জন প্রাতঃস্মরণীয় বাঙালি ব্যক্তিত্ব অবস্থান করছিলেন, তাঁরা ছিলেন পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০–১৮৯১) এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮–১৮৯৪)। এঁদের মধ্যে পণ্ডিত বিদ্যাসাগর যেখানে ঊনিশ শতকের প্রথমার্ধের বাংলার যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ এবং সমাজসংস্কারের প্রধান পুরুষ ছিলেন; অন্যদিকে বঙ্কিমচন্দ্র সেখানে এ শতাব্দীরই দ্বিতীয়ার্ধের জাতীয়তাবাদী চেতনা, মননশীল সাহিত্য এবং হিন্দু সংস্কৃতির নব্যায়নের পুরোধা ছিলেন। তাছাড়া বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কারের মূল ভিত্তি যেখানে শাস্ত্রীয় প্রমাণের সাহায্যে লৌকিক কল্যাণ সাধন এবং চরম যুক্তিবাদ ছিল; সেখানে ধর্মের এক সংশোধিত, আধ্যাত্মিক ও জাতীয়তাবাদী রূপের পুনরুত্থানই বঙ্কিমচন্দ্রের লক্ষ্য ছিল। আর যদিও এখন অনেকেই মনে করেন যে, এ দুই মণীষীর মধ্যেকার সম্পর্ক শুধুই বিরোধের ছিল, কিন্তু তবুও, সমকালীন বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক নথিপত্রগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তাঁদের সম্পর্কটি আসলে একদিকে গভীর শ্রদ্ধাবোধ, এবং অন্যদিকে তীব্র মতাদর্শগত দ্বান্দ্বিকতার এক অভূতপূর্ব মিশ্রণ ছিল। এ প্রবন্ধে তাঁদের মধ্যকার সে জটিল সম্পর্ক, ব্যক্তিগত সংশ্লেষ, মতাদর্শগত সংঘাত তৎকালীন সাহিত্যিক-সামাজিক ইতিহাসের আলোকে বিস্তারিত ও প্রামাণিকভাবে উপস্থাপিত করবার চেষ্টা করা হল।
বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনেতিহাস লক্ষ্য করলে দেখতে পাওয়া যায় যে, পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যখন বিধবাবিবাহ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে বাংলার রক্ষণশীল সমাজের ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছিলেন (১৮৫৫-৫৬), বঙ্কিমচন্দ্র তখন হুগলি কলেজ ও পরবর্তীতে নবপ্রতিষ্ঠিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্র ছিলেন। এসময়ে বিদ্যাসাগর মূলতঃ কলকাতার সংস্কৃত কলেজের ঐতিহ্য থেকে উঠে আসা একজন প্রথাগত পণ্ডিত ছিলেন, যিনি তখন পাশ্চাত্য যুক্তিবাদকে নিজের মত করে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। অন্যদিকে বঙ্কিমচন্দ্র তখন ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত বাংলার প্রথমদিককার স্নাতক এবং ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের (ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট) এক অংশ ছিলেন। অতীতে ডঃ সুকুমার সেন তাঁর ‘বাঙ্গলা সাহিত্যের ইতিহাস’ গ্রন্থের ২য় খণ্ডে এ দু’ প্রজন্মের মানসিকতার পার্থক্য সুন্দরভাবে তুলে ধরেছিলেন বলে লক্ষ্য করা যায়। তাঁর মত ছিল যে, তৎকালীন সমাজ থেকে মধ্যযুগীয় কুসংস্কার দূর করাই যেখানে বিদ্যাসাগরের যুগের লক্ষ্য ছিল, সেখানে বঙ্কিমচন্দ্রের যুগের লক্ষ্য ছিল পরাধীন জাতির আত্মপরিচয় ও আত্মগৌরব প্রতিষ্ঠা করা। ফলে একসময়ে এ দুই ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রয়োজনের কারণেই তাঁদের মধ্যে চিন্তার সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।
গবেষকদের মতে, বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যে প্রথম কোন বড় ধরণের প্রকাশ্য মতাদর্শগত সংঘাত ১৮৭১ থেকে ১৮৭৩ সালের মধ্যে, বিদ্যাসাগরের ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কি না’ বিষয়ক দ্বিতীয় পুস্তিকাকে কেন্দ্র করে দেখা দিয়েছিল। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, পণ্ডিত বিদ্যাসাগর প্রথমে ১৮৭১ সালে, এবং পরবর্তীতে ১৮৭৩ সালের এপ্রিল মাসে ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক বিচার’—দ্বিতীয় পুস্তকটি প্রকাশ করেছিলেন। এ পুস্তকে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, সেযুগের কুলীন ব্রাহ্মণদের মধ্যে প্রচলিত থাকা বহুবিবাহ প্রথা কোনোভাবেই শাস্ত্রসম্মত আচার তো নয়ই; বরং এটা একটা সামাজিক ব্যাধি। আর তাই তিনি বৃটিশ সরকারের কাছে আইন করে এ প্রথাটি বন্ধ করবার আবেদন জানিয়েছিলেন। এরপরে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর সদ্য সম্পাদিত ও প্রকাশিত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার ১২৮০ বঙ্গাব্দের বা ১৮৭৩ সালের আষাঢ় সংখ্যায় ‘বহুবিবাহ’ শিরোনামের একটি সুদীর্ঘ সমালোচনা প্রবন্ধ লিখেছিলেন; এবং এতে তিনি বিদ্যাসাগরের শাস্ত্রনির্ভরতার তীব্র সমালোচনা করে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, হিন্দুসমাজের পরিবর্তনের জন্য বারবার ঔপনিবেশিক সরকারের আইনের দ্বারস্থ হওয়া অনুচিত। আর ইংরেজি শিক্ষা এবং সামাজিক চেতনার বিস্তারের ফলে বহুবিবাহ যেহেতু এমনিতেই বিলুপ্তির পথে, সেজন্য এবিষয়ে আলাদা কোন আইনের প্রয়োজন নেই। শুধু তাই নয়, এসময়ে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর এ প্রবন্ধে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ভাষাতেই লিখেছিলেন—
“বিদ্যাসাগর মহাশয় যে বহুবিবাহ নিবারণার্থে এত যত্নবান হইয়াছেন, তাহার প্রয়োজন আমরা দেখি না। শিক্ষার বিস্তারের সহিত এই কুপ্রথা সমাজ হইতে আপনিই চলিয়া যাইতেছে। … রাজদ্বারে আবেদন করিয়া আইন প্রণয়ন করানোর অর্থ সামাজিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা।” (বঙ্গদর্শন, ২য় বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা, শ্রাবণ ১২৮০ বঙ্গাব্দ, ১৮৭৩ সাল, পৃ: ১৬৫-১৬৮)
এখানে বলাই বাহুল্য যে, বঙ্কিমচন্দ্রের এ মন্তব্য তখন বিদ্যাসাগরকে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ করেছিল; কারণ, তিনি মনে করতেন যে, নির্দিষ্ট কোন আইন ছাড়া এ গভীর সামাজিক ব্যাধি দূর করা অসম্ভব।
তবে ঘটনাটা এখানেই শেষ হয়ে যায়নি, বরং এরপরেও বঙ্কিমচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়েছিলেন; এবং বিধবাবিবাহ প্রসঙ্গেও বিদ্যাসাগরের সাথে বঙ্কিমচন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ও বঙ্কিম-সাহিত্যে এর প্রতিফলন দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। ঊনিশ শতকের বাংলার ইতিহাসের সাথে পরিচিত প্রায় সকলেই অবগত রয়েছেন যে, ১৮৫৬ সালে বিধবাবিবাহ আইন পাস করানো পণ্ডিত বিদ্যাসাগরের জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি ছিল। অন্যদিকে বঙ্কিমচন্দ্র যদিও তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে বিধবাবিবাহের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন না; কিন্তু তবুও, সমাজের স্থিতিশীলতা ও পারিবারিক কাঠামোতে ভাঙনের আশঙ্কায় তিনি এর অবাধ প্রচলনকে সমর্থন করতে পারেননি বলেই গবেষকরা মনে করে থাকেন। আর খুব সম্ভবতঃ এ কারণেই তিনি তাঁর ‘বিষবৃক্ষ’ (১৮৭৩) উপন্যাসের কুন্দনন্দিনী, এবং ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ (১৮৭৮) উপন্যাসের রোহিণী—এ দুটি বিধবা চরিত্রের ট্র্যাজেডির মাধ্যমে সকলকে এটাই দেখতে চেয়েছিলেন যে, কোন বিধবার প্রেম বা সমাজ-স্বীকৃতির বাইরে গিয়ে বিবাহ কিভাবে পারিবারিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাছাড়া এগুলির মধ্যে ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসের সূর্যমুখী নামক চরিত্রের লিখিত একটি চিঠির মাধ্যমে বঙ্কিমচন্দ্র প্রকারান্তরে বিদ্যাসাগরকেই বিদ্রূপ করেছিলেন বলেও অনেক সমালোচক মনে করে থাকেন। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, এ সূর্যমুখী নিজের পত্রে লিখেছিলেন—
“ঈশ্বর বিদ্যাসাগর নামে কলকাতায় একজন বড় পন্ডিত আছেন, তিনি আবার একখানি বিধবাবিবাহের বহি লিখিয়াছেন। যে পুরুষের মাগ মরে সে যদি আবার বিয়ে করতে পায়, তবে যে মাগীর পুরুষ মরে সে কেন আবার বিয়ে করতে পাবে না?”
লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, বঙ্কিমচন্দ্র এখানে তৎকালীন সমাজের মুখের ভাষা ব্যবহার করলেও, উপন্যাসের সামগ্রিক পরিণতিতে বিধবাবিবাহের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার অভাবকেই ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
অতীতে এ ঘটনাটি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ইতিহাসবিদ ডঃ অমলেশ ত্রিপাঠী তাঁর ‘Indian Awakening and Bengal’ (পি. কে. ভট্টাচার্য পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৬০) গ্রন্থের ১৪২নং পৃষ্ঠায় এ দুই ব্যক্তিত্বের মানসিকতার পার্থক্যকে চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করে লিখেছিলেন যে—
‘বিদ্যাসাগরের দৃষ্টি ছিল অতীতে—শাস্ত্রের সমর্থনে তিনি বর্তমানকে বদলাতে চেয়েছিলেন; কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল ইহজাগতিক মানবতাবাদ। বঙ্কিমচন্দ্রের দৃষ্টি ছিল ভবিষ্যতে—তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলনে এক নতুন জাতীয়তাবাদের ভিত্তি গড়তে চেয়েছিলেন, যেখানে ধর্ম হবে সংস্কৃতির প্রধান অঙ্গ।’
আসলে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যে যুগের সন্তান ছিলেন, সেযুগের সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তির প্রাধান্য সূচিত হতে আরম্ভ করেছিল। এর আগে মধ্যযুগীয় বাঙালিসমাজে ব্যক্তির ভূমিকা নিতান্তই নগণ্য ছিল। কিন্তু ঊনিশ শতকের সূচনা থেকে গোষ্ঠীকে অতিক্রম করে সমাজে ব্যক্তিই প্রধান হয়ে উঠতে শুরু করেছিলেন। আর ঊনিশ শতকের বাঙালিসমাজে রাজা রামমোহন রায় এর প্রথম উদাহরণ ছিলেন। অতঃপর বাঙালি সমাজে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের এ জয়যাত্রা বিদ্যাসাগরের সময়েও অব্যাহত ছিল; এবং বিদ্যাসাগরের যাবতীয় ঐতিহাসিক প্রয়াস বা সংগ্রাম তাই একক প্রয়াস বা একক সংগ্রাম ছিল বলেই গবেষকরা মনে করে থাকেন। তাছাড়া বিদ্যাসাগরের তখন কিছু অনুরাগী থাকলেও, তাঁর নিজস্ব কোনো দল কখনোই ছিল না; এবং অন্যদিকে যদিও তাঁর বিরোধীপক্ষ ছিল, কিন্তু তাঁরাও তখন সংগঠিত ছিলেন না। আর একারণেই ইতিহাসে বিদ্যাসাগর সম্পর্কে একই গোষ্ঠীভুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য দেখতে পাওয়া যায়। অর্থাৎ, বিদ্যাসাগরের সময়ে তাঁর নিন্দা-প্রশংসার গোটা ব্যাপারটাই ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্কের ওপরে দাঁড়িয়ে ছিল। অন্যভাবে বললে, সেসময়ের একটি বিচিত্র মানসিকতাকে কেন্দ্র করেই ব্যক্তিগত সম্পর্কের এ ঘাত-প্রতিঘাত আরো জমে উঠেছিল।
গবেষকদের মতে, খৃষ্টীয় ঊনিশ শতকে যাঁরা বাংলা সাহিত্যচর্চা করতেন তাঁরা মোটামুটিভাবে তখন দুটি দলে বিভক্ত ছিলেন—ইংরেজিনবিশ এবং সংস্কৃতনবিশ। এঁদের মধ্যে ইংরেজিনবিশেরা তখন পাশ্চাত্য থেকে তাঁদের সাহিত্যের আদর্শ গ্রহণ করেছিলেন, আর সংস্কৃতনবিশেরা সংস্কৃত সাহিত্য অবলম্বনেই নিজেদের সাহিত্যসম্ভার সৃষ্টি করেছিলেন। এছাড়া তৎকালীন সমাজের মতোই সাহিত্যক্ষেত্রেও তখন ভীষণভাবে দলাদলি চালু ছিল বলে সেযুগের ইংরেজিনবিশ লেখকেরা সংস্কৃতনবিশদের কিছুটা অবজ্ঞার চোখেই দেখতেন। কিন্তু তাঁরা অবজ্ঞার চোখে দেখলেও সংস্কৃতনবিশ একজন লেখকই ধীরে ধীরে ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার শ্রেষ্ঠ লেখকের সম্মানজনক আসনটি অধিকার করে নিয়েছিলেন। আর তখন এ ব্যাপারটাকে মেনে নিতে না পারলেও, ঊনিশ শতকের সত্তরের দশকের আগে কেউ এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানানোর জন্য তেমনভাবে এগিয়ে আসেননি।
অতঃপর ১৮৬৫ সালে বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে আবির্ভাবের কয়েক বছরের মধ্যেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নিজের একটা পাকাপোক্ত জায়গা করে নিয়েছিলেন। কিন্তু তখনও পর্যন্ত বাংলার শ্রেষ্ঠ লেখকের সম্মান ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কাছেই ছিল। তবে এসময় থেকেই বিদ্যাসাগরের মত একজন অনুবাদক ও পাঠ্যপুস্তক লেখক আদৌ এ সম্মান পেতে পারেন কিনা, এ বিষয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিলেন। এরপরে ১৮৭২ সালে বঙ্কিমচন্দ্রের সম্পাদনায় ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা প্রকাশিত হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই, বাংলায় বঙ্কিম-অনুরাগী একটি লেখকগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। আর তারপরে এ লেখকগোষ্ঠীর লেখকেরাই বিদ্যাসাগরের সমালোচনা করবার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। এবং বঙ্কিমচন্দ্রের কাছের দু’জন মানুষ—অক্ষয়চন্দ্র সরকার ও হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এক্ষেত্রে তখন প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।
সেকালে অক্ষয়চন্দ্র সরকারের ‘সাধারণী’ এবং সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘ভ্রমর’ বিদ্যাসাগর-বিরোধী পত্রিকা হিসাবে সাধারণের কাছে অত্যন্ত সুপরিচিত ছিল। তাছাড়া বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে সেকালের আরেক বিশিষ্ট লেখক দামোদর মুখোপাধ্যায়েরও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। এ দামোদর মুখোপাধ্যায় তখন ‘প্রবাহ’ নামের একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন; আর এ ‘প্রবাহ’ পত্রিকাটিও সাহিত্যসেবক বিদ্যাসাগরকে মোটেও ভালো চোখে দেখত না। এমনকি বঙ্কিমের অন্য একজন অনুরাগী রমেশচন্দ্র দত্ত তো বিদ্যাসাগরকে কোনদিনই বড়মাপের সাহিত্যিক বলেই মনে করেন নি! এছাড়া বঙ্কিম-অনুরাগী শ্রীশচন্দ্র মজুমদারও সুযোগ পেলেই বিদ্যাসাগরের সমালোচনা করতে কখনোই কুণ্ঠাবোধ করেননি।
এসব ছাড়া সেসময়কার বাংলার সাহিত্যক্ষেত্রে এ দলাদলি যে কতটা তীব্র ছিল, একথা চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায়ের আচরণ থেকেও ইতিহাসগতভাবে প্রমাণিত হয়ে যায়। তাঁর জীবনেতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, তিনি নিজের প্রথমজীবনে ‘জ্ঞানাঙ্কুর’ পত্রিকায় বিদ্যাসাগরের পক্ষ সমর্থনে এগিয়ে আসবার পরে ওই পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর ‘বিদ্যাবিড়ম্বনা’ নামক প্রবন্ধটি পড়ে বঙ্কিমচন্দ্র মুগ্ধ হয়েছিলেন; এবং তাঁকে বঙ্গদর্শনের লেখক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল যে, এরপরেই চন্দ্রশেখর আর কখনোই বিদ্যাসাগরের সমর্থনে কলম ধরেননি! এমনকি বঙ্কিম গোষ্ঠীভুক্ত হওয়ার পরে তিনি তাঁর নিজস্ব পত্রিকা ‘মাসিক সমালোচক’–এ বিদ্যাসাগরকে আক্রমণ করে লেখা প্রবন্ধ ছাপতেও ইতঃস্ততঃ করেননি।
তবে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে সেসময়কার ইংরেজিশিক্ষিত গোষ্ঠীর একাংশের নিবিড় পরিচয় ছিল; এবং তাঁরা সকলেই বিদ্যাসাগরের প্রশংসায় সবসময় উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। এ প্রসঙ্গে এখানে দীনবন্ধু মিত্রের নাম সর্বাগ্রে স্মরণীয়। অতীতে এ বিষয়ে বিদ্যাসাগরের অন্যতম জীবনীকার সুবলচন্দ্র মিত্র জানিয়েছিলেন যে, তাঁদের উভয়ের মধ্যেকার সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিল যে, দীনবন্ধুর মৃত্যুর পরে বিদ্যাসাগর নিয়মিতভাবে তাঁর স্ত্রী-পুত্রের খবরাখবর রেখেছিলেন। আর খুব সম্ভবতঃ এ ঘনিষ্ঠতার জন্যই দীনবন্ধু তাঁর জীবদ্দশায় বিদ্যাসাগরকে ‘ললিত মধুর বাংলাভাষার জনক’ বলতেও ইতঃস্ততঃ করেননি। এছাড়া বাঙালি সম্পাদিত সেকালের দুটি বিখ্যাত ইংরেজি পত্রিকা—‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ ও ‘ওয়েল উইশার’–এর সম্পাদকদ্বয়ের সঙ্গেও বিদ্যাসাগরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও কৃষ্ণদাস পালের আমলের ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ পত্রিকা বিভিন্ন সময়ে বিদ্যাসাগরের বিভিন্ন কাজকে খোলাখুলিভাবে সমর্থন জানিয়েছিল। আর ‘ওয়েল উইশার’ পত্রিকার সম্পাদক প্যারীচরণ সরকার তো বিদ্যাসাগরের সবথেকে বিশ্বস্ত বন্ধুদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। এমনকি বিদ্যাসাগরের যেসব বন্ধু কোনো অবস্থাতেই তাঁকে ত্যাগ করেননি, প্যারীচরণ তাঁদের মধ্যেও অন্যতম ছিলেন।
এসব ছাড়া নিজের ব্যক্তিগত জীবনে বিদ্যাসাগর সেসময়কার অনেককেই তাঁদের জীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে সাহায্য করেছিলেন, এবং চরম দুঃসময়ে এগিয়ে গিয়ে অনেককেই তিনি বিপর্যয়ের হাত থেকে উদ্ধার করেছিলেন। আর বিদ্যাসাগরের এ করুণাধারায় তখন যাঁরা সিক্ত হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই পরবর্তীকালে তাঁর সম্পর্কে প্রচুর উচ্ছাস প্রকাশ করেছিলেন বলে লক্ষ্য করা যায়। এ প্রসঙ্গে এখানে নবীনচন্দ্র সেনের নাম সর্বাগ্রে স্মরণীয়। তাঁকে বিদ্যাসাগর কিভাবে সাহায্য করেছিলেন, এর বিবরণ তিনি নিজেই তাঁর ‘আমার জীবন’ গ্রন্থে লিখেছিলেন। এ গ্রন্থটি থেকে জানা যায় যে, যখন তাঁর জীবনের সব আশা নিভে গিয়েছিল, তখন তিনি বিপদভঞ্জন হরির শরণ নিয়েছিলেন, আর এরপরে—
“তিনি প্রহ্লাদের মত আমাকেও তাঁহার নরমূর্তিতে দেখা দিলেন। সেই নরনারায়ণ শ্রীঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।”
অতঃপর নবীনচন্দ্র তাঁর ‘পলাশির যুদ্ধ’ নামক বইটি ‘দয়ার সাগর’ বিদ্যাসাগরকে উৎসর্গ করতে গিয়ে তাঁর কাছে নিজের ঋণ স্বীকার করে নিয়ে লিখেছিলেন—
“যে যুবক দুঃখের সময়ে অশ্রুজলে একদিন আপনার চরণ অভিষিক্ত করিয়াছিল, আজি সেই যুবক আবার আপনার শ্রীচরণে উপস্থিত হইল। আপনার আশীর্বাদে ততোধিক আপনার অনুগ্রহে, আজি তাঁহার বদন প্রফুল্ল, হৃদয় আনন্দে পরিপূর্ণ। আপনার দয়াসাগরের বিন্দুমাত্র সিঞ্চনে দরিদ্রতা দাবানল হইতে সেই মানস কানন রক্ষা পাইয়াছিল, আজি সেই কানন প্রসূত একটি ক্ষুদ্র কুসুম আপনার শ্রীচরণে উৎসর্গীকৃত হইল।”
অন্যদিকে বিদ্যাসাগরের প্রতি ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতাবোধের জন্যই রামগতি ন্যায়রত্ন তাঁর ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব’ গ্রন্থেও বিদ্যাসাগরের উচ্ছ্বসিত গুণকীর্তন করেছিলেন। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, রামগতি শুধুমাত্র বিদ্যাসাগরের প্রিয় ছাত্রই ছিলেন না; বরং, রামগতির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল। আর বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর এ ঘনিষ্ঠতার জন্যই বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘বঙ্গদর্শন’–এ একসময়ে রামগতিকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছিলেন। এ আক্রমণের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, সেসময়ে রামগতির প্রতি বঙ্কিমের এ আক্রমণে ব্যথিত হয়ে সমকালীন একজন মন্তব্য করেছিলেন—
“যদি বঙ্গদর্শনের ন্যায় পত্রিকাও এইরূপে বিদ্বেষ ও বাচালতা প্রকাশের স্থল হইয়া উঠিল, তবে আর যৎসামান্য পত্রিকা হইতে উহার প্রভেদ কোথায়। … বঙ্গদর্শন ন্যায়রত্ন মহাশয়কে বৃথা তিরস্কার করিয়া স্বীয় গৌরবের মস্তকে পদাঘাত করিতে যথেষ্ট যত্ন পাইয়াছেন।”
তবে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে বিদ্যাসাগর যেমন অনেকের উপকার করেছিলেন, তেমনি তাঁর কার্যকলাপ আবার সেসময়কার কারো কারো স্বার্থকে ক্ষুন্নও করেছিল। আর এসব মানুষদের মধ্যেই কেউ কেউ পরবর্তীকালে বঙ্কিমের পক্ষ নিয়ে বিদ্যাসাগরের সমালোচনায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। যেমন—পণ্ডিত মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সঙ্গে প্রথমজীবনে বিদ্যাসাগরের যতটা সুসম্পর্ক ছিল, শেষজীবনে ঠিক ততটা ছিল না। আর মদনমোহনের জনপ্রিয় গ্রন্থ ‘শিশু শিক্ষা’র স্বত্ব বিদ্যাসাগরের হাতে চলে যাওয়ার জন্য মদনমোহনের আত্মীয়দের মধ্যেও একসময়ে বিদ্যাসাগরকে নিয়ে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। অতঃপর এ ক্ষোভ থেকেই মদনমোহনের জামাই যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ বারবার বিদ্যাসাগরকে লোকচক্ষে হেয় করবার চেষ্টা করেছিলেন। তাছাড়া সেযুগের ছাত্রদের পাঠ্যপুস্তক নির্বাচনকালে ও একজন প্রকাশক হিসাবেও বিদ্যাসাগরের কার্যকলাপ সমকালীন কারো কারো স্বার্থকে ক্ষুন্ন করেছিল। ফলে সেযুগের যেসব বইকে তিনি ছাত্রপাঠ্য বলে বিবেচনা করেননি, সেসব গ্রন্থের লেখক বা প্রকাশকেরা তখন অনেক সময়েই বঙ্কিমপক্ষে যোগ দিয়ে বিদ্যাসাগরের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। আবার বহুবিবাহের বিরুদ্ধে বিদ্যাসাগরের ভূমিকাকে লক্ষ্য করে সমকালীন কোনো কোনো কুলীনও তাঁর উপরে ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন। এবং বিদ্যাসাগরের চেষ্টা সফল হলে তাঁদের বিবাহ ব্যবসা উঠে যাবে বলে আশঙ্কা করে, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ লেখনী ধারণ করে বঙ্কিমপক্ষে যোগ দিয়ে বিদ্যাসাগরকে তীব্র আক্রমণ করেছিলেন।
প্রসঙ্গতঃ আরো উল্লেখ্য যে, বঙ্কিমচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ‘সাধারণী’ পত্রিকার সম্পাদক অক্ষয়চন্দ্র সরকার, এবং সনাতনপন্থী প্রাবন্ধিক চন্দ্রনাথ বসু সম্পূর্ণভাবে বঙ্কিমচন্দ্রের হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদ ও সাহিত্যাদর্শর গোঁড়া সমর্থক ছিলেন; আর তাঁরা বিদ্যাসাগরের সংস্কৃতঘেঁষা গদ্যরীতি যুগোপযোগী নয় বলেই মনে করেছিলেন। এমনকি চন্দ্রনাথ বসু তো তাঁর একটি প্রবন্ধে তখন বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কারের প্রচেষ্টাকে ‘পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ’ বলে অভিহিত করে স্পষ্টভাবেই লিখেছিলেন—
“আমাদের সমাজ ও ধর্মের মূল ভিত্তি বিনাশ করিয়া যে সংস্কার, তাহা কদাপি কল্যাণকর হইতে পারে না। পণ্ডিতপ্রবর বিদ্যাসাগর মহাশয় শাস্ত্রের যে ব্যাখ্যা দিয়াছেন, তাহা সনাতন ধর্মের মস্তকে কুঠারাঘাত।” (শকুন্তলাতত্ত্ব, চন্দ্রনাথ বসু, বাল্মীকি প্রেস, কলকাতা, ১৮৮১, পৃ- ৪২)
অন্যদিকে ঊনিশ শতকের প্রথমার্ধের বাংলার যুক্তিবাদী সমাজ ও ‘আলালের ঘরের দুলাল’ নামক গ্রন্থের রচয়িতা প্যারীচাঁদ মিত্র বা টেকচাঁদ ঠাকুর, এবং কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য বিদ্যাসাগরের চরিত্রবল ও সমাজ সংস্কারের প্রতি অনুগত থাকলেও বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের শৈল্পিক উৎকর্ষকে অস্বীকার করতে পারেননি।
তবে অতীতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক, গবেষক ও আধুনিক সমালোচকরা অবশ্য এ দুই মনীষীর সম্পর্ককে কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা নয়, বরং দুটি ভিন্ন ঐতিহাসিক ধারার সংঘর্ষ হিসেবে দেখেছিলেন। যেমন—বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ডঃ সুকুমার সেন এ দুই গদ্যশিল্পীর ভাষারীতির পার্থক্য ও মানসিকতার দ্বন্দ্ব নিয়ে লিখেছিলেন—
“বিদ্যাসাগরের গদ্য ছিল স্থাপত্যের মতো সুবিন্যস্ত ও ক্লাসিক্যাল; বঙ্কিমচন্দ্রের গদ্য চিত্রশিল্পের মতো রঙে ও রসে ভরপুর। বিদ্যাসাগর চেয়েছিলেন সমাজকে শৃঙ্খলিত ও নীতিপরায়ণ করতে, বঙ্কিমচন্দ্র চেয়েছিলেন চিত্তের মুক্তি ও সৌন্দর্যের বিকাশ। ফলে এই দুইজনের আদর্শগত সংঘাত ছিল অনিবার্য।” (বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, ২য় খণ্ড, ডঃ সুকুমার সেন, ইস্টার্ন পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৬৫, পৃ- ২১০)
অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞানী বিনয় ঘোষ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে বিদ্যাসাগরের একাকিত্ব এবং বঙ্কিমচন্দ্রের উত্থানের সামাজিক পটভূমি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানিয়েছিলেন—
“১৮৭০-এর দশকের পর বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজে যে হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদের ঢেউ আসে, বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন তার প্রধান চালিকাশক্তি। বিদ্যাসাগর এই হাওয়াকে মেনে নিতে পারেননি। তাই জীবনের শেষভাগে তিনি সমাজ থেকে দূরে সাঁওতাল পরগণায় একপ্রকার নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের তীব্র সমালোচনাই বিদ্যাসাগরকে অধিকতর একাকী করে তুলেছিল।” (বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ, বিনয় ঘোষ, ওরিয়েন্ট লংম্যান, কলকাতা, ১৯৭৩, পৃ- ৩২৭)
কিন্তু মতাদর্শগত অমিল থাকা সত্ত্বেও তাঁদের মধ্যেকার ব্যক্তিগত সম্পর্ক কখনোই সম্পূর্ণভাবে বৈরি ছিল না বলেই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়; এবং একইসাথে একথাও বলে যে, বঙ্কিমচন্দ্র বরাবরই বিদ্যাসাগরের চারিত্রিক দৃঢ়তা ও পরোপকারিতার গুণগ্রাহী ছিলেন। আর খুব সম্ভবতঃ একারণেই বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ব্যঙ্গাত্মক গ্রন্থ ‘লোকরহস্য’র (১৮৭৪) ‘ব্যাঘ্রাচার্য্য বৃহল্লাঙ্গুল’ নামক প্রবন্ধে সমসাময়িক অনেক সমাজসংস্কারককে ব্যঙ্গ করলেও বিদ্যাসাগরের প্রতি একধরণের প্রচ্ছন্ন শ্রদ্ধা বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর এ ব্যঙ্গাত্মক গ্রন্থেরই অন্তর্গত ‘বাবু’ এবং ‘সুবর্ণগোলক’ ইত্যাদি রচনায় সমকালীন যেসব সমাজসংস্কারকদের পরোক্ষেভাবে ব্যঙ্গ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে পণ্ডিত বিদ্যাসাগর ছিলেন বলেও গবেষকরা মনে করে থাকেন; আর বিশেষ করে তখন বিদ্যাসাগরের ছদ্মনামে (কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য) লেখা পুস্তিকাগুলোর স্থূল রসিকতার সমালোচনা বঙ্কিম-শিবির থেকেই করা হয়েছিল বলেই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। অতীতে গবেষক ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমের মধ্যেকার এ সাহিত্যিক দ্বন্দ্বের বিবরণ দিতে গিয়ে লিখেছিলেন—
“বঙ্কিমচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজ-সংস্কারের আন্তরিকতার প্রশংসা করিলেও, তাঁহার আন্দোলনের উগ্রতা এবং রক্ষণশীল সমাজের প্রতি বিদ্যাসাগরের তীব্র আক্রমণাত্মক ভাষা পছন্দ করেন নাই। বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত সমালোচনাগুলি তাহারই প্রমাণ।” (বিদ্যাসাগর-প্রসঙ্গ, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, রঞ্জন প্রকাশনী, কলকাতা, ১৯৩১, পৃ- ৮৯)
প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, ১৮৯১ সালের ২৯শে জুলাই তারিখে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রয়াণ ঘটলে বঙ্কিমচন্দ্র কিন্তু এ সংবাদে অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছিলেন; আর যদিও তিনি তখন নিজেও শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন, তবে তা সত্ত্বেও বিদ্যাসাগরের জন্য আয়োজিত শোকসভায় এবং স্মৃতিচারণায় তাঁর অতুলনীয় ব্যক্তিত্বের কথা স্বীকার করে নিয়েছিলেন। এছাড়া বঙ্কিমচন্দ্র তখন তাঁর একটি ব্যক্তিগত পত্রে—যা পরবর্তীতে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘বঙ্কিম-প্রসঙ্গ’ নামক গ্রন্থে সংকলিত হয়েছিল, লিখেছিলেন—
“পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ন্যায় মহাপ্রাণ ব্যক্তি এ দেশে আর জন্মগ্রহণ করেন নাই। তাঁহার দয়া, তাঁহার দানশীলতা এবং তাঁহার চারিত্রিক তেজস্বিতা বাঙ্গালীর আদর্শ হইয়া থাকিবে। সমাজ সংস্কারের বিষয়ে আমাদের মতভেদ থাকিতে পারে, কিন্তু তাঁহার মহত্ত্বের কাছে আমরা সকলেই নতশির।” (অনুসন্ধান পত্রিকা, কলকাতা, আগস্ট, ১৮৯১; বঙ্কিম-জীবনী, শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পি. এম. বাগচী অ্যান্ড কোং, কলকাতা, ১৯১১, পৃ- ২৭৪)
বিদ্যাসাগরের সঙ্গে বঙ্কিমের এ বিচিত্র সম্পর্কের কথা অতীতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক, গবেষক ও সমালোচকদের লেখাতেও পাওয়া যায়; আর আলোচ্য প্রসঙ্গে এখানে এ বিষয়ে তাঁদের মতামতও অবশ্য উল্লেখ্য। যেমন—অতীতে ডঃ অমলেশ ত্রিপাঠী তাঁর বিখ্যাত ‘Vidyasagar: The Traditional Modernizer’ (Orient Longman, 1974) গ্রন্থের ৮৪নং পৃষ্ঠায় জানিয়েছিলেন—
“Vidyasagar looked at society through the lens of shastric injunctions and immediate humanitarian relief. Bankim, influenced by Auguste Comte and Positivism, looked for an organic social evolution. Their conflict was not personal animosity, but a clash between Utilitarian reform and Nationalist conservatism.”
অন্যদিকে গোপাল হালদার তাঁর ‘বঙ্কিমচন্দ্র ও বিদ্যাসাগর’ নামক প্রবন্ধ সংকলনের (মণীষা গ্রন্থালয়, কলকাতা, ১৯৬২) ৪৫-৪৮নং পৃষ্ঠায় এ বিষয়ে বলেছিলেন—
“বিদ্যাসাগর ছিলেন কাজের মানুষ, বঙ্কিম ছিলেন ভাবের মানুষ। বিদ্যাসাগর যা হাতেনাতে করতে চেয়েছিলেন, বঙ্কিম তা সাহিত্যের দর্পণে বিচার করতে চেয়েছিলেন। সেই কারণেই ‘বঙ্গদর্শন’ ও বিদ্যাসাগরের লেখনীর মধ্যে যে যুদ্ধ, তা উনিশ শতকের বাংলার শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ।”
আর প্রমথনাথ বিশী তাঁর ‘চিত্রচরিত্র’ (মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স, কলকাতা, পুনর্মুদ্রণ ১৯৮৫) নামক বিখ্যাত গ্রন্থের ১১২নং পৃষ্ঠায় এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন—
“বঙ্কিমচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ আন্দোলনকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করতে পারেননি, কারণ বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিত্ব ছিল হিমালয়ের মতো। বঙ্কিম তাঁর উপন্যাসে বিধবাদের যে করুণ পরিণতি দেখিয়েছেন, তা বিদ্যাসাগরের আন্দোলনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিক্রিয়া মাত্র, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নয়।”
সুতরাং, এ বিষয়ে গবেষকদের মতামতগুলি লক্ষ্য করলে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যকার বিরোধকে কোনো সংকীর্ণ ব্যক্তিগত রেষারেষি বলা যেতে পারে না; বরং, এটিকে ঊনিশ শতকের বাংলার দুটি প্রধান চিন্তাধারার মধ্যেকার অনিবার্য সংঘর্ষ বললেই উচিত কথা বলা হয়। আসলে বিদ্যাসাগর যেখানে ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং তাৎক্ষণিক মানবিক যন্ত্রণার লাঘব করতে চেয়েছিলেন; বঙ্কিমচন্দ্র সেখানে সমাজ নামক বৃহত্তর যৌথ কাঠামোর স্থায়িত্ব ও জাতীয় সংহতির কথা ভেবেছিলেন। আর একারণেই বঙ্কিমচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কারের পদ্ধতির সমালোচনা করলেও, বিদ্যাসাগরের অকুতোভয় চরিত্র ও দয়ার্দ্র হৃদয়কে কিন্তু চিরকাল শ্রদ্ধাই করেছিলেন। অন্যদিকে বিদ্যাসাগরও বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য প্রতিভা ও ‘বঙ্গদর্শন’–এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে উপেক্ষা করেননি। এবং এ দুই বিপরীতধর্মী শক্তির টানাপোড়েনেই ঊনিশ শতকের আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও সমাজ শেষপর্যন্ত পূর্ণতা লাভ করতে পেরেছিল।#




