গবেষক: সালমা পারভিন
তত্ত্বাবধায়ক: ড. অনাথবন্ধু চ্যাটার্জী
বিভাগ: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ
প্রতিষ্ঠান: সিকম্ স্কিলস্ ইউনিভার্সিটি
প্রকাশনা: সময়ের শব্দ
ISSN: 2704-1387
প্রকাশের তারিখ: ২০ আগস্ট, ২০২৬
উনিশ শতকের বাংলার পুরুষতান্ত্রিক, ধর্মীয় অনুশাসননির্ভর ও প্রথাসর্বস্ব সমাজব্যবস্থায় বিধবা নারীর জীবন ছিল কঠোর বিধিনিষেধ, সামাজিক বঞ্চনা ও মানসিক যন্ত্রণায় পরিপূর্ণ। বৈধব্য কেবল ব্যক্তিগত শোকের বিষয় ছিল না, বরং নারীর ওপর আরোপিত এক নির্মম সামাজিক নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে বাংলার নবজাগরণ, সমাজসংস্কার ও নারী-মুক্তির আন্দোলন বিধবা নারীর জীবন ও সামাজিক অবস্থানকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ সৃষ্টি করে। রাজা রামমোহন রায়ের সতীদাহবিরোধী আন্দোলন এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবা-বিবাহ আন্দোলন এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি নির্মাণ করে। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ, কৌলিন্যপ্রথা, নারীশিক্ষা ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলন সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ ও নারীর অবস্থানকে নতুন করে বিচার করার ক্ষেত্র তৈরি করে।
উনিশ শতকের বাংলা উপন্যাসে এই সমাজবাস্তবতার বহুমাত্রিক প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল-এ কৌলিন্যপ্রথা ও বাল্যবিবাহের পরিণতিতে নারীর অসহায়তা, রমেশচন্দ্র দত্তের সংসার-এ বিধবা-বিবাহ ও সমাজসংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, স্বর্ণকুমারী দেবীর স্নেহলতা-য় বিধবার প্রেম, পুনর্বিবাহ ও আত্মমর্যাদার সংকট এবং যোগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের প্রিয়ংবদা বা প্রেম প্রতিমা-য় ব্রহ্মচর্য ও পতিব্রতা আদর্শের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বিধবা-সমস্যাকে ঘিরে সমকালীন সমাজচিন্তার বিভিন্ন প্রবণতা প্রকাশিত হয়েছে। পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের উমা-তেও বিধবা নারীর দমিত আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক অনিরাপত্তার করুণ পরিণতি চিত্রিত হয়েছে।
নির্বাচিত উপন্যাসগুলোর আলোচনায় বিধবা নারী কখনও সামাজিক নিপীড়নের শিকার, কখনও প্রতিবাদী সত্তা, আবার কখনও রক্ষণশীল নৈতিক আদর্শের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ফলে উনিশ শতকের বাংলা উপন্যাসে বৈধব্যজীবনের উপস্থাপনা কেবল নারীর ব্যক্তিগত বেদনার সাহিত্যিক প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর মধ্য দিয়ে সমকালীন সমাজসংস্কার, পিতৃতান্ত্রিকতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, নারী-অধিকার এবং নবজাগরণের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বও প্রকাশিত হয়েছে। এই অর্থে বাংলা উপন্যাসে বিধবা নারীর জীবনচিত্র উনিশ শতকের সমাজবাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক দলিল।
মূল শব্দ: উনিশ শতকের বাংলা, বৈধব্যজীবন, বিধবা নারী, বাংলা উপন্যাস, সমাজসংস্কার, বাংলার নবজাগরণ, বিধবা-বিবাহ, নারী-অধিকার, পিতৃতান্ত্রিক সমাজ।
উনিশ শতকের বাংলার সমাজব্যবস্থা ছিল পুরুষতান্ত্রিক, ধর্মীয় অনুশাসননির্ভর এবং সামাজিক রীতিনীতি ছিল বজ্রকঠিন। এই সময়-পর্বের উপন্যাসগুলোতে নারীর বৈধব্য জীবন ও তার সংলগ্ন ঘটনাবলির প্রতি মনোযোগ দিলে হৃদয় ভারাক্রান্ত হতে বাধ্য। পাঠককে মুখোমুখি হতে হয় এক অতি করুণ সামাজিক বাস্তবতার। স্বামীর মৃত্যুর পর নারী শুধু ব্যক্তিগত শোকেই নয়, সমাজের নিষ্ঠুর বিধিনিষেধেও জর্জরিত হয়ে পড়ত। দক্ষ ঔপন্যাসিকদের হাতে উঠে আসা এই নির্মম বাস্তবতা ইতিহাস ও সমাজমনস্তত্ত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বিভিন্ন উপন্যাস ও সমকালীন আলোচনায় সমাজের অসংগতিগুলো ধাপে ধাপে উন্মোচিত হয়েছে। বহুস্তরীয় প্রশ্ন ও দ্বন্দ্বে যুক্তিবাদী মানুষ আন্দোলিত হতে বাধ্য হয়েছে। সেকালেও প্রশ্ন উঠেছিল—হাতেগোনা কিছু প্রগতিশীল মানুষের আধুনিক মনস্কতা ও সমাজসংস্কারক হিসেবে ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে এই প্রথানির্ভর সমাজব্যবস্থার ভিতেই একপ্রকার কুঠারাঘাত করা সম্ভব হয়েছিল। আজও সেই ব্যবস্থার সংক্রমণ কোথাও কোথাও অন্য রূপে প্রত্যক্ষ করা যায়। অতীতের সেই কঠোর অনুশাসন, সীমাবদ্ধতা ও নিষ্ঠুরতা আজও নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। ফলে বিধবা জীবনের উপাখ্যান বাংলা কথাসাহিত্যের ভেতর থেকে অন্বেষণ করতে হলে শুধু নির্দিষ্ট সময়কাল নয়, তার পূর্বাপর সামাজিক প্রেক্ষিতকেও ক্ষুরধার যুক্তির আলোকে বিশ্লেষণ করতে হবে। উপন্যাস তো রয়েছেই, একইসঙ্গে সাহিত্যের অন্যান্য শাখাতেও বৈধব্যজীবনের সুকঠিন ব্রত, যন্ত্রণা ও সামাজিক বিভাজনের নানা রূপ অনুধাবন করা যায়।
প্রসঙ্গত বলতে হয়, বৈধব্যজীবন ছিল আচারসর্বস্বতার এক নির্মম প্রতীক। বিধিনিষেধ, আত্মসংযম এবং ভোগবিলাস থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন জীবনযাপনই ছিল বিধবার নিয়তি। সাদা কাপড় পরিধান, অলংকার ত্যাগ, নিরামিষ ভোজন, সামাজিক অনুষ্ঠানে অনুপস্থিতি—এসব ছিল বাধ্যতামূলক সামাজিক অনুশাসন। উনিশ শতকের প্রথম সারির ঔপন্যাসিকদের রচনায় বৈধবা নারীর এই সংকুচিত জীবনচিত্র সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সমকালীন বিভিন্ন উপন্যাসে বৈধব্যজীবনের জটিল বিধিনিষেধ, সামাজিক বৈষম্য এবং নৈতিক দ্বন্দ্ব গভীরভাবে চিত্রিত হয়েছে। বৈধব্য নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে দমন করে এবং তাকে সামাজিক কলঙ্কের বোঝা বহনে বাধ্য করে। বলাবাহুল্য, উনিশ শতকের উপন্যাসে বৈধবা নারী প্রায়ই সহানুভূতির পাত্র হলেও তিনি সিদ্ধান্তগ্রহণে স্বাধীন নন। তাঁর জীবন সমাজের বহুস্তরীয় করুণা, ছলনা কিংবা নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরশীল। আবার কিছু উপন্যাসে দেখা যায়, বৈধবা নারী সামাজিক নিয়ম ভাঙতে চাইলে তাকে কঠোর পরিণতির সম্মুখীন হতে হয়। এর মাধ্যমে ঔপন্যাসিকেরা তৎকালীন সমাজের নির্মম নৈতিকতার তীব্র সমালোচনা করেছেন। একইসঙ্গে এই সময়ের সাহিত্য কেবল করুণ চিত্রণেই সীমাবদ্ধ নয়; বৈধবা নারীর অন্তর্গত বেদনা, মানসিক টানাপোড়েন, আত্মমর্যাদাবোধ এবং মানবিক আকাঙ্ক্ষাকেও গভীর সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করেছে। ফলে পাঠকের মনে যেমন গভীর সহানুভূতির জন্ম হয়, তেমনি সামাজিক সংস্কারের অপরিহার্যতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
একথা অনস্বীকার্য যে, উনিশ শতকের নির্বাচিত উপন্যাসে নারীর বৈধব্যজীবন শুধু ব্যক্তিগত দুঃখের কাহিনি নয়; এটি তৎকালীন সমাজব্যবস্থার এক নির্মম দলিল। এই উপন্যাসগুলো নারীর প্রতি সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে এক নীরব অথচ শক্তিশালী প্রতিবাদ এবং ভবিষ্যতের অধিকতর মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রত্যাশায় রোপিত এক প্রগতিশীল বীজ।
উনিশ শতকের বাংলায় সমাজসংস্কার, ধর্মীয় পুনর্বিবেচনা এবং নারী-মুক্তির আন্দোলন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিল। এই কারণেই সময়-পর্বটি বাংলার নবজাগরণের যুগ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার—যেমন সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, বিধবাদের প্রতি নিষ্ঠুর বিধিনিষেধ, জাতিভেদপ্রথা, স্পৃশ্য-অস্পৃশ্যতার বিভাজন এবং ধর্মীয় গোঁড়ামি—সমাজজীবনকে ক্রমাগত বিষাক্ত করে তুলেছিল। এই পরিস্থিতিতে সমাজসংস্কারকেরা শিক্ষা, যুক্তি, নৈতিকতা ও মানবিকতার ভিত্তিতে সমাজে আমূল পরিবর্তনের আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন যে, কেবল শিক্ষার প্রসার নয়, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই প্রকৃত সামাজিক মুক্তির পথ।
এই নবচেতনার সর্বপ্রথম অগ্রদূত ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের ফলস্বরূপ ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের উদ্যোগে সতীদাহ আইনত নিষিদ্ধ হয়। ‘বেঙ্গল সতী রেগুলেশন’ (Regulation XVII of 1829)-এর মাধ্যমে এই অমানবিক প্রথা নিষিদ্ধ হলেও রক্ষণশীল সমাজের প্রবল বিরোধিতা দীর্ঘদিন অব্যাহত ছিল। তবু রামমোহনের যুক্তিবাদী অবস্থান ও মানবিক সংগ্রাম ভারতীয় সমাজে নতুন এক যুগচেতনার সূচনা করে। তিনি ধর্মকে মানবকল্যাণের আলোকে ব্যাখ্যা করেছিলেন এবং মনে করতেন, ধর্ম যদি অমানবিক আচারের পৃষ্ঠপোষকতা করে, তবে সেই ধর্মীয় প্রথার সংস্কার অপরিহার্য।
উল্লেখ্য,সমাজসংস্কারের এই ধারায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন রামমোহনের সর্বার্থে সার্থক উত্তরসূরি। বিধবা নারীর শোচনীয় জীবন তাঁকে গভীরভাবে বিচলিত করেছিল। তাঁর ঐতিহাসিক প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ ১৮৫৬ সালে বিধবা-বিবাহ আইন প্রবর্তিত হয়, যা অবহেলিত ও বঞ্চিত নারীদের নতুন জীবনলাভের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। একইসঙ্গে নারীশিক্ষার প্রসার, বাল্যবিবাহের বিরোধিতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি জাতি গঠনে নারীর ভূমিকার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রচেষ্টা মূলত মধ্যবিত্ত সমাজকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও ক্রমে তা বৃহত্তর সমাজজীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
এই সমাজসংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে ধর্মীয় পুনর্বিবেচনাও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল। ১৮২৮ সালে রাজা রামমোহন রায়ের নেতৃত্বে এবং দ্বারকানাথ ঠাকুরের সহযোগিতায় ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। একেশ্বরবাদ, যুক্তিনিষ্ঠ ধর্মচিন্তা, জাতিভেদবিরোধিতা এবং আচারসর্বস্বতার বিরুদ্ধে ব্রাহ্মসমাজের অবস্থান শিক্ষিত সমাজে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে। ধর্মকে কেবল আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নৈতিকতা, মানবিকতা ও যুক্তির আলোকে পুনর্ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে এই আন্দোলনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
অন্যদিকে, হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও এবং ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ এবং আধুনিক শিক্ষার প্রসারে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। নারী-মুক্তি এই সময়ের সমাজসংস্কারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে। শিক্ষার প্রসার, বিধবা-বিবাহ, সতীদাহ প্রথার বিলোপ এবং বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আন্দোলন নারীর সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির ভিত্তি নির্মাণ করে। পরবর্তীকালে বেগম রোকেয়া এই ধারাকে আরও সুদৃঢ় ও বিস্তৃত করলেও, উনিশ শতকের এই নবজাগরণই নারী-আন্দোলন ও নারীশিক্ষার ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্মাণ করে দেয়। বাংলার সমাজসংস্কার, ধর্মীয় পুনর্বিবেচনা এবং নারী-মুক্তির এই সম্মিলিত প্রবাহ উনিশ শতকের বাংলা উপন্যাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ফলে সমকালীন ঔপন্যাসিকেরা সমাজবাস্তবতার অন্তর্লীন সংকট, বৈধব্যজীবনের বেদনা এবং মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে তাঁদের সৃষ্টিশীলতার অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেন।
ফলে উনিশ শতকের বাংলা ছিল সামাজিক, ধর্মীয় ও বৌদ্ধিক রূপান্তরের এক যুগান্তকারী পর্ব। পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব, ঔপনিবেশিক শাসনের বাস্তবতা এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক কুসংস্কারের চাপে বাংলার সমাজ গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিল। এই সংকট থেকেই জন্ম নেয় এক নতুন চেতনা, যা সাধারণভাবে ‘বাংলার নবজাগরণ’ নামে পরিচিত। যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ এবং সমাজসংস্কারের বহুমাত্রিক আকাঙ্ক্ষাই ছিল এই নবজাগরণের মূল বৈশিষ্ট্য। এই প্রেক্ষাপটে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, প্যারীচাঁদ মিত্র, কেশবচন্দ্র সেন, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার দত্ত প্রমুখ মনীষীর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এই নবজাগরণের ধারায় প্যারীচাঁদ মিত্র একটি স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করে আছেন। তাঁর জন্ম ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুলাই। তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের তুলনায় প্রায় ছয় বছরের জ্যেষ্ঠ। যদিও উভয়েই সমাজসংস্কারমূলক চিন্তার ধারক ছিলেন, তথাপি তাঁদের কর্মপদ্ধতিতে সুস্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। বিদ্যাসাগর প্রত্যক্ষ সামাজিক সংস্কার, শিক্ষাবিস্তার এবং আইন প্রবর্তনের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন; অপরদিকে প্যারীচাঁদ মিত্র সাহিত্য, সাংবাদিকতা এবং মননচর্চার মাধ্যমে সমাজসচেতনতা গড়ে তোলার পথ বেছে নেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে সমকালীন সমাজজীবনের অসংগতি, কুসংস্কার এবং মানসিক পশ্চাৎপদতার সমালোচনা বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে।
তবে উনিশ শতকের সমাজসংস্কার আন্দোলনের ইতিহাসে সর্বাগ্রে স্মরণীয় নাম রাজা রামমোহন রায়। তাঁকে ছাড়া বাংলার নবজাগরণ এবং সমাজসংস্কারের ইতিহাস কার্যত অসম্পূর্ণ। সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম ছিল ভারতীয় সমাজসংস্কারের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। সতীদাহ কেবল নারীর ওপর চরম নির্যাতনের নিদর্শনই ছিল না; এটি ছিল পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির এক নির্মম প্রকাশ।
রামমোহন রায় উপলব্ধি করেছিলেন যে, সতীদাহ প্রথা বিলোপ করতে হলে কেবল আবেগ বা মানবিক আবেদন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শাস্ত্রসম্মত যুক্তি, যুক্তিবাদী বিশ্লেষণ এবং সুসংগঠিত সামাজিক প্রতিরোধ। এই উদ্দেশ্যে তিনি ধারাবাহিকভাবে একাধিক বিতর্কমূলক গ্রন্থ রচনা করেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে— ‘উৎসবানন্দ বিদ্যাবাগীশের সহিত বিচার’ (১৮১৬), ‘ভট্টাচার্যের সহিত বিচার’ (১৮১৭), ‘গোস্বামীর সহিত বিচার’ (১৮১৮), ‘সহমরণ বিষয়ক প্রবর্তক নিবর্তক সম্বাদ’ (১৮১৮), ‘সুব্রহ্মণ্য শাস্ত্রীর সহিত বিচার’ (১৮২০), ‘কবিতাকারের সহিত বিচার’ (১৮২০) এবং ‘সহমরণ বিষয়ক প্রস্তাব’ (১৮২৯)। এসব রচনায় তিনি শাস্ত্রের আলোকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, সতীদাহ বা সহমরণ হিন্দুধর্মে বাধ্যতামূলক ধর্মীয় বিধান নয়। বিশেষত ‘সহমরণ বিষয়ক প্রবর্তক নিবর্তক সম্বাদ’ গ্রন্থে তিনি সতীদাহের অমানবিকতা, বিধবাদের ওপর সংঘটিত পাশবিক নির্যাতন এবং সমাজের অন্ধ কুসংস্কারকে তীক্ষ্ণ যুক্তির মাধ্যমে উন্মোচিত করেছেন। তাঁর এই নিরলস আন্দোলন ও যুক্তিনিষ্ঠ প্রচেষ্টার ফলেই গভর্নর-জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের উদ্যোগে ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা আইনত নিষিদ্ধ হয়। এই আইন প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রকে নারীর অধিকার ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে প্রত্যক্ষ ভূমিকা গ্রহণে বাধ্য করে। তাই সতীদাহ প্রথার বিলোপকে ভারতীয় তথা বাঙালি নারীমুক্তির ইতিহাসে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সাফল্য হিসেবে গণ্য করা হয়।
রামমোহনের চিন্তা ও আদর্শ পরবর্তীকালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার দত্ত এবং বিশেষত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডে নতুন মাত্রা লাভ করে। তবে সতীদাহ প্রথা বিলোপের মধ্য দিয়েই বিধবা নারীর দুর্দশার অবসান ঘটেনি। আইন পরিবর্তিত হলেও সমাজের মানসিকতা দীর্ঘদিন অপরিবর্তিত থেকে যায়। বরং রক্ষণশীল সমাজ বিধবাদের ওপর আরও কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধ আরোপে সচেষ্ট হয়। অধিকাংশ মানুষ পরিবর্তনের বিরোধিতা করেছিল; সমাজ তখনও মানবিক মূল্যবোধ, নারী-অধিকার এবং সংস্কারের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করার মতো মানসিক প্রস্তুতি অর্জন করতে পারেনি। ফলে অকালবিধবাসহ সকল বিধবা নারীর জীবনে মাথা মুণ্ডন, সাদা বস্ত্র পরিধান, অলংকার ত্যাগ, উপবাস পালন, নিরামিষ আহার এবং সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব থেকে নির্বাসিত জীবনযাপন এক প্রকার বাধ্যতামূলক সামাজিক নিয়মে পরিণত হয়। বৈধব্য তখন কেবল ব্যক্তিগত শোকের পরিচয় নয়; বরং এক নির্মম সামাজিক শাস্তি এবং আজীবন বহন করতে বাধ্য হওয়া এক অবমাননাকর পরিচয়ে রূপান্তরিত হয়।
সতীদাহ প্রথা বিলোপ এবং বিধবা-বিবাহ আন্দোলন উনিশ শতকের সমাজসংস্কারের ইতিহাসে যুগান্তকারী ঘটনা হলেও বাস্তব সমাজে বিধবা নারীর জীবন একদিনে বদলে যায়নি। বরং আইন ও সামাজিক মানসিকতার মধ্যে দীর্ঘকাল এক গভীর ব্যবধান বিদ্যমান ছিল। রাষ্ট্র আইন প্রণয়ন করতে সক্ষম হলেও সমাজের রক্ষণশীল মনস্তত্ত্ব, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং প্রথানির্ভর মানসিকতা সহজে পরিবর্তিত হয়নি। ফলে একদিকে সংস্কারের আদর্শ, অন্যদিকে সমাজের কঠোর বাস্তবতা—এই দ্বিমুখী টানাপোড়েন উনিশ শতকের সামাজিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। এই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে নির্মম শিকার ছিলেন বিধবা নারীরা।
সমকালীন বাংলা উপন্যাস এই সামাজিক বাস্তবতাকে গভীর সংবেদনশীলতা ও শিল্পসচেতনতার সঙ্গে ধারণ করেছে। ঔপন্যাসিকেরা বিধবার জীবনকে কেবল করুণার বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেননি; বরং তাঁরা বিধবা চরিত্রকে সমাজব্যবস্থার নৈতিক সংকট, ধর্মীয় গোঁড়ামি, পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য এবং মানবিক অধিকারের প্রশ্নে এক কেন্দ্রীয় প্রতীকে পরিণত করেছেন। নির্বাচিত উপন্যাসগুলিতে বিধবা নারী কখনও সামাজিক নিপীড়নের প্রতীক, কখনও নীরব প্রতিবাদের ভাষ্যকার, আবার কখনও পরিবর্তনশীল সমাজচেতনার সূক্ষ্ম বাহক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। ফলে উনিশ শতকের বাংলা উপন্যাসে বৈধব্যজীবনের চিত্রায়ণ কেবল সাহিত্যিক কল্পনার বিষয় নয়; এটি সমকালীন সমাজচেতনা, সমাজসংস্কার আন্দোলন এবং মানবমুক্তির ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই নির্বাচিত উপন্যাসগুলিতে বিধবা নারীর জীবন, মানসিকতা, সামাজিক অবস্থান এবং আত্মসংগ্রামের বহুমাত্রিক রূপ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
এপ্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য উদ্ধৃতি হলো:
“সমাজ সংস্কারক ও যুগস্রষ্টা রামমোহনের সাহিত্যচর্চাও বিস্ময়ের উদ্রেক করে। তবে নিছক সাহিত্য রচনা বা শিল্পসৃষ্টির জন্যই তিনি লেখনী ধারণ করেননি, সামাজিক দায়বদ্ধতাই তাঁকে গ্রন্থ রচনা প্রণোদিত করেছে। তিনি যুক্তি তর্ক তথ্য তত্ত্ব দিয়ে তাঁর মত প্রকাশ করেছেন, তুলে ধরেছেন নিজস্ব ভাবনাকে। আবার তার হাতে সাহিত্য যেন শাণিত অস্ত্র হয়ে উঠেছে যা দিয়ে বিরুদ্ধবাদীদের মতকে তিনি প্রবলভাবে আক্রমণ করেছেন, আঘাত হেনেছেন। তার উদ্দেশ্য ছিল মিথ্যার অপনোদন করা, অন্যায়কে আঘাত করা এবং ন্যায় ও সত্যের প্রতিপাদন করা। এর দ্বারা তিনি দেশবাসীর বুদ্ধি ও বিচারবোধকে স্থবিরতা মুক্ত করে জাগ্রত করতে প্রয়াসী হয়েছেন।” ১
এই অমানবিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বিধবা নারীর পুনর্বাসনের প্রশ্নটি সামনে আনেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগর উপলব্ধি করেছিলেন যে, বিধবা বিবাহ প্রচলন না হলে নারীর সামাজিক মুক্তি অসম্ভব। তিনি শাস্ত্র গভীরভাবে অধ্যয়ন করে দেখান যে, বিধবা বিবাহ শাস্ত্রবিরোধী নয়। এই যুক্তিকে প্রতিষ্ঠা করতে তিনি রচনা করেন ‘বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’(১৮৫৫) এবং ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার’( প্রথম খণ্ড ১৮৭১, দ্বিতীয় খণ্ড ১৮৭৩) শিরোনামাঙ্কিত কালজয়ী গ্রন্থ। বাল্যবিবাহের শোচনীয় পরিণামের কথা দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে তিনি নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে,
“বিদ্যাসাগর কৌলিন্যপ্রথার ভয়াবহতার কথা বলেছেন। ইংরেজ আমলেও এই কদর্য প্রথা বিদ্যমান ছিল, তার তথ্যনিষ্ঠ প্রমাণ রেখেছেন বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগর বড় লেখক ছিলেন, সমাজ কল্যাণকামী মানুষ হিসেবেও কোনও অংশেই তাঁর মহিমা কম ছিল না। তিনি পণপ্রথার ভয়াবহতার কথা বলেছেন যা কলকাতাতে প্রকট ছিল। বিধবাদের জীবনের অসহায়তা ও জটিলতার কথা বলেছেন ‘ বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব রচনায়(১ম ও ২য় খণ্ড ১৮৫৫)।” ২
১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই হিন্দু বিধবা-বিবাহ আইন (Act XV of 1856) প্রণীত হওয়ার পর একই বছরের ৭ ডিসেম্বর কলকাতার ১২ নম্বর সুকিয়া স্ট্রিটে (বর্তমান ৪৮৩/৪৮বি, কৈলাস বসু স্ট্রিট) রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে প্রথম বিধবা-বিবাহ সম্পন্ন হয়। এর পূর্বে ২৭ নভেম্বর ১৮৫৬ শ্রীশচন্দ্রের সঙ্গে এক বিধবার বিবাহের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাঁর মাতা সূর্যমণি দেবীর তীব্র বিরোধিতার কারণে তা স্থগিত হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইংলিশ ম্যান ও সংবাদ ভাস্কর বিদ্যাসাগরকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে; এমনকি পাত্রীপক্ষ ক্ষতিপূরণের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে মামলাও দায়ের করে। পরবর্তীকালে শ্রীশচন্দ্রের সম্মতিতে ৭ ডিসেম্বর ১৮৫৬ বিবাহটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবা-বিবাহ আন্দোলন ছিল যুক্তিনিষ্ঠ, মানবতাবাদী এবং কর্মমুখী। তিনি কেবল শাস্ত্রসম্মত যুক্তি প্রদর্শনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; সামাজিক বিরোধিতা, ধর্মীয় বিতর্ক ও ব্যক্তিগত আক্রমণ উপেক্ষা করে বাস্তবে বিধবা-বিবাহ কার্যকর করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ঐতিহাসিক সেই বিবাহে প্রায় ৮০০ জন আমন্ত্রিত অতিথি উপস্থিত ছিলেন। রামগোপাল ঘোষ, জজ হরচন্দ্র ঘোষ, শম্ভুনাথ পণ্ডিত, দ্বারকানাথ মিত্র, রমাপ্রসাদ রায়, প্যারীচাঁদ মিত্র, রাজা দিগম্বর মিত্র, কালীপ্রসন্ন সিংহ, গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্যসহ তৎকালীন বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। জনসমাগমের সম্ভাবনা উপলব্ধি করে বিদ্যাসাগর পুলিশি ব্যবস্থারও আয়োজন করেছিলেন।
তৎকালীন বাংলার ছোটলাট স্যার ফ্রেডেরিক জেমস হ্যালিডে বিদ্যাসাগরের অনুরোধে শ্রীশচন্দ্রকে বনগাঁয় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিয়োগ দেন। পরবর্তীকালে এই আন্দোলনের প্রভাব সাহিত্যজগতেও প্রতিফলিত হয়; বিশেষত মাইকেল মধুসূদন দত্ত-এর সঙ্গে বিদ্যাসাগরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ১৮৬৪ সালে ইউরোপে অবস্থানকালে তাঁকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের ঘটনাও এই মানবিক বন্ধনের স্মারক। সর্বোপরি, বিদ্যাসাগরের নিরলস প্রচেষ্টায় বিধবা-বিবাহ আন্দোলন বাংলার সমাজসংস্কারের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে এবং নারীর সামাজিক মর্যাদা, মানবিক অধিকার ও আত্মসম্মান প্রতিষ্ঠার পথে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
একথা অনস্বীকার্য যে, ‘আলালের ঘরের দুলাল’ বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে কেবল পথিকৃৎ রচনাই নয়, উনিশ শতকের সমাজবাস্তবতার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। আলোচ্য উপন্যাসে প্যারীচাঁদ মিত্র বিধবা-জীবনকে মূল কাহিনির কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন না করলেও বাল্যবিবাহ, কৌলিন্যপ্রথা এবং তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে বৈধব্যের করুণ বাস্তবতাকে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করেছেন। মোক্ষদা, প্রমদা প্রমুখ চরিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন যে, নারীর ব্যক্তিগত ইচ্ছা, শিক্ষা, আত্মমর্যাদা কিংবা মানবিক অধিকার—সবকিছুই সামাজিক অনুশাসনের কাছে পরাভূত ছিল। বৈধব্য এখানে কেবল একটি পারিবারিক দুর্ঘটনা নয়; এটি ছিল সমাজব্যবস্থার নির্মিত এক অমানবিক পরিণতি। প্যারীচাঁদ মিত্রের বিশেষ কৃতিত্ব এই যে, তিনি প্রত্যক্ষ প্রচারধর্মিতার আশ্রয় না নিয়ে সামাজিক বাস্তবতাকেই তাঁর বক্তব্যের প্রধান ভিত্তি করেছেন। বিধবা-বিবাহের পক্ষে তিনি উচ্চকণ্ঠ স্লোগান তোলেননি; বরং বিধবার অসহনীয় জীবনসংগ্রাম, সামাজিক অবমাননা এবং মানবিক বঞ্চনার বাস্তব চিত্র অঙ্কনের মধ্য দিয়েই পাঠকের বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিই উপন্যাসটিকে সমাজসংস্কারমূলক সাহিত্যের এক তাৎপর্যপূর্ণ নিদর্শনে পরিণত করেছে। বলা যায়, ‘আলালের ঘরের দুলাল’-এ বিধবা চরিত্রের উপস্থাপনা পরবর্তী বাংলা উপন্যাসে বৈধব্যজীবনের অধিকতর গভীর, মনস্তাত্ত্বিক এবং সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ভিত্তি নির্মাণ করে। তাই বৈধব্যজীবনের আলোচনায় এই উপন্যাসের গুরুত্ব তার প্রত্যক্ষ বক্তব্যের চেয়ে পরোক্ষ সামাজিক অভিঘাতেই অধিক নিহিত। ‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাসে দেখা যায়,
“বালবিধবা মোক্ষদা কৌলিন্য প্রথার শিকার হয়েছে। প্রমদা কুলীন ব্রাহ্মণের অনেক পত্নীর মধ্যে একজন। কুলীন বামুনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে সত্য কিন্তু অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে তার বাবার বাড়িতেই থাকতে হয়। শ্বশুর বাড়িতে বসবাসের কোনো উপায় নেই। তার স্বামীর যখন টাকা পয়সায় টান পড়ে তখন অর্থের প্রয়োজনে ক্ষণিকের জন্য হয়তো তার স্বামী শ্বশুর বাড়িতে উপস্থিত হয় এবং কিছু টাকাপয়সা হাতিয়ে নিয়ে কেটে পড়ে। ফলে প্রমদার দাম্পত্য জীবন বলে তেমন কিছু ছিল না। পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায় সেকালে নারীজাতি সম্পর্কে যে সংকীর্ণতা ছিল এখানে তা অতিক্রম করতে লেখক সক্ষম হননি। সমসাময়িক কালের বাস্তবোচিত ঘটনার প্রেক্ষাপটে অনাগত ভবিষ্যতের সামান্যতম ইঙ্গিতও লেখক দেননি – যা শক্তিমান লেখকের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকে। এছাড়া বাবুরাম বাবুর পত্নীর মধ্যেও একজন নারীর যে স্বাভাবিক আত্মসচেতনতা ও নিজ অধিকারবোধের ধ্যানধারণা তারও পরিচয় আমরা পাই না।” ৩
ড. ক্ষেত্র গুপ্ত ‘আলালের ঘরের দুলাল ‘ প্রসঙ্গে যা বলেছেন, তাতে আলোচ্য বিষয়ের গভীরে দৃষ্টিপাত করতে অসুবিধা হয় না।
“সামাজিক জীবনের বিবিধ উপকরণের পরিচয়, সেই উদ্দেশ্যে কাহিনির সূত্রকে এদিকে -সেদিকে নানা পথে ঘোরানো হয়েছে।বাবুরাম, মতিলাল, বরদাপ্রসাদ -রামলাল, বাঞ্ছারাম, ঠকচাচা,বেণীবাবু-বেচারাম – এদের নানা প্রসঙ্গ, কখনও একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত থেকেছে, আবার নিজের পৃথক পথে চলেছে। মোটমাট কলকাতা-বৈদ্যবাটী-বালী-হুগলীর কাছারিতে – একদিকে যশোহর ( কদাচিৎ বাদা অঞ্চলেও) অন্যদিকে বারাণসী পর্যন্ত হাত-পা ছড়িয়ে দিয়েছে এই উপন্যাস। সেভাবেই জুটে এসেছে জীবনের ও সমাজের নানা প্রসঙ্গ।” ৪
উল্লেখ্য,সমাজের মধ্যে এক ধরনের দ্বিমুখী সম্পর্ক দৃষ্টিগোচর হয়। সাহিত্যে শিল্পগুণকে মান্যতা দিয়ে বিভিন্ন ধরনের জীবনধারা ও বোধশক্তি প্রকাশ করার চেষ্টা থাকে। একজন লেখক যখন সাহিত্য রচনায় নিজেকে নিবদ্ধ করেন,তখন দুই ধরনের উপাদানই
সৃষ্ট সাহিত্যের মধ্যে অনিবার্যভাবে মিশ্রিত হতে দেখা যায়। লেখকের মধ্যে চলমান সমাজের প্রতিফলন অবশ্যই দেখা যাবে । সাহিত্যেও সেই বাস্তবতার প্রয়োগ কোনোভাবেই উপেক্ষিত হবে না। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো,বহুক্ষেত্রে বিভিন্ন কারণে বেশকিছু সীমাবদ্ধ চোখে পড়ে। সাধারণত সমাজের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ বিষয় ও বৈশিষ্ট্য সাহিত্যে এসে ভিড় করে। আমাদের বাংলা সাহিত্যের উপন্যাসে বিষয় হিসেবে সমকালীন সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে জীবনযাত্রাকে যুক্ত করে, তৎকালীন লেখকরা যে সব উপন্যাস রচনা করেছেন – তা মূলতঃ সমকালীন জীবনযাত্রারই প্রকাশকলার পরিচয় বহন করে। বাংলার উপন্যাসের উন্মেষ পর্বে প্রমথনাথ শর্মা ছদ্মনামে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নববাবু বিলাস’ (১৮২৩) প্রথম উপন্যাসের গৌরবে গৌরবান্বিত। ‘নববাবু বিলাস’ বাবু কালচার-এর নেতিবাচক দিকগুলি তুলে ধরা হয়। তবে সার্থক উপন্যাস হিসেবে প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’-এ পারিবারিক জীবনের চিত্র প্রকাশিত।
প্যারীচাঁদ মিত্রের পর রমেশচন্দ্র দত্ত (১৮৪৮–১৯০৯) বাংলা সামাজিক উপন্যাসে সমাজসংস্কারমূলক ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা নির্মাণ করেন। তাঁর ‘সংসার’ (১৮৮৬) এবং ‘সমাজ’ (১৮৯৪) উপন্যাস উনিশ শতকের সমাজবাস্তবতার উল্লেখযোগ্য দলিল। বিশেষত ‘সংসার’ উপন্যাসে বিধবা-বিবাহ, নারীশিক্ষা এবং পারিবারিক মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে সমকালীন সমাজের নানা দ্বন্দ্ব শিল্পরূপ লাভ করেছে। উপন্যাসে বিন্দু, কালীতারা ও উমা—এই তিন বাল্যসখীর সংসারজীবনের মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক দেখিয়েছেন যে, সুখী দাম্পত্যের মূল ভিত্তি ধনসম্পদ বা বংশমর্যাদা নয়; বরং পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও বোঝাপড়া।
আলোচ্য উপন্যাসের অন্যতম তাৎপর্য নিহিত রয়েছে বিন্দুর বিধবা বোন সুধা এবং শিক্ষিত যুবক শরৎচন্দ্র-এর বিবাহকে কেন্দ্র করে। এই বিবাহের মাধ্যমে রমেশচন্দ্র দত্ত বিধবা-বিবাহের সামাজিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন এবং আইন প্রণয়নের পরও সমাজে বিদ্যমান রক্ষণশীল মানসিকতার বাস্তব চিত্র অঙ্কন করেছেন।
ফলে উপন্যাসটি কেবল একটি পারিবারিক কাহিনি নয়; এটি বিধবা-বিবাহ আন্দোলনের সামাজিক অভিঘাত এবং নবজাগরণের প্রগতিশীল চেতনারও শিল্পিত প্রকাশ। ঐতিহাসিক রোমান্সের পরিবর্তে সমকালীন সমাজজীবনের বাস্তব সমস্যাকে উপজীব্য করে রমেশচন্দ্র দত্ত মানবিক মূল্যবোধ, নারী-অধিকার এবং সমাজসংস্কারের পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তাঁর ‘সংসার’ উপন্যাস তাই উনিশ শতকের বাংলা উপন্যাসে বৈধব্যজীবন ও বিধবা-বিবাহ প্রসঙ্গের একটি তাৎপর্যপূর্ণ সাহিত্যিক দলিল হিসেবে বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।
একথা অনস্বীকার্য যে, ‘সংসার’ উপন্যাসের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিধবা-বিবাহের সার্থকতা ও সামাজিক যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করা। একইসঙ্গে ঔপন্যাসিক কৌলিন্যপ্রথা, বাল্যবিবাহ এবং বংশগৌরবনির্ভর বিবাহব্যবস্থার অমানবিক পরিণতিকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত পরিচয় বংশমর্যাদায় নয়, ব্যক্তিগত যোগ্যতা, মানবিকতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ায় নিহিত। উপন্যাসে উমা ও কালীতারার জীবনকাহিনির মধ্য দিয়ে কৌলিন্যপ্রথার নির্মম অভিঘাত এবং অকালমৃত্যু ও বৈধব্যের করুণ বাস্তবতা অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে চিত্রিত হয়েছে। এর মাধ্যমে রমেশচন্দ্র দত্ত স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করেছেন যে, বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ ও কৌলিন্যপ্রথার মতো অমানবিক সামাজিক রীতির আমূল সংস্কার ব্যতীত নারীজীবনের প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়।
কবি ঈশ্বর গুপ্ত এই কৌলিন্য প্রথার বিরোধিতা করে ব্যঙ্গবিদ্রুপ সহকারে লিখেছিলেন,
“মিছা কেন কুল নিয়া কর আঁটাআঁটি।
এ যে কুল কুল নয় সার মাত্র আঁটি।।
কুলের গৌরব কর কোন্ অভিমানে।
মূলের হইলে দোষ কেবা তারে মানে।।
ঘটকের মুখে সুধু কুলীনের চোপা।
রস নাই যশ কিসে কুল হল টোপা।।
আদর হইত তবে ভাঙ্গিলে অরুচি।
পোকাধরা সোঁকা ভার দেখে যায় রুচি।।” ৫
এ প্রসঙ্গে স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্রের একটি বক্তব্য উপস্থাপন করা যেতে পারে। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ‘সাম্য’ গ্রন্থে লিখেছেন,
“যদি কোনো বিধবা হিন্দুই হউন, আর যে জাতীয়া হউন, পতির লোকান্তর পরে পুনঃপরিণয়ে অধিকারিনী। যদি পুরুষ পত্নী বিয়োগের পর পুর্নবার দারপরিগ্রহে অধিকারী হয়, তবে সাম্যনীতির ফলে স্ত্রী পতি বিয়োগের পর অবশ্য, ইচ্ছা করিলে পুনর্বার পতি গ্রহণে অধিকারিনী,” ৬
স্বর্ণকুমারী দেবীর ‘স্নেহলতা’-এ কমলা চরিত্রের মাধ্যমে প্রথমবার এক নারীকে অন্য নারীর অধিকারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে দেখা যায়। তবু অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সামাজিক সংস্কার ও পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের কারণে নারীমুক্তির পথ সহজ হয়নি। উপন্যাসটি স্পষ্ট করে যে, রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নারীমুক্তির আদর্শ সমাজে আলোড়ন তুললেও বাস্তবে ধর্মীয় গোঁড়ামি, সতীত্বের আদর্শ এবং বিধবার ব্রহ্মচর্যবন্দনা সেই মুক্তির পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই মতাদর্শগত দ্বন্দ্বেরই আরেকটি রূপ দেখা যায় যোগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের ‘প্রিয়ংবদা’ বা ‘প্রেম প্রতিমা’ (১৮৯৯) উপন্যাসে। এখানে বিধবা-বিবাহের পরিবর্তে ব্রহ্মচর্য ও পতিব্রতা আদর্শকে মহিমান্বিত করা হয়েছে। প্রিয়ংবদা পুনর্বিবাহ প্রত্যাখ্যান করে কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে এবং পরবর্তীকালে দেবীতুল্য মর্যাদা লাভ করে। ফলে উপন্যাসটি বিধবার সামাজিক পুনর্বাসনের পরিবর্তে আত্মত্যাগ ও সতীত্বকেই আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
অন্যদিকে, ব্রাহ্ম সমাজনেতা শিবনাথ শাস্ত্রীর ‘যুগান্তর’ (১৮৯৩) উপন্যাসে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। বিজয়া চরিত্রকে কেন্দ্র করে তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষা, নারীশিক্ষা এবং বিধবা-বিবাহের পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছেন। বিজয়া সামাজিক কুসংস্কার ও রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠলেও পারিবারিক বাস্তবতার কাছে তার কিছু সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে। তবুও উপন্যাসটির মূল বক্তব্য—সমাজের অগ্রগতির জন্য প্রথার পরিবর্তন ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। এইভাবে ‘প্রিয়ংবদা’ ও ‘যুগান্তর’—দুটি উপন্যাসই বিধবাজীবনকে কেন্দ্র করে উনিশ শতকের সমাজচিন্তার পরস্পরবিরোধী দুই মতাদর্শকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করেছে।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয়, যোগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় (১৮৫৮-১৯০৯) , তিনি একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে বাংলা সাহিত্যে পরিচিতি পেয়েছেন। সেই অর্থে গুরুত্বপূর্ণ না হলেও তাঁর গুরুত্ব অবশ্যই বিশেষ বিশেষ যুক্তিতে অনস্বীকার্য। তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়,যথা,
“তিনি ১৮৭৭ খ্রি. ‘সুধাকর’ মাসিক পত্রিকা এবং তৎকালীন অন্যান্য পত্রিকায় প্রবন্ধাদি প্রকাশ করতে থাকেন। ১৮৭৮ খ্রি. ‘কল্পনা’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই পত্রিকাতেই স্বরচিত প্রথম উপন্যাস ‘কনে বৌ’ প্রকাশিত হয়। তিনি গার্হস্থ্য উপন্যাস রচনায় সুদক্ষ ছিলেন।” ৭
যোগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়-এর একটি উপন্যাস হলো ‘প্রিয়ংবদা’ বা ‘প্রেম প্রতিমা’ (১৮৯৯)। এই ‘প্রেম প্রতিমা’ উপন্যাসে উপেন্দ্রের বিধবা স্ত্রীর কিশোরী জীবনে ব্রহ্মচারিণী, যৌবনে যোগিনী, বিষয়ভোগে উদাসিনী এমনই একটি চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। সমগ্র উপন্যাসে বিধবা নারীর সতীত্বকে পঞ্চমে তুলে ধরে এই বার্তাই পৌঁছে দিতে চেয়েছেন, বিধবা নারীর পক্ষে এইসব বিধিবিধান ও ‘অবশ্য পালনীয়’ কর্তব্য। অপরদিকে বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধেও জোর প্রচার করা হয়েছে । বিধবা নারীর ব্রহ্মচর্য পালন কেন করতে হবে তার পক্ষে একজন নারীরই উক্তিতে স্পষ্ট হয়ে গেছে, প্রিয়ংবদার দাদা যখন ভগ্নীর পুর্নবিবাহের আয়োজনের উদ্যোগ নেয়, তখন প্রিয়ংবদা তার দাদার উদ্দ্যেশ্যে বলে উঠেছে,
“আপনারা পু্রুষ, রমনী হৃদয় বুঝিবার ক্ষমতা আপনাদের কিরূপ হইবে? পতিব্রতা রমনী একবার যাহাকে হৃদয় মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করিবারে সে মূর্তিকে চূর্ণ করিয়া তাহার স্থানে অন্যমূর্তির প্রতিষ্ঠা করিতে কখনই পারে না।“ ৮
ফলে এইসব তথ্য ও অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করা যায় যে,এমন নারী মুক্তি নয়, নারীকে দেবীরূপে প্রতিষ্ঠা করে একটি বার্তা প্রেরণ করা হয়েছে। বৈধব্যের মীমাংসা পুর্নবিবাহ নয়, ব্রহ্মচর্য পালনই বিধবা নারীর কাম্য হওয়া বাঞ্ছনীয়,এই বার্তা আধুনিক মনস্ক দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি প্রচারিত হয়ে পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থার মধ্যে দ্বন্দ্ব সঞ্চার করবার প্রচেষ্টা করা হয়েছে।
স্বর্ণকুমারী দেবীর পর বাংলা উপন্যাসে বিধবাজীবনের প্রশ্ন নতুন মাত্রা লাভ করে। তাঁর ‘স্নেহলতা’ (১২৯৯ বঙ্গাব্দ) উপন্যাসে বিধবা নারীর প্রেম, পুনর্বিবাহ, সামাজিক সংস্কার এবং ব্রাহ্মসমাজের আদর্শ একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। স্নেহলতা চরিত্রের মাধ্যমে লেখিকা দেখিয়েছেন, বিধবার জীবনে সামাজিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি মানসিক দ্বন্দ্ব ও আত্মমর্যাদার সংকটও সমানভাবে কার্যকর। চারুর প্রতি স্নেহলতার প্রেম থাকা সত্ত্বেও আজন্ম সংস্কার, সামাজিক বিধিনিষেধ ও আত্মসম্মানবোধ তাকে পুনর্বিবাহের পথে সহজে এগোতে দেয় না। শেষ পর্যন্ত আত্মহননের মধ্য দিয়ে তার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে, যা উনিশ শতকের সমাজে বিধবা নারীর অসহায়তার এক মর্মস্পর্শী প্রতীক। এই উপন্যাসে স্বর্ণকুমারী কেবল বিধবার দুর্দশাই চিত্রিত করেননি; বরং নারী-
অধিকার, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দ্বিচারিতা এবং সংস্কার আন্দোলনের সীমাবদ্ধতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। তাই ‘স্নেহলতা’ বাংলা সাহিত্যে বিধবা-সমস্যাভিত্তিক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত।
এই ধারারই পরবর্তী পর্বে যোগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় (১৮৫৮–১৯০৯)-এর ‘প্রিয়ংবদা’ বা ‘প্রেম প্রতিমা’ (১৮৯৯) সম্পূর্ণ ভিন্ন মতাদর্শের পরিচয় দেয়। এখানে বিধবা-বিবাহের পরিবর্তে ব্রহ্মচর্য, পতিব্রতা আদর্শ ও আত্মসংযমকেই বিধবা জীবনের শ্রেষ্ঠ পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রিয়ংবদা পুনর্বিবাহ প্রত্যাখ্যান করে কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে এবং পরবর্তীকালে দেবীতুল্য মর্যাদা লাভ করে। ফলে উপন্যাসটি বিধবা-মুক্তির পরিবর্তে সতীত্ব ও ত্যাগের আদর্শকে মহিমান্বিত করে। এই রচনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয় যে, উনিশ শতকের বাংলা সমাজে বিধবা-বিবাহ আন্দোলনের পক্ষে যেমন শক্তিশালী সাহিত্যিক ধারা গড়ে উঠেছিল, তেমনি তার বিপরীতে রক্ষণশীল আদর্শকেও সাহিত্য সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। বিধবাজীবনকে কেন্দ্র করে এই মতাদর্শগত দ্বন্দ্বই উনিশ শতকের বাংলা উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
বঙ্কিমচন্দ্রের পরবর্তী সময়েও বাংলা উপন্যাসে হিন্দু বিধবা নারীর জীবন নানা দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচিত হয়েছে। পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৬৯–১৯২৩) রচিত ‘উমা’ (১৯০০) উপন্যাসে বিধবা বিনোদিনী চরিত্রের মাধ্যমে বিধবা নারীর দমিত আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক অনিরাপত্তা এবং নৈতিক সংকটের এক করুণ পরিণতি চিত্রিত হয়েছে। যোগেশ্বর-উমার সংসারে আশ্রয় নেওয়া বিনোদিনী প্রথমে আদর্শ গৃহিণীরূপে প্রতিষ্ঠিত হলেও পরবর্তীকালে যোগেশ্বরের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে; গর্ভধারণ, ভ্রূণনাশ এবং শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে উপন্যাসটির সমাপ্তি ঘটে। এই উপন্যাস প্রকাশের পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চোখের বালি’-র সঙ্গে এর সাদৃশ্য নিয়ে সমকালীন সাহিত্যসমাজে বিতর্কের সৃষ্টি হয়; সুরেশচন্দ্র সমাজপতি ‘চোখের বালি’-কে ‘উমা’-র অনুকরণ বলে অভিহিত করেন। অন্যদিকে চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায় ‘বঙ্গদর্শন’-এ পাঁচকড়ির রচনাকে ‘পাপচিত্র’ অঙ্কনের অভিযোগে সমালোচনা করেন।
সামগ্রিকভাবে উনিশ শতকের বাংলা উপন্যাসে বিধবা জীবনের উপস্থাপনা পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, এই সাহিত্যধারা কেবল নারীর ব্যক্তিগত বেদনার কাহিনি নয়; বরং সমাজসংস্কার, মানবিক মূল্যবোধ এবং রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ বৌদ্ধিক সংগ্রামের দলিল। একদিকে প্রগতিশীল মনীষীরা সমাজকে পরিবর্তনের পথে এগিয়ে নিতে সচেষ্ট হয়েছেন, অন্যদিকে রক্ষণশীল শক্তি সেই পরিবর্তনের বিরোধিতা করেছে। এই দ্বন্দ্ব ও বিতর্কের মধ্য দিয়েই বাংলা সমাজ ধীরে ধীরে মধ্যযুগীয় কুসংস্কার অতিক্রম করে আধুনিকতার পথে অগ্রসর হয়েছে। এই নবযাত্রার পেছনে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পাশাপাশি অসংখ্য স্বল্পপরিচিত সমাজসংস্কারক, সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদের সম্মিলিত অবদান সমানভাবে স্মরণীয়।
তথ্যসূত্র:
১. ড. দিলীপ কুমার মিত্র, ‘বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ পরিচয়’, দিশারী প্রকাশনী, ৫ বি কলেজ রো, কলকাতা – ৭০০০০৯, জানুয়ারি,২০১৩ ,(তৃতীয় সংস্করণ), পৃষ্ঠা: ২০৭
২. তদেব, পৃষ্ঠা: ২১১
৩. ড. সুশীল ভট্টাচার্য, ‘বাংলা উপন্যাসের ক্রমবিকাশ’, সাহিত্যশ্রী,৭৩ মহাত্মা গান্ধী রোড, কলকাতা – ৭০০০০৯, ডিসেম্বর,২০১৮, পৃষ্ঠা: ৬১-৬২
৪. ক্ষেত্র গুপ্ত, ‘বাংলা উপন্যাসের ধারা ‘, পৃষ্ঠা; ১০৮-১০৯
৫ . ঈশ্বর গুপ্ত, ‘কৌলিন্য’, https://www.bangla-kobita.com/ishwarchandragupta/koulinyo/
৬ .বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ‘সাম্য’ , ‘বঙ্গদর্শন’, ১৮৭৯
৭. অঞ্জলি বসু (সম্পাদনা),’সংসদ বাঙালি চরিত অভিধানন’ ১ম খন্ড, আগস্ট ২০১৬, পৃষ্ঠা : ৬১০
৮. যোগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়,’প্রিয়ংবদা’ বা ‘প্রেম প্রতিমা’, দ্বাবিংশ পরিচ্ছদ, ১৮৯০
সহায়ক গ্রন্থ ও পত্রপত্রিকা:
১. গোপাল হালদার( সম্পাদক), ‘বঙ্কিম রচনা সংগ্রহ’, উপন্যাস খণ্ড, সাক্ষরতা প্রকাশক, পশ্চিমবঙ্গ নিরক্ষরতা দূরীকরণ সমিতি,১৯৭৪
২. অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য,’বঙ্কিম উপন্যাসে নারী: পুনর্বিচার ‘,
‘দেশ’, ১৭ ভাদ্র, ১৩৯৬ বঙ্গাব্দ, ২ সেপ্টেম্বর ১৯৮১,
৫৬ বর্ষ, ৪৪ সংখ্যা
৩.যোগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়,’বিষবৃক্ষ’, ‘আর্য দর্শন’, ১৮৭৭
৪. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ‘মৃণালিনী’ উপন্যাস
৫. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,’গীতবিতান’, বিশ্বভারতী, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
৬.বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ‘মৃণালিনী’ উপন্যাস
৭.পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,’শৈশব সহচরী’,‘বঙ্গদর্শন’ ১২৮২ বঙ্গাব্দ
৮. Sisir Kumar Das, ‘A History of the Indian Literature 1800-1900’,Sahitya Akadami,New Delhi, 1991
৯. ‘দুই ভগ্নী’, দামোদর মুখোপাধ্যায়,পাঞ্চজন্য,এইচ.এম. মুখার্জি এন্ড কোং, ১৩৩৯ বঙ্গাব্দ।
১০.শর্মিষ্ঠা সেন, ‘বাংলা সাহিত্যে বিধবা চিত্রণ’,পুস্তক বিপণি, ২০০৭, পৃষ্ঠা: ১৭৭




