একজন সাহিত্যিকের সাহিত্যকর্মের মধ্যে তার ইতিহাস চেতনাকে নির্দেশ করার আগে কয়েকটি বিষয় বুঝে নেওয়ার প্রয়োজন আছে। ইতিহাস ও সাহিত্যের মধ্যে সম্পর্কটি সঠিকভাবে কি? তা একটু আলোচনার দাবি রাখে।
ইতিহাস ও সাহিত্যের কাজই হলো সময়কে নিয়ে। সময়ের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ ও বিবেচনা করেন একজন ঐতিহাসিক, সেক্ষেত্রে তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীন। এই স্বাধীনতার ফলে অনেক সময় ঐতিহাসিকের নিজস্ব মতামত দিয়ে ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এ কথা ঠিক যে সময় এবং সময়ের চরিত্র ধরা পড়ে সাহিত্যিকের কলমে, মননে ও সৃষ্টিতে। সেই দিক থেকে সাহিত্য পরোক্ষে বা কোথাও কোথাও প্রত্যক্ষে সময়ের দলিল হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে ইতিহাস বলতে যদি আমরা শুধুই রাজ-রাজড়ার কাহিনী, রাজ্য জয় -বিজয় -পরাজয়ের কাহিনীকেই ধরে নিই তবে ভুল হবে। এই সমাজের মূল সভ্যতার বয়ে চলার নানান দিক ও বিষয়ই ইতিহাসের অঙ্গীভূত—তা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশ, মানুষের আচার-আচরণ, মানুষের মানসিক অবস্থার বিবর্তন, শিক্ষা, খেলাধুলা, পোশাক -পরিচ্ছদ, খাদ্যাভ্যাস, লোভ লালসা, ক্রোধ- উন্মুক্ততা, যৌনতা সব কিছুই ইতিহাসের মধ্যে পড়ে। “আসলে বর্তমানের মানসিকতা থেকে সম্পূর্ণ সরে না গেলে সাহিত্যে ইতিহাস আসে না। যদি সাহিত্যিক অন্য যুগের মনকে তার রচনায় ধরতে পারেন, পাঠক যদি সেই মনকে পৃথক বলে চিনতে পারেন, কিন্তু স্বাভাবিক বলে মানতে পারেন, তাহলেই সেই সাহিত্য নিঃসন্দেহে ইতিহাস ধর্মী।” (১)
মনে রাখতেই হবে সময়ের বীক্ষণে যেকোনো রচনাই সেই সময়কার ইতিহাস। ইতিহাস যেমন মানুষ সভ্যতার বিবর্তনের ধারাকে বুঝতে চায়, বিশ্লেষণ করতে চায় ঠিক তেমনভাবেই সাহিত্যের মধ্যেও আমরা সেই সময়কার সমাজের দর্শন ও মানুষের জীবন যাপন চিত্রের চলন ও ধরণকে বোঝার চেষ্টা করি। রাজা-রাজরার কাহিনী, তাদের অস্ত্রের ঝলকানিকে রবীন্দ্রনাথ কখনোই ইতিহাস বলে মনে করেন নি পরবর্তীকালে কিছু ঐতিহাসিক’সাব অল্টারনের’ নামে শুধুই মাত্র নিম্নবর্গীয়দের ইতিহাস রচনায় নিমগ্ন হন। এই ইতিহাস চর্চ খুব প্রাসঙ্গিক এবং প্রয়োজনীয় কিন্তু সামগ্রিক নয়। ইতিহাস হল একটা জাতির বা মানব সভ্যতার সামগ্রিক ইতিহাস যাকে আমরা বলি Total history. তাই বলে নিম্নবর্গীয় ইতিহাস চর্চাকে কোন মতে কিন্তু বরবাদ করছি না।” রবীন্দ্রনাথ যে ইতিহাসকে ইতিহাস বলতে চাননি সম্ভবত সেই ইতিহাস প্রকৃত ইতিহাস ছিল না বলেই। কারণ সে ইতিহাস ছিল শুধু রাজার রাজরার বর্ণময় স্বর্ণ ছটার ফেনবুদবুদাকার, নিম্নবর্গের গণচেতনাকে আত্মদান, প্রতিবাদকে করা হয়েছিল আড়াল, নিম্নবর্গের সংগ্রাম ছিল দ্বিমুখী সংগ্রাম।
এক. ঔপনিবেশিক শাসক শ্রেণী বিরুদ্ধে, দুই. দেশীয় জমিদার মহাজন যোদ্ধা শ্রেণীর বিরুদ্ধে। সাহিত্যে কিন্তু ইতিহাসের মতো আড়াল করার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায় না। বহু সাহিত্যেই নিম্নবর্গের জীবনচর্চা, সংগ্রামকে তুলে ধরা হয়েছে সাহিত্যের চিরাচরিত রসবারিধারা সহযোগে ফলে পাঠকরা পেয়েছে রসাস্বাদনের সুযোগ। একই ঘটনা রসসিঞ্চনে হয়ে উঠেছে সাহিত্য অপরদিকে রস বিয়োজনে ইতিহাস।” (২)
ঠিক এই দৃষ্টিভঙ্গিতেই আমরা মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্য রচনায় তার ইতিহাস চেতনার সন্ধানে প্রবৃত্ত হবে। একজন সাহিত্যিক তার সাহিত্যে মানুষ এবং সমাজকে কেমন ভাবে তুলে ধরবেন তা নির্ভর করে তার মানসিক গঠন অন্তর্দৃষ্টি অনুভব ও জীবনবীক্ষার উপর। মহাশ্বেতা দেবী বাংলা সাহিত্য জগতে এক অনন্ত পথের পথিক। সৃষ্টির মধ্যে আমরা শুধু নির্ভেজাল নিরীহ সাহিত্যের রস ও বারিধারা খুঁজলে ভুল করব। তিনি একজন ঐতিহাসিকের মতোই তাঁর সাহিত্যে মানুষ ও সমাজকে নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করেছেন এবং আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন।তিনি নিজে তাঁর সাহিত্য কর্মকে বিশ্লেষণ করেছেন নিম্নলিখিতভাবে, “লেখায় আমি আপাত ঘটনাকে বিশ্লেষণ করায়, বিচার করায়, সময়কে দলিলী করণে বিশ্বাস করি। কেননা একমাত্র সেভাবেই আমার মতে উত্তরণ সম্ভব আরও মুক্ত ও স্বচ্ছন্দ, কোনো আকাশে। আমি বিশ্বাস করি গণ ও জনজীবন আশ্রিত জীবনচর্যায়। ইতিহাস চর্চা আমার মতে সাহিত্য স্রষ্টার পক্ষে আবশ্যিক।” (৩)
উপরের বক্তব্য থেকে আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে মহাশ্বেতা দেবীর ইতিহাস বোধ ছিল প্রখর এবং বাস্তবিক, ফলে একথা বললে খুব একটা অত্যুক্তি হবে না যে তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির প্রেরণাভূমি ছিল ইতিহাসের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ এবং তিনি তাঁর রচনা সম্ভারকে ইতিহাসেরই দলিলে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। কারণ তিনি সময়কে ধরতে চেয়েছিলেন তাঁর সাহিত্যে, যার জন্য পবিত্র স্বীকারোক্তিও উচ্চারিত হলো’ … সময়কে দলিলী করণে বিশ্বাস করি’।
মহাশ্বেতা দেবীর গল্প উপন্যাস নিয়ে আলোচনার আগে বিখ্যাত ঐতিহাসিক রোমিলা থাপারের একটি দীর্ঘ উদ্ধৃতি উপস্থাপন করব বিষয়টিকে সূত্রায়িত করার জন্য। বিভিন্ন আখ্যান কিভাবে ইতিহাসের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে অথবা এই আখ্যান ও ইতিহাস কিভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এবং এই সূত্রের উপর দাঁড়িয়েই থাকে মহাশ্বেতার গল্পগুলি যেখানে মানুষের জীবন চর্যা ও বিশ্বাসের মধ্যে দিয়ে এক সামাগ্রিক ইতিহাস প্রতিবিম্বিত হয়ে ওঠে এবং ভবিষ্যৎ ইতিহাসকারদের উপাদানে পরিণত হয়। রোমিলা থাপার বলেন, “ইতিহাসের লিখনের সাথে সাহিত্যের একটা অবিরাম সংযোগ তথা আদান-প্রদান রয়েছে। অতীত ঘটনাবলি সংক্রান্ত তথ্য আহরণের জন্য ঐতিহাসিকরা সাহিত্য-মন্থন করেন এবং বক্তব্যকে অন্যান্য প্রমাণাদির সাথে মিলিয়ে নেন। এই প্রক্রিয়াটা নিতান্তই বৈধ। তথাপি আমার মতে, এই সংযোগটি আরো প্রখর করা প্রয়োজন। সাহিত্য ও ইতিহাসের এই সংযুক্তি যে ঐতিহাসিক দৃষ্টিপটকে মেলে ধরে বিভিন্ন আখ্যানের অধ্যয়নের মাধ্যমে তারও অনুসন্ধান একান্ত জরুরি। … কিন্তু সাহিত্য ও ইতিহাসের এই সম্পর্কটি কেবল একটি সংযোগ মাত্র নয় এরই মাধ্যমে আমরা আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সন্ধান পাই। শকুন্তলার আখ্যানটি একটি লিঙ্গ বৈষম্য ভিত্তিক দৃষ্টিকোণের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে, যেখানে একই চরিত্র বহু বিচিত্র রূপে উপস্থাপিত। এই প্রতিবেদনগুলিই কি সেই ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন? তাহলে কি মনে হয় না যে, দৃষ্টিভঙ্গির তারতম্য গুলি অনুধাবনের জন্যই তাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতের সাথে আমাদের পরিচিত হওয়া একান্ত জরুরি?” (৪)
আধুনিক যুগে মহাশ্বেতার কলমে উঠে আসে এই ভয়ংকর সমাজের এক নীরব যন্ত্রণার ইতিহাস তাঁর ‘স্তনদায়িনী’ গল্পে। এই গল্পে প্রান্ত নারীর অন্তর্জীবনের চিত্র ও সমকালীন সময়ের ও সমাজের ইতিহাসটা নির্মম ও অত্যন্ত কঠোর সত্যের মধ্য দিয়ে দলিলীভুক্ত হয়ে পড়ে। এই গল্পে দেখি গল্পের নায়িকা যশোদা পেটের দায়ে হালদার বাড়ির ছেলেদের ‘দুধ মা’ হয়ে যায়। পরিবর্তে অর্থ উপার্জনের একটা পথ সে খুঁজে পায় এই পেশাটিকে টিঁকিয়ে রাখার জন্য সে প্রতিবছর সন্তান ধারণ করে তার স্তন দুটিকে দুধে ভরে রাখে—সংসার বাঁচাতে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য পেতে সে তার দেহকে পণ্যরূপে গড়ে তোলে। তার বুকের সুধারস দিয়ে বড়লোকের সন্তান ও নিজের সন্তানদের বাঁচিয়েছে। অথচ যাদের সে বাঁচিয়েছে তারাই একদিন তাকে অবজ্ঞা ও অবহেলার আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে ফেলেছে। তার শরীরে মরণ রোগ ক্যান্সার দানা বাঁধলে সে নিঃসঙ্গ, নিঃস্ব হয়ে মারা যায় এবং তাকে কেউ দাহ করতে আসে না। শ্মশানের ডোমরা তাকে দাহ করে। এ গল্প এখানেই শেষ। কিন্তু এই গল্পে যা বলা হলো তা সামাজিক ইতিহাসের একটি নির্মম ও নির্মোহ দলিল ছাড়া আর কিছুই নয়। মহাশ্বেতার কাছে ইতিহাস দলিলসম। পশ্চিমবঙ্গে নকশাল পন্থী আন্দোলন ও গণহত্যার যে রাজনীতি চলছিল তাকেও তিনি তাঁর গল্পে তুলে এনেছেন ‘অনন্ত খাটুয়া’ ও ‘এপার বাংলা ওপার বাংলা’ গল্প দুটিতে। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লেখেন, “‘হাজার চুরাশির মা’ বইয়ের মধ্যে সেদিনের বিজয়গড়কে ধরে রেখেছি। আমি সময়কে দলিলী করণে বিশ্বাসী। সে ও ছিল ইতিহাস। আর ইতিহাসে আমার কাছে প্রধান ও মুখ্য। সে যে ইতিহাস তা ভুলে যায় আজকের বিজয়গড়। সেদিনের ‘লাশ ফেলা মাঠ ‘আজকের গল্ফগ্রীন” শুধু তাই নয় ‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাসে সাঁওতাল বিদ্রোহের ও জনজীবনের, জীবন সংগ্রামের ইতিহাস রেখে গেছেন তিনি।
তিনি ভারতবর্ষকে জানতে চেয়েছিলেন। এই ভারতের অধিকাংশ মানুষই তো বঞ্চিতের দলে। সেই বঞ্চিতদের জগতকে, যাদের ভাষা থেকেও নেই— সেই ভাষাহীন সমাজকেই তিনি ধরতে চেয়েছেন তার গল্প উপন্যাসে এবং তাদের অবহেলিত, বঞ্চিত, দুর্দশাগ্রস্ত জীবনের ইতিহাসকেই দলিলীকরণ করতে চেয়েছেন তিনি আজীবন। তাই তিনি বলেন, “আমার লেখার মধ্যে নিশ্চয় বারবার ফিরে আসে সমাজের সেই অংশ, যাকে আমি বলি The voiceless Indian Society. এই অংশ শুধু নিরক্ষর স্বল্প সাক্ষর ও অনুন্নত শুধু নয় মূল স্রোতের থেকে এরা বড়ই বিচ্ছিন্ন। অথচ ভারতীয় সমাজের এই অংশকে না জানলে ভারতকে জানা যায় না।” (৫)
ভারতীয় ইতিহাস চর্চার মূলধারায় এই অংশের মানুষরা থেকে গেছেন অন্তরালে এবং চর্চাহীন। ঈদের ইতিহাসে কোন স্বীকৃতি নেই। তাই ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে বলেন, “ভারতীয় সভ্যতা ও ভারতের ইতিহাস আজ পর্যন্ত আদিবাসীদের এবং সেই সঙ্গে জনসাধারণের ইতিহাসকেও স্বীকৃতি দেয়নি। ইতিহাসের কাছে ছোট বড় নেই। ইতিহাসে লেখা হয় সমাজের দেশের ঘটনা ও কাহিনী। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত যেসব জাতি অনুন্নত জাতি বলে গণ্য হচ্ছে, তাদের কথা তারা লিখলেন না। বরং স্পষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয়, যারা বন-জঙ্গলের বাঘ ভাল্লুক তাড়িয়ে তৈরি করল দেশ, বন জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে তৈরি করল জমি জায়গা, চাষাবাদ করল, মাটি খুঁড়ে বের করল সোনা রুপা, তার স্বীকৃতি তো পেলই না বরং ইতিহাসে পরিচিত হল বর্বর জাতি বলে।”(৬)
যেকোনো শ্রেণি বিভক্ত সমাজে আধিপত্যকারী ও শক্তিশালী শ্রেণিই দেশের ইতিহাসকে পরিচালিত করে। ভারতের মতো শ্রেণী বিভক্তির সাথে সাথে বর্ণ ভিত্তিক সমাজে তো আধিপত্যবাদীদের আরো রমরমা। তাদের রচিত ইতিহাসে সর্বদা মান্যতা পেয়ে এসেছে এদেশে। তারাই ইতিহাস নির্মাণ করেছে নিজেদের মতো করেই। তারাই ঠিক করে ইতিহাসে কাদের অংশ কতটা থাকবে, কারা বাদ যাবে, সবকিছু। “ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি ফলে যে বহিরাগত আর্য আক্রমণ আদিবাসী জনজাতি একদিন বনবাসী হতে বাধ্য হয়েছিল তাদের উত্তর পুরুষরাই উপনিবেশিক কায়দায় আজও আদিবাসীদের মূল শাসনব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। …সাহিত্য প্রসঙ্গের আলোচনাতে একই কথা বলা যায়। মূল ধারার ইতিহাস যখন কোন জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি ও বিকাশকে অস্বীকার ক’রে তাকে রুদ্ধ করে রাখে তখন সাহিত্যেও তার প্রভাব থেকে যেতে বাধ্য। ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যের ক্ষেত্রে যেমন এটা সত্য তেমনি বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ছবিটা অন্যরকম হয়ে ওঠেনি। ফলে সঠিকভাবে বলতে গেলে শার্টের দশকেই বাংলা সাহিত্যে আদিবাসী মূল বাসী সমাজের প্রতি চলতে থাকা অবহেলা উদাসীনতার ছবিটা পাল্টাতে শুরু করে। বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক’ এর পর নিজের সৃজনীকলমে আদিবাসী সমাজ জীবনের কথা বিশেষ গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেন মহাশ্বেতা দেবী। … মহাশ্বেতা দেবীর গল্প উপন্যাস প্রভৃতি সৃজনশীল রচনায় আদিবাসী সমাজ জীবন, সংগ্রাম, ইতিহাস, সংস্কৃতি, পুরান কথা, ধর্মীয় প্রথা ইত্যাদি নানা বিষয় তার গভীর পারদর্শী অভিজ্ঞতায় চিত্রিত হয়েছে।” (৭)
এই কারণেই মহাশ্বেতা দেবী ভদ্রলোকের ইতিহাসকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং এক বিকল্প ইতিহাসের পথে হাঁটেন। নিম্নবর্গীয় ইতিহাস চর্চাকে তিনি গুরুত্ব দেন নিম্নবর্গীয় মানুষগুলোকে অন্তর থেকে ভালোবেসেই। এই কারণেই তিনি মহিলাদের কাছে ‘মারংদাই’ অর্থাৎ বউদি হয়ে ওঠেন। তিনি এক ভিন্ন ইতিহাস রচনা করেন। তার কাছে সাহিত্যচর্চা হল ইতিহাস নির্মাণেরই নামান্তর। তিনি তার সাহিত্যের মধ্য দিয়েই তার ইতিহাস চর্চাকে শানিত করেন।
সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণি তাঁর কাছে হয়ে উঠেছে হৃদয়ের মানুষ। “তাই তাঁর সাহিত্যে স্থান পায় সেইসব অখ্যাত মানুষেরা যাদের দিকে শিক্ষিত সমাজ কোনদিন ভালো করে ফিরেও তাকায়নি। তথাকথিত শিক্ষিতরা তাদের চোর, বর্বর বলে বিবেচনা করে কিন্তু তাদের সমাজের মূল খাতে ফিরিয়ে আনতে প্রয়াসী হতে দেখা যায় না। এই মন্ত্রহীন মানুষদের সঠিক পথ দেখাতে মহাশ্বেতা বারবার কলম ধরেন।” (৮)
তাঁর সাহিত্য সৃষ্টিই ছিল এক বিকল্প ইতিহাস ধারার রচনা। শ্রেণী ও বর্ণ ভিত্তিক ভারতীয় সমাজে প্রান্তিক মানুষের অবস্থান, তাদের দুঃখ-কান্না-হতাশা, সর্বোপরি অত্যাচারিত হতে হতে রুখে দাঁড়ানোর ইতিহাস, অন্ত্যজ ও আদিবাসী নারীদের বহু কৌণিক দুঃখ- বেদনা- অত্যাচারের ছবি এবং তাকে অতিক্রম করে এক মহান জীবনের দিকে যে যাত্রা তার ইতিহাসই লিখে গেছেন মহাশ্বেতা দেবী তাঁর বিভিন্ন গল্প ও উপন্যাসে।
তাঁর সৃষ্ট “হুল মাহার মা” নামক গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র এক মহিলা মহনি। মহনি এক অনৈতিহাসিক চরিত্র। কিন্তু তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই ঐতিহাসিক। আসলে মহাশ্বেতা দেবী ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এই চরিত্রকে স্থাপন করেছেন। ১৮ শতকের প্রথম পর্বের বৃহৎ সাঁওতাল পরগনার অধিবাসীদের জীবন ও সংগ্রামের এক ইতিহাস মূর্ত হয়ে ওঠে এই গল্পে। তাই অনৈতিহাসিক চরিত্র হয়েও যেন সত্যিকারের এক ঐতিহাসিক ‘হুল মাহার মা’ বিদ্রোহের মা হয়ে ওঠে মহনি। একজন গবেষক লেখেন, “ইতিহাস নির্ভর এই সৃজনশীল রচনায় যা স্পষ্ট ভাবে উঠে এসেছে তা হল ১৮৫৫ ও তার পূর্ববর্তী সময়ে আদিবাসী নারীদের বিদ্রোহী চেতনা কিভাবে গড়ে উঠেছিল, কিভাবে তা সমগ্র সমাজকে প্রভাবিত করেছিল এবং মহান সাঁওতাল বিদ্রোহে আদিবাসী নারীদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল।” (৯)
বিপুল সাহিত্য নিয়ে এখানে আলোচনা সম্ভব না। কয়েকটি গল্প বা উপন্যাসের ঐতিহাসিকতা নিয়েই আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ। তাঁর সাহিত্যের মূল্যায়ন কিন্তু এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। শুধুমাত্র তার রচনায় ইতিহাস সচেতনতাটাই আমরা দেখছি। যাইহোক, মহাশ্বেতা দেবীর আরেক মহান সৃষ্টি ‘দ্রৌপদী’ গল্পটি। এই গল্পটির প্রেক্ষাপট ১৯৭০ এর পরবর্তী সময়কাল। স্বাধীনতার পর দরিদ্র, অন্ত্যজ, অধিকারহীন, বঞ্চিত মানুষের উপর চতুর্মুখী আক্রমণে সামিল হয়েছিল জোতদার, জমিদার, মধ্যস্বত্বভোগী দালাল, পুলিশ প্রশাসন সবাই। গণ আন্দোলন সংগঠিত হয়। সেই আন্দোলন সশস্ত্রও ছিল। এই সশস্ত্র আন্দোলন নকশাল দলের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে এবং তাতে নির্দ্বিধায় অন্ত্যজ আদিবাসী মানুষেরা অংশগ্রহণ করে। জোতদার ও সুদখোর এলাকার লম্পট মহাজন সূর্যসাউ এর বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ ও প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠে তাতে নেতৃত্ব দেয় দুলনা মাঝি ও তার স্ত্রী দ্রৌপদী মাঝি। ইতিহাসের এক বিশ্বস্ত দলিল হয়ে উঠেছে এই গল্পটি। বিপ্লবী দ্রৌপদীর চরিত্র এক বহুমাত্রিক রূপে প্রকাশ পেয়েছে এই গল্পে।
এক গভীরতম ইতিহাসবোধ ও চেতনাই মহাশ্বেতা দেবীকে দিয়ে সাহিত্য রচনা করিয়ে নিয়েছিল। শুধু অন্তজ্য শ্রেণীই নয়, তাঁর বিভিন্ন গল্প উপন্যাস রচনার প্রেক্ষাপট ইতিহাস, এবং শুধুই ইতিহাস।
তিনি তাঁর কয়েকটি লেখা সম্পর্কে বলেন, ” ইতিহাস, ইতিহাসই আমার কাছে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে চিরকাল। এখন যে পাঠক সমালোচক আমাকে আবিষ্কার করেন ‘ হাজার চুরাশির মা ‘ থেকে, তাঁদের সবিনয়ে বলি, আমার লেখার প্রথম থেকে সত্তরের দশকের লেখালেখির আগের পর্যায় অবধি পরিচয় তাঁদের নেই। থাকলে তাঁরা দেখতেন জনেতিহাসের লোকগাথা, লোককথা এসবের ধূসর পথ ধরে এক পথ সন্ধানীর অবিরাম পথ চলা।…. “অমৃত সঞ্চয়” বইয়ের মতো গুরুত্ব দিই “আঁধার মানিক” বইকে। ইতিহাস পড়ে বুঝেছিলাম। ১৭৪০ থেকে বারবার মারাঠা আক্রমণ বা বর্গিহানা না ঘটলে বাংলার রাজনীতি এত প্রভাবিত হতো না; বাংলা থেকে দিকে ঘটতো না মানুষের পলায়ন আলীবর্দী বর্গী ঠেকাতে ব্যস্ত এবং বর্গিরা ঘোড়ায় চড়ে যে নদী পেরোতে পারত না সে নদী পেরিয়ে হানা দিত না বলেই কলকাতা নগরী ক্রমে জনসংখ্যা বেড়ে শক্তিশালী হয়েছিল; আলিবর্দী দৌহিত্র সিরাজকে দত্তক নেন এবং উত্তরাধিকারী করেন, ফলে রাজ বৃত্তে গন্ডগোল, বণিক বৃত্তে ক্ষমতার লড়াই, গণবৃত্তে প্রচন্ড অত্যাচার এত সব কিছু যোগাযোগ হয়েছিল বলেই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শক্তিমান হয়। জার্মান, পর্তুগিজ, ডাচ ও ফরাসী ইন্ডিয়া কোম্পানিগুলি হয় হীনবল এবং বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ড হবার পথ সুগম হয়। এটাও ঘটনা যে ইংল্যান্ড স্থিত কোম্পানির ডাইরেক্টরেটদের আগে নির্দেশ ছিল যে ভারতে কোম্পানি ব্যবসা করবে, জমি মালিকানায় যাবে না।
“আঁধার মানিক” উপন্যাসে এই চিত্র, বিশেষ কলকাতায় শিক্ষেচ্ছু ,বাঙালির এক শ্রেণী গড়ে ওঠে, এর সবই ইঙ্গিত আছে। তথাকথিত ‘নবজাগরণ’ এর অংকুর সূচনার ইঙ্গিত আছে। এর জন্য প্রচলিত ইতিহাসের বাইরে গঙ্গারামের ‘মহারাষ্ট্র পুরাণ’, মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামের ‘চৌধুরী বংশাবলী চরিত’ (বাংলা লিপিতে ওড়িশা ভাষায় লেখা) এসবই ব্যবহার করেছিলাম।” (১০)
উপরের দীর্ঘ উদ্ধৃতি পাঠ করলে মনে হবে এ যেন এক গভীর মনোযোগী ঐতিহাসিকের ইতিহাস নির্মাণের ইতিহাস। আসলে ইতিহাসকে তিনি এভাবেই সাহিত্য নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন। তাঁর কাছে সাহিত্য রচনা ভবনটি ইতিহাসের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ কারণেই মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চন্ডীমঙ্গল’এবং অন্যদিকে ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ প্রভৃতি আকর গ্রন্থ ব্যবহার করে লেখেন ‘কবি বন্দ্যঘন্টী গঞির জীবন ও মৃত্যু’। নীহার রঞ্জন রায়ের ‘বাঙালির ইতিহাস’ ও দুর্গা নাথ সান্যালের ‘বাঙ্গালার সামাজিক ইতিহাস” পড়ে তিনি ‘রোমথা’ কাহিনীটি লেখেন। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটেই তিনি অসংখ্য ছোট গল্প লেখেন অন্তজ্য শ্রেণিকে নিয়ে। আদিবাসী ও অন্ত্যজ শ্রেণির জীবন যাপনকে নিয়ে যে ছোট গল্পগুলি লেখেন তা কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ হয়ে প্রকাশিত হয়। যেমন ‘শালগিরার ডাকে’, ‘ হরিরাম মাহাতো’, ‘ইটের পরে ইট’ ‘সিধু কানুর ডাকে’ প্রভৃতি।” এই কারণেই তাঁর একাধিক লেখা হয়ে উঠেছে অন্ত্যজ শ্রেণির ঐতিহাসিক দলিল। ইতিহাসের সমান্তরালে তিনি রচনা করেছেন জনবৃত্ত অন্বেষণের বিকল্প ইতিহাস। আর এই ইতিহাসের ভেতরেই সুপ্ত থাকে সমাজনীতি, অর্থনীতি এবং তার আনুষাঙ্গিক আচার-আচরণ, সংস্কৃতি, দেশজ জীবন ব্যবস্থা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি অন্তেবাসীদের সংগ্রামের মানসিক চেতনার বিকাশ ঘটাতেই বিকল্প এক ইতিহাসের উন্মোচন করেছেন।” (১১)
শুধু অন্ত্যজ শ্রেণিকে নিয়েই যে তিনি তাঁর সাহিত্য রচনার ডালিটি সাজিয়েছেন তা কিন্তু নয়। আপাদমস্তক ইতিহাস সচেতন মহাশ্বেতা দেবী ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিনিধিদের, জীবনের বহুকৌণিক অবস্থান এবং মানুষের বিচিত্র বর্ণময় ও অন্ধকারময় জীবনেতিহাস রচনা করেছেন।
আসলে তিনি তাঁর সাহিত্য রচনার মধ্য দিয়ে সমান্তরাল ভাবে একটি বিকল্প ও সৎ ইতিহাস চর্চা করে গেছেন। যে ইতিহাস চর্চায় আমরা খুঁজে পাই ভারতীয় অন্ত্যজ শ্রেণির এক বিপন্নতার বিশ্বস্ত দলিল এবং সাহিত্য রচনার আধারে স্থানীয় ইতিহাস নির্মানের এক আশ্চর্য নব কৌশল। ইতিহাস ও সাহিত্য যদি পরস্পর নির্ভরশীল হয় বা সাহিত্য যদি ইতিহাস নির্মাণের এক পদ্ধতি হয় তবে নিশ্চিত ভাবে বলা যায় যে মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্য সম্ভার একদিন অন্ত্যজ শ্রেণির প্রকৃত ইতিহাস নির্মাণে এক শক্তিশালী উপকরণ হিসেবে চিহ্নিত হবে । শুধু তাই নয়, জাত-পাত লাঞ্ছিত ও শ্রেণি বিভক্ত ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার ,রাস্ট্রীয় ব্যবস্থার এক বিশ্বাসযোগ্য দলিল ও উপকরণ হয়ে থাকবে তাঁর রচিত সাহিত্য সমূহ ভবিষ্যতে এক নির্মোহ ইতিহাস নির্মাণের জন্য।
সূত্র নির্দেশ:
১) নির্মল বন্দ্যোপাধ্যায়, ইতিহাস চর্চা, কলকাতা, ২০০১ ,পৃষ্ঠা ১৯
২) ইন্দ্রনীল মন্ডল ,তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সমকাল ও ইতিহাস, কলকাতা,২০০৪, পৃষ্ঠা ৪
৩) দেবী মহাশ্বেতা, ‘ভূমিকার পরিবর্তে শ্রেষ্ঠ গল্প, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা, পৃষ্ঠা ৯
৪) রোমিলা থাপার , আখ্যানবলি ও ইতিহাসের নির্মাণ, কলকাতা, ২০০৮, পৃষ্ঠা ১৩-১৪
৫) সোমা মুখোপাধ্যায় ( সম্পা:) মহাশ্বেতা দেবীর নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ গল্প, কলকাতা, ১৯৯৭, পৃষ্ঠা ৭
৬) ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে ,সাঁওতাল গণসংগ্রামের ইতিহাস, কলকাতা, ২০০৩, পৃষ্ঠা -১
৭) সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবীর গল্পে বিদ্রোহী আদিবাসী নারী, চয়নপত্র, (পত্রিকা) শারদীয়া সংখ্যা ,২০২০,(সম্পা:) হর্ষবর্ধন চৌধুরী, কলকাতা ২৮, পৃষ্ঠা ১৪-১৫
৮) ডঃ বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য, প্রেক্ষিত ও প্রেক্ষাপট মহাশ্বেতা দেবীর নির্বাচিত ছোট গল্প, (প্রবন্ধ) International Journal of
Humanities and social science Studies (IJHSss), ISSN- 2349-6711, Vol- 1, Issue -3, Nov’ 2014. P-38
৯) চয়ন পত্রিকা, পূর্বোক্ত।
১০) মহাশ্বেতা দেবী, ‘এক জীবনেই ‘ স্মৃতি কথা সংগ্রহ, ২০১৭, কলকাতা, পৃষ্ঠা ২৪২.
১১) রাজেশ খান ও ড: সুজয় কুমার মন্ডল, মহাশ্বেতা দেবীর ছোট গল্প, অন্ত্যজ ও আদিবাসী সমাজ ও সংস্কৃতির পরিসর: নির্বাচিত গল্প কেন্দ্রিক বিশ্লেষণ, ‘প্রতিধ্বনি’, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল, ISSN-22785264, Vol- 5, Issue – 1, July – 2017, Page -17




