ভারতবর্ষের প্রখ্যাত দার্শনিক ডক্টর সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান একবার বলেছিলেন যে একজন প্রকৃত কবি হবেন দার্শনিক এবং একজন প্রকৃত দার্শনিক হবেন কবি। তিনি মনে করতেন যে একজন কবি যদি দার্শনিক না হতে পারেন তবে তার কোনো মূল্য নেই। রাধাকৃষ্ণান এ কথাগুলোই বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথের কবিতা পাঠ করে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা পাঠ করে তিনি অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। বিশেষ করে তাঁর নিজের জীবন যখন এক কঠিন ও অসময়ের ভিতর দিয়ে চলছিল, তখন নিজের পাঠ্য ও প্রিয় বিষয় দর্শনও তাঁকে শান্তি দিতে পারছিল না। সেই সময় তিনি রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি পাঠ করেন। এই গীতাঞ্জলিই তাঁকে তাঁর সেই মানসিক অবস্থা থেকে মুক্ত করেছিল। তখনও কিন্তু এই দুই প্রতিভার মুখোমুখি সাক্ষাৎ ঘটেনি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়ে রাধাকৃষ্ণান ১৯১৮ সালে ‘ফিলোজফি অব রবীন্দ্রনাথ টেগোর’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ বই লেখেন। সেই সময়কার বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা ম্যাকডুলান কোম্পানি এই বইটি প্রকাশ করে। বইটি প্রকাশ হবার আগে বইটির পাণ্ডুলিপি তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন একটি ভূমিকা লেখার জন্য। সেই বইয়ের পাণ্ডুলিপি এবং চিঠি পেয়ে রবীন্দ্রনাথ রাধাকৃষ্ণানকে লেখেন, “আপনার গ্রন্থের ভূমিকা লেখা অত্যন্ত কঠিন। কারণ এ সম্পর্কে লিখতে হলে আমার যে কী কর্তব্য তা আমি জানি না। পাঠকের পথ করার জন্য যদি আমাকে কিছু লিখতে হয়, তাহলে আমাকে বলতে হয়, সেরকম কিছু করা আমার সাধ্যের অতীত। তবে আমার রচনার দার্শনিক অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছু বলতে হলে আমার অবস্থা গল্পের সেই চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করা যায়, যিনি জানতেন না, সারা জীবন নিজের অজ্ঞাতসারে গদ্যের বদলে পদ্যে কথাই বলে এসেছেন।”
সত্যি কথা বলতে এই গ্রন্থে রাধাকৃষ্ণান যে সহজ-সরল ভাষায় রবীন্দ্রদর্শনের কথা আলোচনা করেছেন, তা তাঁকে বিস্মিত করেছিল। রবীন্দ্রনাথের উপনিষদীয় দর্শন এবং রাধাকৃষ্ণানের বেদান্তদর্শন যেন এক মোহনায় এসে মিলিত হয়েছিল। এ যেন দুই মহাসাগরের মহামিলন। দুই মহান মানবের মধ্যে চিঠিপত্রের মাধ্যমেই যোগাযোগ হতো। ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ মহীশূর যান এবং তখনই দুজনের মধ্যে প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ ঘটে। দুই মহাপুরুষ একে অন্যের সান্নিধ্যে এসে দুজনেই মুগ্ধ হয়েছিলেন। দুজন দুজনকে পরস্পর উজ্জীবিত করেছিলেন। ভারতীয় দর্শন নিয়ে উভয়ের মধ্যে বিভিন্ন আলোচনা ও মত বিনিময় হয়। রাধাকৃষ্ণান রবীন্দ্রনাথকে বলেছিলেন যে ভারতীয় দর্শনের মূল বা সার বক্তব্যই হল সাধারণ মানুষের সঙ্গে দর্শনের অভীক্ষাকে একত্র করা। কিন্তু কিছু মানুষ দর্শনকে নিজেদের কুক্ষিগত করে রাখার জন্য সাধারণ মানুষকে নীরবে দর্শনের জগৎ থেকে বিযুক্ত করে রেখেছেন। এর ফলে তারা দর্শনবিমুখ হয়ে পড়েছেন, যা একটি জাতির চেতনার দীনতাকেই প্রকট করতে সাহায্য করে। রাধাকৃষ্ণানের এই বিশ্লেষণ রবীন্দ্রনাথকে ভীষণভাবে উদ্দীপ্ত করেছিল। তাঁর কাছেও যেন এক বন্ধ দরজা খুলে গেল। এবং সেটা খুলতে সাহায্য করলেন এক তরুণ অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী ও দার্শনিক। তিনি তাঁর অন্তর থেকে উপলব্ধি করলেন যে আধুনিক ভারতে রাধাকৃষ্ণানের মতো তরুণ প্রগতিপন্থী বুদ্ধিজীবী ও দার্শনিকের ভীষণ প্রয়োজন। তবেই ভারতবর্ষে উন্নতি সম্ভব। অন্যদিকে রাধাকৃষ্ণান মনে করতেন যে রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ভারতীয় আত্মার প্রকৃত প্রকাশ ঘটেছে। তাঁর কবিতাই যেন ভারত-আত্মার বাণী। অতএব তাঁর কবিতা পাঠ করলেই একজন পাঠকের ভারতীয় দর্শন সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়ে যাবে।
এরপর ১৯২৫ সালে ইন্ডিয়ান ফিলজফিক্যাল কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন হয় ডক্টর রাধাকৃষ্ণানের উদ্যোগেই। এই অধিবেশনে ডক্টর রাধাকৃষ্ণানের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথকে সভাপতিত্ব করতে হয়। যদিও প্রথমে তিনি রাজি হননি, তবুও এই তরুণ বুদ্ধিজীবীর অনুরোধকে তিনি কোনোমতেই অগ্রাহ্য করতে পারেননি। এইভাবে দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে এক গভীর সখিতা। আলাপ ধীরে ধীরে বন্ধুত্বে পরিণত হয়। কারণ এই দর্শনের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য রবীন্দ্রনাথকে আমন্ত্রণ জানাতে রাধাকৃষ্ণান শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন। সেখানেই রাধাকৃষ্ণান শান্তিনিকেতনে কবির আতিথ্য গ্রহণ করেন এবং দর্শন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে দুই মহান পুরুষের এক বৌদ্ধিক সংযুক্তি ঘটে যায়। ১৯৩৮ সালেও রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে রাধাকৃষ্ণান শান্তিনিকেতনে কবির আতিথ্য গ্রহণ করেন। একটি কথা এখানে না বললেই নয়। কবির যখন শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল না, তখন রাধাকৃষ্ণানের উদ্যোগেই অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে কবিকে সাম্মানিক ডি-লিট উপাধি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কবির পক্ষে তখন কোনোক্রমেই সেখানে যাওয়া সম্ভব ছিল না। এই অবস্থায় রাধাকৃষ্ণান নিজে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রতিনিধি হয়ে শান্তিনিকেতনে এসে কবির হাতে সাম্মানিক ডি-লিট তুলে দেন। এক গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সম্পর্কের জন্যই এটা সম্ভব হয়েছিল।
ডক্টর রাধাকৃষ্ণানের হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ যেন এক আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছিলেন। আমরণ তিনি তাঁর কাছে একজন সত্যদ্রষ্টা ঋষি হয়েই ছিলেন। এর জন্যই তিনি মনে করেন যে রবীন্দ্রনাথ শুধু একজন কবি নন, তিনি আধ্যাত্ম প্রেমী, মানবতাবাদী ও প্রগতিবাদী। এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর কাছে জীবনের ধ্রুবতারা।




