বিশ্বব্যাপী বহুরকম পরিবর্তনের সময়কালে জীবনানন্দ দাশের সাহিত্যসম্ভার প্রচলিত প্রথার বিপরীতে আধুনিক চিন্তাশক্তির প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। বাংলা সাহিত্যের অগ্রগণ্য কবি, কথাসাহিত্যিক জীবনানন্দ দাশ (১৭.০২.১৮৯৯—২২.১০.১৯৫৪)। তাঁর ভাবনার বিচিত্র দিক, তাঁর লেখা ‘আধুনিক সাহিত্য’ নামক একটি প্রবন্ধ ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকায় (মাঘ, ১৩৫৫ বঙ্গাব্দ, ১৯৪৮) প্রকাশিত হয়। সেখানে আলোচনা করতে গিয়ে তুলনামূলকভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অদ্রে জিদের প্রসঙ্গ এসেছে। বিশেষ করে জিদের নানামুখী বিশ্লেষণে আনাতোল ফ্রাঁস, রোলাঁ, নীটশে, ব্রাউনিং, ডস্টয়েভস্কি, ব্লেক, স্যঁতভব প্রমুখের বিষয়টি প্রাসঙ্গিক করে উত্থাপন করেছেন। বিশ্বসাহিত্যের দিকপালদের নিয়ে আলোচনায় তাঁর প্রখর দৃষ্টিভঙ্গি উন্মোচিত হয়। একজন সাহিত্যিককে জ্ঞানবিজ্ঞান, রাজনীতি, সামাজিক বিজ্ঞান, ইতিহাস, ঐতিহ্য, অর্থনীতি, পুরাণ সম্পর্ক গভীর পাঠ থাকতেও হয়। ‘The Journal of Andre Gide, Vol. 1914–1927’ নিয়ে আলোচনায় জীবনানন্দের জ্ঞান ও পাঠের পরিধি কতটা বিস্তৃত ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকি জীবনানন্দের ‘Doctor Faustus: A Novel by Thomas Mann’ নিয়ে যে আলোচনাটা পড়ে অভিভূত হতেই হবে। ‘এ ধরনের আলোচনাসাচ্ছল্যের কথা আমি উল্লেখ করতাম না, কিন্তু গ্যেটের ফাউস্ট সম্বন্ধে এখনও অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। গ্যেটেই প্রথম ফাউস্টীয় বেদ এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে আজকের মানুষের আশা অন্ধকার সংকট সংকল্পকে নিজের বোধির বলে ধারণা করতে পেরেছিলেন এত দূর পর্যন্ত যে ফাউস্টের ভিতর নব পর্যায়ের সৎ সাহিত্যপর জন্ম হ’ল, শেক্সপীয়ারের ট্রাজেডিগুলোকে অতিক্রম ক’রে নয় অবশ্যি, সেগুলোকেও ধ্যান ক’রে—কিন্তু তবুও নিজের বিশেষ ও বহুল নতুন আলোর প্রসাদে।’ (সমালোচনা, চতুরঙ্গ, একাদশ বর্ষ)।
জীবনানন্দ দাশ বাংলার প্রতিভাধর কবি এবং জীবনের বাঁকও ব্যতিক্রম মনে হয়েছে। পাশ্চাত্য সাহিত্যের উপর কবির অগাধ পাঠ ও পাণ্ডিত্য ছিল। এজন্য কবি বলতে পারেন, ‘আগাগোড়া বাংলা কাব্যের সঙ্গে আত্মীয়তাবোধই সব চেয়ে আগে এবং সর্বদাই দরকারি; কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দরকার ও-দেশের বিশেষত ইংরেজি ও ফরাসি কবিতার মর্ম হাড়ের ভেতর বোধ করবার শক্তি। সেটা যত বেশি সম্ভব হবে বর্তমান বাংলা কাব্য রচনার হেতু ও সার্থকতা তত বেশি স্পষ্ট হতে থাকবে মনে হয়।’ (১৩৬০, চতুরঙ্গ, পঞ্চদশ বর্ষ)।
বিশ্বসাহিত্যে আধুনিকতার ধারা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’, ভার্জিনিয়া উল্ফের ‘মিসেস ডালওয়ে’, টি. এস. এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্টল্যান্ডে’। আরও যাঁরা সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁরা হলেন ফ্রাঞ্জ কাফকা, ডব্লিউ. বি. ইয়েটস, হেনরি জেমস, জোসেফ কনরাড বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তাহলে আধুনিকতাবাদ কী? বিশ শতকের শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে জনগণ নগরসমাজে আবাসন গড়ে তোলে। যা জীবনের ধারাবাহিক ধারাকে বিচ্ছিন্ন করে। নব অভিব্যক্তির নবরূপে অতীতের সাথে বিচ্ছেদ ঘটায়। যাকে আধুনিকতাবাদ বলা হয়। যা ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তন, সংশয়ের সময়কালে শিল্পী সাহিত্যিক চিন্তকদের বিভিন্ন ধরনের নিরীক্ষা লক্ষ্য করা যায়। অর্থনীতিতে কার্ল মার্কস, এঙ্গেলস, সমাজবিজ্ঞানে ফ্রয়েডের তাত্ত্বিক গবেষণায় শিল্পায়ন, পুঁজিবাদ, উপনিবেশিকরণ, সাম্রাজ্যবাদ বিষয়গুলো উঠে আসে। মনোবিজ্ঞান, দর্শনশাস্ত্রের নতুন নতুন উদ্ভাবনে সমাজ রাষ্ট্রে অতীতের ব্যক্তিতন্ত্র, বিশ্বাসভূমি ক্ষুণ্ন হয়ে যায়। সাহিত্যের পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পেও আধুনিকতা পরিলক্ষিত হয়। তাঁদের মধ্যে দৃশ্যকলায় এদুয়ার মানে, পাবলো পিকাসো এবং সালভাদর দালি; স্থাপত্যে লুডভিগ মিয়েস ফন ডার রোহে, লে করবুসিয়ে; নৃত্যে মার্থা গ্রাহাম, ক্যাথরিন ডানহাম; সংগীতে আর্নল্ড শোয়েনবার্গ, ইগর স্ট্রাভিনস্কি উল্লেখযোগ্য। পাশ্চাত্যে আধুনিক প্রপঞ্চের প্রভাব বাংলা সাহিত্যে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বিশ শতকের তিরিশের দশককে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ বলা হয়। এই সময়ের দিকপাল বুদ্ধদেব বসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, জীবনানন্দ দাশ প্রমুখ। তাঁদের সাহিত্যে আধুনিকতাবাদের বৈশিষ্ট্য যেমন বিষণ্নতা, নগরজীবনের সংশয় ক্লান্তি, মনস্তাত্ত্বিক ভিন্নতা উঠে আসে। আধুনিক পাশ্চাত্যবোধের সকল প্রপঞ্চ ভাবনার সফল প্রয়োগ ও প্রতিফলন জীবনানন্দ দাশের সাহিত্যসম্ভারে পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ ব্রাহ্মসমাজ, ঢাকায় জীবনানন্দ দাশের স্মৃতির স্থানটি আজও আছে। তবে রামমোহন লাইব্রেরির ঘরটি জরাজীর্ণ হয়ে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এই ভগ্ন লাইব্রেরি সংলগ্ন ঢাকাস্থ ব্রাহ্মমন্দিরে লাবণ্য গুপ্তের সাথে তিনি ব্রাহ্মরীতিতে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পঞ্চান্ন বছরের জীবনে নানা টানাপোড়েনের ভেতর কবির সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যের আধুনিক পর্যায়কে শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে তাঁর লেখাসমূহ পাঠ করলে ধারণাগুলো পাকাপোক্ত হয়ে ওঠে। কবির সৃষ্টিশীল সম্ভার তাঁর জীবদ্দশায় পাঠকের নিকট তিনি প্রকাশিত বই আকারে তুলে ধরতে পারেননি। সিংহভাগ অপ্রকাশিত ছিল। জীবনানন্দ দাশের কবিতার যে ব্যাপ্তি, তা প্রতিনিয়ত যেন নতুন করে উদ্ভাবিত হয়ে ওঠে।
জীবনানন্দ দাশের কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধসমূহ তাঁর অসামান্য সৃষ্টিশীলতার পরিচয় বহন করে। সাহিত্যের বিচিত্র পথে তিনি নতুন পথরেখা সৃষ্টি করেছেন এবং সেইসব বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর ২১টা উপন্যাস ও ১২৬টি গল্প জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি। বর্তমানে সময়ে তাঁর অসংখ্য অপ্রকাশিত লেখা প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে তাঁর প্রবন্ধগুলোও লেখক পাঠককে ভাবতে শেখায়। ‘কবিতার কথা’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাংলা কবিতা’, ‘মাত্রাচেতনা’, ‘উত্তররৈবিক বাংলা কাব্য’, ‘কবিতার আত্মা ও শরীর’, ‘কী হিসাবে কবিতা শাশ্বত’, ‘কবিতাপাঠ’, ‘দেশকাল ও কবিতা’, ‘সত্যবিশ্বাস ও কবিতা’, ‘রুচি, বিচার ও অন্যান্য কথা’, ‘কবিতার আলোচনা’, ‘আধুনিক কবিতা’, ‘বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ’, ‘কেন লিখি’, ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘শরৎচন্দ্র’, ‘কঙ্কাবতী ও অন্যান্য কবিতা’, ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ’, ‘পৃথিবী ও সময়’, ‘যুক্তি, জিজ্ঞাসা ও বাঙালি’, ‘অর্থনৈতিক দিক’, ‘শিক্ষা ও ইংরেজি’, ‘শিক্ষা-দীক্ষা-শিক্ষকতা’, ‘শিক্ষার কথা’, ‘শিক্ষা সাহিত্যে ইংরেজি’ এবং ‘শিক্ষা-দীক্ষা’ উল্লেখযোগ্য।
এছাড়াও তাঁর ৫৬টি বাঁধানো এক্সারসাইজ খাতার লিটারারি নোটসের পাণ্ডুলিপি কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে। যার পৃ. সংখ্যা ৪,২৭২ এবং শব্দসংখ্যা ৬ লাখ ৬৩ হাজারের মতো। আরও কিছু দিনলিপিসহ তাঁর সৃজনশীল নিদর্শনের তথ্য পাওয়া যায়।
বাংলা সাহিত্যের প্রতিভাধর আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশের বিশাল সাহিত্যসম্ভার নিয়ে পাঠ ও গবেষণায় নিছক দায়সারা তথ্য পাওয়া যায়। আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী গবেষকদের অব্যাহত গবেষণায় জীবনানন্দ দাশের সৃষ্টিশীলতা নতুনভাবে উঠে আসবে। মাত্র ৫৫ বছর জীবনকালে অর্থাৎ স্বল্প সময়ে যা সৃষ্টি করে গেছেন, তা অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে। প্রতিনিয়ত তাঁর কবিতায় মুগ্ধ হতে হয়…
“পৃথিবীর বুকে আজো ‘মৃত্যু আর মাছরাঙা ঝিলমিল’ করে।
‘এখনো এ পৃথিবীতে’ জীবনের পথে আসে পায়ের চিহ্ন।
সময়ের ঢের আয়ু শেষ করে প্রদীপ জ্বালে স্থির অনুভব।
‘তোমার স্বপ্নের হাতে’ ধীরে ধীরে স্বপ্ন ঝরে
শান্তি ঝরে আকাশ থেকে।
এক বিচ্ছিন্ন সময়ে মৃত্যু হয়ে যায় আমাদের জন্মের”
অথবা,
“কার মুখ?—আমলকী শাখার পিছনে
শিঙের মত বাঁকা নীল চাঁদ একদিন দেখেছিলো তাহা;
এ-ধূসর পাণ্ডুলিপি একদিন দেখেছিলো, আহা,
সে-মুখ ধূসরতম আজ এই পৃথিবীর মনে।”
(মহাপৃথিবী, ১৯৪৪)




