আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে বিশ্বের সকল নারীকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা। মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় নারীর অবদান অপরিসীম। পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে নারীর অংশগ্রহণ আজ ক্রমশ বাড়ছে। তবুও বাস্তবতা হলো অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে বিশ্বের বহু দেশের মতো বাংলাদেশেও নারীরা এখনও নানা বৈষম্য ও সহিংসতার শিকার।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ইতিহাস শত বছরেরও বেশি পুরোনো। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে নারী শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ ও ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই দিবসের সূচনা। পরে ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সেই থেকে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে।
প্রতিবছর আন্তর্জাতিক নারী দিবস একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য নিয়ে পালিত হয়। এই প্রতিপাদ্যের উদ্দেশ্য হলো নারীর অধিকার, সমতা, নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নের নির্দিষ্ট বিষয়গুলোকে বিশ্বজুড়ে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য “Give To Gain” (গিভ টু গেইন)। এই প্রতিপাদ্যের মূল বার্তা হলো, নারীর উন্নয়ন, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নে বিনিয়োগ মানেই সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা। অর্থাৎ নারীদের জন্য সুযোগ, নিরাপত্তা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করা হলে তার সুফল পুরো সমাজই পাবে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রতিপাদ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই প্রতিপাদ্যের বাস্তবায়নে সরকারকে জোরালো ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর সমান সুযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশে নারীর অগ্রগতির নানা ইতিবাচক দিক থাকলেও নারী নির্যাতনের চিত্র উদ্বেগজনক। ধর্ষণ, হত্যা, যৌতুক নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা এবং সামাজিক নিপীড়নের ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই সংবাদ শিরোনামে উঠে আসে। বিশেষ করে কন্যাশিশুরা ক্রমবর্ধমানভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছে, যা একটি সভ্য সমাজের জন্য অত্যন্ত লজ্জার বিষয়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নারী ও কন্যা নির্যাতনবিষয়ক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সারা দেশে অন্তত ৩২ জন নারী ও কন্যাশিশু হত্যার শিকার হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৯ জন কন্যাশিশু, যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। একই সময়ে মোট ১৮৩ জন নারী ও কন্যা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩২ জন, যাদের মধ্যে ৪ জন কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া যৌন নিপীড়ন, উত্ত্যক্তকরণ, সাইবার সহিংসতা, পারিবারিক নির্যাতন এবং যৌতুকজনিত সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে।
ফেব্রুয়ারি মাসেই ১৭ জন নারী ও কন্যাশিশুর মৃত্যু রহস্যজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আত্মহত্যা করেছেন কয়েকজন নারী। এসিডদগ্ধ ও অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। যৌতুকজনিত সহিংসতার শিকার হয়েছেন একাধিক নারী, যার মধ্যে হত্যার অভিযোগও রয়েছে। এসব পরিসংখ্যান এর পেছনে রয়েছে অসংখ্য ভেঙে যাওয়া পরিবার, নষ্ট হয়ে যাওয়া স্বপ্ন এবং গভীর মানবিক বিপর্যয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রেও অনেক সময় সামাজিক চাপ বা আপসের মাধ্যমে ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষিতার বিয়ে দিয়ে মামলা নিষ্পত্তির ঘটনা ঘটে। এতে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যায় এবং ভুক্তভোগী নারীকে আজীবন মানসিক ও সামাজিক যন্ত্রণা বহন করতে হয়। এ ধরনের বিচার প্রক্রিয়া ন্যায়বিচারের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এর পাশাপাশি সমাজে একটি উগ্রগোষ্ঠী প্রকাশ্যে নারীর অগ্রগতি ও সমতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। তারা বাল্যবিবাহকে উৎসাহিত করছে এবং পুরুষের একাধিক বিবাহকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করার পক্ষে বক্তব্য দিচ্ছে। এসব বক্তব্য নারীর অধিকার ও মর্যাদার জন্য যেমন হুমকিস্বরূপ, তেমনি সমাজকে পশ্চাৎমুখী করে তোলার ঝুঁকিও তৈরি করে।
দুঃখজনকভাবে এসব বিষয়ে অনেক সময় নারীবান্ধব ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভূমিকা যথেষ্ট শক্তিশালীভাবে দৃশ্যমান হয় না। যখন সমাজে নারীর নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে, তখন নীরবতা সমস্যাকে আরও গভীর করে তোলে।
বাংলাদেশে নারী সুরক্ষার জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইনসহ নানা আইনি কাঠামো বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু কেবল আইন প্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন, দ্রুত বিচার এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। এই অর্ধেক জনগোষ্ঠী যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তবে উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না। তাই নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিচার প্রক্রিয়ার গতি বাড়ানো, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় লিঙ্গসমতার মূল্যবোধ জোরদার করা জরুরি।
প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন প্রতিপাদ্য নিয়ে নারী দিবস উদযাপিত হয়। কিন্তু যদি বাস্তবে নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে এসব প্রতিপাদ্য কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারী ও কন্যাশিশুর ওপর সহিংসতার যে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
অতএব আন্তর্জাতিক নারী দিবস শুধুমাত্র উদযাপনের পাশাপাশি হওয়া উচিত আত্মসমালোচনা ও দায়বদ্ধতার দিন। নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, সমাজ এবং প্রতিটি নাগরিককে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে বাস্তবে পরিবর্তন ঘটাতে পারলেই নারী দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য প্রতিষ্ঠিত হবে।#




