উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এক অনন্য নাম। তবে তাঁকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে সেই সময়ের মনীষা ও নবজাগরণের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। বিদ্যাসাগরের পাশাপাশি রাজা রামমোহন রায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, অক্ষয়কুমার দত্তসহ বহু মনীষীর চিন্তা, সাহিত্যচর্চা ও সমাজসংস্কারের মধ্য দিয়ে উনিশ শতকের বাংলায় এক নতুন মননশীলতার বিকাশ ঘটেছিল। তাঁদের কর্ম ও চিন্তার আলোকে সেই সময়কে ফিরে দেখা এবং বর্তমান সময়ে তার প্রাসঙ্গিকতা অনুধাবনই এই প্রবন্ধের বিষয়।
নবজাগরণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস:
উনবিংশ শতকের প্রারম্ভ থেকে ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তনের ফলে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে আলোড়ন ওঠে। ইংরেজি ভাষা মারফত বাঙালি বিচিত্র দুনিয়ার সঙ্গে পরিচিত হয়। ইউরোপীয় জীবনবাদী জ্ঞান-ভাবনার সঙ্গে পরিচয়ের ফলে শিক্ষিত মানুষের ভাবচেতনায় পরিবর্তন সূচিত হয়, যুগোচিত মানসিকতা গ্রহণ করে। মানুষ নতুন কাজ ও নতুন চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়। এই নতুন চেতনায় বাংলা সাহিত্যে নবজাগরণ ঘটে। কাজকর্ম, চিন্তাভাবনা, জ্ঞান-মনীষা এবং সৃষ্টি প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই ভাবনা প্রসারিত হয়। এই নতুনত্বই নবজাগরণ বা রেনেসাঁস নামে অভিহিত হয়।
সমাজ-প্রভাব: ইংরেজি শিক্ষার প্রসার, বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা, ইংরেজি নাট্যাভিনয় প্রভৃতি দ্বারা বাংলায় নবজাগরণ ঘটে। প্রাচীন জ্ঞান ও চারুকলার নতুন আবিষ্কার, জীবন সম্বন্ধে নতুন বোধ, ধর্ম বা জীবনাদর্শ সম্বন্ধে নতুন উপলব্ধি ছিল এই ভাবের বৈশিষ্ট্য। জীবনযাত্রায়, মননে, মানবিকতার উদ্বোধনে, ঐতিহ্যের নতুন মূল্যায়নে, ইহজীবনবোধে, শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টি প্রভৃতি কাজে পরিবর্তন এল, কালান্তর সূচিত হল।
রেনেসাঁসের প্রভাবে মানুষ ধর্মীয় আবেগ ও ভাবালুতা পরিহার করে যুক্তিবাদী চিন্তায় আকৃষ্ট হয়। যুক্তির নিরিখে সব যাচাই করতে চায়। দেবদেবীর অলৌকিকতা সম্বন্ধে সন্দিগ্ধ হয়, মানবচিন্তা ও মানবতা জাগ্রত হয়। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’ এ যুগের মত ও পথ হয়। অধ্যাত্মজ্ঞানের চেয়ে ইতিহাস, ভূগোল, জীববিদ্যা ও মানবজ্ঞানে মানুষ মনোনিবেশ করে।
দীর্ঘলালিত অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী মানুষ জেহাদ ঘোষণা করেন। সতীদাহ প্রথা নিবারণ, বহুবিবাহ রদ, স্ত্রীশিক্ষার প্রসার ও নারীমুক্তি আন্দোলন জোরদার হয়। মননশীল ও সহৃদয় মানুষ সমাজসংস্কারে আত্মনিয়োগ করেন। ঐতিহ্য উদ্ধারে বহু ব্যক্তি ব্রতী হন। রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণাদি কাব্য-সাহিত্য নিয়ে নতুন ভাব ও আঙ্গিকে রচিত ও পরিবেশিত হয়। শুধু সমাজসংস্কার নয়, যুগাবতার মনীষী ধর্মান্ধতা ও গোঁড়ামি থেকে উদ্ধার করেন।
রামকৃষ্ণের ‘যত মত তত পথ’ ধর্মাদর্শের কথা বলে স্বামীজী বিশ্বজয় করেন। তাঁর ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’ বাণী, মানবসেবা হয় এ যুগের ধর্ম।
নবজাগরণের বিশিষ্ট লক্ষণ স্বাজাত্যবোধের উন্মেষ। শিল্প, সাহিত্য, ধর্মচিন্তায় নানাভাবে স্বদেশচেতনার প্রকাশ ঘটে। শিক্ষাবিস্তার আমাদের কূপমণ্ডূকতা থেকে উদ্ধার করে। ইংরেজি শিক্ষার প্রচলনে মানুষের জ্ঞানের পরিধি প্রসারিত হয়। সীমাহীন জ্ঞান আহরণের সুযোগ আসে। রেনেসাঁসের প্রভাবে বাঙালি ভাবদ্বন্দ্বে আন্দোলিত হয়। পাশ্চাত্য শিক্ষা-দীক্ষায় ‘ইয়ং বেঙ্গল’ উন্মার্গগামী হয়ে দেশি আচার-আচরণের বিরোধিতায় নামে। ‘হিন্দু রিভাইভ্যালিস্ট’ এদের ঠিক বিপরীত আচরণ করে। এই ভাবদ্বন্দ্বের ফলশ্রুতিতে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সমন্বয় বা দুই মতাদর্শের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপিত হয়।
নবজাগরণ ও বাংলা সাহিত্য:
উনিশ শতকের নবজাগরণের ফলে বাঙালির চিত্তলোক উন্মোচিত হয়। ফলে সাহিত্য-শিল্পে, ভাবনায়, রূপ ও আঙ্গিকে পরিবর্তন আসে। এ যুগে দেবতার স্থলে মানুষ ঠাঁই করে নেয়। আধ্যাত্মিকতা নয়, মানবতা গুরুত্ব পায়। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, কামনা-বাসনা, দুঃখ-যন্ত্রণা সাহিত্যের উপজীব্য হয়। দেবনির্ভরতা নয়, আত্মশক্তিতে আস্থাশীল, পৌরুষদীপ্ত চরিত্রসৃষ্টিতে স্রষ্টারা অধিকতর উৎসাহী হন। বাংলা সাহিত্যে বিশ্বের ছায়া পড়ে। জীবনের প্রত্যয় বর্ণবৈচিত্র্যে ভরে ওঠে। একালের সাহিত্যে আধুনিক মনন ও বাণী সঞ্চারিত হয়। সাহিত্য বেগবান ও গতিশীল হয়। পত্রপত্রিকার প্রচলন হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বার্তা সহজে জানা হয়। গদ্য চিন্তাকে সুতীক্ষ্ণ করেছে, যৌক্তিক পারম্পর্য বিন্যস্ত করেছে। গদ্যভাষা গল্প, উপন্যাস, নাটক প্রভৃতি কথাসাহিত্যের সূচনা করে। সাহিত্য পত্রপল্লবে ভরে ওঠে। ইংরেজদের নাট্যমঞ্চে অভিনয় প্রত্যক্ষ করে বাঙালি নাট্যমঞ্চে অভিনয় শুরু হয়। ইউরোপীয় আদলে নাট্যমঞ্চ গড়ে ওঠে, নাট্যসাহিত্য জন্ম নেয়।
উনিশ শতকে মুদ্রণযন্ত্রের প্রচলন হয়, জ্ঞানের চৌহদ্দি প্রসারিত হয়। সাহিত্য ব্যাপকতা লাভ করে। আধুনিকতার বৈশিষ্ট্যগুলি বাঙালির জীবনে ও সাহিত্যে বিকশিত হয়।
উনিশ শতকের নবজাগরণ কর্মযজ্ঞের হোতা ও মনীষার দিশারীর ন্যায় ভারতপথিক রাজা রামমোহন রায় এবং প্রাণপুরুষ ‘বঙ্গের কুলচূড়া’ বিদ্যাসাগর।
‘কী রাজনীতি, কী বিদ্যাশিক্ষা, কী সমাজ, কী ভাষা, আধুনিক বঙ্গদেশে এমন কিছুই নাই রামমোহন রায় স্বহস্তে যাহার সূত্রপাত করিয়া যান নাই।’
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বাংলার অগ্রদূত রাজা রামমোহন রায়। সমাজসংস্কার ও প্রগতিশীল চিন্তাধারা প্রচলনে তিনি ব্যাপৃত ছিলেন। ব্রাহ্মধর্মের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। আগাছাভরা কুসংস্কার দূর করে উদার ও স্বাধীন চিন্তাভাবনার প্রবর্তন তাঁর লক্ষ্য ছিল। ইংরেজি শিক্ষার প্রসার, স্বাধীনতাবোধের উন্মেষে তিনি ছিলেন অগ্রণী। তাঁর মানবতাবোধ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়। আধুনিক বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা-দীক্ষার প্রগতিশীল ভাবের প্রথম সূচনা রাজা রামমোহন রায়ের। বাঙালি তথা ভারতবাসীকে মধ্যযুগের গুটি কেটে আধুনিক যুগের মহাকাশে উড়তে শিখিয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়। সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন, জুরির বিচার, সম্পত্তিতে স্ত্রীলোকের অধিকার, পাশ্চাত্য শিক্ষার সম্প্রসারণ প্রভৃতি বিষয়ে তিনিই ভারতের পথিকৃৎ। তিনি একেশ্বরবাদী তত্ত্বের দ্বারা বেদ-বেদান্ত-উপনিষদকে রূপান্তরিত করে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেন। আধুনিক যুক্তিবাদী ও বৈজ্ঞানিক মননের দ্বারা তিনি দেশবাসীকে নবযুগের অগ্রপথিক করে তোলার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। আধুনিক ভারতচেতনার তিনি অগ্রদূত, প্রগতি আন্দোলনের তিনি হোতা।
যুগপৎ তেজস্বী দৃঢ় ব্যক্তিত্ব ও মমতা, পাণ্ডিত্য ও নিরহংকার, বজ্রকঠোর ও কুসুমকোমল, পরিশ্রমী ও সহিষ্ণু, উপার্জনী ও ত্যাগী, অনুশাসক ও সেবাপরায়ণ, ধর্মনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ, সৃষ্টিশীল ও বর্জনমনা, বহু গুণান্বিত চরিত্রাদর্শী ছিলেন বীরসিংহের সিংহশিশু, বাংলার গদ্যের জনক, খাঁটি বাঙালি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। অক্লান্ত পরিশ্রম, নিষ্ঠাবান অনুশীলন ও মেধার জোরে তদানীন্তন এক বিদগ্ধ পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র ‘বিদ্যাসাগর’ শিরোপায় বন্দিত হন। তাঁর কীর্তিকলাপ, চরিত্রাদর্শ, সারস্বত সাধনা, দরদী মনন, সমাজসংস্কার আন্দোলন, দানশীলতা, জাতীয়তাবোধ প্রভৃতি গুণে তিনি শ্রেষ্ঠ চরিত্র বলে অভিহিত।
‘অণুবীক্ষণ নামে এক প্রকার যন্ত্র আছে, তাহাতে ছোট জিনিসকে বড় করিয়া দেখায়; বড় জিনিসকে ছোট দেখাইবার নিমিত্ত উপায় পদার্থবিদ্যাশাস্ত্রে নির্দিষ্ট থাকিলেও ঐ উদ্দেশ্যে নির্মিত যন্ত্র আমাদের মধ্যে সর্বদা ব্যবহৃত হয় না। কিন্তু বিদ্যাসাগরের জীবনচরিত্র বড় জিনিসকে ছোট দেখাইবার জন্য নির্মিত যন্ত্রস্বরূপ। আমাদের দেশের মধ্যে যাহারা খুব বড় বলিয়া আমাদের নিকট পরিচিত, তন্নাল্প একখানি সম্মুখে ধরিবা মাত্র তাঁহারা সহসা অতি ক্ষুদ্র হইয়া পড়েন।’ রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, চরিতকথা
দয়ার সাগরের চরিত্রের প্রতিধ্বনি একটি ইংরেজি উদ্ধৃতিতে মেলে:
“The genius and wisdom of an ancient sage, the energy of an Englishman, and the heart of a Bengali Mother”
— মধুসূদনের চিঠি
দুশ বছর ধরে বাঙালি তাঁর আকাশচুম্বী চরিত্রাদর্শ, অকার্পণ্যের কর্মসাধনা, অতুল জীবনচর্চা, দরদভরা মানবপ্রীতিরূপ এক অনন্য ‘বিদ্যাসাগর সংস্কৃতি’ পালন করে চলেছে। আজও ধর্ম-বর্ণ, জাতপাত, আঞ্চলিকতা, গোষ্ঠী, সমাজনীতি, ভেদনীতি, রাজনীতি নির্বিশেষে তাঁকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসিয়ে বাঙালি শ্রদ্ধাভক্তির অর্ঘ্য নিবেদন করেন। এর ব্যতিক্রম বাঙালির কাম্য নয়।
বিদ্যাসাগরের অধ্যবসায়, কর্মতৎপরতা অতুলনীয়। তাঁর বাবা-মায়ের প্রতি ভক্তি সর্বজনবিদিত, ‘বাপ মা বিনা দেবতা সাগর মানে নাইকো আর।’ মায়ের ডাকে উত্তাল দামোদর পেরিয়ে বাড়ি ফেরা তো বহুচর্চিত গল্প। তাঁর মায়ের চাওয়া তিন অলঙ্কার। তাঁর বীরসিংহ গ্রামে একটি অবৈতনিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, একটি দাতব্য চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং দরিদ্রদের বস্ত্র বিতরণ করেছিলেন। ড্রিংকওয়াটার বেথুন ও মেরী কার্পেন্টারের সহায়তায় তিনি বালিকা বিদ্যালয় গঠন ও নারীশিক্ষা আন্দোলন গড়ে তোলেন। এম. এ. পাশ করা চন্দ্রমুখী বসুকে তিনি পুরস্কৃত ও উৎসাহিত করেন।
বিধবা বিবাহ প্রবর্তন বিদ্যাসাগরের চিরস্মরণীয় কীর্তি। বিদ্যাসাগর স্বয়ং বলেন, ‘বিধবা বিবাহ প্রবর্তন আমার জীবনের সর্বপ্রধান সৎকর্ম্ম।’ তাঁর বিধবা বিবাহ আন্দোলনের কথা তাঁতিদের শান্তিপুরে শাড়ীতে সংযোজিত হয়:
‘সুখে থাক বিদ্যাসাগর চিরজীবী হয়ে
সদরে করেছে রিপোর্ট বিধবাদের হবে বিয়ে।’
দাশুরথি রায়ের আবেগ মথিত উচ্ছ্বসিত প্রশংসা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে:
‘তোমরা ঈশ্বরের দোষ ঘটাবে কিরূপে
রাখি ঈশ্বরের মত হইয়া ঈশ্বর দূত
এসেছেন ঈশ্বর বিদ্যাসাগর রূপে।’
— দাশুরথি রায়
শুধু বিধবা বিবাহ প্রচলন নয়, বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করতে বিদ্যাসাগর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে প্রায় ২১,০০০ লোকের স্বাক্ষরযুক্ত বহুবিবাহ রদের আবেদন সরকারের কাছে পেশ করা হয়। বাঙালি সমাজে এর আলোড়ন পড়ে।
একদা বিদ্যাসাগর যাদু ঘর দেখতে যান। চটি জুতা পরা বিদ্যাসাগরকে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। তিনি আর কোনোদিন সেখানে যাননি।
১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাসাগরকে সি. আই. ই. উপাধিতে ভূষিত করা হয়। দরবারি পোশাকে যেতে হবে; বিদ্যাসাগর তা আনতে যাননি। ‘বিদ্যাসাগর খাঁটি বাঙালি হইয়া ভূমিষ্ঠ হইয়াছিলেন, শেষদিন পর্যন্ত তেমনি বাঙালিটি ছিলেন।’
চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে বিদ্যাসাগরের আচার-ব্যবহার নিষ্ঠাবান হিন্দু ব্রাহ্মণের মতো ছিল না। বিহারীলাল সরকার লিখেছেন বিদ্যাসাগর নাস্তিক ছিলেন। ক্ষুদিরাম বসু লিখেছেন তিনি একেশ্বরবাদী ছিলেন। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত, তিনি এক রকমের নাস্তিক ছিলেন, যাকে বলে অজ্ঞেয়বাদী। তবে ‘করুণাসাগর বিদ্যাসাগর’-এর প্রণেতা ইন্দ্রমিত্র তথা অরবিন্দ গুহ বিদ্যাসাগরের ঈশ্বরবিশ্বাস প্রসঙ্গে মত দিয়েছেন, ‘আমি বিদ্যাসাগরের মতই।’
— শিলাদিত্য, আগস্ট ২০১৮ সংখ্যা, পৃ. ১‘বোধোদয়’ (১৮৫১), ‘ঋজুপাঠ’ (১৮৫১), ‘বর্ণ পরিচয়’ (১ম ভাগ, ১৮৫৫), ‘বর্ণ পরিচয়’ (২য় ভাগ, ১৮৫৫) প্রভৃতি শিশুপাঠ্য রচনায় বিদ্যাসাগর দিগন্ত উন্মোচন করেন। স্বরবর্ণ সংস্কারে দেখি ঌ, ৡ বর্জিত হল; ং, ঃ বাদ গেল। ১২টি স্বরবর্ণ রইল। ব্যঞ্জনবর্ণ হল, ক্ষ (ক্ ও ষ) বর্জিত হল। ঃ, ঁ স্বতন্ত্র ব্যঞ্জন হল। ড়, ঢ়, য় নতুন ব্যঞ্জন, তা বিদ্যাসাগরের আবিষ্কার। ব্যঞ্জনবর্ণ হল মোট ৪০টি। “বিদ্যাসাগর তাঁর চলার পথ নিজেই আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি কাউকে অনুসরণও করেননি, কারও দ্বারা প্রভাবিতও হননি,… সকলের থেকে স্বতন্ত্র ভাবে গড়ে ওঠা এই মানুষটির চরিত্রের প্রধান দুটি গুণ, স্বাতন্ত্র্যবোধ ও স্বাধীন চিন্তন।”
— সুকুমার সেন: আধুনিকতম মানুষ বিদ্যাসাগর
বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন বিভাগ বঙ্কিমচন্দ্রের সাধনায় সার্থক পরিণতি লাভ করে। প্রতিভাধর বঙ্কিম ধর্ম, দর্শন, ইতিহাস, পুরাণ, সমাজতত্ত্ব, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে হৃদয়গ্রাহী ও পাঠযোগ্য আলোচনা করেন। সামান্য বিষয় বঙ্কিমের প্রতিভার স্পর্শে প্রকাশ নৈপুণ্যে অসামান্য হয়ে ওঠে, নীরস বিষয় হয় সরস ও আস্বাদ্য। যুক্তি ও তথ্যের সঙ্গে তিনি মিশিয়ে দিতেন দিগন্ত প্রসারী কল্পনা। তাঁর কল্পনার রঙে রঞ্জিত, মনের মাধুরী মিশ্রিত রচনাগুলি রসসাহিত্যের পর্যায়ে উন্নীত হয়। তাঁর রচনা ‘পার্সোনাল এসে’ বা ব্যক্তিগত প্রবন্ধের পর্যায়ে পড়ে।
১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গদর্শন প্রকাশ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বঙ্কিমচন্দ্র সম্পাদিত ও প্রকাশিত বঙ্গদর্শনে উপন্যাস, সমাজতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব, নীতিতত্ত্ব প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ ছাপা হতো। দেশবাসীর চিত্তোৎকর্ষ সাধন ছিল তাঁর লক্ষ্য। জাতির হতগৌরব পুনরুদ্ধার ছিল তাঁর ব্রত। জাতিকে আত্মসচেতন মুক্ত-চিত্ত করে তুলতে তিনি প্রয়াসী হন। যুগপৎ মৌলিক প্রবন্ধ ও সমালোচনা সাহিত্যচর্চার জন্য রবীন্দ্রনাথ তাঁকে সব্যসাচী নামে অভিহিত করেন। তাঁর সাহিত্য সাধনা সম্পর্কে যথার্থ মন্তব্য করেন, “একদিকে অগ্নি জ্বালাইয়া রাখিতে ছিলেন আর একদিকে ধূম ও ভস্মরাশি দূর করিবার ভার নিজেই লইয়াছিলেন।” ‘লোকরহস্য’ (১৮৭৪), ‘মুচিরাম গুড়ের জীবন চরিত’ (১৮৮৪) বঙ্কিমচন্দ্রের বিদ্রুপাত্মক রচনা। গ্রন্থ দুটিতে তিনি দুর্বল, আত্মমর্যাদাহীন বাঙালিকে বিদ্রূপ ও কটাক্ষ করে সচেতন করতে চেয়েছেন। সমালোচনার তীক্ষ্ণ আঘাত, ব্যঙ্গের কটাক্ষ থাকলেও কৌতুক রসে তা আস্বাদ্য ও পাঠযোগ্য হয়েছে। ‘মুচিরাম গুড়ের জীবন চরিত’ রচনায় তিনি ব্রিটিশ রাজের অপদার্থ কর্মচারীদের প্রতি তীক্ষ্ণ বাক্যবাণে জর্জরিত করেছেন। তাঁর ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ (১৮৭৫) বাংলা সাহিত্যে অভিনব সংযোজন। ডি. কুইনস রচিত ‘কনফেশন অফ অ্যান ইংলিশ অপিয়াম ইটার’ গ্রন্থের সঙ্গে এর কিছুটা সাদৃশ্য আছে। সরকারি চাকুরে বঙ্কিমচন্দ্রের লেখায় ব্রিটিশ রাজের সমালোচনায় বিধিনিষেধ আরোপিত হয়, কোনো কোনো রচনা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। এই সময় বঙ্কিম অর্ধোন্মাদ, মাদকাসক্ত কমলাকান্ত ছদ্মনামে লেখেন ‘কমলাকান্তের দপ্তর’। দেশের অধঃপতনের সুগভীর বেদনাবোধ লেখককে এই রচনা সৃষ্টিতে প্রেরণা যোগায়। এইসব রচনায় তাঁর বাস্তবতাবোধ, পর্যবেক্ষণ শক্তি, বিশ্লেষণাত্মক মনন, স্বাজাত্যবোধ, মানবিক অনুভূতি প্রভৃতি গুণাবলির পরিচয় পাওয়া যায়। প্রত্যেকটি রচনা পারিপাট্যে অনবদ্য হয়ে ওঠে।
‘বিজ্ঞান রহস্য’ (১৮৭৫) বঙ্কিমচন্দ্রের বিজ্ঞান চেতনার ফসল। এর নির্মল কৌতুক রস বাংলা সাহিত্যে অনাস্বাদিতপূর্ব। ‘সাম্য’ (১৮৭৯) গ্রন্থে সাম্যবাদের কথা ঘোষিত হয়েছে। এখানে তাঁর সমাজ সচেতনতার পরিচয় মেলে। ‘আমি সাম্য নীতি যেমন মোটামুটি বুঝিয়াছি, সেই রূপ লিখিয়াছি।’ ইউরোপের অনুকরণে নয়, বঙ্কিমচন্দ্র ভারতীয় প্রেক্ষাপটে নিজের মতো করে সাম্যবাদের ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর ‘বিবিধ প্রবন্ধ’ (তিন খণ্ড ১৮৮৭-৯২) বিভিন্ন বিষয়ের প্রবন্ধের সমষ্টি। কৃষি, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস প্রভৃতি বিবিধ বিষয় এর উপজীব্য। ‘কৃষ্ণচরিত্র’ (১৮৮৬) গ্রন্থে লেখক নিজস্ব চিন্তায় কৃষ্ণের ঐতিহাসিক রূপ উদ্ঘাটন করেছেন। কেবল সাহিত্যের ইতিহাস নয়, বঙ্কিম সৃষ্ট সাহিত্যের প্রভাবে বাংলার জাতীয় ইতিহাসেরও মোড় ফেরে। সাহিত্যসাধক বঙ্কিমের হাতে বাংলা সাহিত্য শাখা-প্রশাখা, পত্র-পল্লবে ভরে ওঠে।
সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিষবৃক্ষ’ ও ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ বৈধব্য সমস্যা নিয়ে লেখা উপন্যাস। সেখানে নীতিবাগীশ বঙ্কিম বিধবাদের প্রতি সমর্থন দূরের কথা, ভাগ্যবিড়ম্বিতদের আশা আকাঙ্ক্ষা ভোগ লিপ্সার জন্য তাদের আত্মহত্যা বা গুলির মুখে মৃত্যু ভাগ্য লিখন হিসাবে দেখিয়েছেন। ১২৮৭ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় বিধবাদের বিরোধিতা পরিলক্ষিত হয়—
‘…পাঁচ জনের জন্য যাঁহার প্রাণ কাঁদে, সমাজের সহস্র সহস্র লোকের জন্য তাহার হৃদয় ফাটিয়া যাওয়া উচিত। …যদি পাঁচজন বিধবার দুঃখ মোচন না করিলে নিষ্ঠুরতা হয় তবে বিধবা বিবাহ চালাইয়া সমাজের সহস্র ব্যক্তির অপকার করা চপলতা।’
বলাই বাহুল্য নীতিবাগীশ বঙ্কিমচন্দ্র বিধবা বিবাহ সমর্থন করেননি, উক্ত আন্দোলনের কর্ণীদের ব্যঙ্গ ও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি। তাঁর উদ্দিষ্ট ব্যঙ্গের লক্ষ্য দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর।
কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯)-এর লেখায় নারী শিক্ষার প্রতি বিদ্রূপ বাক্য শোনা যায়—
‘যত ছুঁড়িগুলো তুড়িমেরে
কেতাব হাতে নিচ্ছে যবে
তখন এ. বি. শিখে বিবি সেজে
বিলিতি বোল কবেই কবে।’
—ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত: সংবাদ প্রভাকর
মদন মোহন তর্কালঙ্কার (১৮১৭-১৮৫৮) শিশুর প্রথম পাঠ প্রায় সবার জানা—
‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল।
কাননে কুসুম কলি সকলি ফুটিল॥’
তিনি ‘রসভ তরঙ্গিনী’ ও ‘বাসব দত্তা’ নামে কাব্য সৃষ্টি করেন। বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তিনি যৌথভাবে ‘সংস্কৃত যন্ত্র’ নামে এক মুদ্রণ খোলেন। বেথুন সাহেব ও বিদ্যাসাগরের শিক্ষা আন্দোলনে তিনি সামিল হন। নিজের মেয়েকে শুধু বিদ্যালয়ে পাঠাননি, উক্ত বিদ্যালয়ে বিনা পারিশ্রমিকে পড়ানোর কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। ‘শিশু শিক্ষা’ (তিন ভাগ) রচনা করে তিনি তৎকালীন শিশু পাঠ্যের অভাব মেটান।
অক্ষয় কুমার দত্ত (১৮২০-১৮৮৬) ‘অনঙ্গমোহন’ কাব্য রচনা করে খ্যাত হন। তিনি তত্ত্ববোধিনী সভার সভ্য হন এবং তত্ত্ববোধিনী পাঠশালার শিক্ষক পদে ব্রতী হন। ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নর্ম্যাল স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ‘বাহ্যবস্তুর সঙ্গে মানব প্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার’, ‘ধর্মনীতি’, ‘প্রাচীন হিন্দুদিগের সমুদ্র যাত্রা ও বাণিজ্য বিস্তার’ প্রভৃতি তাঁর রচিত গ্রন্থ। শিশু সাহিত্য ও পাঠ্য পুস্তক রচনায় অক্ষয় কুমার অসামান্য খ্যাতি পান। তাঁর ‘চারু পাঠ’ (১ম ভাগ ১৮৫২, ২য় ভাগ ১৮৫২, ৩য় ভাগ ১৮৫৪) সেকালে সমাদৃত হয়।
জনৈক সমালোচকের একটি মত উদ্ধার করা হল:
‘নানা ইংরেজি পুস্তক হইতে সংকলিত’ হয়ে বাংলা গদ্যে এক অপূর্ব জ্ঞানভাণ্ডার উদ্ঘাটিত করেছিল। নীতি জ্ঞান সাধনাকে এই গ্রন্থিকা কয়টির মাধ্যমে অক্ষয় কুমার বাংলা ভাষার পাঠকের কাছে সত্যিই চারু পাঠ করে তুলেছিল।’
— ভূদেব চৌধুরী
বেথুন সাহেব কলকাতায় বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি বিমাতৃসুলভ আচরণ করেন। তবে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর হার্দিক সহায়তা করেছিলেন। কবিশ্রী মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩)
রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের খনিত পথে মধুসূদন দেশি আখ্যানের চক্ষে বিদেশি ভাবনা কল্পনা প্রকাশ করতে ব্রতী হন। মধুসূদন ছিলেন অনন্য সাধারণ প্রতিভার অধিকারী। অভূতপূর্ব শক্তিতে তিনি পাশ্চাত্য সাহিত্য থেকে উপকরণ সংগ্রহ করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে তোলেন। বাংলা ভাষাকে তিনি বেগবান করেন।
মহাবিদ্যালয়ে পাঠকালে মধুসূদন ইউরোপীয় সাহিত্যের ভাব ও আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। হোমার, ভার্জিল, মিলটন, টাসো প্রমুখ কবিদের মতো তাঁর ইংরেজি ভাষার কবি হওয়ার বাসনা জাগে। বিলাত যাওয়ার বাসনায় তিনি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। মাদ্রাজে অবস্থানকালে তিনি ইংরেজিতে Captive Ladie এবং Vision of the Past (১৮৪৯) নামক দুটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। বাঙালি কবির ইংরেজি লেখা কাব্যে আশানুরূপ যশ জোটেনি। তৎকালীন শিক্ষা-পরিষদের সভাপতি জে. ই. ডি. বীটন সাহেবের পরামর্শে তিনি মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চার পথ বেছে নেন।
মধুসূদনের বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম কাব্য ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’ (১৮৬০)। মহাভারতের সুন্দ-উপসুন্দের কাহিনি নিয়ে কাব্যটি রচিত। সুন্দ ও উপসুন্দের মধ্যে বিরোধ বাঁধিয়ে বধ করার জন্য তিল তিল করে সৌন্দর্য নিয়ে গড়া হলো অপরূপা নারী তিলোত্তমা। কাব্যটিতে নীতি কবিতার সুর ধ্বনিত হয়েছে। এই কাব্যে প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহৃত হয়েছে। মধুসূদনের সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’ (১৮৬১)। রামায়ণের লঙ্কাকাণ্ড অবলম্বনে মেঘনাদ বধ কাব্য রচিত। সৌমিত্র লক্ষ্মণের দ্বারা রাবণপুত্র মেঘনাদের নিধন এই কাব্যের উপজীব্য। রামায়ণের কাহিনি অবলম্বনে রচিত হলেও এই কাব্যে বাল্মীকি, ব্যাস, কালিদাস, টাসো, হোমার, ওবিদ, দান্তে, পেত্রার্ক প্রভৃতি দেশি-বিদেশি কবিদের প্রভাব পড়েছে। মধুসূদনের অনন্য প্রতিভার স্পর্শে রামায়ণ কথা ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’ নতুন রূপে সৃষ্টি হয়ে উঠেছে। অভিষেক, অস্ত্রলাভ, সমাগম, অশোকবন, উদ্যোগ, বধ প্রভৃতি ৯টি সর্গে কাব্যটি বিন্যস্ত। প্রথম সর্গে ভ্রাতা বীরবাহুর মৃত্যুতে ইন্দ্রজিতের সেনাপতিত্বে ‘অভিষেক’ হয়। ইন্দ্রজিৎকে বধ করার জন্য ইন্দ্রের সহায়তায় লক্ষ্মণ অস্ত্রলাভ করেন, দ্বিতীয় সর্গের নাম হয় ‘অস্ত্রলাভ’। যুদ্ধযাত্রার আগে স্বামীর সঙ্গে প্রমোদ কাননে প্রমীলা মিলিত হন, ‘সমাগম’ নামের সার্থকতা বহন করে। চতুর্থ সর্গে ‘অশোক বন’-এ বসে সীতা-সরমার কথোপকথনের মধ্য দিয়ে লঙ্কাকাণ্ডের পূর্বপট আঁকা হয়েছে। পঞ্চম সর্গে মায়াদেবীর সাহায্যে লক্ষ্মণ ও বিভীষণ নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে মেঘনাদকে বধ করার ‘উদ্যোগ’ নিয়েছেন। ষষ্ঠ সর্গে লক্ষ্মণ কর্তৃক ইন্দ্রজিৎ বধের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। ক্ষত্রিয় ধর্ম না মেনে অন্যায়ভাবে পুত্রকে বধ করার জন্য ক্রুদ্ধ রাবণ লক্ষ্মণকে শক্তিশেল বাণে বিদ্ধ করেন, ‘শক্তি নির্বেদ’ নামে সর্গটি নামাঙ্কিত হয়। রামচন্দ্র ‘প্রেতপুরী’ গিয়ে পিতা দশরথের সঙ্গে মিলিত হয়ে লক্ষ্মণকে বাঁচানোর ওষুধের খোঁজ পান। অষ্টম সর্গে ইন্দ্রজিতের সৎকারের কাহিনি বিবৃত। মেঘনাদ বধ কাব্য বাংলা সাহিত্যের একটি সার্থক আলংকারিক মহাকাব্য। বিধি বিড়ম্বিত নিয়তি তাড়িত রাবণ চরিত্রের বিয়োগ ব্যথা আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে।
তাঁর বৈষ্ণব পদাবলী অবলম্বনে লেখা ‘ব্রজাঙ্গনা কাব্য’ (১৮৬১) এবং ওভিদের ‘হেরোইদাস’ অনুসরণে লেখা ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’ (১৮৬২) উল্লেখযোগ্য। এখানে নারীদের স্বাধীন সত্ত্বা ব্যক্তিত্বের কথা আছে।
‘চতুর্দশ পদী কবিতাবলী’ (১৮৬৬) কবির গাঢ় প্রণতি প্রকাশ পায়। একটি কবিতায় কবি বিদ্যাসাগরের দানশীলতার কথা ব্যক্ত করেছেন—
‘বিদ্যাসাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে
করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে
দীন যে দীনের বন্ধু!’
হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৯০৩) বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহের সমর্থক ছিলেন। ‘বিধবা রমণী’ কবিতায় তা অভিব্যক্ত—
‘ভারতের পতিহীনা নারী বুঝি ওই রে!
নহিলে এমন দশা নারী আর কই রে;
মলিন বসনখানি অঙ্গে আচ্ছাদন,
আহাদোষ অঙ্গে নাই অঙ্গের ভূষণ।’
— হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়: ‘বিধবা রমণী’
নবীনচন্দ্র সেন (১৮৪৭-১৯০৯) ‘রৈবতক’, ‘কুরুক্ষেত্র’, ‘প্রভাস’-ত্রয়ী মহাকাব্য রচয়িতা। তাঁর ‘পলাশীর যুদ্ধ’ ঐতিহাসিক কাব্য তাঁর স্বদেশচেতনা ও দেশপ্রীতির পরিচয় বহন করে। বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ প্রচলনের তিনি সমর্থক ছিলেন। বিধবাদের প্রতি সহানুভূতি ছিল তাঁর সুগভীর ও হার্দিক। একটি দৃষ্টান্ত হল—
‘অশ্রুজলে ঢল ঢল নয়নের তারা
অকালে শিশিরে কেন সিক্ত কমলিনী?
নীলোৎপল হতে ঝরে মুকুতর ঝরা
কাহার লাগিয়া আহা! দিবস যামিনী?’
— নবীনচন্দ্র: ‘কোন এক বিধবা কামিনীর প্রতি’
রবীন্দ্রনাথ বিধবাদের প্রতি ছিলেন সহানুভূতিশীল। তিনি ‘নিষ্কৃতি’ কবিতায় বিধবা ‘মঞ্জুলী’র হৃদয়বেদনা সহৃদয়তার সঙ্গে এঁকেছেন—
‘তেরো বচ্ছরের মধ্যিখানে দুয়ার এঁটে
পলে পলে শুকিয়ে মরবে ছাতি ফেটে
একলা কেবল ওইটুকু ওই মেয়ে—’
শেষপর্যন্ত পুলিন বিধবা মঞ্জুলিকাকে বিয়ে করে ঘর ছাড়ে, কৌলিন্য প্রথার গোড়ায় কুঠারাঘাত হানে। বৃদ্ধ কুলিন বাবা সদ্য বাল্য বিবাহ করে বাড়ি ফিরে বিধবা মেয়েকে দেখতে পান না। জানলেন পরে—
‘খবর পেলেন চিঠি পড়ে
পুলিন তারে বিয়ে করে
গেছে দোঁহে দূর এলাহাবাদ চলে
সেইখানেতে ঘর পাতবে বলে
আগুন হয়ে বাপ
বরে বরে দিলেন অভিশাপ’
অন্ধ সংস্কারের মোহে বিধবা বিবাহ কুলীন বাপও মেনে নিতে পারেন না, আবার সংস্কারচ্ছন্ন কুলীন নাতি-নাতনী থাকা সত্ত্বেও গৌরীকে বিয়ে করতে বিবেক বাধে না। ‘নিষ্কৃতি’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ কৌলিন্য প্রথা, বাল্য বিধবা ও বিধবা বিবাহের দুই জীবন্ত ছবি তুলে ধরেছেন।
কবিগুরু স্বীয় পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে শেষেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও বিনয়িনী দেবীর বিধবা কন্যা প্রতিমা দেবীর সঙ্গে পুনর্বিবাহ দেন। বিদ্যাসাগরের লক্ষ্য ও আদর্শ বিশ্বকবির আন্তরিক প্রয়াসে দেশ জাতি আলোড়িত হয়।
শ্রীরামকৃষ্ণ (১৮৩৬-১৮৮৬) উনিশ শতকে ধর্মজগতে এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী নাম। তাঁর ‘যত মত তত পথ’ ধর্ম সমন্বয়ের বাণী এবং নরের মধ্যে নারায়ণ বা ‘যত্র জীব তত্র শিব’ ধর্মকথা বিশ্বের নজর কাড়ে। ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিগণ তাঁর মত ও পথ জানার জন্য ছুটে আসতেন এবং প্রীত হয়ে ফিরতেন।
শ্রীরামকৃষ্ণের প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২) বীর সন্ন্যাসী নামে খ্যাত। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের ‘যত মত তত পথ’, ‘সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম’ বা ‘যত্র জীব তত্র শিব’ এবং মানবসেবা:
‘বহু রূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর,
জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’
এই হল তাঁর প্রচারিত ধর্মের মূল কথা। এই ধর্মকথা শুনিয়ে তিনি ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব জয় করেন:
‘বীর সন্ন্যাসী বিবেকের বাণী ছুটেছে জগৎময়,’
দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধে তিনি জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেন। কর্মই ধর্ম বলে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মিশন আজ সারা বিশ্বে সেবা কার্যে ব্রতী আছে।
একদা শ্রীরামকৃষ্ণ দয়ার সাগর বিদ্যাসাগরের সঙ্গে মিলিত হন। কথাবার্তায় উভয়ের রসিকতা মেলে। পাণ্ডিত্য থাকলেও সেই পাণ্ডিত্যের অহংকার বিদ্যাসাগরের ছিল না। বিদ্যাসাগর শ্রদ্ধা ও শুচিচিত্তে পরমহংসের কথামৃত পান করেন। সৌজন্যবোধে এতটুকুও ঘাটতি ছিল না।
বিধবা বিবাহ প্রচলন, বহুবিবাহ রদ আন্দোলন:
সংস্কার আন্দোলনের এক ঝড়স্বরূপ ডিরোজিও বঙ্গদেশে এক আলোড়ন তোলেন। তাঁর উদ্যোগে ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে ‘Academic Association’ গড়ে ওঠে। হিন্দু সমাজের নানা কুপ্রথার বিরুদ্ধে ডিরোজিও ও তাঁর অনুসারীরা সোচ্চার হন। বাল্য বিবাহ, কৌলীন্য প্রথাসহ বিভিন্ন সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধেও তাঁরা জনমত গড়ে তোলেন। তত্ত্ববোধিনী সভা, সর্বশুভকরী সভা, বেথুন সোসাইটির সঙ্গেও বিদ্যাসাগরের যোগ ছিল। প্রসন্নকুমার ঠাকুর তাঁর ‘রিফর্মার’ পত্রিকায় বহুবিবাহের বিরুদ্ধে জনমত ছড়াতে সচেষ্ট হন। যোগেশচন্দ্র গুপ্তের ‘কীর্তি বিলাস’, দীনবন্ধু মিত্রের ‘জামাই বারিক’, মনোমোহন বসুর ‘প্রণয় পরীক্ষা’, রামনারায়ণ তর্করত্নের ‘কুলীন কুল সর্বস্ব’, ‘নব নাটক’, ‘উভয় সংকট’ নাটকে বাল্য বিবাহ ও বহুবিবাহ রদ এবং বিধবা বিবাহ প্রচলনের অনুকূলে মতামত পোষণ করা হয়। কিশোরীচাঁদ মিত্রের ‘সমাজোন্নতি বিধায়িনী সুহৃদ সমিতি’র পক্ষ থেকে ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে বহুবিবাহ প্রথা রদ করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা হয়।
১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে মার্চে বহুবিবাহ রদের জন্য ভারতবর্ষের ব্যবস্থাপক সভা সমাজের নজরে আনেন এবং একটি আইনের খসড়া জমা দেন। এই সময় ২৭ ডিসেম্বর ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে ঋদ্ধ পণ্ডিত সমাজসংস্কারক সরকারের সুনজরে থাকা বিদ্যাসাগর কৌলীন্য প্রথা বা বহুবিবাহ রদকরণ আইন প্রণয়ন করতে আবেদন জানান। বহুবিবাহ প্রথা রদ হওয়ার অনুকূলে মত গড়ে ওঠে। তবে ১৮৫৫-১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতে সাঁওতাল ও সিপাহি বিদ্রোহের জন্য অস্থিরতার ফলে আইনকানুন গড়া বন্ধ থাকে। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে অক্টোবর মাসে প্রাণনাথ চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে কিছু ব্যক্তি সরকারের কাছে আইনের বলে বহুবিবাহ বন্ধ করার আবেদন জানান। একই আবেদন করেন দুর্গাচরণ নন্দী।
তাঁর গোষ্ঠীর কাছ থেকেও আবেদন আসে। পাল্টা আবেদন দাখিল হয় রক্ষণশীল সমাজের তরফ থেকে। রাধাকান্ত দেব বহুবিবাহ বন্ধের বিরোধিতা করে আবেদন করেন। নীলদর্পণখ্যাত নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্রের ‘বিয়ে পাগলা বুড়ো’ প্রহসনে বহুবিবাহের ফলে সতীনদের ঝগড়ায় বুড়ো পদ্মলোচনের দুর্বিষহ জীবনযন্ত্রণা ফুটে ওঠে। প্রহসনের মধ্য দিয়ে মর্মান্তিক জীবনযন্ত্রণার বাস্তব ছবি চিত্রিত হয়।
১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯ মার্চ ভূকৈলাসের রাজা সত্যশরণ ঘোষালের নেতৃত্বে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরসহ একটি প্রতিনিধিদল ছোটোলাট স্যার সিসিল বিডনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। প্রতিনিধিদলের নেতা সত্যশরণ ঘোষাল বহুবিবাহবিরোধী আবেদনটি তাঁর হাতে তুলে দেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষক, সহপাঠী, ছাত্র এবং সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রতি আলোকপাত করা যেতে পারে।
ভরতচন্দ্র শিরোমণি (১৮০৪-১৮৭৮) প্রথিতযশা সমাজ সংস্কারক। তিনি ছিলেন বিদ্যাসাগরের শিক্ষক। ছিলেন বিদ্যাসাগরের বহুবিধ কর্মধারার সহযোগী। বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ প্রচলন ও বহুবিবাহ রোধ আন্দোলনকে তিনি সমর্থন ও সহযোগিতা করেন।
দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ (১৮১৯-১৮৮৬) ছিলেন বিদ্যাসাগরের সহপাঠী। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। সোমপ্রকাশ পত্রিকার তিনি সম্পাদক ছিলেন। সহকর্মী ও সহপাঠী বিদ্যাভূষণ সহযোগী ও সহকর্মী হিসাবে বিদ্যাসাগরের শিক্ষা সংস্কার, বিধবা বিবাহ প্রচলন এবং বহুবিবাহ রদ আন্দোলন সমর্থন করেন। তাঁর আরও একটি পত্রিকা প্রকাশ পায়, তার নাম ‘কল্পদ্রুম’।
রামনারায়ণ তর্করত্ন (১৮২২-১৮৮৬) প্রখ্যাত নাট্যকার। ‘কুলীন কুল সর্বস্ব’ (১৮৫৪) তাঁর আলোড়ন সৃষ্টিকারী নাটক। তাঁর লেখা ‘কুলীন কুল সর্বস্ব’, ‘নব নাটক’ ও ‘উভয় সংকট’ নাটকে বিধবা বিবাহ আন্দোলনের কথা আছে। তিনি নাটুকে রামনারায়ণ নামে খ্যাতি পান।
গিরিশ বিদ্যারত্ন (১৮২২-?) ছিলেন বিদ্যাসাগরের সহপাঠী। ১৮৫০-’৫২ অলঙ্কারের অধ্যাপক ছিলেন। ‘বিদ্যারত্ন যন্ত্র’ এবং পরে ‘গিরিশ বিদ্যারত্ন যন্ত্র’ নামে ছাপাখানা খোলেন। তিনি বিদ্যাসাগরের সঙ্গে বিধবা বিবাহ আন্দোলনে শামিল হন। ‘বিধবা বিষম বিপদ’ নাটক রচনা তাঁর সৃষ্টিশীল সাহিত্য রচনার স্বাক্ষর।
শিবনাথ শাস্ত্রী (১৮৪৭-১৯১৮) ছিলেন বিদ্যাসাগরের ছাত্র। তিনি বিদ্যাসাগরের আদর্শে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন এবং আত্মগ্লানি অনুভব করেন।
পরে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। পৌরসভা সংস্কার, দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন, বিদ্যালয় সংস্কার প্রভৃতি কর্মে তিনি নিয়োজিত হন। তিনি বিদ্যাসাগরের স্নেহধন্য ছাত্র। তিনি বিদ্যাসাগরের জীবনীকারও বটে। বিভিন্ন কাজে তিনি বিদ্যাসাগরের সাহায্য পেয়েছেন। প্রত্যক্ষভাবে তিনি বিদ্যাসাগরের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
রাজনারায়ণ বসু (১৮২৬-১৮৯১) ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের পিতামহ নামে খ্যাত। স্বদেশপ্রীতি ও জাতির কল্যাণ তাঁর ব্রত। শিক্ষা বিস্তার, সংগীত সাধনা, শরীরচর্চা, অশ্বারোহণ, বন্দুক চালনা, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার প্রভৃতি বিষয়ে তিনি জাতিকে উৎসাহিত করেন এবং স্বয়ং সচেষ্ট হন।
ব্রজসুন্দর মিত্র (১২২৭-১২৮২ বঙ্গাব্দ) ঢাকা নিবাসী ছিলেন। ব্রাহ্ম সমাজ গঠন, বিধবা বিবাহ প্রচলন, স্ত্রী শিক্ষা বিস্তার, বহুবিবাহ ও মদ্যপান নিবারণ প্রভৃতি কর্মে তিনি ব্রতী ছিলেন। তিনি তাঁর মেয়েদের লেখাপড়া শেখান। দুর্গামোহন দাশ (১৮৪১-১৮৯৭) পূর্ববঙ্গে বিধবা বিবাহ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এই কর্মে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন।
অতুল প্রসাদ সেন (১৮৭০-১৯৩৪) সংগীত রচয়িতা হিসাবে খ্যাত। তিনি নিজের বিধবা বিমাতাকে বন্ধু দুর্গামোহন দাশের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে বিদ্যাসাগরের আশীর্বাদধন্য হন।
রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন বিদ্যাসাগরের অন্তরঙ্গ বন্ধু। তিনি কর্মজীবনে ছিলেন বিদ্যাসাগরের অনুসারী; ভক্তও বলা চলে। তাঁর ‘শিশুশিক্ষা’, ‘নীতিবোধ’ পাঠ্যপুস্তক হিসাবে খ্যাতি পায়।
তারাশঙ্কর তর্করত্ন (১৮৫৮-?), নীলমণি বসাক (১৮০৮-১৮৬৪), রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮১৩-১৮৮৫) প্রমুখ ব্যক্তি সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; বিদ্যাসাগরের সান্নিধ্যে আসেন। তাঁদের কীর্তি অবহেলার নয়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৮৫৩-১৯৩১) বিদ্যাসাগরের কর্মযজ্ঞের জীবনযাত্রা ও সেবাপরায়ণতার চাক্ষুষ সাক্ষী। জীবনীকার বলা অসঙ্গত নয়।
জলধর সেন (১৮৬১-১৯৩৯) প্রখ্যাত সাহিত্যিক। বিদ্যাসাগরের করুণা ও দয়া যেন দীক্ষালাভ করতে সমর্থ হন। তাঁর অকৃপণ দয়ার তিনি প্রচারক। বিদ্যাসাগরের চরিত্র চিত্রণে জলধরের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের মননশীলতার তুলনামূলক বিচারে এক দুরূহ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। স্থান, কাল, পাত্রভেদে সবকিছুই পরিবর্তিত হয়। বিদ্যাসাগরের কাল থেকে একটা দশক নয়, প্রায় দুটো শতাব্দী অতিবাহিত হয়েছে। নদীতে বহু জল গড়িয়েছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন ঘটেছে। সময়ের সঙ্গে অনেক ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, এমনকি স্থান ও স্থানের নামও পরিবর্তিত হয়েছে। ধর্মীয় উগ্রতা, রাজনৈতিক আন্দোলন ও স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক চক্রান্তে বাঙালির আবেগে আঘাত হানা হয়েছে; বিদ্যাসাগরের মূর্তিও ভেঙে ফেলা হয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণের ‘যত মত তত পথ’, ‘যত্র জীব তত্র শিব’ এবং মানবসেবার আদর্শকে স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছিলেন। আজ আমরা সেই উদার মানবিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হতে বসেছি। ধর্মীয় বিভাজন ও দলাদলি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে।
বাঙালির মনন ও সংস্কৃতি থেকে বিদ্যাসাগরকে বিচ্ছিন্ন করা যায়নি। স্বামীজীর প্র্যাকটিক্যাল বেদান্ত দর্শনও তার প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। বরং সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও বিদ্যাসাগরের ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিচর্চা জাতির জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে। রাজা রামমোহন রায়, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভরতচন্দ্র শিরোমণি, দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ, রামনারায়ণ তর্করত্ন, গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্ন, শিবনাথ শাস্ত্রী, রাজনারায়ণ বসু, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ মনীষীর চিন্তা ও কর্ম উনিশ শতকের মননশীলতার এক বিস্তৃত পরিসর নির্মাণ করেছে। তাঁদের সেই মনন, সমাজসংস্কারের প্রয়াস এবং মানবিক মূল্যবোধের আলোকে বিদ্যাসাগরের বহুমুখী কর্মধারাকে বিচার করলে উনিশ শতকের নবজাগরণের তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমান সময়েও সেই মনন ও মানবিক মূল্যবোধের প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়ে যায়নি।




