খোয়াবের ভেতর ফ্রেম: স্মৃতি, জমিন ও ইতিহাসের শরীর

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচিত খোয়াবনামা বাংলা উপন্যাসের ভেতরে এমন এক বর্ণনাজগৎ নির্মাণ করে, যেখানে ইতিহাস, স্মৃতি ও লোকজ কল্পনা পরস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত। উপন্যাসটি পাঠ করতে গিয়ে বোঝা যায়, এখানে ঘটনাপ্রবাহের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সেই চেতনার বিন্যাস, যার মধ্য দিয়ে একটি জনপদের জীবন, তার ভয়, আকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়। এই লেখায় উপন্যাসটির সেই বর্ণনাশৈলী, ইতিহাসচেতনা এবং বাস্তব ও কল্পনার পারস্পরিক সম্পর্ককে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।

ইতিহাস সবসময় সরলরেখায় চলে না; তার ভেতরে জমে থাকে স্মৃতির স্তর, লোককথার ধুলো, আর বাস্তবতার সঙ্গে মিশে যাওয়া স্বপ্নের ভাঙা ভাঙা টুকরো। কখনো সেই ইতিহাস কাগজে লেখা থাকে, কখনো আবার মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়, রূপ বদলায়, কিন্তু থামে না। এই ভাঙাচোরা স্মৃতি আর জীবনের অসম্পূর্ণ বয়ানই শেষ পর্যন্ত একটি জনপদের সবচেয়ে সত্যিকার ভাষা হয়ে ওঠে। বিক্ষিপ্ত অথচ গভীর ইতিহাস চেতনার ভেতর দাঁড়িয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা এমন এক বর্ণনাজগৎ নির্মাণ করে যে- বিলের পানি দেখা যায় না শুধু, তার গন্ধও পাওয়া যায়। মানুষের ভয় শুধু বোঝা যায় না, তা পাঠকের শরীরেও জমে থাকে। সেখানে বাস্তবতা আর কল্পনা আলাদা দুই প্রান্ত নয়; বরং একই স্রোতের ভেতরে মিশে থাকা দুই প্রবাহ।

আর এই প্রবাহ কেবল একটি উপন্যাস নয়। এটি এমন এক বর্ণনামূলক অভিজ্ঞতা, যেখানে লেখা ধীরে ধীরে দৃশ্য হয়ে ওঠে, আর পাঠক অজান্তেই দর্শকে রূপান্তরিত হয়। এর গদ্য এতটাই ঘন, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এবং চলমান যে পড়তে পড়তে মনে হয় কোনো স্থির সাহিত্য নয়, বরং একটি দীর্ঘ, অনির্বচনীয় চলচ্চিত্রের ভেতর দিয়ে আমরা হাঁটছি। যেখানে ক্যামেরা কখনো মাটির খুব কাছে, কখনো মানুষের মুখ বরাবর তাক করা, আবার কখনো ইতিহাসের অদৃশ্য শ্বাসের ওপর দারুণ একটা লং শট। উপন্যাস নামক এই সিনেমাটিক টেক্সটে আরো আছে– দৃশ্য নির্মাণ, আলো-ছায়ার টানাপোড়েন, শব্দের ভেতরের নীরবতা এবং লোকজ বাস্তবতার কাঁচা রং যা বস্তুত একত্রে একটি ভিজ্যুয়াল স্মৃতি নির্মাণ করে। এখানে দৃশ্য নির্মিত হয় অবিচ্ছিন্ন সিকোয়েন্সের মতো, এডিটিংয়ের কাটের চেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে মিজ-আঁ-সিনের সুবিন্যস্ত বিন্যাস। বর্ণনার দৃষ্টিকোণ কখনো হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরার মতো অস্থির ও অন্তরঙ্গ, আবার কখনো ডীপ ফোকাস শটে বিস্তৃত জনপদকে একসঙ্গে ধরে রাখে। সময় এখানে লিনিয়ার নয়। বরং জাম্প কাট, ফ্ল্যাশব্যাক এবং সাবজেক্টিভ ফ্রেমিংয়ের মতো ভেঙে ভেঙে প্রবাহিত হয়। স্মৃতি নিজেই একটি এডিটিং টুল হয়ে ওঠে। ফলে খোয়াবনামা কেবল সাহিত্যিক টেক্সট থাকে না। এটি হয়ে যায় এক ধরনের নন-লিনিয়ার সিনেমাটিক অভিজ্ঞতা, যেখানে পাঠক একই সঙ্গে দর্শক এবং ক্যামেরার চোখ।

এই সিনেমাটিক বর্ণনার ভেতরেই খোয়াবনামা তার ম্যাজিক রিয়েলিজম নির্মাণ করে। তবে এখানে ম্যাজিক রিয়েলিজম কোনো আমদানি করা কৌশল নয়। এটি গ্রামীণ বাংলার চেতনার স্বতস্ফুর্ত ভাষা। মৃত মানুষ ফিরে আসে, পীরের অলৌকিকতা বাস্তব রাজনৈতিক ঘটনার চেয়ে বেশি সত্য হয়ে ওঠে, আর স্বপ্ন এমনভাবে কাজ করে যেন তা সমাজের বিকল্প বাস্তবতা। এখানে বাস্তবতা আর অলৌকিকতা আলাদা দুই জগত বলার চেয়ে একই স্রোতের দুই ভিন্ন ঘূর্ণি বলাটাই বেশি যুক্তিযুক্ত ঠেকে। এই নির্মাণশৈলীর কারণে খোয়াবনামাকে বিশ্ব সাহিত্যের বৃহত্তর ধারার সঙ্গে তুলনা করা যায়। এর ভেতরে যেমন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের One Hundred Years of Solitude-এর মতো সময়ের চক্রাকারতা ও স্মৃতির পৌরাণিকতা আছে, তেমনি উইনাম ফকনারের ভাঙ্গা সময়চেতনা এবং বহুস্বরিক বর্ণনার প্রতিধ্বনিও পাওয়া যায়। তবে পার্থক্য হলো ইলিয়াসের জগৎ কোনো কল্পিত মাকোন্দো নয়। এটি সরাসরি বাংলার মাটি, যেখানে ইতিহাস কোনো রূপক নয়, বরং শ্রেণি শোষন, রক্ত, ক্ষুধা এবং জমিনের বাস্তব রাজনীতি।

সেই রাজনীতির কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে শোষণ ও প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস। উপন্যাসে বারবার ফিরে আসে শোষকের চরিত্র। কালাম মাঝি, শরাফত মণ্ডলের মতো চরিত্ররা, চরিত্রকে ছাপিয়ে দীর্ঘ ও চলমান সামন্ততান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামোর রূপ হিসেবে উপস্থাপিত হয়। তাদের ক্ষমতা দৃশ্যমান, দৈনন্দিন, এবং প্রায় স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে তমিজ, কুলসুম, বৈকুণ্ঠ, কিংবা তমিজের বাপের মতো চরিত্ররা সেই ইতিহাসের নিচে চাপা পড়া জীবন। তাদের অস্তিত্বই বয়ে বেড়ায় শোষণের নীরব সাক্ষ্য। আবার এই কাঠামোর ভেতরেই এক ধরনের ভান ও ছদ্ম-চেতনার চরিত্র উঠে আসে, যেমন কেরামত। কেরামতদের উপস্থিতি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের জগতে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তারা কখনো ধর্মীয়, কখনো রাজনৈতিক, আবার কখনো নৈতিকতার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা এক ধরনের কৌশলী বয়ান নির্মাণ করে। এই ভান-নির্মাণই দেখায় কীভাবে ক্ষমতা শুধু শোষণ করে না, বরং নিজেকে বৈধও করে তোলে। এই দ্বন্দ্ব কোনো সরল নৈতিক বিভাজন নয়। ইলিয়াস শোষককে কার্টুনিশ খলনায়ক বানান না, আবার শোষিতকে কেবল করুণার পাত্রও করেন না। তিনি দেখান কীভাবে ক্ষমতা এবং বঞ্চনা একটি সামাজিক স্বাভাবিকতার মতো কাজ করে। সেখানে শোষণ এমন নিত্যদিনকার ঘটনা যে তা আর ব্যতিক্রম নয়, বরং একপ্রকার নিয়ম।

নিয়মের ভেতরেই প্রবাহিত হয় আরেকটি বৃহত্তর ইতিহাস। বাংলা ভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং উপনিবেশোত্তর ভাঙনের রাজনীতি। খোয়াবনামা-র জগতে রায়ট কেবলই একটা ঐতিহাসিক ঘটনা ছাড়াও এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ফাটল। যেখানে দীর্ঘদিনের সহাবস্থান হঠাৎ করে বিভাজনের ভাষায় রূপ নেয়। মানুষ জমির জন্য লড়তে লড়তে হঠাৎ ধর্মের নামে বিভক্ত হয়ে পড়ে, আর শোষণের অর্থনৈতিক কাঠামো ঢেকে যায় পরিচয়ের রাজনৈতিক পর্দায়। এই জায়গাতেই উপন্যাসটি তার সবচেয়ে গভীর ট্র্যাজেডি নির্মাণ করে। মানুষ জানে না তারা আসলে কিসের বিরুদ্ধে লড়ছে। জমির শোষণ, না পরিচয়ের বিভাজন? এই অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়েই ইতিহাস এগিয়ে যায়, কিন্তু কোনো মুক্তির নিশ্চয়তা তৈরি করে না। তবে খোয়াবনামার সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এই- এটি ইতিহাসকে স্থির সত্য হিসেবে দেখায় না। ইতিহাস এখানে একটি চলমান দৃশ্যপট, যেখানে প্রতিটি চরিত্র একই সঙ্গে ভুক্তভোগী, অংশগ্রহণকারী এবং স্মৃতির বাহক। তাই উপন্যাসটি শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান দেয় না। একটি দীর্ঘ, অসমাপ্ত দৃশ্যের মতো পাঠককে দাঁড় করিয়ে রাখে। সেখানে ক্যামেরা থেমে যায় না,শুধু বদলে যায় দৃষ্টিকোণ। এই অর্থে খোয়াবনামা সাহিত্যকর্মকে ছাপিয়েও সিনেমাটিক ইতিহাসচর্চা হয়ে উঠে যেখানে স্বপ্ন, রাজনীতি, লোকবিশ্বাস এবং সহিংসতা একই ফ্রেমে সহাবস্থান করে। আর সেই ফ্রেমের ভেতর দিয়ে আমরা দেখি ইতিহাস কখনো সরল নয়, এটি সবসময়ই ভাঙা আলো, কাঁপা ছবি, এবং কতগুলো অসমাপ্ত খোয়াবের সমষ্টি।

শেষভাগে এসে ইলিয়াস এক ধরনের বংশপরম্পরাগত স্বপ্নের রূপক নির্মাণ করেন, যা উপন্যাসের সবচেয়ে কাব্যিক ও গভীর অংশগুলোর একটি। জোনাকির আলোর হেঁশেলের ক্ষীণ আভায় ফুলজান, আর তার মেয়ে সখিনার উপস্থিতি যেন দীর্ঘ এক স্মৃতিপ্রবাহের ধারাবাহিকতা। চেরাগ আলী থেকে শুরু হয়ে তমিজের বাপ, এবং তার পর তমিজের মেয়ে সখিনা– এ এক অনন্ত উত্তরাধিকার, যেখানে স্বপ্ন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান। এ যেন কোনো ব্যক্তিগত কাহিনি নয়, বরং বংশপরম্পরায় বহমান একটি খোয়াব, যার নামা যুগে যুগে বয়ে চলে করোতোয়া নদীর মতো। কখনো খরস্রোতা, কখনোবা ভীষণ শান্ত, কিন্তু থেমে থাকে না কখনোই । এই বহমান খোয়াবের নদীই শেষ পর্যন্ত উপন্যাসকে একটি চূড়ান্ত প্রতীকে রূপ দেয়, যেখানে ইতিহাস আর ব্যক্তিগত জীবন আলাদা থাকে না; তারা একই স্রোতের অংশ হয়ে যায়।

এইভাবে খোয়াবনামা শেষ পর্যন্ত কোনো সমাপ্তি নয়। জোনাকির ঝাঁক তার পাখায় পাখায় আগুন নিয়ে গোটা মোষের দিঘীর অন্ধকার পেরিয়ে পাঠককে ধীরে ধীরে আসমানের চাঁদের দিকে টেনে নিয়ে যায়। আর সেই রেশ সুধাধারার মতো, আউশ ধানের ঘ্রাণের মতো পাঠকের ভেতরে দীর্ঘকাল জ্বলে থাকে কিইবা তারও বেশি আবিষ্ট করে রাখে। শেষ পৃষ্ঠা পেরিয়েও তাই খোয়াব ফুরায় না; তা উত্তরাধিকারের মতো সঞ্চারিত হয় এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে, এক শরীর থেকে আরেক শরীরে, এক ইতিহাস থেকে আরেক ইতিহাসে।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!