জাহানারা ইমামের কলমে একাত্তর

ইতিহাস শুধু রাষ্ট্রের নথিতে লেখা হয় না। ইতিহাস লেখা হয় মানুষের জীবনেও। সেই ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল দলিল একাত্তরের দিনগুলি। একজন শিক্ষিকা, একজন মা এবং একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে জাহানারা ইমাম মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোকে যেভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সংযোজন এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তাই তাঁকে শুধু ‘শহীদ জননী’ পরিচয়ে স্মরণ করলে তাঁর সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক অবদানের একটি বড় অংশ আড়ালেই থেকে যায়। তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়, তিনি ছিলেন একাত্তরের এক অনন্য দিনলিপিকার।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বহু স্মৃতিকথা, গবেষণাগ্রন্থ ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে। এসব গ্রন্থ যুদ্ধের রাজনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট বুঝতে সাহায্য করে। কিন্তু একটি জাতির ইতিহাস শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে রচিত হয় না। ইতিহাস রচিত হয় মানুষের ঘরে, পরিবারের ভেতরে, প্রতিদিনের জীবন, উদ্বেগ, অপেক্ষা, ক্ষতি ও প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে। সেই ইতিহাসকেই শব্দে ধারণ করেছেন জাহানারা ইমাম।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি নিয়মিত দিনলিপি লিখেছিলেন। ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সেই দিনলিপি একাত্তরের দিনগুলি নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। যুদ্ধ চলাকালেই লেখা এই দিনলিপিতে প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও পর্যবেক্ষণ ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। একাত্তরের দিনগুলি ব্যক্তিগত স্মৃতিকথার পাশাপাশি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক দলিল।

জাহানারা ইমামের লেখায় যুদ্ধকে কোনো অলঙ্কারময় ভাষায় উপস্থাপন করা হয়নি। তিনি দেখিয়েছেন, যুদ্ধ কীভাবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বদলে দেয়। ঢাকার রাস্তাঘাট, মানুষের আতঙ্ক, গুজব, গণহত্যার খবর, স্বাধীনতার প্রত্যাশা, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে উৎকণ্ঠা এবং পরিবারের নীরব কথোপকথন, সবকিছুই তাঁর লেখায় স্বাভাবিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। এই সংযত বর্ণনাভঙ্গিই তাঁর দিনলিপিকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে।

এই গ্রন্থের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অধ্যায়গুলোর একটি তাঁর পুত্র শফি ইমাম রুমীকে ঘিরে। একজন মা হিসেবে তাঁর উৎকণ্ঠা, ছেলের সিদ্ধান্তকে সম্মান করার সাহস, গ্রেপ্তারের পর অনিশ্চয়তার দীর্ঘ সময় এবং শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত বেদনা, সবকিছুই গভীর সংযমের সঙ্গে উঠে এসেছে। তিনি ব্যক্তিগত শোককে কখনো আবেগের অতিরঞ্জনে রূপ দেননি। সেই কারণেই তাঁর লেখা একজন মায়ের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সীমা অতিক্রম করে মুক্তিযুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দলিলে পরিণত হয়েছে।

স্বাধীনতার পরও জাহানারা ইমামের ভূমিকা থেমে থাকেনি। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ইতিহাস সংরক্ষণ এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ব্যক্তিগত শোক তাঁকে নিভৃত করেনি; বরং স্বাধীনতার ইতিহাসকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষার প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। দীর্ঘ অসুস্থতার মধ্যেও সেই অবস্থান থেকে তিনি সরে আসেননি।

জাহানারা ইমামের সাহিত্যিক পরিচয়, তাঁর দিনলিপি এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী নাগরিক ভূমিকা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একাত্তরের দিনগুলি ব্যক্তিগত স্মৃতিকথার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নাগরিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এই গ্রন্থে সংরক্ষিত অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও সময়ের ভাষ্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে এই অসামান্য লেখক, শিক্ষাবিদ এবং একাত্তরের দিনলিপিকারকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।# 

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on print
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!