বিধবাবিবাহের সমর্থনে ঊনিশ শতকের বাঙালি কবিরা একাধিক কাব্য লিখেছিলেন। এবিষয়ে বিপিনবিহারী গুপ্ত লিখিত ‘পুরাতন প্রসঙ্গ’ গ্রন্থটি থেকে জানা যায় যে, বাংলায় বিধবাবিবাহ আন্দোলনের উদ্যোক্তা পণ্ডিত বিদ্যাসাগরকে ব্যঙ্গ করে সেযুগের স্বভাবকবি ধীরাজ ‘বিদ্যাসাগরের বিদ্যে বোঝা গিয়েছে’ শিরোনামের প্রথম গানটি রচনা করেছিলেন, এবং কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য জানিয়েছিলেন যে, অশ্লীল ও রুচিবিগর্হিত এই গানটি ধীরাজের কণ্ঠে শুনে স্বয়ং বিদ্যাসাগরও আনন্দ পেয়েছিলেন। (পুরাতন প্রসঙ্গ, বিপিনবিহারী গুপ্ত, শ্রীবিশু মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত, পৃ- ৫২) অন্যদিকে সমকালে নদিয়ার শান্তিপুরের তাঁতিরা সুযোগ বুঝে তাঁদের তৈরি কাপড়ের পাড়ে—
“বেঁচে থাকুক বিদ্যাসাগর চিরজীবী হয়ে
সদরে করেছে রিপোর্ট বিধবাদের হবে বিয়ে”
—গানটি ছাপিয়ে বেশ দু’পয়সা রোজগার করে নিয়েছিলেন। ঠিক একইসময়ে এই জনপ্রিয় গানটিকে ব্যঙ্গ করে বিধবাবিবাহের বিরোধীপক্ষরা “শুয়ে থাক বিদ্যাসাগর চিররোগী হয়ে” শিরোনামের অন্য একটি গানও প্রচার করেছিলেন। বস্তুতঃ সেকালের বাংলায় বিধবাবিবাহ নিয়ে এরকম অজস্র গান পল্লীবাংলার আনাচে-কানাচে লোকের মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল, এবং সাধারণ গৃহস্থঘরের বউ-ঝি থেকে শুরু করে গোরুর গাড়ির গাড়োয়ান পর্যন্ত সকলের মুখে মুখে তখন এই গানগুলি শোনা গিয়েছিল। এছাড়া বিদ্যাসাগরের জীবনীকার বিহারীলাল সরকার জানিয়েছিলেন যে, তখন পল্লীগ্রামের চাষাভূষোর মধ্যে বিদ্যাসাগর ‘বিধবার বিয়ে দেওয়া বিদ্যাসাগর’ নামেই পরিচিত হয়ে গিয়েছিলেন। (বিদ্যাসাগর, বিহারীলাল সরকার, ৪র্থ সংস্করণ, পৃ: ২৯৬-৯৭)
এরপরে পাঁচালিকার দাশরথি রায় (১৮০৬-৫৭) ‘বিধবাবিবাহ পালা’ নামের একটি পালাগান রচনা করেছিলেন। যদিও গবেষকদের মতে, মোট ছ’টি গীত সম্বলিত এই পালাগানটিতে দাশরথি রায়ের রক্ষণশীল মনোভাবের পরিচয় থাকলেও বিধবাবিবাহ আন্দোলনের প্রতি তাঁর কৌতুকমিশ্রিত সমর্থনকে অস্বীকার করা চলে না, কিন্তু তবুও দাশরথি-গবেষক হরিপদ চক্রবর্তী এটিকে পালা না বলে সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ওপরে তৈরি একটি নকশা বলেই নিজের মতপ্রকাশ করেছিলেন। (দাশরথি রায় ও তাঁর পাঁচালী, ডঃ হরিপদ চক্রবর্তী, ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ, পৃ- ৩৬৮) তাছাড়া সমকালে ‘গুপ্তকবি’ ঈশ্বর গুপ্তের কাব্যেও বিধবাবিবাহ আন্দোলন প্রতিফলিত হয়েছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়। যেহেতু বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত নাকি শাস্ত্রবিরোধী—এবিষয়ে তখন দীর্ঘদিন ধরে শাস্ত্রবিচার চলেছিল এবং সেই বিচারের অবসান হতে না হতেই বিধবাবিবাহ আইনতঃ পাস হয়ে গিয়েছিল, সেহেতু তিনি খেদ করে কাব্য করেছিলেন—
“না হইতে শাস্ত্রমতে বিচারের শেষ।
বল করি করিলেন আইন আদেশ।”
(বিধবাবিবাহ আইন, ঈশ্বর গুপ্তের গ্রন্থাবলী, বসুমতী সাহিত্য মন্দির সংস্করণ, পৃ- ১২৩)
এমনকি বিধবাবিবাহ প্রচলিত হলে সমাজে কি ধরণের হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, এসম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন—
“কোলে কাঁকে ছেলে ঝোলে যে সকল রাঁড়ী
তাহারা সধবা হবে প’রে শাঁখা শাড়ী।”
(বিধবাবিবাহ আইন, ঈশ্বর গুপ্তের গ্রন্থাবলী, বসুমতী সাহিত্য মন্দির সংস্করণ, পৃ- ১২৩)
এসব ছাড়াও, ‘শরীর পড়েছে ঝুলি চুলগুলি পাকা’—এমনতর বিধবাদের পুনর্বিবাহের সম্ভাবনাও তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়। (বিধবাবিবাহ, ঈশ্বর গুপ্তের গ্রন্থাবলী, বসুমতী সাহিত্য মন্দির সংস্করণ)
গবেষকদের একাংশের মতে, ঊনিশ শতকের বাংলার বিধবাবিবাহ আন্দোলন সমকালীন হিন্দুসমাজে একটা গুরুতর পরিবর্তনের সূচনা করলেও, এই পরিবর্তন আদতে মঙ্গলের কিংবা অমঙ্গলের, অথবা এই পরিবর্তন হিন্দুসমাজের প্রতিষ্ঠায় কোন ফাটল ধরাবে নাকি হিন্দুসমাজকে আরও দৃঢ়তরভাবে প্রতিষ্ঠা করবে—ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের মধ্যে এবিষয়ে বিচার করবার মত দূরদৃষ্টির যথেষ্ট অভাব ছিল। প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, সেকালের বাল্যবিধবাদের দুঃখও কিন্তু কোনভাবেই তাঁকে বিচলিত করতে পারেনি। বস্তুতঃ নারীর সতীত্ব সম্বন্ধে এর আগে থেকেই তাঁর মনে যে আদর্শ গড়ে উঠেছিল, সেটার কোন ধরণের ব্যতিক্রমকে তিনি কখোনোই সমর্থন করতে পারেননি। আর একারণেই নিজের কাব্যের একজায়গায় তিনি লিখেছিলেন—
“বিবাহ করিয়া তারা পুনর্ভবা হবে।
সতী ব’লে সম্বোধন কিসে করি তবে?”
(বিধবাবিবাহ আইন, ঈশ্বর গুপ্তের গ্রন্থাবলী, বসুমতী সাহিত্য মন্দির সংস্করণ, পৃ- ১২৩)
আর খুব সম্ভবতঃ একারণেই পাঁচালিকার দশরথি রায় ঈশ্বর গুপ্তের বিধবাবিবাহ আইন ও বিধবাবিবাহ শিরোনামের কবিতা দুটি নিয়ে অভিযোগ করে লিখেছিলেন—
“ঈশ্বর গুপ্ত অলপেয়ে।
নারীর রোগ বুঝে না বৈদ্য হয়ে।”
কিন্তু এটাকে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের আসল পরিচয় বলা যেতে পারে না। কারণ, সমকালীন ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, তিনি প্রগতিশীল ব্রাহ্মদের নিকট সান্নিধ্যে এসেছিলেন এবং অক্ষয়কুমার দত্ত, দীনবন্ধু মিত্র প্রমুখ সমকালীন ব্যক্তিরাও তাঁর সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় প্রায় নিয়মিতভাবেই লিখতেন। এছাড়া তিনিই অক্ষয়কুমার দত্তর সাথে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। ঊনিশ শতকের বাংলায় তিনি যে একজন ‘Progressive’ চিন্তাধারার অধিকারী ব্যক্তি ছিলেন, একথার প্রমাণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, তিনি সেকালের ‘Society for the Acquisition of general knowledge’ নামক প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গেও কিছুদিন ধরে যুক্ত ছিলেন। এমনকি ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে তেমন কোন জ্ঞান না থাকলেও তিনি তাঁর সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় ‘Tom Paine’ লিখিত ‘Age of Reason’–এর বঙ্গানুবাদ প্রকাশ করেছিলেন। অন্যদিকে চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন যে, বিধবাবিবাহ বিষয়ক আইনের জন্য ব্যবস্থাপক সভায় প্রেরিত আবেদনপত্রে গুপ্তকবিও সই করেছিলেন। তাছাড়া প্রথম বিধবাবিবাহ অনুষ্ঠানে তিনিও উপস্থিত ছিলেন, এবং ১৮৫৫ সালের ৮ই ও ৯ই ফেব্রুয়ারি তারিখের সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ গ্রন্থ সম্পর্কে তিনি একাধিকবার সশ্রদ্ধ উক্তি তো করেছিলেনই, এমনকি সেকালে এধরণের পুস্তক প্রকাশিত করবার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছিলেন। সমকালে ‘অহং যথার্থবাদী’ ছদ্মনামের আড়ালে ‘বন্ধু হইতে প্রাপ্ত’ শিরোনামের প্রবন্ধে বিধবাবিবাহ চালু না থাকবার ফল আলোচনা করে ‘ধর্মানুরঞ্জিকা’ পত্রিকার সম্পাদক যেভাবে বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ বিষয়ক গ্রন্থের প্রতি কটূক্তি নিক্ষেপ করে শিষ্টাচারের বিধি লঙ্ঘন করেছিলেন, ১৮৫৫ সালের ৭ই মার্চ তারিখে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তাঁর সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় এবিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ না করে থাকতে পারেননি বলেই দেখা যায়। সুতরাং সবমিলিয়ে সমাজসচেতন, সহানুভূতিশীল, যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তকে কিন্তু সেযুগের রক্ষণশীলদের দলভুক্ত করাটা অবাঞ্ছনীয় ও অন্যায় বলেই মনে হয়। গবেষকদের মতে, সাধারণ জ্ঞানোপার্জিকা সভা বা ‘Society for the Acquisition of general knowledge’ থেকে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ও পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে যে পরিচয়ের সূত্রপাত ঘটেছিল, পরবর্তীকালে সেটাই তাঁদের উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের কারণ হয়ে উঠেছিল। ঈশ্বর গুপ্ত যেহেতু সেকালের একজন বৈঠকী মানুষ ও আড্ডাবাজ স্বভাবকবি ছিলেন, সেহেতু বিধবাবিবাহ আন্দোলন একদিকে যখন তৎকালীন হিন্দুসমাজে ঝড়ের সৃষ্টি করেছিল এবং এই আন্দোলন নিয়ে পণ্ডিতেরা যখন একের পর এক শাস্ত্রের পৃষ্ঠা উল্টাতে ব্যস্ত ছিলেন ও অন্যদিকে এই আন্দোলন যখন সমাজের একাংশের মানুষের কাছে গালগল্প হাসিঠাট্টার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখন বৈঠকী মানুষ ঈশ্বর গুপ্ত যদি এসব নিয়ে পরিহাসের সুরে দু’-চারটি কবিতা লিখেও থাকেন, তাহলেও সেসব কিছুতেই তাঁর রক্ষণশীল তাঁর চিন্তাভাবনার পরিচায়ক হতে পারে না। বস্তুতঃ ইতিহাস একথাই বলে যে, সংবাদ প্রভাকর পত্রিকার সম্পাদক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত কখনোই তাঁর নিজের সম্পাদকীয় নিরপেক্ষতাকে বিসর্জন দেননি; আর তাই তাঁর পত্রিকায় একদিকে যেমন বিধবাবিবাহের সমর্থনে বিভিন্ন লেখা প্রকাশিত হয়েছিল, অন্যদিকে তেমনি বিধবাবিবাহের বিপক্ষে থাকা ঠাকুরদাস ন্যায়পঞ্চাননের মত রক্ষণশীল ব্যক্তির লেখা ছাপাতেও তিনি কোন দ্বিধাবোধ করেননি। (বাংলায় নবচেতনার ইতিহাস, ডঃ স্বপন বসু, ১৯৭৫ সাল, পৃ- ২৬১) শুধু পরিহাসপটু ও আড্ডাবাজ এই স্বভাবকবি তখন মাঝে মাঝেই বিদ্যাসাগরকে নিয়ে পরিহাস করবার লোভ সামাল দিতে না পেরে লিখেছিলেন—
“যে সাগরে কূল নাই, তরি নাই, তরি।
বাপ বাপ সে সাগরে দণ্ডবৎ করি।”
তবে অন্যদিকে পরিহাস ছেড়ে বিধবাবিবাহের পক্ষ নিয়ে ১৮৫৫ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি তারিখের (৫১৫৩ সংখ্যার) সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় এই একই ব্যক্তি যখন লিখেছিলেন—
“পণ্ডিতবর শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় বিধবাবিবাহের কর্তব্যতা বিষয়ে যে পুস্তক প্রকাশ করিয়াছেন, তাহা অতি উত্তম হইয়াছে, ঐরূপ পুস্তক সকল প্রকাশ পূর্বক বিধবা মহিলাগণের বিবাহ বিষয়ে সাধারণের উৎসাহ বৃদ্ধি করা অতি আবশ্যক বলিতে হইবেক, যেমত কোন তরু রোপণ করিয়া অনবরত যত্নবারি সেচন না করিলে তাহার ফল দৃষ্টি হয় না, সেইরূপ কোন গুরুতর কর্মসাধন বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা ও পরিশ্রম প্রভৃতির আবশ্যক করে, কঠিনতর কার্যসকল কোন মতেই অনায়াসে সাধ্য হইতে পারে না।”
—তখন তাঁকে অন্ততঃ বিধবাবিবাহের বিরোধী বলে চিহ্নিত করলে সেটা ইতিহাসকেই অবমাননা করা হয়।
যাই হোক, বিধবা নারীদের বৈধব্যের দুঃখযন্ত্রণাও সেকালের বাঙালি কবিদের কাব্য রচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, বিধবাবিবাহ আইন পাস হওয়ার পরে দু’-চারজন বিধবার বিবাহ হলেও, সমকালীন সমাজমন কিন্তু এই পরিবর্তনকে তখন স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। আর একারণেই সমকালীন কবিরা তাঁদের কাব্যে অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে সেযুগের নারীর বৈধব্যজীবনের অসহায়তার করুণ ছবি অঙ্কিত করে বিধবাবিবাহের পক্ষে মানুষের সামাজিক সমর্থন আদায় করবার চেষ্টা করেছিলেন। এপ্রসঙ্গে প্রথমেই এখানে কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের (১৮৩৭-১৯০৯) ‘বঙ্গবিধবা’ কবিতাটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেযুগের বঙ্গবিধবাদের শুষ্ক মুখ, এলায়িত কুন্তল ও আভরণহীন দেহ সন্দর্শন করে অত্যন্ত আহত হয়ে এই কবি লিখেছিলেন—
“কে রে এ রমণী সদা বিষাদিনী
দুলিছে কণ্ঠেতে বিষাদের মালা,
বিষাদিত বাণী কার ওষ্ঠে শুনি
বিষাদ পাথারে ডুবেছে রে বালা।
…
এলায়িত বেণী কালভুজঙ্গিনী
সমরে দংশিছে নিতম্ব মাঝারে
কুঞ্চিত কপাল হায় রে কপাল।
ভেঙ্গেছে কপাল কাল পদ ভরে।
…
হারায়েছে সতী প্রাণ পতিধন
হরে নিল বিধি অবলা রতন,
তাই রে ভাসিছে নয়ন সলিলে
জুড়াও বালারে সুমধুর বোলে।”
(বঙ্গবিধবা, কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার)
এছাড়া তৎকালীন সমাজের একশ্রেণীর মানুষের হৃদয়হীনতাকেই এই কবি সেযুগের বিধবার দুঃখকষ্টের মূল কারণ বলে মনে করে তাঁদের হৃদয়ে বিধবাদের জন্য সহানুভূতি উদ্রেক করবার উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন—
“এ বিষাদ ছবি নয়নে হেরিলে
দহে না কি হৃদি অনুতাপানলে?
রে ভারতবাসী তাই বলি তোরে
রেখো না এ ছবি নয়ন অন্তরে।
কে রাখিবে এবে তোরা না রাখিলে,
কে দিবে রে অন্ন বদন কমলে,
কে ঢাকিবে আর বারিদ নয়নে,
এ সারল্য ছবি ভুল না জীবনে।”
(বঙ্গবিধবা, কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার)
এরপরে ১২৮৯ বঙ্গাব্দে সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৮৩৭-৭৮) লিখিত ‘মহিলা’ শিরোনামের কাব্যেও এই একই বক্তব্যের প্রতিফলন দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। যেহেতু এই কবি ভালো করেই জানতেন যে, সমাজের স্বার্থে শাস্ত্রীয় অনুশাসনের পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী এবং হিন্দুসমাজ ও পরিবারের স্বার্থে বিধবাবিবাহ প্রচলনও অনিবার্য, সেহেতু শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে তখন যাঁরা বিধবাবিবাহের বিরোধিতা করছিলেন, সে সমস্ত অপরিণামদর্শী ব্যক্তিদের প্রতি নিজের আন্তরিক বিদ্বেষ ও ঘৃণার অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে নিজের কবিতার একজায়গায় তিনি লিখেছিলেন—
“শাস্ত্রের বিধানে যদি কর কেহ বল,
নয় শাস্ত্রে অনুরাগ কেবল সে ছল।
পালিতেছে শাস্ত্রের বিধান কোন্ জনা
ব্রাহ্মণের ক্রিয়া যাহা,
ব্রাহ্মণ কি করে তাহা,
তবে কেন কর শুধু অবলা পীড়ন।
বিশেষতঃ শাস্ত্র মর্ম বুঝে কয়জন।”
(মহিলা, সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার)
তাছাড়া কবিতার মাধ্যমে সেকালের হিন্দুসমাজের বিধবা সমস্যার বাস্তবচিত্র প্রতিফলিত করবার বিষয়েও উক্ত কবিতাটিতে এই কবির তীক্ষ্ণ সমাজসচেতনার পরিচয় পাওয়া যায়।
“বয়স্থা বিধবা নারী ঘরে আছে যার,
দেখ দেখি কোন্ দিন সুখ আছে তার।
পিতামাতা দহিতে সে জ্বলন্ত অনল।
অন্তরের ক্ষোভ ভরে,
সদা সে কলহ করে,
জ্বালাতন করিবারে সদা চায় ছল,
যারে সুখী দেখে তারে ভাবে পরদল॥”
(মহিলা, সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার)
সাহিত্য সমালোচকরা অনুমান করে থাকেন যে, উদ্দেশ্যমূলক এই কবিতাটি সমকালীন চিন্তাশীল জনমানসে অনুরূপ চিন্তাভাবনার বিকাশে অনেকাংশে সহায়ক হয়েছিল।
এবারে আলোচ্য প্রসঙ্গে এখানে কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৯০৩) লিখিত ‘বিধবা রমণী’ কবিতাটির কথা উল্লেখ্য, যাতে বিধবাবিবাহ আন্দোলন প্রতিফলিত হয়েছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, হেমচন্দ্রের এই কবিতাটি প্রথোম ১২৭৫ বঙ্গাব্দের ১৬ই ফাল্গুন তারিখের ‘এডুকেশন গেজেট’ পত্রিকায় ‘বিধবা’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল। উক্ত কবিতাটির প্রথম ছত্রে সেকালের যৌবনবতী বিধবার রূপবর্ণনার মধ্যে দিয়ে এই কবির হৃদয়বেদনার যে পরিচয় পাওয়া যায়, সেটা নিম্নরূপ—
“আহা কি চাঁচর কেশ পড়েছে এলায়ে
আহা কি রূপের ছটা গিয়াছে মিলায়ে।
কি নিতম্ব কিবা উরু, কিবা চক্ষু কিবা ভুরু,
কি যৌবন মরি মরি শোকে দগ্ধ হয় রে।”
(বিধবা রমণী, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)
নারীর প্রতি কবির এই বেদনাবোধই কবিতাটির পরবর্তী অংশে তাঁকে সেযুগের বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার করে তুলেছিল, এবং তিনি লিখেছিলেন—
“পুরুষ দুদিন পরে আবার বিবাহ করে,
অবলা রমণী বলে এতই কি সয় রে?”
(বিধবা রমণী, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)
এরপরে সেকালের নিষ্ঠুর দেশাচারের প্রতি অন্ধ আনুগত্যই হিন্দুদের দুর্গতির মূল কারণ বলে মনে করে এই কবি তখনকার প্রচলিত সমাজব্যবস্থার প্রতি নিজের ক্ষোভপ্রকাশ করতে গিয়ে বলেছিলেন—
“ঈশ্বর থাকেন যদি, করেন বিচার,
করিবেন দৌরাত্ম্য সমূলে সংহার,
অবিলম্বে হিন্দুধৰ্ম্ম ছারখার হবে।
হিন্দুকুলে বাতি দিতে কেহ নাহি রবে।
দেখ রে দুৰ্ম্মতি যত, চিরম্লেচ্ছ পদানত,
বিধবার শাপে হায় এ দুর্গতি হয় রে।”
(বিধবা রমণী, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)
এছাড়া, সেযুগের বিধবা রমণীদের প্রতি তাঁর কবিহৃদয়ের সুগভীর শ্রদ্ধার অভিব্যক্তি নিম্নোক্ত ছত্রগুলিতে ফুটে উঠেছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়—
“সোনার প্রতিমা গড়ে বিধবা নারীর,
রাখিতাম স্থানে স্থানে ভারতভূমির,
লিখিতাম নিম্নদেশে ‘কি স্বদেশে কি বিদেশে
রমণী এমন আর ধরাতলে নাই রে’।”
(বিধবা রমণী, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)
কিন্তু সাহিত্য সমালোচকদের মতে, যুগসমস্যা সম্বন্ধে সচেতনতা, প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্রোধ, স্বাধীনতাস্পৃহা ও সেই স্পৃহার বাস্তবায়নে অসামর্থ্য ইত্যাদি মানবিকগুণ থাকলেও, কবির উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনোভাব, সর্বোপরি তাঁর অনিয়ন্ত্রিত হৃদয়োচ্ছ্বাস উক্ত কবিতাটিকে সেযুগের একটি সার্থক গীতিকবিতার গৌরব থেকে বঞ্চিত করেছিল। তবে একইসাথে একথাও সত্যি যে, কবিতাটির নিম্নোক্ত শেষ পঙ্ক্তিগুলিতে সেযুগের গীতিকবিতার শান্ত ও মন্ময় সুরও ধ্বনিত হয়েছিল—
“অনাথা বিধবা দুঃখ রবে চিরকাল।
আমার অন্তরে গাঁথা, যখনি দেখিব
সুগন্ধ কুসুমে কীট, তখনি কাঁদিব;
রাহুগ্রাসে শশধর, নক্ষত্র পতন
যখনি দেখিব, হায় করিব স্মরণ
বিধবা নারীর মুখ! …”
(বিধবা রমণী, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)
প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, অরুণকুমার মুখোপাধ্যায় লিখিত ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা গীতিকাব্য’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, অতীতের কাব্য সমালোচক আচার্য কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য হেমচন্দ্রের এজাতীয় কবিতায় ইংরেক কবি বায়রনের প্রভাবের কথা উল্লেখ করলেও, অন্যান্য সমালোচকরা বায়রনের মত হেমচন্দ্র রোম্যান্টিক বিষাদকে আয়ত্ত করতে পারেননি, অর্থাৎ—বিষাদের গভীরে উপনীত হতে পারেননি বলেই জানিয়েছিলেন। তাঁদের মতে, এরফলে কবির ব্যক্তিগত দুঃখ ব্যক্তিগতই থেকে গিয়েছিল, সেটা আর কল্পনাসমৃদ্ধ হয়ে সর্বহৃদয়সংবাদী হয়ে ওঠেনি। (ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা গীতিকাব্য, অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়, ১৩৭৭ বঙ্গাব্দ, পৃ- ২৩২) তবে কাব্যগত এসব ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও এই কবিতাটি কিন্তু একসময়ে বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। আর একারণেই যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত তাঁর ‘বঙ্গের মহিলা কবি’ গ্রন্থের একজায়গায় (বঙ্গের মহিলা কবি, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, ১৩৬০ বঙ্গাব্দ, পৃ: ১৬০-৬৩) জানিয়েছিলেন যে, ঊনিশ শতকের ভাবপ্রবণ বাঙালির মুখে প্রায়ই শোনা যেত—
“ভারতের পতিহীনা নারী বুঝি ঐ রে।”
এমনকি কখনও কখনও গোধূলি সময়ে মাঠ থেকে ঘরে ফেরবার পথে সেযুগের রাখাল বালকরা সুর করে গাইতেন—
“ভারত শ্মশান মাঝে আমি রে বিধবা বালা।”
এসব ছাড়াও, হেমচন্দ্রের ‘ভারত কামিনী’ কবিতাটিতেও সেযুগের বিধবাদের প্রতি কবির আন্তরিক সহানুভূতি ও তখনকার প্রচলিত সমাজব্যবস্থার প্রতি তাঁর বিদ্বেষের চিত্র নিম্নলিখিতভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়—
“বাঁধিয়া রেখেছ বামা রাশি রাশি
অনাথা করিয়া গলে দিয়া ফাঁসি,
কাড়িয়া লয়েছ কবরী, কঙ্কণ,
হার, বাজু, বালা, দেহের ভূষণ,
অনন্ত দুঃখিনী বিধবা নারী।”
(ভারত কামিনী, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)
এমনকি হেমচন্দ্রের ‘কামিনী কুসুম’ কবিতাতেও সেযুগের বিধবাদের প্রতি এই কবির শ্রদ্ধামিশ্রিত বিস্ময়ের অভিব্যক্তি লক্ষ্য করা যায়—
“অধরে অমিয়া ধরি হৃদে ধরি বাসনা
বঙ্গের বিধবা সম কোথা পাব ললনা।”
(কামিনী কুসুম, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)
খৃষ্টীয় ঊনিশ শতকের বাংলার বিধবাবিবাহ আন্দোলন যে কিভাবে সমকালীন কবিমানসকে আলোড়িত করেছিল, ইতিহাসে এর দৃষ্টান্তের কোন অভাব দেখা যায় না। যেমন—নবীনচন্দ্র সেন (১৮৪৭-১৯০৯) তাঁর ‘কোন এক বিধবা কামিনীর প্রতি’, ‘কে তুমি’, ও ‘অবলাবান্ধব’—এই তিনটি কবিতার মাধ্যমে তখনকার বিধবাদের প্রতি সমাজমনে সহানুভূতির তরঙ্গ উত্তোলিত করবার প্রচেষ্টা করেছিলেন। এগুলির মধ্যে ‘কোন এক বিধবা কামিনীর প্রতি’ কবিতাটি রচনা করবার উদ্দেশ্য সম্পর্কে এই কবি নিজেই ‘আমার জীবন’ গ্রন্থের ১ম ভাগে বলেছিলেন—
“ছাত্রাবস্থায় তাঁহার কোন ব্রাহ্মবন্ধু তাঁহার ভগিনীর বাড়ীতে বেড়াইতে গিয়া এই বিধবা চাকরানী দেখিয়াছে। দেখিয়া ভ্রাতৃভাবে দেশাচার রাক্ষসী হইতে হতভাগিনীকে উদ্ধার করিতে অধীর হইয়াছে। নবীনচন্দ্র এই বিষয় শ্রবণে কৌতুকাবিষ্ট হইয়া উক্ত কবিতা রচনা করেন এবং শিবনাথ শাস্ত্রীর হাতে দিয়া উহা ‘এডুকেশন গেজেট’-এর সম্পাদক প্যারীচরণ সরকার মহাশয়ের কাছে পৌঁছে দেন। তিনি উহা গেজেটে প্রকাশ করেন। (আমার জীবন, ১ম ভাগ, নবীনচন্দ্র সেন, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৩১৯ বঙ্গাব্দ, পৃ- ১৪৮)
তবে আলোচ্য কবিতাটি লেখবার আগে নবীনচন্দ্রের মনে ঘটনাটি সম্পর্কে যে কৌতুক ছিল, রচনায় কিন্তু সেসবের কোন সন্ধান তো পাওয়াই যায় না, বরং কবিতাটির প্রতিটি ছত্রে বিধবাদের প্রতি তাঁর করুণ গাম্ভীর্যের স্পর্শ অনুভব করা যায়; যেমন—
“মলিন বদন আহা! মলিন বসন,
মলিন রূপের আভা মলিন বরণ,
চন্দ্রমুখ হইয়াছে কালির বরণ।
এতই নিষ্ঠুর কি হে বিধাতার মন!”
(কোন এক বিধবা কামিনীর প্রতি, নবীনচন্দ্র সেন)
এই কবির আত্মজীবনী থেকে জানা যায় যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন এবং তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। এছাড়া আলোচ্যযুগের ইংরেজি রোম্যান্টিক কাব্যসাহিত্যের মানবতাবাদও তাঁর হৃদয়কে প্রত্যক্ষভাবে আঘাত করেছিল। আর তাই নিষ্ঠুর দেশাচারের প্রতি দেশবাসীর অন্ধ আনুগত্যকেই তিনি সেকালের বিধবাদের জীবনে বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি ভালো করেই জানতেন যে, বিধবাদের এই বিপর্যয় থেকে মুক্ত করে সুস্থ সমাজগঠনের ভূমিকায় নিয়োজিত করতে গেলে একজন দক্ষ কর্ণধারের প্রয়োজন রয়েছে। আর তাই তিনি নিজের কবিতার একজায়গায় লিখেছিলেন—
“নিরাশ্রয় অবলার জীবনের তরী,
পড়ে দেশাচার ঝড়ে নিরাশা সাগরে,
বিনা কর্ণধার আহা! বাঁচিবে কি করি,
নিশ্চয় ডুবিবে পূর্ণ-যৌবনের ভারে।”
(কোন এক বিধবা কামিনীর প্রতি, নবীনচন্দ্র সেন)
এসব ছাড়াও কবিতাটির নিম্নলিখিত অংশে বিদ্যাসাগরের ‘বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা’ প্রবন্ধের প্রভাব বর্তমান রয়েছে বলেও দেখা যায়—
“আর কতদিন আহা! আর্য্য সুতগণ,
ভুলিয়া থাকিবে পাপ মোহের ছলনে।
কতদিন দেশাচার দুর্লঙ্ঘ বন্ধন,
পবিত্র মানিয়া তারা রাখিবে যতনে?”
(কোন এক বিধবা কামিনীর প্রতি, নবীনচন্দ্র সেন)
সেযুগের বিধবা রমণীদের পুত চরিত্র তাঁর কবিহৃদয়ে কি ধরণের শ্রদ্ধার উদ্রেক করেছিল, আলোচ্য কবিতাটিতে এরও পরিচয় পাওয়া যায়। কবি নবীনচন্দ্র সেনের মত ছিল যে, এসব মহিলা বঙ্গের গৌরব, তাঁরা সকলের নমস্য এবং দেবেরও দুর্লভ ধন। আর তাই ত্যাগ, তিতিক্ষা, সেবা ও কর্তব্যপরায়ণতার প্রতিমূর্তি বঙ্গবিধবাদের প্রতি কবি নিজের আন্তরিক শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে গিয়ে লিখেছিলেন—
“দেবের দুর্লভ এই কুসুম রতন।”
(কোন এক বিধবা কামিনীর প্রতি, নবীনচন্দ্র সেন)
এরপরে বিধবাদের বিরুদ্ধে সেযুগের প্রচলিত সমাজব্যবস্থার প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করে কবি বলেছিলেন—
“ইচ্ছা করে এই দণ্ডে ঝাঁপ দিতে জলে,
বাঁচাইতে প্রাণপণে করিয়া যতন,
কিন্তু মিথ্যা এই ঝড়ে পড়িলে অতলে,
কার্য্য সিদ্ধ না হইবে, যাইবে জীবন।”
(কোন এক বিধবা কামিনীর প্রতি, নবীনচন্দ্র সেন)
কাজেই এই দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় এই কবি শেষপর্যন্ত বিস্মৃতিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন ও স্মৃতিকে বিস্মৃতির অতলে ডুবিয়ে দুঃখের পরিসমাপ্তি ঘটাতে চেয়ে বলেছিলেন—
“আ লো স্মৃতি! আর কেন? নয়ন আমারে,
প্রেমের সুবর্ণরঙে; চিত্রেছ যে ছবি,
অতল বিস্মৃতি জলে ডুবাও তাহারে,
দেখিব না আর তারে সাক্ষী শশী রবি!”
(কোন এক বিধবা কামিনীর প্রতি, নবীনচন্দ্র সেন)
আসলে বিধবাদের দুঃখকষ্টে সেযুগের অনেক সহৃদয় ব্যক্তি বিচলিত হলেও তখনকার প্রবল সামাজিক বাধাকে অতিক্রম করে কোন বিধবাকে স্বাভাবিক সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠা করবার মত শক্তি তাঁদের মধ্যে না থাকবার ফলে তাঁরা যে তখন নীরবে নিজেদের অশ্রুবিসর্জন করেছিলেন, নবীনচন্দ্রের কবিতার উপরোক্ত পঙ্তিতে একথারই পরিচয় পাওয়া যায়।
অন্যদিকে ‘কে তুমি’ কবিতায় তিনি সেকালের শারদ আনন্দের পটভূমিতে বিষণ্ণ বঙ্গবিধবার হৃদয়বেদনাকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন বলে দেখা যায়। তখনকার বিধবারা শারদীয় উৎসবে দেশব্যাপী আনন্দে অংশ নিতে অসমর্থ ছিলেন। আর তাই সেকালের সমাজপীড়িতা বিধবা বঙ্গনারীদের ব্যর্থ জীবনের এই শূন্যতা, কবি নবীনচন্দ্র সেনের হৃদয়বীণায় আনন্দের শিহরন না জাগিয়ে বেদনার সুরকে ঝঙ্কৃত করেছিল। ঊনিশ শতকের বঙ্গবিধবার বিষাদময় জীবনের কারুণ্য যে তাঁর কবিচিত্তকে কিভাবে বেদনাহত করেছিল, আলোচ্য কবিতার নিম্নোক্ত পঙ্ক্তিগুলিতে একথার পরিচয় পাওয়া যায়—
“বাজিতেছে যেই আনন্দ সংগীত
বঙ্গ চিত্ত যন্ত্রে কাঁদাইল কেন
তোমার হৃদয় বীণা? তোল মুখ,—
বল না, কে তুমি?”
(কে তুমি, নবীনচন্দ্র সেন)
ঊনবিংশ শতকের বাংলার নারীসমাজের উন্নতির জন্য দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ১২৭৬ বঙ্গাব্দে ‘অবলাবান্ধব’ নামের পত্রিকাটি প্রকাশিত হওয়ার পরে নবীনচন্দ্র সেনও ‘অবলাবান্ধব’ নামের একটি কবিতা লিখে তখনকার নারীসমাজের সমস্যা সম্বন্ধে নিজের সচেতনতার পরিচয় দিয়েছিলেন। কবিতাটির অংশবিশেষ নিম্নরূপ ছিল—
“কেবল অনাথা যত বিধবা কামিনী
তাহাদের সমদুঃখে হইয়া দুঃখিনী
কিম্বা পতিপ্রেমে দুঃখী যেই অভাগিনী
তোমাকে শুনাব তাঁর বিষাদ কাহিনী
… হাহাকার।”
(অবলাবান্ধব, নবীনচন্দ্র সেন)
পরবর্তী বাঙালি কবিদের মধ্যে দেবেন্দ্রনাথ সেনের (১৮৫৮-১৯২০) ‘বিধবা নারী’, ‘আমি কে?’, ‘পাগলী বিধবার গান’ ও ‘বিধবার আরসী’ কবিতায় সেকালের বিধবাদের প্রতি এই কবির শ্রদ্ধা, সহানুভূতি ও আন্তরিক বেদনা প্রকাশিত হয়েছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়। এই কবি বিধবাবিবাহকে প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন না জানালেও তাঁর কবিতাগুলিতে বিধবাদের প্রতি বেদনামিশ্রিত শ্রদ্ধার অভিব্যক্তি ঘটেছিল, যা সমকালীন সমাজমানসকে পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে বিধবাবিবাহ আন্দোলনকেই শক্তিশালী করে তুলেছিল। এছাড়া, সেযুগের হিন্দুসমাজে অশুভ-শক্তির প্রতীক বলে চিহ্নিত ও ভাগ্যাহত বিধবা রমণীদের হৃদয়বেদনাকে উপশম করে, তাঁদের স্বাভাবিক সমাজজীবনে শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত করবার বিষয়েও এই কবিতাগুলি সহায়ক হয়েছিল। সুতরাং এদিক থেকে বিধবাদের নিয়ে দেবেন্দ্রনাথ সেনের লিখিত কবিতাগুলি আসলে বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য সিদ্ধির সহায়ক হয়েছিল। আলোচ্য কবিতাগুলির মধ্যে ‘বিধবা নারী’ কবিতাটি রচনা করবার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে এই কবি জানিয়েছিলেন—
“পুণ্যশ্লোক বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিধবা কন্যা মাতৃকম্পা শ্রীমতী হেমলতা দেবীর আদর্শে ‘বিধবা নারী’ রচিত। তাঁহারি পাদপদ্মে ইহা অর্পিত হইল।” (অশোকগুচ্ছ, দেবেন্দ্রনাথ সেন, বিধবা নারী, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৩১৯ বঙ্গাব্দ, পৃ- ৭)
সমালোচকদের মতে এই কবিতাটিতে কবির উপরোক্ত উদ্দেশ্য যথাযথভাবে অনুসৃত হলেও কোন ব্যক্তিবিশেষকে কেন্দ্র করে লেখা এই কবিতাটিতে নারীত্বের পূর্ণাদর্শও অঙ্কিত হয়েছিল, যা পাঠক-পাঠিকার দৃষ্টি এড়ায় না। কবিতাটিতে কবি বলতে চেয়েছিলেন যে, পুণ্যহৃদয়া বঙ্গবিধবারা দেবপ্রতিমা তুল্য; তাঁরা ত্যাগ ও সেবাধর্মের জীবন্ত বিগ্রহ। তাই শুধু মর্ত্যলোকেই নয়, দেবতাদের কাছেও তাঁরা নমস্যা। জ্ঞানময়ী, ভক্তিময়ী, তপোব্রতে ব্রতী বঙ্গবিধবারা সাবিত্রী, অরুন্ধতী, গায়ত্রী প্রমুখ প্রাচীন ভারতীয় যে কোনও প্রাতঃস্মরণীয় রমণীর সমকক্ষ। নিজেদের পরিবারের কাছে তাঁরা সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা। অনাথ আতুরের সেবায় তাঁদের পবিত্র হস্ত সদা প্রসারিত। এককথায় সমকালীন বঙ্গবিধবাদের দৈহিক সৌন্দর্য ও চারিত্রিক মাধুর্যে শ্রদ্ধাবনত কবিহৃদয় বিস্মিত হয়েছিল আর কবির এই বিস্ময় আলোচ্য কবিতার নিম্নোক্ত ছত্রে ফুটে উঠেছিল—
“দেবী কি মানবী উনি? কাহাকে সুধাই রে?”
(বিধবা নারী, দেবেন্দ্রনাথ সেন)
তাঁর মত ছিল যে, বাঙালি বিধবাদের ‘এহেন পুণ্যের ছবি বিশ্বমাঝে’ বিরল। আর খুব সম্ভবতঃ একারণেই কবিতাটির অবশিষ্ট পঙ্ক্তিগুলিতেও তাঁর হৃদয়ের অনুরূপ চিন্তাভাবনার অভিব্যক্তি ঘটেছিল—
“প্রশান্ত ললাট! নাহি সিন্দুরের ছটা,
তবু যেন ঝলমল প্রভার কি ঘটা।
উষার সীমন্ত দেশে শুক্র তারকাটি,
লাজে সে গো গেছে সরি, হেরি পরিপাটি
মুখ বালার্কের ওই মহিমা কিরণ।
শ্রী অঙ্গেতে হার, কাঞ্চী, বলয়, কঙ্কণ,
নাহি আর, তারা যেন কিছুদিন থাকি,
পবিত্র দেহের ওই রেণুকণা মাখি,
হ’য়ে গেছে সুপবিত্র! হই রে উদাসী,
নির্জ্জন আঁধারে এ যে তারাও সন্ন্যাসী!
দেবদ্বিজ গুরুজনে; প্রাণমন সমর্পণে
পূজিছেন! হেরি তাঁরে পুণ্যময় হই রে,
ভারতে বিধবা নারী তপস্বিনী ওই রে!”
(বিধবা নারী, দেবেন্দ্রনাথ সেন)
উপরোক্ত কবিতাটি ছাড়াও ‘পাগলী বিধবার গান’, ‘বিধবার আরসী’ ইত্যাদি কবিতাতেও বিধবাদের প্রতি এই কবির হৃদয়ের সুগভীর বেদনা ও গভীর সহানুভূতির অভিব্যক্তি প্রকাশিত হয়েছিল। বিশেষ করে বিধবার মলিন আরসী, নারীর সধবাজীবন যেটি তার সবথেকে আদরের ধন ছিল, সেটাই নারী বিধবা হওয়ার পরে সঙ্গীহীন ও মৌন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই মলিনতাকে আভরণ করে নিজের প্রিয়বিরহের অব্যক্ত বেদনা বুকে নিয়ে তবুও সে কোনওমতে টিকে ছিল। তার অভিযোগ ছিল যে, বিধবা একবারও তার কোন খোঁজখবর নেয় না। কিন্তু আরসীর এই মোহভঙ্গ হতে দেরি হয়নি। নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতায় সে বুঝতে পারে যে, এতে বিধবার কোন দোষ নয়; কারণ, তারা দুই সতীন এখন একসঙ্গেই পতিহারা। আর তাই বিধবার সমদুঃখে দুঃখী হয়ে আরসী শেষপর্যন্ত নিজের ভুল স্বীকার করে বলেছিল—
“ভুল ভুল ‘সখী’ নয়, সে মোর ‘সতীন’ হয়,
সবকথা বুঝিয়াছি আমি;
যামিনী হয়েছে ভোর ভেঙ্গেছে স্বপন ঘোর,
একদিনে দু’সতীনে হারায়েছি স্বামী।”
(বিধবার আরসী, দেবেন্দ্রনাথ সেন)
আসলে ঊনিশ শতকের বিধবাবিবাহ আন্দোলন সেযুগের সহানুভূতিশীল মানুষের হৃদয়দ্বারে কি নিদারুণ আঘাত হেনেছিল, উপরোক্ত পঙ্তি থেকে একথারই পরিচয় পাওয়া যায়।
সেযুগের মহিলা কবিদের মধ্যে মানকুমারী বসু লিখিত ‘পতিতোদ্ধারিণী’ কবিতায় তখনকার বিধবাদের অসহায়তার বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত হয়েছিল। সেকালের সমাজ ও সংসারে বিধবারা কতটা অসহায় ছিলেন, নিজের কবিতার মাধ্যমে একথা তুলে ধরে সহৃদয় ব্যক্তিদের সহানুভূতি লাভ করবার এই প্রচেষ্টা বাংলা সাহিত্যে অভিনব না হলেও প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এই কবির তীব্র বিদ্রূপ কবিতাটিকে বিশিষ্টতা দান করেছিল। কবিতাটির অংশবিশেষ নিম্নরূপ ছিল—
“যে ডোবে, সে ডুবে যায়, আমাদের ঘরে
কখন সে পায় না আশ্রয়,
আমাদের ঘরবাড়ী আমাদের তরে।
যে পড়ে তার ঠাঁই নয়।
অনুতাপে যদি তার হৃদয় ভাঙ্গিবে,
তবু মোরা দূরেই রহিব,
অভাগা সে যদি কিছু উঠিতে চাহিবে
ছি ছি; তার হাত না ধরিব।
সুখের সাধক মোরা আত্মসুখ দাস
সে পতিত পথের কাঙ্গালি।”
(পতিতোদ্ধারিণী, মানকুমারী বসু)
এই কবিতাগুলি ছাড়াও আলোচ্যযুগে বিধবাবিবাহের সমর্থনে বিভিন্ন পত্রপত্রিকাতে একাধিক কবিতা লেখা হয়েছিল বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। সেসবের মধ্যে এখনও পর্যন্ত যেসব উল্লেখযোগ্য কবিতার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, সেগুলির নাম, পত্রিকার নাম ও প্রকাশকাল নিম্নের তালিকায় তুলে ধরা হল—
কবিতার নাম→পত্রিকার নাম→প্রকাশকাল
(১) বিধবা বামার শোকোক্তি→বামাবোধনী→শ্রাবণ, ১২৭৭ বঙ্গাব্দ;
(২) বিধবা সম্পর্কিত (শ্রী শ্রীরাম পালিত)→ধর্মরক্ষিণী সমাজ→জৈষ্ঠ্য, ১২৭৮ বঙ্গাব্দ;
(৩) বিধবা সম্পর্কিত→হালিশহর পত্রিকা→মাহ অগ্রহায়ণ, ১২৭৮ বঙ্গাব্দ;
(৪) বিধবা রমণী→সাধারণী→ফাল্গুন, ১২৮০ বঙ্গাব্দ;
(৫) আমি ত বিধবা (শ্রীমতি কামিনী দেবী)→বঙ্গমহিলা→অগ্রহায়ণ, ১২৮৩ বঙ্গাব্দ;
(৬) বঙ্গবিধবা (জ্ঞানদাসের ছন্দানুকৃতি)→বান্ধব→৪র্থ সংখ্যা, ১২৮৫ বঙ্গাব্দ;
(৭) বঙ্গবিধবা (শ্রী দু. না. চ)→আর্যদর্শন→বৈশাখ, ১২৮৮ বঙ্গাব্দ;
(৮) বিধবার প্রার্থনা→নবজীবন→আষাঢ়, ১২৯২ বঙ্গাব্দ;
(৯) বালবিধবার কথা→অনুসন্ধান→৩১শে শ্রাবণ, ১২৯৬ বঙ্গাব্দ;
(১০) বাল্যবিধবার দুঃখদর্শনে লেখা→পূর্ণিমা→বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য, ১৩০৩ বঙ্গাব্দ।




