সত্যিকারের প্রেম, ভালোবাসা, স্নেহ, মায়া-মমতা, এসব স্বর্গীয় জীবনবোধ আমাদের মানবজীবনে কোথা থেকে, কীভাবে, কোন সময়ে চলে আসে, সেটা রীতিমতো এক রহস্যময় ব্যাপার। কখনো আবার নিজেরই প্রেমহীন শূন্য জীবনে হঠাৎ করে প্রেম-ভালোবাসা নীরবে এসে যায়।
রেশমা সুলতানা একজন গায়িকা এবং গীতিকার। বয়স চব্বিশ বছর, বেশ সুন্দরী। মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের ছাত্রী। সংগীত তার জীবন এবং এ নিয়েই সে তার ভবিষ্যৎ কাটিয়ে দিতে চায়।
তার এক প্রেমিক আছে, নাম সেলিম। সেলিম ধনী পরিবারের ছেলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র। সেলিমকে নিয়ে রেশমার সমস্যা হলো, সে ভীষণ সন্দেহপ্রবণ। যখনই রেশমা কোনো পুরুষের সঙ্গে কথা বলে, সেলিম সেটা সহ্য করতে পারে না। অনর্থক হিংসায় জ্বলে ওঠে। সেলিমের অভিযোগ, “তুমি অনেক সুন্দরী। পাছে আমাকে ছেড়ে অন্য কারও সঙ্গে চলে যাও, সেটা আমি সহ্য করতে পারি না এবং পারবও না।”
রেশমা তাকে অভয় দেয়, কিন্তু কে কার কথা শোনে! কী আর করা, রেশমা তার ভালোবাসার মানুষটির অপ্রিয় ব্যবহার অনিচ্ছাসত্ত্বেও সময়ে-অসময়ে সহ্য করে যায়।
একদিন তারা দুজনে কলাভবনের একতলার সিঁড়িতে বসে কোনো কারণে তর্কে জড়িয়ে পড়ে। একসময় সেই তর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে সেলিম রাগের বশে রেশমাকে জোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। রেশমা গড়িয়ে সিঁড়ির শেষ মাথায় গিয়ে পড়ে। এই আকস্মিক ঘটনায় তার পাঁজরের কয়েকটি হাড় ভেঙে যায় এবং মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত লাগে। আশপাশের ছাত্রছাত্রীরা তাকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
এই অবাঞ্ছিত ঘটনার ফলে রেশমাকে প্রায় এক মাস হাসপাতালে থাকতে হয়। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর দৈনন্দিন চলাফেরার জন্য তাকে হুইলচেয়ারের সাহায্য নিতে হলো। সে শুধু ভাবে, কোন পাপে এই অপরিসীম সাজার আবর্তে পড়ে গেল! তার জীবনের সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা যেন এক মুহূর্তে কর্পূরের মতো বিলীন হয়ে গেল। প্রায়ই শরীর ব্যথায় জর্জরিত থাকে। হতাশাগ্রস্ত মনে ভাবে, “ভবিষ্যৎ বলে আমার জীবনে কিছুই নেই।”
সেলিমের সঙ্গে তার সম্পর্কও সেখানেই শেষ হয়ে যায়। যে মানুষের হাতে তার জীবনের এত বড় ক্ষতি হয়েছে, তাকে আর নিজের জীবনে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবতে পারে না রেশমা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে না পেরে রেশমা নিজের মতো করে সংগীতের জগতে ডুবে যায়। সংগীত নিয়ে ব্যস্ত থাকলে কিছুক্ষণের জন্য সে তার বিরামহীন ব্যথা ভুলে থাকতে পারে। সংগীতের জগৎ থেকে বের হলেই শরীরের ব্যথাটা আবার চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কখনো কখনো রেশমা হুইলচেয়ার ছেড়ে হাঁটার চেষ্টা করে, কিন্তু বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। এক বছরে সে সাতাশবার পড়ে গেছে। এই হলো তার রোজকার জীবন।
এক বান্ধবীর সাহায্যে রেশমা ঢাকার একটি নামকরা বেসরকারি হাসপাতালের খোঁজ পেল, যেখানে তার শারীরিক অবস্থার জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। রেশমার বাবা-মাও খবরটি শুনে উৎসাহিত হয়ে বললেন, “দিনের পর দিন তোর এরকম করুণ অবস্থা দেখতে আমাদের অনেক কষ্ট হয়। আমাদের অবর্তমানে তোকে কে দেখাশোনা করবে? চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী?”
বাবা-মায়ের কথা রেশমাকে ভাবিয়ে তুলল। তাই তো, চেষ্টা করে দেখা যাক। এই ভেবে সে ওই হাসপাতালে ভর্তি হলো। হাসপাতালের নিয়ম অনুসারে তাকে ছয় মাস নিবিড় চিকিৎসায় রাখা হবে। তারপর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি সেশনে নেওয়া হবে।
হাসপাতালে ভর্তির কয়েক মাসের মধ্যেই রেশমা চিকিৎসায় উন্নতি দেখতে পেল। ক্রমে সে হুইলচেয়ার ছেড়ে ক্রাচ ব্যবহারের স্বাধীনতা লাভ করল। পরবর্তী চিকিৎসার অংশ হিসেবে তাকে ফিজিওথেরাপি সেশনে নেওয়া হলো। সপ্তাহে তিন দিন সেশন।
সেখানেই রেশমার পরিচয় হলো সোয়েবের সঙ্গে। সোয়েব ঢাকার ফায়ার সার্ভিসের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সে ফায়ার সার্ভিসের খেলোয়াড় হিসেবে ঢাকার প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগে খেলে। একদিন ফুটবল ম্যাচ খেলতে গিয়ে সে হাঁটুতে মারাত্মক আঘাত পায়। উপস্থিত সহকর্মীরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, তার হাঁটুতে গুরুতর আঘাত লেগেছে এবং তাকে কয়েক মাস ধারাবাহিকভাবে ফিজিওথেরাপি নিতে হবে। সোয়েব মনে মনে বলে, “কী আর করা! চিকিৎসকদের কথা তো মানতেই হবে।”
ফিজিওথেরাপি সেশনেই রেশমা ও সোয়েবের দেখা হয়। প্রথম দিকে ভদ্রতার খাতিরে একজন আরেকজনকে সাধারণ সম্ভাষণ জানায়। এই যেমন, “হ্যালো, কেমন আছেন?”, “ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?”
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের দেখা-সাক্ষাৎ বাড়তে থাকে। ফিজিওথেরাপি সেশন শেষ হলে দুজনে বসে গল্প করে। তাদের গল্পের কোনো মাথামুণ্ডু থাকে না। কীভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে যায়, তারা টেরও পায় না। তাদের আড্ডার একটি অলিখিত যোগসূত্রও আছে। দুজনই হাড়ের আঘাতের রোগী এবং ক্রাচের ওপর নির্ভরশীল।
একদিন তাদের ফিজিওথেরাপি প্রায় শেষের দিকে। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো হঠাৎ সোয়েবের বুকে তীব্র ব্যথা শুরু হলো। একই সময়ে তার কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্রমেও সমস্যা দেখা দিল।
সোয়েবের ভাগ্য কিছুটা ভালো বলতে হবে। অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনাটি হাসপাতালের ভেতরেই ঘটেছিল। খবর পেয়ে নার্সরা দ্রুত তাকে ট্রলিতে করে কার্ডিয়াক বিভাগে নিয়ে গেলেন।
এদিকে হঠাৎ এই দুঃসংবাদে রেশমা ঘাবড়ে গেল। কেন জানি তার মনে হলো, সে সোয়েবকে ভালোবেসে ফেলেছে। অথচ নার্সদের কাছে সোয়েবের বর্তমান অবস্থা কেমন, সেটাও ঠিকমতো জানতে পারছে না। কারণ সে তো সোয়েবের কেউ নয়। শুধুই বন্ধু, এর বেশি কিছু নয়।
ভারাক্রান্ত মনে রেশমা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সোয়েবের মেঝেতে পড়ে থাকা ক্রাচটির দিকে। মনটা বেদনায় ভারী হয়ে যায়। আতঙ্কিত মনে নিজেকেই প্রশ্ন করে, সোয়েব কি আদৌ বেঁচে যাবে?
শুধু এটুকু জানতে পারে, সোয়েবকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার তিন দিন পর রেশমা সোয়েবের একটি টেক্সট মেসেজ পায়। সেই বার্তা পেয়ে রেশমা যে শান্তি অনুভব করে, তা তার জীবনের এক মধুময় স্মৃতি হয়ে থাকে। সোয়েবের প্রতি তার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আরও বেড়ে যায়। নিজের এমন কঠিন সময়েও সোয়েব তাকে স্মরণ করেছে।
রেশমা জানতে পারে, সোয়েবের হৃৎপিণ্ডে স্টেন্ট বসানো হয়েছে এবং তাকে কয়েক দিন হাসপাতালে থাকতে হবে। একদিন সময় করে রেশমা তাকে দেখতে যায়। হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারে, সোয়েব আবার অপারেশন থিয়েটারে। কথাটা শুনে রেশমা যেন বিশ্বাসই করতে পারে না। জীবনে কখনো নিজেকে এত অসহায় মনে হয়নি তার।
চার ঘণ্টা পর রেশমা সোয়েবকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে দেখতে যাওয়ার অনুমতি পায়। চিকিৎসকেরা তাকে ট্রিপল বাইপাস অপারেশনের জন্য প্রস্তুত করছেন। অপারেশনটি দীর্ঘ নয় ঘণ্টা চলে।
অপারেশনের কয়েক দিন পর রেশমা যখন সোয়েবের হাসপাতালের কেবিনে দেখা করতে গেল, সোয়েব বলল, “কেবিনের পর্দাটা টেনে দাও। আমাদের কিছুটা প্রাইভেসি থাক।”
রেশমা পর্দাটা টেনে ঘুরে সোয়েবের দিকে তাকাতেই সে ব্যাগ থেকে একটি মুক্তার আংটি বের করে রেশমার হাতে পরিয়ে দিল।
রেশমা হতবাক!
তার মনে প্রশ্ন জাগল, এই অসুস্থ শরীর নিয়ে সোয়েব কখন, কোথা থেকে, কীভাবে এত সুন্দর আংটিটি জোগাড় করল?
সোয়েব বলল, “আমার হার্ট অ্যাটাক হওয়ার আগেই বুঝতে পেরেছিলাম, আমি তোমাকে ভালোবেসেছি। কিন্তু দেখো অদৃষ্টের কী পরিহাস! কথাটা বলার আগেই আমার হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেল। তবে যাই হোক, আজ আমি আর সুযোগটা হারাতে চাই না। আমি আমার জীবনে সব সময় তোমাকে পাশে রাখতে চাই।”
ঘটনাটি এতটাই আবেগময় যে রেশমা খুশিতে কেঁদে ফেলল। তার হৃদয়ের কথাটিই যেন সোয়েব উচ্চারণ করেছে। যে জীবনকে রেশমা একদিন ভেবেছিল ভবিষ্যৎহীন, সেই জীবনের শেষ প্রান্ত থেকেই যেন শুরু হলো নতুন এক পথ।#




