কিন্তু সুবই আর ফিরে আসেনি। অথচ একজন তার প্রাণের আকুতি ঢেলে সুবইকে আরেকটিবার ফিরে আসার কথা বলেছিলেন। যদিও সুবইয়ের ফিরে আসার জন্য আমার কোনো অপেক্ষা ছিল না। তবু কেন জানি না, কতকাল আগে শোনা সেই আহ্বানের কয়েকটি শব্দ আর সুর আমার কানে প্রায়ই বেহাগের রাগে বেজে ওঠে— “অ সুবুই, সুদিনে আরকবার আইসগো।”
একজনের স্নেহের ধন-কন্যাসমা নারীকে আবার ফিরে আসার জন্য এক প্রৌঢ়ার আকুল আহ্বান— “অ সুবুই, সুদিনে আরকবার আইস।”
প্রায় আটচল্লিশ বছর আগের কথা। সুবই তখন শেষবারের মতো এ গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য উঠান থেকে হালটে নামছে। বকুলবালা তার উঠানের প্রান্তে দাঁড়িয়ে বলছেন— “অ সুবুই, সুদিন আইলে আরকবার আইছ।”
তখন চৈত্র মাস। বাজারে চাউলের দাম বেড়ে গেছে। চাউল, ডাইল, তেল, লবণ— সবকিছুই ঘরে বাড়ন্ত। সুবইকে ভালো করে একবেলা খাওয়াতে না পেরে মনটা পুড়ছিল আমার একমাত্র পিসি বকুলবালার। তাঁর মনপোড়ানি কষ্ট থেকে এই আহ্বান— “অ সুবুই, সুদিনে আরকবার আইছ।”
কিন্তু না, সুদিন এসেছিল বকুলবালার জীবনে; না আর ফিরে এসেছিল সুবই। শুধু আমার কানে আর মনে এ দৃশ্য আর আহ্বান অক্ষয় হয়ে রইল।
এখনো কাউকে কোনো বাড়ি থেকে ভারাক্রান্ত মনে বিদায় হতে দেখলে, এবং আমি নিজেও কোনো জায়গা বা কারো নিকট থেকে বিদায় নিতে গিয়ে ভারাক্রান্ত হলে, চার যুগ আগের সুবইয়ের অশ্রুসজল চোখে চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখি আর কানের ভেতর বকুলবালার কাতর আহ্বান শুনতে পাই।
এমনকি কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আমার মায়াময়ী পিসি কথাগুলো বলছিলেন, সেই জায়গাটা আর সুবই যে পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিল, সেই পথ, পথের বাঁকটাও আমি দেখতে পাই। আমাদের মস্ত উঠানের শেষ মাথার যেখান থেকে পথ শুরু হয়ে একটু ঢালুতে নেমে দিগন্তরেখার দিকে ছুটে যায়, সেই ঢালু জায়গাটার বাম পাশে একটা নারকেল গাছ। ঢালু পথ ধরে নেমে কয়েক কদম হেঁটে গেলে হাতের ডানে একটা আমগাছ, যার আম অনেকটা দেখতে ও খেতে ফজলি আমের মতো। সেই পায়ে চলা পথের রেখা ধরে হেঁটে যাচ্ছে সুবই, আর পথের দুপাশে হাঁটুসমান ঘাস, আগাছা, নানারকম গাছের চারা, যা আপনা-আপনি গজায়। সেই চিরল পথের দিকে সুবইয়ের চলে যাওয়া দেখছেন আমার পিসি বকুলবালা, আমার মা এবং দেখছি আমাদের সকল ভাইবোনেরা।
পিসি আবার বলছেন— এবার একটু গলা ছেড়ে, “অ সুবই, সুদিনো আরকবার আইস—”
শেষবারের এই আহ্বানে একটা হাহাকারের মূর্ছনা ছড়িয়ে পড়ে আকাশে-বাতাসে, আর সুবইয়ের চলে যাওয়া পথ যে দিগন্তরেখার দিকে যাচ্ছে, সেদিকেও। ঘরে ফিরে আমরা সকলেই ভারাক্রান্ত হয়ে বসেছিলাম অনেকক্ষণ। সেই মনের ভার বাকি জীবন বয়ে বেড়াতে দেখেছি পিসিকে। আর আমার মনে কেবল ঘুরে ফিরে সেই সুদিনের কথা উঠেছে আর পড়েছে।
কেবল ভেবেছি— সুদিনটা কেমন হয়? সে যেমনই হোক, সুদিন তাহলে একদিন আসবে। আমাদেরও সেই সুদিনের অপেক্ষায় থাকতে হবে।
প্রায়ই ভাবি, আচ্ছা, সেদিন পিসি কোন সুদিনের কথা বলেছিলেন?
পিসিকে একদিন সে কথা জিজ্ঞেস করাতে বলেছিলেন, যেদিন ঘরে চাউল-ডাইল, মাছ, তরকারির অভাব থাকবে না, পর্যাপ্ত পরিমাণ দই, দুধ ও ঘি থাকবে, সেদিনটাই সুদিন হবে।
কিন্তু সুবই দিদি জানবে কী করে, কবে আমাদের সেই সুদিন আসবে?
পিসি প্রথমে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি। হয়তো তার হিসেব মিলছিল না। শেষে খানিকক্ষণ চিন্তাভাবনা করে বলেছিলেন—
“বৈশাগ-জৈষ্ঠি মাসো যখন মাইনষের ঘরে ঘরে ধানচাউল থাকে, বাজারো জিনিসপত্রেরও দাম কমে, মাইনষের খাওয়া-পরার অভাব থাকে না; এমন দিনরে সুদিন কয়।”
যতদূর মনে পড়ে, পিসি বেঁচে থাকা অবধি এবং আজও সেই অর্থে আমাদের ঘরে সুদিন আর আসেনি। বৈশাখ মাসে ধান-চাউলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কিছুটা কম থাকলেও আমাদের পক্ষে সেসব কেনার সামর্থ্য ছিল না, যা পেলে মানুষ সুখী হয়, বলতে পারে তাদের জীবনে সুদিন এসেছে। না, আমরা সেভাবে হয়তো না খেয়ে থাকিনি; তবে অনেক চাওয়া-পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে বিসর্জন দিয়ে চলতে হতো আমাদের। কিন্তু আমার পিসি সোনার চামচ মুখে নিয়ে না জন্মালেও সাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করেছেন। অথচ আমাদের সংসারে তাকে দিনযাপন করতে হয়েছে নিত্য অভাবের সঙ্গে।
আমাদের একখানি জমি চাষ করে যে ধান হতো, তাতে ছয় মাসের খোরাকিও হতো না। চাষবাসের পর বেকার সময়ে বাবা বাঁশের কুলা-ডালা তৈরি করে বাজারে নিয়ে বসতেন। সারা বছর কুলা-ডালার প্রয়োজন হয় না লোকের। তাই কাঁঠালের মৌসুমে কাঁঠাল, অন্যসময় কলা বা চাউলেরও ব্যবসা করতেন বাবা। ঘরের খোরাকির চাউল ফুরিয়ে গেলে ওই ব্যবসার টাকাতেই চাউল-ডাইলসহ আমাদের নিত্যদিনের সওদাপাতি কেনা হতো। আমাদের ভাইবোনদের পড়ার বই আর কাগজ-কালি, স্কুলের বেতন আর পরিবারের সকলের জামাকাপড় কিনতে হিমশিম অবস্থা বাবার।
তখন বাজারে বিদেশি পুরোনো জামাকাপড় উঠছে কেবল। লোকে বলত লিলামি কাপড়। নতুন কাপড় কেনার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলায় সেই লিলামির দোকান থেকে আমাদের কাপড় কেনা শুরু হলো। দেখা গেল কোনোটা গায়ে লাগছে, তো কোনোটা অনেক বড়। বড় হলে সেটা নিয়ে দর্জির কাছে যাও। দর্জি কাকা আমাদের নিয়ে হাসত— “আহারে, তোরার বাপে বুঝি এইবারও একটা নতুন কাপড়ের জামা বানাইয়া দিত না রে? স্কুলে পড়স আর তর বাপে পাইছে এক লিলামি কাপড়! যা, যা! যা অখন! আমার পুরান কাপড় সিলাই করার অত সময় নাই।”
অনেক অনুনয় করলে তবে দর্জি কাকার মন গলত। আমার বোনও সেই লিলামি কাপড়ের জামা পরে স্কুল যেত। তার সহপাঠী হামিদা, যার বাপ লন্ডনে থাকে, মেয়ের জন্য বাপ কাড়ি কাড়ি টাকা পাঠায়, আর তাতেই তার গায়ে থাকে নিত্য নতুন জামা। সেই অহংকারে স্কুলের গাধা ছাত্রী হামিদা, লিলামি কাপড়ের জামা পরা ক্লাসের সবচে মেধাবী ছাত্রী আমার বোনকে মানুষই মনে করত না। হামিদার নানারকম টিটকারি শুনে কিনা, শেষপর্যন্ত বোন পড়ালেখাই ছেড়ে দিল। আর অতিরিক্ত পরিশ্রমে বাবার শরীর খারাপ হলে বড় ভাইয়ের অপোক্ত কাঁধেই পড়ল বিশাল সংসারের বোঝা। সেও পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে রোজগার করতে নামল।
তা যে সুবইয়ের কথা দিয়ে গল্প শুরু করেছিলাম, তার কথাই আবার বলি। বলতে গেলে সুবই বকুলবালার কেউ ছিল না। আবার অনেক কিছুই ছিল। সুবইয়ের মা সুলোচনা, বকুলবালার মাঘব্রত পালনের সই। তাদের বিয়ের আগের শৈশব কেটেছে পাশাপাশি বাড়িতে। আবার বিয়েও হয়েছিল একই গাঁয়ে। গাঁয়ের বধূ হওয়ায় এপাড়া থেকে ওপাড়ায় যাওয়ার খুব সুযোগ ছিল না তাদের। তবে পূজা-পার্বণে দুজনের শ্বশুরবাড়ির মধ্যে নিমন্ত্রণ-আমন্ত্রণের সুবাদে বউঝিদেরও যাওয়া-আসার চল ছিল। বছরে চার-পাঁচবার দেখা হতো। কিছুটা সময় একসঙ্গে কাটানোর সুযোগ হতো দুই সইয়ের। তবে তাদের বাপের বাড়ি নাইয়র যাওয়া হতো একসঙ্গে।
একবার বকুলবালার বাপ, তো আরেকবার সুলোচনার বাপ তাদের শ্বশুরবাড়ি গিয়ে যেমন দুজনকেই নিয়ে আসত, তেমনি শ্বশুরবাড়িরও কেউ একজন গিয়ে দুজনকে নিয়ে আসত কেরায়া নৌকার ভাড়ার পয়সা বাঁচাতে। যাওয়া-আসার ও নাইয়রযাপনের দিনগুলো তারা একসাথেই কাটাত। পাড়া-প্রতিবেশী ও জ্ঞাতিগোষ্ঠীর বাড়ির লোকেরাও দুই নাইয়রিকেই একসঙ্গে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াত। তবে সেই সুখের দিন তাদের বেশিদিন থাকেনি।
বকুলবালার প্রথম সন্তান জন্মের দুদিনের মাথায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তারপর থেকে তার বারবার গর্ভধারণ আর সন্তানের জন্য অপেক্ষা চলতে থাকে। পরপর ছয়-ছয়টি সন্তানের জন্ম আর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বকুলবালার জীবনের অনেকগুলো বছর কেটে গেল। একটি সন্তানকেও বাঁচাতে পারেনি কোনো ডাক্তার-কবিরাজ। জন্মের পরই নীল রং ধারণ করত প্রতিটি সন্তানের সুন্দর শরীর। আর শরীর বেঁকিয়ে কেবল কান্না করত। তারপর কান্না করতে করতে দু-এক দিনের মধ্যেই মরে যেত।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টা এমন হলো যে, বকুলবালা গর্ভধারণ করলেই খুব করুণার চোখে তাকাত সকলে। তারা জানত, বকুলবালার পেটে যে আসছে, সে মরে যাওয়ার জন্যই আসছে। যদিও এ সংসারে সকলেই মরে যাওয়ার জন্যই জন্মায়, তবু জন্মদাতারা এবং আত্মীয়স্বজন সকলেই আশা করে— যে জন্মেছে বা জন্মাবে, সে মরার আগে কিছুদিন এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে, তার বাবা-মাকে আনন্দ প্রদানসহ নিজের জীবনকে উপভোগ করবে এবং কিছু সৃষ্টি করে যাবে।
কিন্তু বকুলবালার গর্ভস্থ শিশুগুলোকে নিয়ে কেউ এরকম স্বপ্ন দেখেনি। হয়তো বকুলবালা দেখে থাকতে পারেন, অথবা এতটা আশা হয়তো শেষ পর্যন্ত তিনিও আর করেননি।
বকুলবালার সব সন্তানদের জন্ম-মৃত্যুর মাঝখানের কোনো এক সময়ে জন্মেছিল সুবই। তবে সুবইয়ের মায়ের ঘরেও সে ছাড়া আর কারও জন্মই হয়নি। সেই ছিল মা-বাপের চোখের মণি। তারপরও সুবই তার মায়ের সই বকুলবালার শূন্যমাতৃহৃদয়েও জায়গা করে নিয়েছিল।
অভাবে পড়ে সুবইয়ের বাপ জায়গাজমি খোয়ালে বকুলবালার শ্বশুর নিজের বাড়িতে তাদের ঘর বেঁধে থাকার জায়গা দেন। ছন-বাঁশ দিয়ে ছয়দশে ঘর তুলে সুবইয়ের বাপ-মা সুবইকে নিয়ে বাস করতে থাকেন বকুলবালাদের পাশের ঘরে। দুই মায়ের অপরিসীম আদর-যত্নে পালিত হয়ে এ বাড়িতেই বড় হয় সুবই। বিয়েও হয় এখান থেকেই। বিয়ের পরপরই সে তার নিজের মা-বাবাকে হারায়। তারপর থেকে বছরে একবার করে সে বকুলবালার বাড়িতে এসে নাইয়র করত। এছাড়াও পূজা-পার্বণে, উৎসবেও দু-চার দিনের জন্য আসত কখনো কখনো।
বকুলবালার বর অমরনাথও তাকে আদর-যত্ন করে পিতৃস্নেহ মেটাতেন। সুবইকে খাওয়ানোর জন্য ভালোমন্দ খাবার জোগাড় করতেন। নাইয়র শেষ হলে একখানা নতুন শাড়ি পরিয়ে চোখের জলে বিদায় দিতেন। যে কারণে সুবই মা-বাবার অভাব তেমন একটা বুঝতেই পারেনি। সন্তানহীন বাবা-মা ও মা-বাপহারা কন্যার বেশ চলছিল।
আষাঢ়-শ্রাবণ এলে আপন কন্যার নাইয়র আসার জন্য যেমন করে অপেক্ষায় থাকে, বা উৎসব-পার্বণে দুদিনের জন্য খুশিতে ভরিয়ে দিয়ে যাবে বলে আকাঙ্ক্ষা করে গাঁয়ের সকল মা-বাপ, সুবইয়ের জন্য তেমনি অপেক্ষা করে থাকতেন তারা।
সুবইয়ের আপন জেঠা-কাকারা গাঁওদেশ ছেড়ে কোথায় যে গেছে, কেউ জানত না। কেউ বলে ইন্ডিয়া, কেউ বলে কোনো ভাটির দেশে— যেখানে অনেক জমি পতিত পড়ে থাকে কাজের লোকের অভাবে, সেই হাওরমুলুকে গেছে তারা।
সুবইয়ের খোঁজ নেওয়ার জন্য বকুলবালা ও তার বর অমরনাথ ছাড়া যখন কেউ রইল না, তখন একদিন সেই অমরনাথও কোনো অসুখ নেই, বিসুখ নেই, ধুম করে চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। বকুলবালা তখন অকূল পাথারে।
অমরনাথের জ্ঞাতিগোষ্ঠীর ভাই-ভাতিজারা বকুলবালার নিঃসন্তান থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাকে ভিটেবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে। বকুলবালা ফিরে এলেন বাপের বাড়ি। না, বাপের বাড়িতে বকুলবালার অনাদর হয়নি। যতদিন তিনি বেঁচেছিলেন, তাঁর ভাই, ভাইয়ের বউ, ভাইপো, ভাইঝি, এমনকি ভাইপোর বউও তাঁকে মাথায় তুলে রেখেছিল। কিন্তু ভাইয়ের সংসারে শান্তি থাকলেও সুখ ছিল না।
মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন হলেও যুদ্ধের অভিঘাতে অন্য অনেকের মতো বকুলবালাদের জীবন থেকেও স্বচ্ছলতা হারিয়ে গিয়েছিল। বকুলবালার ভাই বনমালী এমনই নিরীহ মানুষ যে সাতচড়েও রা করা তার স্বভাববিরুদ্ধ। শরণার্থী শিবিরে কলেরায় বকুলবালা ও বনমালীর মা-বাপ দুজনেই মারা গেলেন। তারা দেশে ফিরে দেখেন ঘরবাড়ি পোড়া। গরু-বাছুর, আসবাব ও তৈজসপত্র সবকিছুই খোয়া গেছে। প্রতিবেশী সৈফুল্লা একখানা ভূয়া দলিল দেখিয়ে বলল, মাঠের সবচে বড় আর সেরা জমিটা নাকি বনমালীর বাপ যুদ্ধের আগে তার কাছে বেচে দিয়েছিলেন। বনমালী আর সেই জমিতে নামতে পারেনি। বনমালীর সংসারে নেমে এল অভাব-অনটন। সংসার চলে বড় টানাটানি করে। ছোট ভাইয়ের কষ্ট বকুলবালাকেও ব্যথিত করে। যেটুকু জমি ছিল বনমালীর, সেবার বৈশাখী তুফান ও ঢলে তার সবটুকু ফসল নষ্ট হয়ে গেল।
তারপরের চৈত্রমাসে সুবই আসে মামার বাড়ির গ্রামে। সুবইয়ের মামারাও গ্রামে থাকে না। তারা সংগ্রামের সময় ইন্ডিয়ার শরণার্থী শিবির থেকে আর ফিরে আসেনি। লোকে বলে, প্রথমে বর্ডারের ওপারের গ্রামে আস্তানা গাড়ে, তারপর আরেকটু জানাশোনা হলে গৌহাটি শহরের কাছে কামরূপ-কামাখ্যার আশেপাশে গিয়ে স্থায়ী হয়েছে তারা। অনেকদিন পর সুবই মামার বাড়ির গাঁয়ে বেড়াতে এসেছে— মায়ের সই বকুলবালারই কাছে।
সুবই যেদিন বকুলবালার কাছে এসেছিল, সেদিন সকালবেলা আমাদের ঘরে তিন-চার পট চাউল ছিল মাত্র। গ্রামের পরিবারে ছয়-সাতজন মানুষের ঘরে তিন-চার পট চাউলের ভাতে পেটভরা খাবার হয় না। তাও বকুলবালার ভাইবউ আর আমার মা সেদিন সকালে হাঁড়িতে মাত্র এক পট চাউল ঢেলে তার সঙ্গে এনে দিলেন উঠানের মাচায় ঝুলে থাকা লাউ, লাউয়ের পাতাসহ ডগা আর শিম, আর ঘরে থাকা আলু। জীবনে সেই প্রথম ডাল ছাড়া খিচুড়ি রাঁধলেন মা। আমরা হাপুস হুপুস করে খাচ্ছি। আর সেই সময় সুবই তার হাতে ধরা একটা আর কোলে একটা বাচ্চাকে নিয়ে আমাদের উঠানে পা দিয়েই হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে।
খাবারের থালা পাশে ঠেলে দিয়ে বকুলবালা উঠে যান আর সুবইকে বুকে জড়িয়ে নেন। তারপর হাতে ধরে ঘরে এনে বসতে দেন নিজের চৌকির বিছানায়।
“মাঐমাগো, কতদিন পরে তুমারে দেখলাম। ইজীবনে আর তুমার লগে দেখা অইব ভাবছি না গো মায়োই মা!”
বকুলবালা চোখের পানি মুছেন।
“আমিও তো ভাবছি না রে মাই, তরে আর দেখমু! কতজনরে জিগাই— আমার সুবুই কই আছে, কেউ জানোনি? কেউ কইত পারে না। একদিন একজন কইল সুবুইর জামাই সুবুইরে লইয়া ইন্ডিয়া গেছেগি। বুকো পাত্থর বাইন্ধা তর কথা ভুইল্যা থাকতাম চাইছিগো সুবই। কিন্তু চাইলেই কি আর ভুলা যায় রে মাই!”
সুবই তবু গাল ফুলায়। অভিমান করে—
“ক্যামনে আমারে ভুইল্যা থাকলায় গো মা?”
“নারে মাই, ভুলছি না। অখন কচাইন দেখি তোরা কই আছস? জানলে না খোঁজ করতাম!”
সুবই মাঐমার কোলের কাছে বসে। ছোটবেলায় যেভাবে বসত। কত বছরের কত কথা জমে আছে! বেলাও বেশি নেই। সুবই প্রাণপণে মাঐমার কাছে না-বলা সব কথা বলার চেষ্টা করে। আবার কবে আসবে, নাকি কোনোদিন আর আসতে পারবে না— তাই জীবনের সব কথা বিনিময়ের এই প্রাণপণ প্রচেষ্টা তাদের।
আর অন্যদিকে আমার মা হাঁড়িতে রান্না চাপিয়ে নিজের কাছেই নিজের কাজের তারিফ করছেন—
“কী যে ভালা কাম করছিলাম গো সোনা, তিন পট চাউল তুইল্যা রাইখ্যা। নাইলে অতিথ মানুষরে না খাওয়াইয়া বিদায় করন লাগত! মাইগো মাই, কী শরমের কথা অইত কওচাইন দেখি! সুবই বেচারি কী দুঃখটাই না পাইত মনে! মনে করত তাইরে আমরা অবহেলা করতাছি।”
সত্যি মায়ের কাছে সেদিন ওই তিন পট চাউল ছাড়া ঘরে রান্না করার মতো তেমন কিছুই ছিল না। ওরা আসার পর আমার বিচক্ষণ মা প্রথমেই সুবইদিদির বাচ্চাদের ডাল ছাড়া খিচুড়ি খেতে দিলেন। তারপর তিন পট চাউলের ভাত রাঁধলেন। উঠানের মাচা থেকে একটা কচি লাউ, শিম আর নতুন গাছে ধরা দুটো বেগুন ছিঁড়ে আনলেন। আমার ছোটবোন কিছু লতাপাতা আর আঙিনার আশেপাশ থেকে শাক তুলে আনল। শাক, বেগুনভর্তা আর লাউ, শিম ও আলু দিয়ে রান্না লাবড়ায় ভাতের থালা সাজিয়ে মা সুবইকে খেতে ডাকলেন। ঘরে একটু দুধ ছিল। শিশু দুটোকে তাই দেওয়া হলো।
খেতে বসে সুবই আবার চোখের জলে নাকের জলে ভাসে।
“আমার মাঐমার ঘরে কত খাওন আছিল গো! আইজ এমন দশা—”
বকুলবালা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন।
“খা গো সুবই, খা। তোর মামাবাবু নু গরিব অই গেছেগি বেটি! দুইপর সময় চাইরটা লবণভাতই খা।”
সুবই ভাতের থালায় হাত রেখে আবার কাঁদে। চোখ মুছে বলে—
“মামী, মাওইমারেও খাইতে দেও। একলগে খাই।”
মা পিসিকেও ভাত বেড়ে দেন। সুবইদিদি হাপুস নয়নে কাঁদে আর অশ্রুজল মুছতে মুছতে ভাত খায়।
যে সুদিন ফেরার আশা নিয়ে পিসিমা সুবইকে আবার আসার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে রেখেছিলেন, সেই সুদিন আর ফিরে আসেনি আমাদের জীবনে। ফিরে আসেনি সুবইদিদিও।
তাও অনেক কষ্টে পড়ালেখা করে আইএ পাশ করেছিলাম। আইএ পাশ বিদ্যায় যেকোনো সরকারি অফিসের কেরানির চাকরি পাওয়া যেত তখন। কিন্তু চাকরি তারাই পেয়েছে, যারা খুব চৌকশ, বিদ্যায়-বুদ্ধিতে যাদের ঠেকানো যায়নি আর যাদের মামার জোর বা টাকার জোর ছিল। আমার কিছুই ছিল না। না মেধা, না মামা, না টাকার জোর।
আধাশিক্ষিত বেকারের বড় জ্বালা। উপরে ওঠার ক্ষমতা নাই, কিন্তু নিচে নামতেও মান যায়। দেখেছি, ঠ্যালাগাড়ি যে ঠেলে তার রোজগার আমার থেকে ভালো। ঠ্যালা নিয়ে বের হলে তার ডালভাতের ব্যবস্থা অনায়াসে হয়ে যায়।
পেটের ধান্ধায় কখনো দিনভর টিউশনি, কখনো ছোটখাটো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। জীবিকা কখনো স্থিতিশীল ছিল না। অনিশ্চিত জীবন বয়ে বেড়ালাম এতটা কাল। এখন ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে একটা মফস্বল শহরে এনে তুলেছে। তারা পড়াশোনা করে আবার রোজগারও করে। বলতে গেলে তারাই সংসারটা টানছে।
আমার জায়গায় সংসারযুদ্ধে আজ নতুন করে অবতীর্ণ আমার ছেলেমেয়েরা। তাদের শ্রান্ত-ক্লান্ত মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে আমি কেবল ভাবি, আর ভাবতে ভাবতে তাদের চেহারায় বিধ্বস্ত যৌবনের আমাকে দেখি।




