অতীতের বাংলার লেখকদের মধ্যে পুলিনবিহারী সেন সর্বপ্রথম সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে— ‘বাংলার স্ত্রী-স্বাধীনতার পথিকৃৎ’ —অভিধায় সম্মানিত করেছিলেন। অতীতে— ‘সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর: বাংলার স্ত্রী-স্বাধীনতার অন্যতম পথিকৃৎ’ —শিরোনামে তাঁর প্রবন্ধটি প্রথমে ইন্দিরা দেবী সঙ্কলিত ‘পুরাতনী’ গ্রন্থে, এবং এরপরে ১৩৬৩ বঙ্গাব্দের শারদীয়া দেশ পত্রিকায় ‘প্রবাসীর পত্র’–র সঙ্গে মুদ্রিত হয়েছিল। পুলিনবিহারী প্রদত্ত এই অভিধাটি সত্যেন্দ্রনাথের প্রতি সার্থকভাবে প্রযুক্ত বলেই ইতিহাস থেকে দেখতে পাওয়া যায়। কারণ— তিনি তাঁর নিজের জীবনাচরণের মাধ্যমে সেযুগের অনেক কুপ্রথাকে বিসর্জন দিয়ে সমাজে আদর্শদৃষ্টান্ত স্থাপন করবার চেষ্টা করেছিলেন। সেকাজের জন্য তিনি তাঁর সমকালের অন্যান্যদের মত প্রকাশ্য জনসভায় আন্দোলন ও প্রচারের পথ বেছে নেননি বলে, অতীতের বাংলার সমাজ সংস্কারকদের নামের তালিকায় তাঁর নামের উল্লেখ বিরল হলেও তিনি তাঁর নিজের অভীষ্টপথে যে সফলকাম হয়েছিলেন, সেকথা পুলিনবিহারী সেনের বক্তব্য থেকেই বুঝতে পারা যায়। এই প্রসঙ্গে পুলিনবিহারী সেন লিখেছিলেন—
“বাংলাদেশে স্ত্রীজাতির উন্নতি ও স্ত্রী-শিক্ষার প্রসারের বিবরণে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উল্লেখ বিরল, কারণ আন্দোলন বলতে আমরা সাধারণতঃ যা বুঝি তার সঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথের যোগ তেমন প্রত্যক্ষ ছিল না। কর্মজীবন বাংলার বাইরেই অতিক্রান্ত হয়েছিল বলে তার সুযোগও তাঁর পক্ষে সামান্যই ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর নারী আন্দোলনে তাঁর দেশ প্রধানতঃ তাঁর পরিবারের মধ্য দিয়েই লাভ করেছে; আমরা যদি একথা স্মরণ রাখি যে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার নবজাগরণের প্রধান একটি কেন্দ্র মহর্ষি দেবেন্দ্রভবন, বঙ্গনারীর আত্মবিকাশের উদযোগ এই পরিবারের কন্যা ও বধূদের দ্বারা এক কালে অনেকখানি পরিপুষ্টি লাভ করেছে, তাহলে স্ত্রী-স্বাধীনতার মন্ত্র এই পরিবারের মধ্যে বিশেষভাবে যাঁর প্রবর্তনায় সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, যাঁর প্রভাব কেবল পরিবারের চতুঃসীমার মধ্যেই আবদ্ধ থাকে নি— তাঁর কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।” (সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর: বাংলার স্ত্রী-স্বাধীনতার অন্যতম পথিকৃৎ, পুলিনবিহারী সেন, পুরাতনী, পৃ- ১৮৭)
বিলাত থেকে সত্যেন্দ্রনাথের তাঁর স্ত্রীকে লেখা চিঠির মধ্যে, তাঁর ভাইবোনদের ও স্ত্রীর স্মৃতিকথায়, বোম্বাইচিত্র (১২১৫ বঙ্গাব্দ) এবং আমার বাল্যকথা ও আমার বোম্বাই প্রবাস গ্রন্থে (১৯১৫)— স্ত্রী-স্বাধীনতার ধ্বজাবাহী সত্যেন্দ্রনাথের একটি সুন্দর চিত্র পাওয়া যায়। বিলাতযাত্রা করবার আগে থেকেই জোড়াসাঁকো ঠাকুরপরিবারের প্রচলিত নিয়ম না মেনে সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর ছোটবোনকে বাড়ির বাইরে বেড়াতে নিয়ে যেতেন। সে যুগের মেয়েদের জন্য গাড়িচড়া তখন একটা লজ্জার বিষয় হলেও সত্যেন্দ্রনাথ সেসব নিয়ে কখনো কোন আপত্তি মানেননি। সেযুগের অন্তঃপুরের বদ্ধজগত থেকে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসে ভীত ত্রস্ত চোখে বাইরের পৃথিবীকে দেখে ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের মন যে কি অপার বিস্ময়ে ভরে উঠত, সেটা স্বর্ণকুমারী দেবীর বক্তব্য থেকেই পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারা যায়। সেই অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তিনি লিখেছিলেন—
“দূরাতীতের একটি কথা বলি— বিলাত যাইবারও কিছু পূর্বে মেজদাদা একদিন আমাকে গাড়ী করিয়া তাঁহার সঙ্গে গঙ্গার ধারে বেড়াইতে লইয়া গিয়াছিলেন। জাহাজ গুলাকে এমন প্রকাণ্ড দৈত্যাকার বলিয়া মনে হইয়াছিল যে সেদিনকার সেই ভয় বিস্ময়ের ছাপ— আলোকচিত্রে অস্পষ্ট ছায়াপাতের ন্যায় এখনো অস্ফুট আকারে মাঝে মাঝে আমার মনের মধ্যে ভাসিয়া উঠে।” (সাহিত্য স্রোত, ১ম ভাগ, শোকনৈবেদ্য, স্বর্ণকুমারী দেবী)
সত্যেন্দ্র জননী সারদাদেবী কিন্তু প্রথমে ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের বাইরে বেড়াতে নিয়ে যাওয়াটা প্রসন্ন মনে গ্রহণ করতে পারেননি; এই প্রসঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথ নিজেই জানিয়েছিলেন যে, সেজন্য তাঁকে তাঁর মায়ের কাছে অনুযোগ শুনতে হয়েছিল—
“আমি ছেলেবেলা থেকেই স্ত্রী-স্বাধীনতার পক্ষপাতী। মা আমাকে অনেক সময় ধমকাইতেন— ‘তুই মেয়েদের নিয়ে মেমদের মত গড়ের মাঠে ব্যাড়াতে যাবি নাকি?’ …” (আমার বাল্যকথা, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, পৃ- ৫)
স্বর্ণকুমারী দেবীর স্মৃতিচারণ থেকে জানতে পারা যায় যে, মায়ের সেই অনুযোগে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে সত্যেন্দ্রনাথ পরম ধৈর্য্য সহকারে সেবিষয়ে মায়ের মনোভাব পরিবর্তন করবার জন্য তাঁকে অবিরত বুঝিয়ে গিয়েছিলেন—
“অন্তঃপুরের অবস্থা সংশোধনের জন্য মাতাকেও ইনি ক্রমাগত ভজাইতেন।” (আমাদের গৃহে অন্তঃপুরশিক্ষ্য ও তাহার সংস্কার, স্বর্ণকুমারী দেবী, প্রদীপ, ভাদ্র, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ)
তাঁর সেই প্রচেষ্টার ফলেই ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের নিয়ে মেমদের মত গড়ের মাঠে বেড়াতে যাওয়ার ব্যাপারে তাঁর মায়ের অনুযোগের কথা ধীরে ধীরে সত্যে রূপান্তরিত হয়েছিল; এবং শেষপর্যন্ত সারদাদেবীও সেবিষয়ে সায় না দিয়ে থাকতে পারেননি—
“অল্পদিনের মধ্যেই মাতার এই বাণীকে তিনি সফলতা দান করিলেন। মা যে ইহাতে অসন্তুষ্ট হইয়াছিলেন একথা বলিতে পারি না।” (সাহিত্য স্রোত, ১ম ভাগ, শোকনৈবেদ্য, স্বর্ণকুমারী দেবী)
জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে সত্যেন্দ্রনাথ— ‘আশৈশব মহিলা-বন্ধু’ —ছিলেন। হাতে শত কাজ থাকলেও তিনি বাড়ির মেয়েদের বাইরে নিয়ে যাওয়ার ভার সানন্দে বহন করতেন। স্বর্ণকুমারী দেবীর কথায়—
“বাড়ীর মেয়েরা মিউজিয়াম বা পশুশালা বা কোন বক্তৃতা শুনিতে যাইতে চাহিলে মেজদাদা অমনি শত কাজ শত অসুবিধা সত্ত্বেও তাঁহাকে সঙ্গে করিয়া যথাস্থানে লইয়া যাইতেন।” (সাহিত্য স্রোত, ১ম ভাগ, শোকনৈবেদ্য, স্বর্ণকুমারী দেবী)
আবার মহর্ষির কাছে মেয়েদের যখন কোন আবেদন থাকত, তখন তাঁদের ‘মুরুব্বি’ হয়ে সত্যেন্দ্রনাথই তাঁর পিতার কাছে অসঙ্কোচে সেসব কথা নিবেদন করতেন। এই প্রসঙ্গে স্বর্ণকুমারী দেবী বলেছিলেন—
“বাড়ীর মেয়েরা সকলেই জানিত মেজদাদার মত সহায়বন্ধু তাঁহাদের আর কেহ নাই, তাঁহার উপর সকলেরই বিশ্বাস ছিল অসীম। বাস্তবিকপক্ষে মহিলাদিগের সর্ব্বতভাবে এমন মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী বন্ধু ও নেতার উপযুক্ত এমন উদার মহদন্তঃকরণ ব্যক্তি সংসারে কম দেখিতে পাওয়া যায়।”
বিলাতযাত্রা করবার আগেই ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরের ‘কয়েদখানাকে’ তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। মুসলমান রীতির অনুকরণে ও মধ্যযুগে মুসলমানদের হাত থেকে আত্মরক্ষা করবার জন্যই ওই অবরোধ প্রথার উৎপত্তি হয়েছিল বলে তিনি স্থিরবিশ্বাস পোষণ করতেন। বিলাতে পৌঁছানোর পরে সেখানে তিনি সামাজিক ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে স্ত্রী-পুরুষের কর্মচঞ্চল স্বচ্ছন্দ জীবনপ্রবাহ দেখে অভিভূত হয়েছিলেন। তাই দেশে ফিরে ফিরে আসবার পরে অবরোধ প্রথা উন্মোচন করবার ব্যাপারে তিনি দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ হয়েছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ মুগ্ধবিস্ময়ে বিদেশে— ‘গার্হস্থ্য জীবনে মেয়েদের মোহন সুন্দর প্রভাব’ ও ‘বিবাহিতা অবিবাহিতা রমণী’দের ‘সমাজের বিবিধ মঙ্গলব্রতে’ উৎসর্গীকৃত জীবন দেখেছিলেন। সেটার সঙ্গে তুলনায় তাঁর নিজের দেশের মেয়েদের জীবন— ‘পর্দার অন্ধকারে কি খর্বিকৃত বদ্ধ’ —সেকথা তিনি সখেদে অনুভব করেছিলেন। (আমার বাল্যকথা, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, পৃ- ৫) অবিরত সেই অবরোধ প্রথা উন্মোচনের চিন্তা— বিদেশেও তাঁর রাত্রির স্বপ্নকেও আচ্ছন্ন করেছিল। যে ‘ঝরকা’ তখন অন্তঃপুরবাসিনীদের বাইরের জগৎ থেকে পৃথক করে রেখেছিল, সেটাকে ভেঙ্গে ফেলবার অস্থিরতায় তাঁর সুখনিদ্রাও ব্যাহত হয়েছিল।
“স্বপ্নে দেখিলাম যেন আমি বাড়ী ফিরিয়া গিয়াছি। … হঠাৎ আমাদের বাড়ীর ভিতরকার কাঠের ঝরকার দিকে নজর পড়িল। তাহা সহ্য করিতে পারিলাম না। কৈলাস (মুখয্যেকে) আবার ডাকাইয়া বলিলাম, যে পর্য্যন্ত ও ঝরকা না ভাঙ্গিয়া ফেলিবে সে পর্যন্ত আমি একগ্রাস অন্ন মুখে করিব না, এক বিন্দু জল পান করিব না। এই কথাগুলি এমন জোরে কুপিতভাবে বলিলাম যে আমার সর্বশরীর কাঁপিতে লাগিল ও ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। ইহাতেই তুমি বুঝিতে পার যে আমি তোমাদের জেলখানার যন্ত্রণা কত মনে করি।” (University Hall, Gordon Square থেকে স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনীকে লেখা সত্যেন্দ্রনাথের পত্র; ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ১৮৭৪ সাল)
দেশে ফিরে ঠাকুরবাড়ির মুক্তাঙ্গনে নিজেদের পরিবারের অন্তঃপুরবাসিনীদের প্রতিষ্ঠা করতে না পারা পর্যন্ত তাঁর মন শান্তি পায়নি। বিদেশ বাসকালে দেশের অন্তঃপুর প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর মন যে চরম বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল, সেকথা সেখান থেকে তাঁর স্ত্রীকে লেখা একটি চিঠির মাধ্যমে জানতে পারা যায়
“স্ত্রীলোক জীবনউদ্যানের পুষ্প। —তাঁহাদের বায়ু ও আলোক হইতে লইয়া কেবল ঘরের মধ্যে শীর্ণ ও বিশীর্ণ করিয়া রাখিলে কি মঙ্গলের সম্ভাবনা।” (১৬ই নভেম্বর, ১৮৬৩ সাল)
স্ত্রীলোকের মর্যাদাই যে তৎকালীন ইউরোপীয় সমাজের উন্নতিকে ত্বরান্বিত করেছিল, এই স্থির বিশ্বাস নিয়েই তিনি জ্ঞানদানন্দিনীকে লিখেছিলেন—
“এখানকার জনসমাজের যাহা কিছু সাধু সুন্দর প্রশংসনীয়— স্ত্রীলোকদের সৌভাগ্যই তাহার মূল। আমাদের দেশে এরূপ সৌভাগ্য কবে হইবে? যেখানে স্ত্রীলোকদের কোন বিষয়ই কর্তৃত্ব নাই, যেখানে দেশাচার, ভর্তার আদেশ ও পরের বাক্যই তাঁহাদের জীবনের নিয়ম সেখান হইতে স্ত্রী-সৌভাগ্য এখনো অনেক দূর।” (১৬ই নভেম্বর, ১৮৬৩ সাল; পুরাতনী, ২নং, স্ত্রীর প্রতি পত্র)
তাই দেশে ফিরে এসে নিজের স্ত্রীর জীবনের বিকাশের মাধ্যমেই অবরোধ প্রথা উন্মোচন করবার বিষয়ে তিনি সফলকাম হতে পেরেছিলেন।
ইউরোপীয় সমাজের মুক্ত প্রাণচঞ্চল তরঙ্গের স্পর্শ জ্ঞানদানন্দিনীও কিছুদিন লাভ করে সুশিক্ষিতা হয়ে নিজের গার্হস্থ্যজীবন শুরু করুন, এটাই সত্যেন্দ্রনাথের কামনা ছিল। এই কারণেই নিজের স্ত্রীকে তিনি লিখেছিলেন—
“আমি থাকিতে থাকিতে তুমি এখানে আসিতে পারিলে আমি কি সুখী হইব। তাহা হইলে এ দেশে যাহাতে তোমার সুন্দররূপ রক্ষা ও শিক্ষা হয় তাহার উপায় করিয়া যাইতে পারি।” (১৮ই জানুয়ারি, ১৮৬৪ সাল)
জ্ঞানদানন্দিনীর শিক্ষার জন্য প্রকৃত সংসার জীবনে প্রবেশ করতে কিছু বিলম্ব হলেও স্ত্রীর উন্নতির জন্য সে বিলম্বকে বরণ করতে সত্যেন্দ্রনাথ প্রস্তুত ছিলেন। জ্ঞানদানন্দিনীকে তাঁর লিখিত একটি পত্র থেকে জানা যায় যে, মহর্ষিকেও তিনি সেই একই আভাস দিয়েছিলেন—
“আমি বাবামহাশয়কে এক পত্র লিখিয়াছি, আমার ইচ্ছা যে তিনি তোমাকে ইংলণ্ডে প্রেরণ করেন। আমি বাবামহাশয়কে লিখিয়াছি যে যেমন উৎকৃষ্ট বীজ ফলিবার জন্য উপযুক্ত সরস জমিকে প্রতীক্ষা করে আমি তোমার জন্য সেইরূপ প্রতীক্ষা করিয়া থাকিব।” (১১ই জানুয়ারি, ১৮৬৪ সাল)
কিন্তু এবিষয়ে সত্যেন্দ্রনাথের প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মহর্ষি তাঁর সেই অনুরোধ অনুমোদন করেননি; কারণ— তাতে তৎকালীন ‘অন্তঃপুরের মানমর্যাদা’ ব্যাহত হত। পিতার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরে তাঁর হৃদয়ে স্ত্রী-স্বাধীনতার অগ্নি আরও প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছিল, এবং যতই পর্বতপ্রমাণ বাধা আসুক না কেন— সবকিছুকে উল্লঙ্ঘন করবার শক্তি তাঁর মধ্যে জেগে উঠেছিল।
“বাবা-মহাশয়কে লিখিলাম— কিন্তু আমার সমুদয় যত্নই ব্যর্থ হইল। বাবা মহাশয় চান আমি যেন অন্তঃপুরের মানমর্যাদার উপর হস্তক্ষেপ না করি, অর্থাৎ তোমাকে চিরজীবনে মত চারিপ্রাচীরের মধ্যে বন্ধ করিয়া রাখি। আমি ত ভাই বুঝিতে পারি না বাবামহাশয়ের এই ইচ্ছা কেমন করিয়া রক্ষা করি। তোমাকে আমি কারাবন্ধ রাখিয়া কখনই সুখী থাকিতে পারিব না।” (জ্ঞানদানন্দিনীকে লিখিত সত্যেন্দ্রনাথের পত্র, ২রা জুলাই ১৮৬৪ সাল)
তাই দেশে ফিরে এসেই তিনি ‘স্ত্রী- স্বাধীনতার দ্বার খোলবার’ প্রথম সুযোগটিকেই গ্রহণ করেছিলেন। তখন বোম্বাই তাঁর প্রথম কর্মস্থল হওয়ার ফলে সেদিক থেকে তিনি লাভবান হয়েছিলেন। দূরদর্শী মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ততদিনে সমাজজীবনে ভাঙ্গনের আভাস পেয়েছিলেন। তিনি তখন বুঝতে পেরেছিলেন যে, সেবারে সত্যেন্দ্রনাথকে সেবিষয়ে অনুমতি না দিলে ফলাফল হিতে বিপরীত হতে পারে। তবে সেবারে অনুমতি দিলেও অন্তঃপুরের প্রাচীন প্রথা যাতে অক্ষত থাকে— সেদিকেও তিনি সত্যেন্দ্রনাথকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন।
“অসূর্যস্পশ্যা কুলবধূ কর্মচারীর চোখের সামনে দিয়ে বাহির দেউড়ি ডিঙ্গিয়ে গাড়ীতে উঠবেন, এ তাঁর কিছুতেই মনঃপুত হল না।” (আমার বাল্যকথা, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, পৃ- ৬)
পিঞ্জরাবদ্ধ বিহঙ্গিনীকে মুক্ত করবার আকাঙ্ক্ষায় সত্যেন্দ্রনাথের হৃদয় তখন দৃঢ় সঙ্কল্পে বদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাই প্রথম পদক্ষেপে অন্তঃপুরের প্রাচীনপ্রথা মেনেই তিনি ঠাকুরবাড়ির কুলবধূ জ্ঞানদানন্দিনীকে নিজের সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন।
“স্ত্রীকে মেজদাদা লইয়া যাইতেছেন বোম্বাইসমুদ্র পার, কিন্তু তখনো অন্তঃপুর হইতে তাঁহাকে বহির্ব্বাটির প্রাঙ্গণ পর্যন্ত হাঁটাইয়া গাড়ী চড়াইতে পারিলেন না। অগত্যা পাল্কী করিয়া তাঁহাকে জাহাজে উঠিতে হইল।” (আমাদের গৃহে অন্তঃপুর শিক্ষা ও তাহার সংস্কার, স্বর্ণকুমারী দেবী, প্রদীপ, ভাদ্র, ১৩০৫ বঙ্গাব্দ)
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, তখনকার ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরে প্রচলিত থাকা প্রাচীনপ্রথা সম্পর্কে স্বর্ণকুমারী দেবী জানিয়েছিলেন—
“তখন অন্তঃপুরে অবরোধপ্রথা পূর্ণ মাত্রায় বিরাজমান। তখনো মেয়েদের একই প্রাঙ্গণের এ বাড়ী যাইতে হইলে ঘেরা-টোপ মোড়া পাল্কীর সঙ্গে প্রহরী ছোটে, তখনো নিতান্ত অনুনয় বিনয়ের গঙ্গা-স্নানে যাইবার অনুমতি পাইলে বেহারারা পাল্কীশুদ্ধ তাঁহাকে জলে চুবাইয়া আনে।” (আমাদের গৃহে অন্তঃপুর শিক্ষা ও তাহার সংস্কার, স্বর্ণকুমারী দেবী, প্রদীপ, ভাদ্র, ১৩০৫ বঙ্গাব্দ)
মহর্ষি যে জ্ঞানদানন্দিনীর বোম্বাই যাত্রা নিয়ে কোনধরণের ‘উচ্চবাচ্য’ করেননি— সেটাকেই সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর যথালাভ বলে মেনে নিয়েছিলেন। কারণ— সমাজসংস্কারের বিষয়ে সেযুগের অনেকেই মহর্ষিকে ‘conservative’ বলে জানলেও, সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর কাজকর্ম বিশ্লেষণ করে বলেছিলেন যে— নিজের জীবনের প্রথমদিকে তিনি যেরকম সমাজসংস্কার করেছিলেন, সেযুগের অনেকেই সেসব করতে পারেননি। কিন্তু ‘বয়সের সঙ্গে সঙ্গে’ ও ‘বহুদর্শনের অভিজ্ঞতায়’ তিনি কিছুটা ‘conservative’ হয়ে পড়েছিলেন বলে— ‘সাবধানে পা ফেলে মাটি পরীক্ষা করে চলতে’ চাইতেন; তাঁর সঙ্গে তুলনায় সত্যেন্দ্রনাথ— ‘ঘোর radical’ —ছিলেন। (আমার বাল্যকথা, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, পৃ- ২৪) তখন তারুণ্যের প্রচণ্ড আবেগে তিনি যেটাকে একবার সত্যি বলে মেনে নিতেন, সেটাকে যে কোনভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করবার প্রবল আগ্রহে তিনি অধীর হয়ে উঠতেন। সৌদামিনী দেবী মহর্ষি প্রসঙ্গে যে কথাটা বলেছিলেন, সেটা সত্যেন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও খেটে যায়—
“একবার পথে বাহির হইলে সে পথে চলা তেমন কঠিন নহে কিন্তু পথ দেখানোই শক্ত।” (পিতৃস্মৃতি, সৌদামিনী দেবী)
মহর্ষির কাছে সম্মতি না পেলে সত্যেন্দ্রনাথের ঈপ্সিত কার্য সাধন করা যে সহজ হত না, স্বর্ণকুমারী দেবীও সেকথা স্পষ্ট করেই জানিয়েছিলেন। (সাহিত্য স্রোত, ১ম ভাগ, শোকনৈবেদ্য, স্বর্ণকুমারী দেবী) পরবর্তীকালে সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর ‘ছেলেবেলার কথা’–য় বলেছিলেন যে, পিতার মতের অনুবর্তী হয়ে সবকাজ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় নি— কিছু কিছু অপ্রিয় কাজও তাঁকে করতে হয়েছিল। কিন্তু মহর্ষি তাঁর কোন কাজের পথেই সুকঠোর বিঘ্নস্বরূপ হয়ে দাঁড়াননি। কারণ—
“তিনি (বাবামশায়) আমাদের মনের উপর উদ্যমের উপর খড়্গহস্ত হলে হয়ত অন্যরকম ভাব দাঁড়াত। আমার সকল কার্য্য যে তাঁর অমতে— তা বলা যায় না— হয়ত কতক তাঁর মতের সঙ্গে মধ্যে মধ্যে কতক বা তার অপ্রিয় ও হতে পারে— কিন্তু আমাদের জীবনপথে তিনি কঠোরভাবে কোন বিঘ্ন বাধা উপস্থিত করেন নি।” (ছেলেবেলার কথা, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর)
মহর্ষি পরিবারে স্ত্রী-স্বাধীনতার প্রধান উদ্যোগী সত্যেন্দ্রনাথের পক্ষে এটি সহায়ক হয়েছিল। নিজের স্ত্রীকে তিনি যেমন দেশের দৃষ্টান্তস্বরূপ করতে চেয়েছিলেন, তেমনি নিজের জীবনাচরণের মধ্যে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষায় তাতে সফলকাম হয়েছিলেন। বোম্বাইতে থাকবার সময়ে সেখানকার পার্সী পরিবারের মধ্যে স্ত্রী-শিক্ষা ও স্ত্রী-স্বাধীনতার অবাধ স্ফুরণ এবং উদ্যানে, পথেপ্রান্তরে, উৎসবে বর্ণাঢ্য পোষাকে নারীসমাজের অবাধ সঞ্চরণ— সত্যেন্দ্রনাথকে মুগ্ধ করেছিল। সেজন্যই তৎকালীন বাংলার নারীদের অবস্থা উন্নত করবার জন্য তিনি বোম্বাইয়ের আদর্শ গ্রহণ করবার পক্ষপাতী ছিলেন। তখনকার বোম্বাই শহরকে দেখে সেকালের ‘নারীবর্জিত কলকাতার দৈন্য’ পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথও অনুভব করেছিলেন।
সবচেয়ে যাহা দেখিয়া হৃদয় জুড়াইয়া যায় তাহা এখানকার নরনারীর মেলা। “নারীবর্জিত কলিকাতার দৈন্যটা যে কতখানি তাহা এখানে আসিলেই দেখা যায়। কলিকাতায় আমরা মানুষকে আধখানা করিয়া দেখি, এইজন্য তাঁহার আনন্দরূপ দেখা যায়। নিশ্চয়ই সেই না-দেখার একটা দণ্ড আছে।” (পথের সঞ্চয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পৃ- ২৮)
সত্যেন্দ্রনাথের প্রভাবে তাঁর অনুজদের চিন্তাধারাও পরিবর্তিত হয়েছিল।
অবরোধ-প্রথা উচ্ছেদের দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসেবে দু’বছর পরে ছুটিতে পাল্কী করে বধূকে বাড়িতে নিয়ে না এসে সত্যেন্দ্রনাথ সরাসরি গাড়ি করেই জোড়াসাঁকোয় উপস্থিত হয়েছিলেন। এর ফলস্বরূপ ঠাকুরবাড়িতে সেদিন ‘শোকাভিনয়’ অনুষ্ঠিত হলেও সত্যেন্দ্রনাথ তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি।
“ঘরের বৌকে মেমের মত গাড়ী হইতে সদরে নামিতে দেখিয়া সেদিন বাড়ীতে যে শোকাভিনয় ঘটিয়াছিল তাহা বর্ণনার অতীত। দারোয়ান ভূত্যগণ মাথা হেঁট করিয়া রহিল!” (শোকনৈবেদ্য, সাহিত্য স্রোত, ১ম ভাগ, স্বর্ণকুমারী দেবী)
বাইরে যাওয়ার উপযুক্ত পরিচ্ছদে সজ্জিতা জ্ঞানদানন্দিনী সেদিন শ্বশুরগৃহে এলেও সেখানকার অন্তঃপুরবাসিনীরা তাঁকে নিজেদের থেকে দূরে দূরেই রেখেছিলেন। তখন পিতৃভবনে এসেও সত্যেন্দ্রনাথকে প্রায় একঘরে হয়েই থাকতে হয়েছিল।
“বাড়ীতেও এই সময় ইহারা একরূপ একঘরে হইয়া রহিলেন। মেজদাদা তাঁহার পত্নীর সহিত একত্রে টেবিলে বসিয়া আহার করিতেন। বাড়ির অন্যান্য মেয়েরা বধূঠাকুরাণীর অসঙ্কোচে খাওয়াদাওয়া করিতে বা মিশিতে কুণ্ঠিত হইতেন।” (আমাদের গৃহে অন্তঃপুর শিক্ষা ও তাহার সংস্কার, স্বর্ণকুমারী দেবী, প্রদীপ, ভাদ্র, ১৩০৫ বঙ্গাব্দ)
নিজের পরিবারে সেই দ্বিধা ও সঙ্কোচ দেখে সত্যেন্দ্রনাথ তখন ব্যথিত হলেও এই বিশ্বাস রেখেছিলেন যে, একদিন সবকিছু সহজ হয়ে যাবে।
স্ত্রী-স্বাধীনতার তৃতীয় পদক্ষেপ হিসেবে সত্যেন্দ্রনাথ তৎকালীন কলকাতার গভর্ণমেন্ট হাউসে অনুষ্ঠিত একটি পার্টিতে জ্ঞানদানন্দিনীকে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই বিষয়টি তখনকার দিনে যে কিরকম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল, সেকথা ১৮৬৭ সালের ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকা থেকে জানা যায়। ১৮৬৬ সালের ২৭শে ডিসেম্বর তারিখে জাতীয় বস্ত্র পরিধান করে জ্ঞানদানন্দিনী সেই পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর সেদিনকার পরিচ্ছদ গ্রামবার্তা প্রকাশিকার সংবাদ পরিবেশক কর্তৃক প্রশংসিত না হলেও সেযুগের হিন্দুঘরের রমণীদের মধ্যে জ্ঞানদানন্দিনীই যে প্রথম গভর্ণমেন্ট হাউসে গিয়েছিলেন— একথা অবশ্যই ঘোষিত হয়েছিল।
“সংবাদসার— ২৭ ডিসেম্বর ১৮৬৬ বৃহস্পতিবার গবর্ণর জেনারেল বাহাদুরের বাটীতে যে মজলিশ হইয়াছিল তাহাতে শ্রীযুক্ত বাবু সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী আমাদের জাতীয় বস্ত্র পরিধান করিয়া উক্ত মন্দিরে গিয়াছিলেন। ইতিপূর্ব্বে কোন হিন্দু রমণী গবর্ণমেন্ট হাউসে যান নাই। তাঁহার অন্য রকম সভ্য-পরিচ্ছদ পরিধানপুর্ব্বক গমন করিলে ভাল হইত।” (গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা, জানুয়ারি ১৮৬৭ সাল; সাহিত্য-সাধক চরিতমালা, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়)
এই প্রসঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথ নিজেও লিখেছিলেন—
“সে কি মহা ব্যাপার। শত শত ইংরাজ মহিলার মাঝখানে আমার স্ত্রী— সেখানে একটি মাত্র বঙ্গবালা।” (আমার বাল্যকথা, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, পৃ- ৬)
জ্ঞানদানন্দিনীর লাটসাহেবের বাড়িতে যাওয়ার কথা ঠাকুর পরিবারের অনেকেই তাঁদের স্মৃতিকথায় লিখলেও, তাঁদের সেইসব বর্ণনার মধ্যে কিছু কিছু অনৈক্য চোখে পড়ে। অন্যদিকে জ্ঞানদানন্দিনীর আত্মকথা থেকে জানা যায় যে, সত্যেন্দ্রনাথ তখন অসুস্থ থাকবার জন্য তিনি নিজে সেখানে না গিয়ে সম্ভবতঃ ‘Lady Phear’–এর সঙ্গে জ্ঞানদানন্দিনীকে সেখানে পাঠিয়েছিলেন। জ্ঞানদানন্দিনী সেই লাট সাহেবের নাম— ‘বোধহয় লর্ড লরেন্স’ —বলেছিলেন। সেদিন বিবিধ ভূষনে সুসজ্জিতা জ্ঞানদানন্দিনীকে সেখানে দেখে অনেকেই তাঁকে ভূপালের বেগম বলে ভেবেছিলেন বলে জানা যায়। কারণ— তখন শুধুমাত্র ভূপালের বেগমই ওরকমভাবে বাইরে বের হতেন। জ্ঞানদানন্দিনী পরে শুনে তাঁর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছিলেন যে, ঠাকুরগোষ্ঠীর অনেকেই সেই ঘটনায় আহত হয়ে সেখান থেকে চলে গিয়েছিলেন; তবে তিনি কারও নাম উল্লেখ করেননি। এছাড়া তিনি একথাও জানিয়েছিলেন যে, সত্যেন্দ্রনাথের ছেলেবেলার একজন শিক্ষক তাঁর পরিচয় পেয়ে আগ্রহী হয়ে সেখানে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তবে সত্যেন্দ্রনাথ এপ্রসঙ্গে, অর্থাৎ— সেদিন ঠাকুরগোষ্ঠীর যাঁরা ওই ঘটনায় আহত হয়ে গভর্ণমেন্ট হাউস ত্যাগ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রসন্নকুমার ঠাকুরের নাম বিশেষ করে উল্লেখ করেছিলেন—
“তখন প্রসন্নকুমার ঠাকুর জীবিত ছিলেন। তিনি ত ঘরের বৌকে প্রকাশ্য স্থলে দেখে রাগে লজ্জায় সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে গেলেন।” (আমার বাল্যকথা, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, পৃ- ৬)
অন্যদিকে সরলা দেবীর লেখায় গভর্ণমেন্ট হাউসে পার্টির প্রসঙ্গে জ্ঞানদানন্দিনীকে দেখে যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর প্রমুখের লজ্জায় পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। (জীবনের ঝরাপাতা, সরলা দেবী চৌধুরাণী, পৃ- ১০৬) সুতরাং ঘটনাটির বর্ণনায় স্থানের ঐক্য থাকলেও কালের ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটা অসম্ভব কিছু নয়। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, স্যার জন লরেন্স ১৮৬৪ থেকে ১৮৬৯ সাল পর্যন্ত ভারতের গভর্নর জেনারেল ছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ ১৮৬৬ ও ১৮৬৭ সালে— দু’বারই শারীরিক অসুস্থতার জন্য ছুটি নিয়েছিলেন। হয়ত এর কোন একসময়ে বিশেষ অসুস্থ থাকবার জন্য তিনি জ্ঞানদানন্দিনীর অন্তরে আত্মশক্তি জাগ্রত করবার উদ্দেশ্য তাঁকে একাই সেই পার্টিতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তদানীন্তন কলকাতা হাইকোর্টের একজন বিচারকের স্ত্রী ‘Lady Phear’ সত্যেন্দ্রনাথদের বিশেষ পরিচিত ছিলেন বলে সত্যেন্দ্রনাথের পত্র থেকে আভাস পাওয়া যায়।
“আমি যে Mrs, Phear কে রহস্য করিয়া মনোমোহনের আবার বিবাহ হইলে তাহার স্ত্রীর Bridesmaid হইতে বলিয়াছিলাম— তাহাতে একটি বিলক্ষণ ভুল হইহাছিল, এখন বুঝিতেছি, কেননা অবিবাহিতা স্ত্রী ভিন্ন Bridesmaid হয় না।” (জ্ঞানদানন্দিনীকে লিখিত সত্যেন্দ্রনাথের পত্র, Bombay, 3rd June, 1868)
জ্ঞানদানন্দিনীর স্মৃতিকথার বিভিন্ন জায়গায় অনেকবার লাটসাহেবের বাড়ির পার্টিতে তাঁর যোগ দেওয়ার কথা পাওয়া যায়, যদিও তাঁর— ‘হাঁটু নুইয়ে Courtesy করাটা ভাল অভ্যাস হয় নি।’ সুতরাং— লাট সাহেবের বাড়িতে জ্ঞানদানন্দিনীকে প্রথমে নিজে নিয়ে গিয়ে সংকোচ কাটিয়ে দেওয়ার পরে সত্যেন্দ্রনাথ একাই তাঁকে সেখানে পাঠিয়েছিলেন বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। আর যতবার তিনি সেখানে গিয়েছিলেন, সম্ভবতঃ ততবারই পাথুরেঘাটা ঠাকুরবংশের কারো না কারো বিরাগভাজন হয়েছিলেন। শেষপর্যন্ত সত্যেন্দ্রনাথের প্রভাবে ধীরে ধীরে—
“এমন দিন এল ব্যবহারগত যেসব সংস্কারে মহর্ষির পুত্রকন্যার অগ্রণী হয়েছিলেন সমস্ত ঠাকুরগোষ্ঠীর শাখাপ্রশাখায় তা অনুপ্রবিষ্ট হল— অন্তঃপুরপ্রথা উঠে গেল, স্ত্রী-শিক্ষার প্রচার হল, সঙ্গীতানুশীলন মেয়েদের জীবনের অঙ্গ হল। ভেদ রয়ে গেল শুধু পূজা ও উপাসনাপদ্ধতিতে।” (জীবনের ঝরাপাতা, সরলাদেবী চৌধুরাণী, পৃ- ৫৪)
স্ত্রী-স্বাধীনতার যে উদ্যোগ সত্যেন্দ্রনাথ নিজের পরিবারে নিয়েছিলেন, সেটা পরবর্তীকালে দেশময় পরিব্যাপ্ত হয়েছে দেখে তাঁর মনস্কামনা অনেকটাই পূর্ণ হয়েছিল বলে তিনি নিজের মুখেই সেকথাটা বলে তৃপ্তি পেয়েছিলেন। (আমার বাল্যকথা, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, পৃ- ৭)
অসীম ধৈর্যে নানা ধিক্কারকে উপেক্ষা করে নিজের অটল বিশ্বাস স্থির হয়ে থাকবার পুরস্কার তিনি তাঁর জীবনে শেষপর্যন্ত পেয়েছিলেন। সেই সময়কার অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে স্বর্ণকুমারী দেবী লিখেছিলেন—
“মেজদাদা আর নিজের ঘরে একঘরে নহেন— দলে পুষ্ট।”
এরপরে সত্যেন্দ্রনাথের কর্মস্থলে তাঁর আত্মীয়েরা গিয়েছিলেন। তখন বোম্বাই অঞ্চলের ‘স্ত্রী-স্বাধীনতার মুক্তবায়ু’ সেবন করে তাঁদের অনেকেরই চিন্তাধারার আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল। আর এবিষয়ে সত্যেন্দ্রনাথের নিজের মত ছিল—
“যাঁহারা স্ত্রীকে লইয়া বাহিরে যান না তাঁহাদের নিকট স্ত্রীকে বাহির না করিলে তাঁহাদের শিক্ষা হইবে কিসে? অভ্যাস পরিবর্ত্তন হইবে কেমন করিয়া?” (শোকনৈবেদ্য, সাহিত্য স্রোত, ১ম ভাগ, স্বর্ণকুমারী দেবী)
তিনি তাঁর কথা ও কাজের মধ্যে কোন প্রভেদ রাখেননি। এমনকি বোম্বাই প্রবাসে থাকবার সময়েও সেখানকার বিভিন্ন সভা সমিতি ও ‘পানসুপারি’–র নিমন্ত্রণে বাড়ির মেয়েরা আমন্ত্রিত না হলে তিনি সেসব অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন না। স্বর্ণকুমারী দেবীর কথায়—
“মেজদাদার স্বভাবে স্ত্রী-সম্মান এতই ওতঃপ্রোতভাবে বর্তমান ছিল যে কোন ভদ্রপুরুষে স্ত্রীজাতির প্রতি অসম্মান দৃষ্টিতে চাহিতে পারে, ইহা তিনি অন্তরে ধারণা করিতেও অক্ষম ছিলেন।” (শোকনৈবেদ্য, সাহিত্য স্রোত, ১ম ভাগ, স্বর্ণকুমারী দেবী)
ছুটিতে জোড়াসাঁকোয় এসে নিজের পরিবারের অবগুণ্ঠনবর্তী ভ্রাতৃবধূদের জড়সড ভাব ও দূরত্বকে তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাঁদের সহজ সাবলীল অথচ পরিমার্জিত আচরণই সত্যেন্দ্রনাথের কাম্য ছিল। ইউরোপীয় প্রথায় যেটুকু ভাল রয়েছে, সেসব তিনি নির্দ্বিধায় তা গ্রহণ করেছিলেন বলে ইন্দিরাদেবী তাঁর ‘সত্যেন্দ্রস্মৃতি’ প্রবন্ধে জানিয়েছিলেন—
“ভ্রাতৃবধূদের মাথার কাপড় টেনে খুলে দিতেন শুনেছি, অথচ তাঁরই আপন দাদা জ্যাঠামশায় আব্রু সম্বন্ধে খুবই রক্ষণশীল ছিলেন।” (সত্যেন্দ্রস্মৃতি, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, বিশ্বভারতী পত্রিকা, ৩য় বর্ষ, শ্রাবণ-আশ্বিন, ১৩৫২ বঙ্গাব্দ)
ইংরেজদের ভোজনগৃহে নরনারীর মেলা বসত। ইউরোপীয় সভ্যজগতের সেই একত্র ভোজনরীতি পারসী পরিবারেও সমাদৃত হয়েছিল; এবং সত্যেন্দ্রনাথের কাছেও সেই রীতি যথার্থই অনুকরণযোগ্য বলে মনে হয়েছিল। সেযুগের মারাঠী পরিবারে পারসী পরিবারের মত একত্রভোজন প্রথা প্রচলিত না হলেও তাঁদের ভোজনগৃহে স্ত্রীরা যে তৎকালীন বঙ্গদেশীয়া রমণীদের মত পর্দার অন্তরালে না থেকে বলয়ঝংকৃত হস্তে অতিথিদের পরিবেশন করতেন— এটি সত্যেন্দ্রনাথকে গভীর তৃপ্তি দিয়েছিল। তাঁর মত ছিল যে— গৃহিনীর উপস্থিতি খাদ্যসম্ভারের আয়োজনের গৌরব বৃদ্ধি করে; কিন্তু সেই তুলনায় তাঁর স্বদেশের গৃহিণীহীন আপ্যায়নকে তিনি শ্রীহীন বলেই মনে করেছিলেন।
“তবে পরিবেশনের বেলায় গৃহিনীর আগমনেও কতকটা তৃপ্তি লাভ করা যায়। আমাদের মত নয় যে, কোন গৃহস্থের গৃহে নিমন্ত্রণে গেলে গৃহকর্ত্রী পর্দ্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকেন, তাঁর হাতের বালাগাছাটি পর্য্যন্ত দৃষ্টিপথে পড়ে না।” (আমার বোম্বাই প্রবাস, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, পৃ- ১৯৪)
স্ত্রী-স্বাধীনতা সম্পর্কে তৎকালীন সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তনের জন্য সতেজ যুক্তির প্রদর্শন করে সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর ‘স্ত্রী-স্বাধীনতা’ নামক পুস্তিকাটি লিখেছিলেন বলে অতীতের ঠাকুর পরিবারের অনেকেই জানিয়েছিলেন। কিন্তু বহু অনুসন্ধানের পরেও বর্তমান সময়ের গবেষকরা তাঁর সেই পুস্তিকাটির সন্ধান না পাওয়ার ফলে সেটির রচনাকাল নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে। তবে এই প্রসঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথ নিজেই জানিয়েছিলেন যে, জন স্টুয়ার্ট মিলের ‘Subjection of Women’ নামক গ্রন্থটি পাঠ করেই তিনি তাঁর ‘স্ত্রী-স্বাধীনতা’ পুস্তিকাটি প্রণয়ন করবার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। (আমার বাল্যকথা, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, পৃ- ৫) এই কারণেই সত্যেন্দ্রনাথের বক্তব্যেও মিলের কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়—
“ভারতমহিলা বল, বিদ্যা ও স্বাধীনতা লাভ করিয়া উন্নত হইলে পুরুষেরাও যে সেই উন্নতির ফলভাগী হইবে ইহা কে না স্বীকার করিবে?” (বোম্বাইচিত্র, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, পৃ- ৮৭)
‘বোম্বাইচিত্র’ গ্রন্থে সত্যেন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে, স্ত্রীজাতিকে অবাধ চলাফেরা করবার সুযোগ দিলে পুরুষকেও দায়ে পড়ে সাহসী ও শক্তিমান হতে হবে। তাঁর নিজের ভাষায়—
“আর এক দিক দিয়া দেখ, স্ত্রীরক্ষণের ভার আমাদের হাতে পড়িলে আমাদের বল ও সাহস দায়ে পড়িয়া হইবে কিনা? স্ত্রীকে কোন বিপদ হইতে রক্ষা করিতে হইলে যে দুর্ব্বল সেও সবল হয়— ভীরুও অভয় হয়।” (বোম্বাইচিত্র, পৃ: ৭৮-৭৯)
স্বর্ণকুমারী দেবীর বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, পুরুষের সঙ্গে তুলনায় নারীজাতি যে কোন অংশেই হীন নয়— এই দৃঢ় বিশ্বাস সত্যেন্দ্রনাথের হৃদয়ে বদ্ধমূল ছিল। তাঁর কথায়—
“মেজদাদার কাছে যদি কেহ বলিত বুদ্ধিতে পুরুষ স্ত্রীলোক অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, যদি কেহ বলিত— পুরুষের ন্যায় তাঁহাদের উচ্চশিক্ষা অনাবশ্যক, কার্য্যক্ষেত্রে তাঁহারা পুরুষে অসমকক্ষ, অমনি তিনি গরম হইয়া উঠিতেন, মেয়েদের পক্ষ লইয়া তর্কপরায়ণ হইতেন।” (শোকনৈবেদ্য, সাহিত্য স্রোত, ১ম ভাগ, স্বর্ণকুমারী দেবী)
‘বোম্বাইচিত্র’ গ্রন্থে সত্যেন্দ্রনাথ তৎকালীন বাংলার অন্তঃপুরপ্রথার উল্লেখ করে বলেছিলেন—
“বলিতে কি, অন্তঃপুরপ্রথা আমার নিতান্ত অনিষ্টকারী কুপ্রথা বলিয়া মনে হয়, তাহাতে অবলাদের নিজের সুখস্বাস্থ্যের হানি, সামাজিক হানি। সমাজের অর্দ্ধাঙ্গ অবরুদ্ধ ও বিকল হইলে অপরার্দ্ধ কিরূপে সুশিক্ষিত, সুস্থ সবল হইবে বল?” (বোম্বাইচিত্র, পৃ- ৭৭)
প্রাচীনকালের ভারতে যে এই কুপ্রথার প্রচলন ছিল না, সেকথা সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর ‘আমার বাল্যকথা’ গ্রন্থে জানিয়েছিলেন। নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে ও সন্তানের জননীকে অবরুদ্ধ করে রাখলে সমগ্র জীবনেই যে ক্রীতদাসত্বের অভিশাপ নেমে আসবে— সেকথা পুনার বালিকা বিদ্যালয়ের ‘ইঁটপত্তন’ কালে তৎকালীন বোম্বের গভর্ণর স্যার জেমসও তাঁর ভাষণে বলেছিলেন বলে জানা যায়। মিলের চিন্তাধারার সঙ্গে স্যার জেমস–এর সেই উক্তির গভীর সাদৃশ্য এবং সেই উক্তিটিতে সত্যেন্দ্রনাথের হৃদয়ের সমর্থন থাকবার জন্য তিনি তাঁর ‘বোম্বাইচিত্র’ গ্রন্থে হুবহু সেটিকে উদ্ধৃত করেছিলেন—
“The custom of secluding your women is not sanctioned by antiquity and it is a custom which not only degrades them, but reduces them to abject slavery. You cannot degrade your wives and the mothers of your children from their rightful position in this life without degrading your race to a slavery, that is sure to act injuriously on yourselves.” (বোম্বাইচিত্র, পৃ- ৭৭)
বোম্বাইচিত্র গ্রন্থে সত্যেন্দ্রনাথ আরো বলেছিলেন—
“আমাদের অনেকের ভয় হয় স্ত্রী-লোকেরা বাহিরে গেলে তাঁহাদের কোন বিপদ ঘটিতে পারে। তাহার উত্তর এ ভয় কল্পনা মাত্র, এ মুসলমান রাজ্য নয় যে অত্যাচার-ভয়ে কুল-কামিনীদিগের গৃহরুদ্ধ রাখা আবশ্যক, ইহা ইংরাজরাজ্য, স্ত্রীলোকের সম্মাননা যাহার প্রধান ধর্ম।” (বোম্বাইচিত্র, পৃ: ৭৭-৭৮)
তখনকার মানুষের সেই ভয় যে নিতান্তই অমূলক ছিল, সেকথা সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর নিজের জীবনযাত্রা দিয়েই প্রতিপন্ন করেছিলেন। প্রথমে তিনি যখন বোম্বাইতে তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছিলেন, তখন কত মানুষ তাঁকে কত বিভীষিকা দেখিয়েছিল। কিন্তু শেষে পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল যে সেটা— “মিথ্যা জুজুর ভয় বই আর কিছুই নয়।” এবিষয়ে প্রাচীন শাস্ত্রবচনকেই সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর নিজের আদর্শরূপে উপস্থাপিত করেছিলেন—
“অরক্ষিতা গৃহেরূদ্ধাঃ পুরুষেরাপ্তকারিভিঃ
আত্মানমাত্মনা যান্তু রক্ষেয়ুস্তা সুরক্ষিতাঃ।”
অর্থাৎ— স্ত্রীরা আপ্তপুরুষ কর্তাকে গৃহরুদ্ধ থাকলেও অরক্ষিতা— যাঁরা আপনাদের রক্ষা করতে পারেন তাঁরাই সুরক্ষিতা। এই আত্মরক্ষার শক্তি বাইরে বেরিয়েই উপার্জন করতে হয়। (আমার বোম্বাই প্রবাস, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, পৃ- ৮৭)
পরিশেষে সত্যেন্দ্রনাথের প্রতি স্বর্ণকুমারী দেবীর সশ্রদ্ধ উক্তি দিয়েই এই প্রসঙ্গের সমাপ্তি করা যেতে পারে—
“রীতিমত বিদ্যাচর্চা, শ্বশুর শাশুড়ীর নিকটও কন্যাভাব, গাড়ী করিয়া যাতায়াত, বোম্বাই ফ্যাসানে পরিচ্ছদ পরিধান— এ সকল এখন হিন্দু সমাজনীতির অঙ্গীভূত— আর এ সকলের যিনি প্রবর্তক তাঁহাকে শত বাধা একাকী এক হস্তে উৎপাটন করিতে করিতে অগ্রগামী হইতে হইয়াছে। নিজের বাড়ীর লোকে পর্যন্ত তাঁহার সহিত যোগ দিতে ভয় পাইয়াছে। … কিন্তু-স্ত্রীজাতির উন্নতিতে ইনি এমনই অটলসংকল্প ছিলেন যে এ সাধনার জন্য তিনি কোন বাধাকেই বাধা জ্ঞান করেন নাই, কোন অপমানেই তাঁহাকে নত করিতে পারে নাই।” (শোকনৈবেদ্য, সাহিত্য স্রোত, ১ম ভাগ, স্বর্ণকুমারী দেবী)




