১৮ জুন ১৯৭১: কান্দাপাড়া, সাতগাঁও ও পাগলা দেওয়ান গণহত্যা

১৯৭১ সালের ১৮ জুন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা একাধিক হত্যাযজ্ঞ চালায়। বাগেরহাটের কান্দাপাড়া, কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার সাতগাঁও এবং জয়পুরহাটের পাগলা দেওয়ান সেদিনের তিনটি উল্লেখযোগ্য গণহত্যার স্থান। এসব হত্যাকাণ্ডে সাধারণ গ্রামবাসী, শিক্ষক, শিশু ও শরণার্থীসহ বহু নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান।

কান্দাপাড়া গণহত্যা, বাগেরহাট:
১৮ জুন ছিল শুক্রবার। দুপুরের দিকে কান্দাপাড়া ও আশপাশের গ্রামের মানুষ জুমার নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই সময় রাজাকার কমান্ডার রজ্জব আলী ফকিরের নেতৃত্বে রাজাকারদের একটি বড় দল এলাকায় অভিযান শুরু করে। তারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন দিক থেকে কান্দাপাড়ার দিকে অগ্রসর হয়। একদল বাগেরহাট থেকে মুনিগঞ্জ খেয়া পার হয়ে বাগেরহাট–চিতলমারী সড়কপথ ধরে আসে। অন্যদল মূলঘর ও কুচিবগা খালপথ ব্যবহার করে এলাকায় প্রবেশ করে।

রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যরা আগে থেকেই যাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, তাদের বাড়িতে বাড়িতে অভিযান চালায়। অনেক বাড়ি লুটপাট করা হয়। আটক ব্যক্তিদের কান্দাপাড়া বাজারে নিয়ে আসা হয়। দেলোয়ার হোসেন মাস্টার ও ইব্রাহিম হোসেন মাস্টারকে বাড়িতে না পেয়ে তাদের বসতঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। একই সময়ে কদমতলা গ্রাম থেকেও কয়েকজনকে ধরে আনা হয়।

মোট ২৫ জনকে একত্র করার পর হত্যাকাণ্ড শুরু হয়। সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টারের নেতৃত্বে রাজাকাররা ১৮ জন যুবক, তিনজন বৃদ্ধ এবং দুই শিশুকে হত্যা করে। পরে তাদের মাথা বিচ্ছিন্ন করে লাশের ওপর রাখা হয় এবং বাজারসংলগ্ন সড়কে সারিবদ্ধভাবে ফেলে রাখা হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে মঞ্জুর মোল্লা প্রাণে বেঁচে যান। আরেকজনকে নির্যাতনের পর মুক্তি দেওয়া হয়। সেদিন কান্দাপাড়া গণহত্যায় ২৩ জন শহীদ হন।

বুড়িচংয়ে সাতগাঁও গণহত্যা:
একই দিনে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার সাতগাঁও গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে একটি পরিবারের চার সদস্য নিহত হন। তাদের মধ্যে আবদুল হাকীম উল্লাহ রফিক, যিনি রফিক মাস্টার নামে পরিচিত ছিলেন, স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তাঁর পরিবারে ছিলেন স্ত্রী সাজেদা বেগম, দুই পুত্র কাশেম ও ইকবাল এবং বোন রোকেয়া। এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প স্থাপনের পর পরিবারটি আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল।

১৮ জুন রাত প্রায় ১১টার দিকে পাকিস্তানি সৈন্যরা রফিক মাস্টারের বাড়িতে আসে। সে সময় তিনি বাড়ির বাইরে ছিলেন। ঘরের ভেতরে তাঁর স্ত্রী সেলাইয়ের কাজ করছিলেন, বড় ছেলে পড়াশোনা করছিল এবং ছোট ছেলে ঘুমিয়ে ছিল। সৈন্যরা দরজায় কড়া নাড়লে কাশেম দরজা খুলে দেয়। এরপর তারা ঘরে ঢুকে গুলি চালায়।

গুলির শব্দ শুনে রফিক মাস্টার দ্রুত বাড়িতে ফিরে আসেন। এসে তিনি দেখতে পান, তাঁর স্ত্রী সাজেদা বেগম, দুই ছেলে কাশেম ও ইকবাল এবং বোন রোকেয়া নিহত অবস্থায় পড়ে আছেন। ওই রাতেই একই পরিবারের চারজন সদস্য প্রাণ হারান।

জয়পুরহাটে পাগলা দেওয়ান গণহত্যা:
১৮ জুন, ৪ আষাঢ় ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ। শুক্রবারের জুমার নামাজ চলছিল। সেই সময় পাকিস্তানি সেনারা জয়পুরহাট সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী পাগলা দেওয়ান এলাকায় অভিযান চালায়। তারা মসজিদ ঘিরে ফেলে এবং মুসল্লিদেরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ধরে আনা কয়েকশ মানুষকে একটি পোড়া বাড়ির কাছে জড়ো করে।

আটক ব্যক্তিদের কাছে পাকিস্তানি সেনারা জানতে চায় কেন গ্রাম পাহারার জন্য রাতে ডিউটি দেওয়া হচ্ছে না। ধলাহার স্কুলের শিক্ষক বাহার উদ্দিন উর্দু ভাষায় উত্তর দেন যে ডিউটি দিলে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর উত্তর শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে গুলি করে হত্যা করে।

এরপর আটক ব্যক্তিদের গর্ত খুঁড়তে বাধ্য করা হয়। পরে সেই গর্তের পাশে নিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়। নিহতদের মরদেহ গর্তে ফেলে দেওয়া হয়। চিরলা গ্রামের আবেদ আলী গুরুতর আহত অবস্থায় সেই হত্যাযজ্ঞ থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরে আসেন। পরে তিনি জানান, আঘাতে অজ্ঞান হয়ে পড়ায় তাঁকে মৃত ভেবে গর্তে ফেলে রাখা হয়েছিল। জ্ঞান ফেরার পর তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন এবং পরে ভারতে চিকিৎসা নেন।

নিহতদের মধ্যে চিরলা গ্রামের সইমুদ্দিন, পাহনন্দা গ্রামের নাজির উদ্দিন, কাইমুদ্দিন, গানা সরদার, নিধি গ্রামের সিরাজুল, চকবরকতের নিঝুম সরদার, মমতাজ উদ্দিন এবং মোহাম্মদ আলীর নাম জানা যায়। আরও বহু নিহত ব্যক্তির পরিচয় আজও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

জয়পুরহাট শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ভারত সীমান্তসংলগ্ন পাগলা দেওয়ান এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী একটি শক্তিশালী ঘাঁটি স্থাপন করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে ভারতগামী শরণার্থীদের জন্য এটি ছিল একটি ভয়ঙ্কর মৃত্যুফাঁদ। বগুড়া, পাবনা, নাটোর, নওগাঁ, শিবগঞ্জ ও জয়পুরহাটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে সীমান্তের পথে যাত্রা করা বহু মানুষ এখানে আটক, নির্যাতিত ও নিহত হন। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, নিহতদের গর্তে ফেলে মাটি চাপা দেওয়া হতো।

পাগলা দেওয়ানে পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যবহৃত বাংকারের ধ্বংসাবশেষ আজও সেখানে বিদ্যমান। এলাকাবাসীর কাছে এটি ১৯৭১ সালের গণহত্যা ও নির্যাতনের একটি নীরব সাক্ষ্য হিসেবে রয়ে গেছে।

তথ্যসূত্র:
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র (সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দ্বাদশ খণ্ড)
বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ (দশম খণ্ড)
সংগ্রামের নোটবুক

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!